এই পৃথিবীর অধিকাংশ রাষ্ট্র যখন তাদের বনাঞ্চল রক্ষায় অনেকটাই দিশেহারা, তখন হিমালয়ের কোণের একটি রাষ্ট্র পরিবেশের প্রতি বৃহত্তর প্রতিশ্রুতি ও সদিচ্ছার অংশ হিসেবে তাদের বনাঞ্চল রক্ষা করে চলেছে। হিমালয়ের পাদদেশে অবস্থিত হওয়ার কারণে ভুটানের অনেক এলাকাই দূর্গম এবং জনবিরল। সেখানে সরকারের বা আইনের নিয়ন্ত্রন সেভাবে নেই। অথচ ঐ দূর্গম অঞ্চলগুলোর অধিবাসীরা তাদের নিজের দায়িত্ববোধ থেকে সরকারের নির্দেশিত পন্থায় প্রতিটি পরিবারের জন্য নির্দিষ্ট গাছ কাঁটা এবং ব্যবহারের নিয়ম মেনে চলেছে।
এই ধরনের আচরণই সমাজবিজ্ঞানীরা “সামাজিক পুঁজি” (Social Capital) বলে থাকেন যেখানে পারস্পরিক বিশ্বাস, সহযোগিতা ও নৈতিক দায়িত্ববোধ মানুষের আচরণ নিয়ন্ত্রণ করে, এমনকি আইন না থাকলেও।
আতাকামা, উত্তর চিলির একটি পাহাড়পর্বতাকীর্ণ এবং মরুভূমি বেষ্ঠিত অঞ্চল। পানি যেখানে দুর্মূল্য। সেচের জন্য কিছু নালাই মূলত সম্বল। দূর্গম এলাকা হওয়ার কারণে এখানেও সরকারের নজর বা নিয়ন্ত্রণ অনেকটাই শিথীল। এই অঞ্ছলে বসবাসরত অধিবাসীরা পারস্পরিক সহমর্মীতার বন্ধনদ্বারা চালিত হয়ে পরস্পরের জমিতে এই সীমিত পানির মাধ্যমে সেচ কার্য সমাধা করে। একই সাথে তাদের সম্প্রদায়গত অনুভূতি দ্বারা চালিত হয়ে নিজেরা সীমিত ব্যবহারের মাধ্যমে এই নালাগুলোকে সংরক্ষন করে থাকে এই আশায় যে তা তাদের ভবিষ্যত সেচ কাজে সহায়তা করবে। নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ এলিনর অস্ট্রম (Elinor Ostrom) তার Governing the Commons গ্রন্থে দেখিয়েছেন, এই ধরনের স্থানীয়ভাবে গড়ে ওঠা নিয়ম ও পারস্পরিক বিশ্বাস “common-pool resources” ব্যবস্থাপনায় অত্যন্ত কার্যকর হতে পারে, এমনকি আনুষ্ঠানিক নজরদারি ছাড়াও।
এই দূর্গম এবং প্রায় বিরান অঞ্চলে যেখানে সরকারের নজরই নেই নিয়ন্ত্রণ তো অনেক পরের কথা, সেখানে পরিবেশ এবং নিজের সমাজের প্রতি এই ধরনের সহমর্মী আচারণের ব্যখ্যা কি? এর উত্তর খুজেছিলেন বিখ্যাত অর্থনীতিবিদ যোসেফ স্টিগলিজ। দুই মহাদেশের দুইটি সম্পূর্ন ভিন্ন পরিবশের দুই সম্প্রদায়ের অধিবাসীদের জবাব ছিল একই রকম; পরিবেশ সংশ্লিষ্ট প্রশ্নে প্রতারনা তো আত্মপ্রবঞ্চনার শামিল, তাই এখানে কোন সংকীর্ণতা বা প্রতারনার প্রশ্রয় নেই। স্টিগলিজ এই আচারণকে অভিহিত করেছেন অধিকতর মানবিক এবং ঘরোয়া পুজি হিসেবে যা জনসাধারণকে এমনভাবে আত্মবিশ্বাসী করে তোলে যা তাদের মধ্যে গড়ে তোলে মর্যাদা এবং পরিচ্ছন্নতার আবহ।
এই দুই পরিবেশের বিপরীত অবস্থা স্টিগলিজ দেখেছেন উজবেকিস্তানে। সেখানে শহরের সামান্য বাইরে সরকারের গড়ে তোলা গ্রীনহাউজের অধিকাংশ কাচ গায়েব হয়ে গেছে। সোজা ভাষায় চুরি হয়ে গেছে, যা করেছে গ্রীনহাউজগুলোর আশে পাশে বাস করা মানুষজন। এর কারণ কি হতে পারে? স্টিগলিজ ব্যখ্যা করেছেন সামাজিক পুজি হ্রাসের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে। এই অবস্থাকে তিনি তুলনা করেছেন বন্য পশ্চিমের মত বন্য পূর্ব হিসেবে। বাংলাদেশের সৌভাগ্য যে এই ভদ্রলোক বিশ্বব্যংকের অর্থনীতিবিদ হিসেবে পৃথিবীর অনেক দেশ নিয়ে কাজ করলেও বাংলাদেশ নিয়ে মনে হয় সেভাবে কাজ করেন নি। নাহলে গ্রীন হাউজের কাচ চুরি হওয়া দেখে যদি বলে থাকেন বন্য পূর্ব! তাহলে বাংলাদেশে অবস্থা দেখলে কি বলতেন?
