বুধবার ৪ঠা মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৯শে ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

অভিবাসন প্রক্রিয়াঃ ট্রাম্পের হুমকিতে যা উল্লেখ আছে

সাদিকুর রহমান   |   শনিবার, ২৯ নভেম্বর ২০২৫   |   প্রিন্ট   |   307 বার পঠিত

অভিবাসন প্রক্রিয়াঃ ট্রাম্পের হুমকিতে যা উল্লেখ আছে

ফাইল ছবি

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বৃহস্পতিবার ‘তৃতীয় বিশ্ব’ থেকে অভিবাসনের প্রক্রিয়া স্থায়ীভাবে বন্ধের হুমকি দেন। কোন দেশগুলো প্রভাবিত হবে তিনি সেটি স্পষ্ট না করলেও এরই মধ্যে ‘তৃতীয় বিশ্বের’ ধারণা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। প্রশ্ন উঠছে, স্বল্পোন্নত দেশ বা এলডিসি থেকে উত্তরণের পথে থাকা বাংলাদেশের অবস্থান কোথায়? এলডিসির কাতারে থাকা দেশগুলো কি ‘তৃতীয় বিশ্ব’ হিসেবে গণ্য হবে? ব্যাখ্যায় যাওয়ার আগে দেখা যাক ডোনাল্ড ট্রাম্প কেন অভিবাসন বন্ধের কথা বললেন। প্রেসিডেন্ট হিসেবে দ্বিতীয় মেয়াদের শুরু থেকেই তিনি অভিবাসন নিয়ে কঠোর পদক্ষেপের হুমকি দিচ্ছিলেন। তবে আগের গুলোর তুলনায় এবারের হুমকিতে ‘স্থায়ী স্থগিতাদেশ’ ও ‘তৃতীয় বিশ্ব’ শব্দগুলো বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ।

আপনার জানা থাকলেও, আলোচনার সুবিধার্থে একটি বিষয় আরেকবার স্মরণ করা যাক। গত বুধবার ওয়াশিংটনে আফগান নাগরিকের গুলিতে ন্যাশনাল গার্ডের এক সদস্য নিহত হন। এর জেরে বৃহস্পতিবার রাতে ট্রুথ সোশ্যালে পোস্ট দেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। লিখেন, যুক্তরাষ্ট্রে স্থিতিশীলতা ফেরাতে ‘তৃতীয় বিশ্বের দেশ’ থেকে অভিবাসন প্রক্রিয়া স্থায়ীভাবে বন্ধ করবেন। অর্থ্যাৎ, এই কাতারে থাকা দেশগুলো থেকে যুক্তরাষ্ট্রে আশ্রয় বা বসবাসের আবেদনের পথ বন্ধ করা হবে।

বিবিসির শনিবারের তথ্য অনুযায়ী, মার্কিন প্রশাসন এরই মধ্যে সব ধরনের ‘আশ্রয়’ আবেদন সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত স্থগিত করেছে। ইউএস সিটিজেনশিপ অ্যান্ড ইমিগ্রেশন সার্ভিসেস (ইউএসসিআইএস) এর পরিচালক জোসেফ এডলোর বলেছেন, প্রত্যেক অভিবাসীকে সর্বাধিক মাত্রায় যাচাই নিশ্চিত না করা পর্যন্ত এই স্থগিতাদেশ থাকবে।

প্রসঙ্গ ‘তৃতীয় বিশ্ব’
এই শব্দগুচ্ছ শুনলে প্রথমেই মাথায় আসে মাথাপিছু জিডিপির (পিপিপি) ভিত্তিতে দরিদ্রতম দেশের কথা। কিন্তু উদ্ভবের সময় এর ব্যবহার এমন ছিল না। বরং সেটি ছিল রাজনৈতিক বিবেচনায়।

ওয়ার্ল্ড পপুলেশন রিভিউয়ের ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, ১৯৫২ সালে ‘থার্ড ওয়ার্ল্ড’ বা তৃতীয় বিশ্ব ধারণাটি প্রথম ব্যবহার করেন ফরাসি ইতিহাসবিদ আলফ্রেড সোভি। ‘ফার্স্ট ওয়ার্ল্ড’ বা প্রথম বিশ্ব বলতে বোঝানো হতো ন্যাটোভুক্ত দেশগুলোকে। যেমন- যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও পশ্চিম ইউরোপের বেশিরভাগ দেশ। ‘দ্বিতীয় বিশ্ব’ বোঝানো হতো কমিউনিস্ট ব্লকের দেশগুলোকে। এর মধ্যে ছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন, চীন ও তাদের মিত্ররা। এই দুই ধরনের জোটের বাইরে যারা ছিল তাদের বলা হতো, তৃতীয় বিশ্ব।