আমাদের বাড়ির একেবারেই কাছ দিয়ে রেল লাইন চলে গেছে। ছোটবেলায় দেখতাম রেল লাইন পাশে বেশ কিছু মানুষ রেলের জায়গায় তাদের বাড়ি বানিয়ে থাকত, কেউ বা রেলের জমিতে দোকান দিয়ে ব্যবসা করে। এর বিনিময়ে তারা রেলকে কি দিত? তারা রেল লাইনে দেয়া পাথরগুলি চুরি করে তাদের বাড়িতে নিয়ে আসত। রেলের লোকজন প্রায়ই এসে এই বাড়িগুলোতে তল্লাশি চালত পাথরের খোজে কিন্তু পাথর আর বের করতে পারত না। ভুটান বা চিলির মত এখানেও পারস্পরিক সহমর্মীতার অনন্য দৃষ্টান্ত দেখিয়ে তারা পরস্পরের পাথর লুকিয়ে রাখত। শুধুই কি পাথর চুরি, পারস্পরিক সহমর্মীতার অনন্য দৃষ্টান্ত দেখিয়ে কি চুরি করেন না তারা?
উপকূলীয় এক জেলায় চাকরির সুবাদে দেখেছি, মাছ ধরা নিষেধের সময় মাছ না ধরার অংগীকার করে, মাছ ধরা থেকে বিরত থাকার জন্য সাহায্য নিয়ে গিয়েই নদীতে নেমে পড়েছে মাছ ধরতে। ফরেস্ট ডিপার্টমেন্ট এ চাকরি করা এক সহকর্মী একবার বলেছিলেন গাছের চোরাকারবারিরা যত গাছ কাটে বন এলাকার আশে পাশে বাস করা সাধারণ মানুষ তার চেয়ে বেশি গাছ কাটে। অথচ এই পাথর চুরি করা, অবৈধ ভাবে মাছ ধরা, গাছ কাঁটা মানুষগুলো কেউই ঠিক পেশাদার অপরাধী নয়। কিন্ত সাধারণ এই মানুষগুলো যে কাজগুলো করছে তা সভ্য সমাজে সবই অপরাধ হিসেবে গণ্য হওয়ার কথা। ভয়ংকর বিষয় হচ্ছে সমাজ, পরিবার কেউই এই কাজগুলোকে অপরাধ বা তাদের অপরাধী বলতে নারাজ।
এটাই মনে হয় আমাদের সমাজের সবচেয়ে ভয়ংকর দীক। আমাদের সমাজ, জনগণ থেকে শুরু করে বুদ্ধিজীবি, সমাজের বিবেক আমরা সবাই আমাদের যে কোন সমস্যার জন্য সরকার, রাষ্ট, প্রতিষ্ঠান তুলে গালাগালি করি। কিন্তু আমরা ভুলে যাই প্রতিষ্ঠান বলতে শুধু কোন অফিস বোঝায় না, ওইটা অনেক পরের বিষয়। এর আগে তার চেয়েও বড় প্রতিষ্ঠান আছে।মূল্যবোধ, সামাজিক দায়বদ্ধতা, সংযত আচারণ, সামাজের প্রচলিত নৈতিক ভাবে স্বীকৃত প্রথা। এইগুলো যখন ব্যক্তির সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনে প্রয়োগ হয় তখন সেটা একটা প্রতিষ্ঠান এ পরিনত হয়।
এই অনানুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠান গুলোই হল রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠানের আত্মা। রবার্ট পুটনাম তার গবেষণায় দেখিয়েছেন, যেখানে এই সামাজিক পুঁজি দুর্বল, সেখানে আইন ও আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠানও কার্যকর হয় না। এইগুলোর অনুপস্থিতিতে আমাদের কাছে যেগুলো প্রতিষ্ঠান হিসেবে স্বীকৃত সেগুলো শুধুই আত্মা ছাড়া একটা অবিনশ্বর শরীর মাত্র। তাই যার আত্মা ঠিক নেই তার শরীরের সৌন্দর্য নিয়ে লাফালাফি করে লাভ হবে না।
যারা কিছু হলেই বাংলাদেশের strong institution না থাকার জন্য গালাগালি করে সকল সমস্যার সমাধান খুঁজতে চান তারা আগে নিজেদের প্রশ্ন করে দেখেন, নিজে সমাজের বা রাষ্টের নিয়মগুলোকে তার মধ্যে কতখানি প্রাতিষ্ঠানীকরন করতে পেরেছেন?
বাংলাদেশের সমস্যার বড় অংশ কেবল রাষ্ট্রীয় কাঠামোর দুর্বলতায় নয়, বরং সামাজিক পুঁজির ক্ষয় এবং অনানুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠানের অবক্ষয়ে নিহিত। ভুটান ও আতাকামার উদাহরণ প্রমাণ করে, যখন সামাজিক নীতি, নৈতিক দায়িত্ববোধ এবং পারস্পরিক বিশ্বাস শক্তিশালী হয়, তখন আইন অনুপস্থিত থাকলেও মানুষ সমষ্টিগত স্বার্থ রক্ষা করে। কিন্তু উজবেকিস্তান কিংবা বাংলাদেশের নানা ঘটনার মতো, যখন ব্যক্তি ও সমাজের নৈতিকতা ক্ষয়ে যায়, তখন প্রতিষ্ঠান যতই শক্তিশালী হোক না কেন, তা কার্যকর হয় না। তাই টেকসই উন্নয়ন বা শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান গঠনের জন্য আগে প্রয়োজন নৈতিকতার সামাজিকীকরণ, মূল্যবোধের পুনর্গঠন এবং ব্যক্তিগত পর্যায়ে দায়বদ্ধতার প্রাতিষ্ঠানীকরণ। রাষ্ট্রের কাঠামোকে বাঁচাতে হলে আগে তার আত্মাকে বাঁচাতে হবে।
লেখক- সৈকত ইসলাম, প্রাবন্ধিক