কিন্তু ১৯৯০ এর শুরুতে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন হলে তৃতীয় বিশ্বের ধারণা বদলে যায়। তখন অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক ও পরিবেশগত দিক থেকে দুর্বল দেশগুলোকে তৃতীয় বিশ্ব হিসেবে চিহ্নিত করা শুরু হয়।

আধুনিক সমাজে লিখিত আকারে ‘তৃতীয় বিশ্ব’ শব্দের আর ব্যবহার হয় না। বক্তা ও লেখকরা বরং সুনির্দিষ্ট শব্দ ব্যবহার করতে পছন্দ করেন। যেমন ‘উন্নয়নশীল দেশ’ বা ‘স্বল্পোন্নত দেশ’। এই শ্রেণি নির্ধারিত হয় জাতিসংঘের মানবসম্পদ উন্নয়ন সূচক অথবা বিশ্বব্যাংকের স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তথ্য অনুযায়ী।

বাংলাদেশ কি ‘তৃতীয় বিশ্বের’ দেশ
ডোনাল্ড ট্রাম্প যদি স্নায়ু যুদ্ধের সময়কার, অর্থ্যাৎ পুরোনো সংজ্ঞার দিকে ইঙ্গিত করেন, তাহলে বাংলাদেশ ‘তৃতীয় বিশ্বের’ কাতারে পড়বে। কিন্তু আধুনিক সংজ্ঞা বিবেচনা করলে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) কাতারে।

জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন বিষয়ক ওয়েবসাইটে এলডিসিভুক্ত ৪৪টি দেশের তালিকা আছে। এর মধ্যে বাংলাদেশসহ এশিয়ার দেশ আটটি। বাকিগুলো হলো- আফগানিস্তান, কম্বোডিয়া, লাওস, মায়ানমার, নেপাল, তিমুর লেস্তে ও ইয়েমেন।

বিবিসি বলছে, ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর পোস্টে তৃতীয় বিশ্বের দেশ বলতে কাদের বুঝিয়েছেন তা স্পষ্ট করেননি। কারা প্রভাবিত হতে পারে সে তথ্যও দেননি।

আগামী বছরের নভেম্বরে বাংলাদেশের এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন বা উত্তরণ হওয়ার কথা আছে। তবে এটি পেছানো হবে কি না তা নিয়ে আলোচনা চলছে।

স্থায়ীভাবে বন্ধের ক্ষমতা কি আছে
ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেওয়া আগের পদক্ষেপগুলো আইনি বাধার মুখে পড়ায় প্রশ্ন উঠছে, প্রেসিডেন্ট কি স্থায়ীভাবে অভিবাসন প্রক্রিয়া বন্ধ করতে পারেন?

ভারতের সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও আন্তর্জাতিক অভিবাসন বিষয়ক পরামর্শদাতা অভিষেক সাক্সেনা। আল জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের ‘ইমিগ্রেশন অ্যান্ড ন্যাশনালিটি অ্যাক্ট (আইএনএ)’ অনুযায়ী, প্রেসিডেন্ট নির্দিষ্ট সময়ের জন্য, অনির্দিষ্টকাল বা পরবর্তী ঘোষণা না দেওয়া পর্যন্ত অভিবাসীদের প্রবেশ স্থগিত করতে পারেন। তবে এটি চ্যালেঞ্জযোগ্য।

সাক্সেনা বলেন, যদি কোনো অনির্দিষ্টকালের স্থগিতাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস কর্তৃক পাস করা আইন লঙ্ঘন করে, তাহলে আদালতে চ্যালেঞ্জ করা যেতে পারে।

মার্কিন গণমাধ্যম এনপিআর-এর গত বছরের জুনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, একজন প্রেসিডেন্ট মূলত, ইমিগ্রেশন অ্যান্ড ন্যাশনালিটি অ্যাক্ট (১৯৫২)- এর সেকশন ২১২(এফ) অনুযায়ী প্রয়োজনে অভিবাসীদের প্রবেশ সাময়িকভাবে স্থগিত রাখা বা সীমিত করতে পারেন। তবে সান ফ্রান্সিসকো বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন ও মাইগ্রেশন স্টাডিজের অধ্যাপক বিল হিং বলেন, দেশে প্রবেশ নিষিদ্ধ করার মতো আরও অনেক আইন আছে। যেমন সন্ত্রাসী সংগঠনের সদস্যদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করার বিধান।

বিল হিং তখন আরও বলেন, ২১২(এফ) ধারাটি বেশ বিস্তৃত। যেমন, কাউকে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকর মনে হলেও প্রেসিডেন্ট প্রবেশ সীমিত করতে পারেন।

ট্রাম্পের হুমকিতে যা উল্লেখ আছে
সিএনএন-এর তথ্য, ডোনাল্ড ট্রাম্পও তাঁর ট্রুথ সোশ্যালের পোস্টে ‘অভ্যন্তরীণ শান্তি বিঘ্নিতকারী’দের কথা বলেছেন। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের ওপর বোঝা, নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করে, অথবা ‘পশ্চিমা সভ্যতার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ’ তাদের দেশ থেকে বের করে দেওয়ার কথা বলেছেন।

অভিবাসন নিয়ে ট্রাম্পের আগের হুমকি ও বৃহস্পতিবারের পোস্ট ইঙ্গিত দেয়, ‘অপরাধ নিয়ন্ত্রণ’ ও জো বাইডেন প্রশাসনের তৈরি করা অভিবাসন নীতির পরিবর্তন আনতেই তিনি স্থগিতের পদক্ষেপ নিতে চান।

এখন কেন এমন সিদ্ধান্ত
প্রশ্ন উঠতে পারে ন্যাশনাল গার্ডের সদস্য নিহতের পরই কেন এমন সিদ্ধান্ত? গত জুনে অভিবাসনবিরোধী অভিযানের প্রতিবাদে বিক্ষোভ শুরু হয় লস অ্যাঞ্জেলেসে। সেই বিক্ষোভ দমনে ট্রাম্প প্রশাসন ন্যাশনাল গার্ড মোতায়েন করেছিল। এই বাহিনী মূলত দেশটির সামরিক বাহিনীর একটি অংশ। অপরাধ নিয়ন্ত্রণের কথা বলে ওয়াশিংটন ডিসিতেও গত আগস্টে তাদের মোতায়েনের ঘোষণা দেওয়া হয়।

মার্কিন রাজনীতিতে ন্যাশনাল গার্ড মোতায়েন নিয়েও সমালোচনার মুখে ছিলেন ট্রাম্প। এর মধ্যেই যখন বাহিনীটির সদস্যদের ওপর হামলা হলো, তখনই কঠোর পদক্ষেপের তোড়জোড় শুরু হলো প্রশাসনে।

বুধবার ওয়াশিংটন ডিসিতে হামলার ঘটনায় যাকে আটক করা হয়েছে তিনি আফগানিস্তানের নাগরিক রহমানউল্লাহ লাখানওয়াল (২৯)। ২০২১ সালে বিশেষ কর্মসূচির আওতায় যুক্তরাষ্ট্রে যান। তাঁর কর্মকাণ্ডকে ‘সন্ত্রাসী কার্যকলাপ’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন ট্রাম্প।

গ্রিন কার্ডধারী ও অভিবাসীর সংখ্যা
‘তৃতীয় বিশ্ব’ থেকে অভিবাসন প্রক্রিয়া স্থগিতের পাশাপাশি ১৯ দেশে জন্ম নেওয়া গ্রিন কার্ডধারীদের পুনরায় যাচাইয়ের কথাও বলেছেন ট্রাম্প। এএফপির তথ্য, এই ১৯ দেশের মধ্যে আছে আফগানিস্তান, কিউবা, হাইতি, ইরান ও মায়ানমার। অভিবাসন বিষয়ক সবশেষ তথ্য অনুযায়ী, এসব দেশের প্রায় ১৬ লাখের বেশি ব্যক্তি মার্কিন গ্রিন কার্ডধারী। সবচেয়ে বেশি কিউবার, প্রায় ৫ লাখ ৬০ হাজার। এরপরে আছে, হাইতি (২,৩৫,০০০) ও ভেনেজুয়েলা (১,৫৩,০০০)।

মার্কিন গবেষণা সংস্থা পিউ রিসার্চ সেন্টারের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গত জুন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী অভিবাসীর সংখ্যা ছিল ৫ কোটি ১৯ লাখ। যা দেশটির মোট জনসংখ্যার ১৫.৪ শতাংশ। গত জানুয়ারিতে এই পরিমাণ ছিল রেকর্ড ৫ কোটি ৩৩ লাখ।

২০২৩ সালের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত পাওয়া তথ্যের বরাত দিয়ে সংস্থাটি জানায়, এই অভিবাসীদের ১ কোটি ১০ লাখের জন্ম মেক্সিকোতে। ৩২ লাখের ভারতে, চীনের ৩০, ফিলিপাইনে জন্ম ২১ লাখের।

বাংলাদেশি কত? মার্কিন জনশুমারি ব্যুরোর তথ্যের বরাত দিয়ে পিউ রিসার্চ সেন্টার জানিয়েছে, ২০২৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রে আনুমানিক ৩ লাখ মানুষ নিজেদের বাংলাদেশি হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন।

Facebook Comments Box

Posted ১২:১৮ অপরাহ্ণ | শনিবার, ২৯ নভেম্বর ২০২৫

manchitronews.com |

সম্পাদক
এ এইচ রাসেল
Contact

5095 Buford Hwy. Atlatna Ga 30340

17709121772

deshtravels7@gmail.com

error: Content is protected !!