সোমবার ১৬ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৩রা ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

এক অসম শহরের গল্প

সৈকত ইসলাম   |   মঙ্গলবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫   |   প্রিন্ট   |   553 বার পঠিত

এক অসম শহরের গল্প

একটি প্রবন্ধে ১৯৮০-র দশকের কলকাতার সন্ধ্যার এক চিত্র এঁকেছিলেন অর্থনীতিবিদ কৌশিক বসু। তিনি লিখেছিলেন, সন্ধ্যা নামে ছাত্র-ছাত্রীরা পড়তে বসে, দোকানদাররা ভিড় সামলানোর প্রস্তুতি নেয়, আর ঠিক তখনই নিভে যায় আলো। শুরু হয় লোডশেডিং, আর বিদ্যুৎ ফেরে না ঘণ্টার পর ঘণ্টা। শহরের মানুষ ধীরে ধীরে এই অন্ধকারকে জীবনের এক অনিবার্য অংশ হিসেবে মেনে নেয়।

কিন্তু বসু দেখিয়েছিলেন, এই লোডশেডিং শুধু দৈনন্দিন জীবনযাত্রার বিঘ্ন নয়, এটি সমাজে সূক্ষ্ম অথচ গভীর বৈষম্য তৈরি করছিল। ধনী শ্রেণির হাতে ছিল নানা বিকল্প : জেনারেটর, ইনভার্টার, টিউশন সেন্টার কিংবা পড়ার জন্য আলাদা আলো। কিন্তু দরিদ্রদের ছিল না তেমন কোনো সুযোগ। ফলে তারাই পড়াশোনায় পিছিয়ে পড়ছিল, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছিল পেশাগতভাবে, আর স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখে পড়ছিল সবচেয়ে বেশি।
এই প্রেক্ষাপটে আমরা যদি ঢাকা শহরের দিকে তাকাই, দেখি এক ভয়ানক মিল। যানজট, দূষণ এবং ডেঙ্গুর মতো স্বাস্থ্যঝুঁকি আজ শহরবাসীর জীবনের স্বাভাবিক বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু এই বাস্তবতা সবার জন্য এক নয়। ধনীরা এরই মধ্যে গড়ে তুলেছে নিজেদের সুরক্ষাবলয় নিজস্ব গাড়ি, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘর, উন্নত স্কুল এবং উঁচু তলার বাসস্থান।

কিন্তু দরিদ্র ও নিম্নমধ্যবিত্ত মানুষ প্রতিদিন এই দুরবস্থার মুখোমুখি হচ্ছে কোনো বিকল্প ছাড়াই। তারা শ্বাস নিচ্ছে দূষিত বাতাসে, ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে থাকছে যানজটে, ডেঙ্গুর আশঙ্কায় দিন কাটাচ্ছে, আর একটি অসুস্থতা মানেই রোজগার হারানো ও ঋণের বোঝা।
এই ক্ষয়ক্ষতি নিঃশব্দ, অদৃশ্য এবং পরিমাপ করা কঠিন। তবু এর প্রভাব দীর্ঘ মেয়াদে ভয়ানক। আগামী এক দশকে যদি দেখা যায় ঢাকা শহরের উৎপাদনশীলতা হঠাৎ কমে গেছে, তখন আমরা গবেষণা ও কাগজপত্রে এর কারণ খুঁজে বেড়াব।

কিন্তু তখন কি আমরা আজকের এই যানজট, দূষণ ও ডেঙ্গুর মতো সমস্যাগুলোকেই দায়ী করব, নাকি বলব, ‘এসব তো আগেও ছিল?’
এসব সমস্যা যেভাবে দরিদ্রদের ওপর disproportional প্রভাব ফেলে, তা কেবল সামাজিক ন্যায়ের প্রশ্নই নয়, অর্থনীতির ভিত্তিকে নাড়িয়ে দেয়। নাগরিক জীবনের মৌলিক সংকটগুলো যখন একটি শ্রেণিকে প্রতিনিয়ত ক্ষতিগ্রস্ত করে, তখন ব্যক্তিগত সম্ভাবনা যেমন বিনষ্ট হয়, তেমনি ক্ষতিগ্রস্ত হয় দেশের সামগ্রিক উৎপাদনশীলতাও।

নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ জোসেফ স্টিগলিজ তাঁর ‘The Price of Inequality’ বইয়ে লিখেছেন, “Inequality is not just morally wrong, it’s economically inefficient.” অর্থাৎ বৈষম্য কেবল সমাজে ন্যায়বিচার নষ্ট করে না, একটি দেশের সম্ভাব্য উৎপাদনও সীমিত করে। যেসব মানুষ প্রতিভা ও শ্রম ব্যবহারের সুযোগ পায় না, তারা শুধু নিজেদের জীবনে পিছিয়ে পড়ে না, বরং জাতীয় অর্থনীতিও তাদের অব্যবহৃত সম্ভাবনার কারণে ক্ষতির শিকার হয়।

এই পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকার নাগরিক সংকটকে শুধু পরিবেশ বা স্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে দেখা যথেষ্ট নয়। এটি একটি নীতি, সামাজিক ন্যায় এবং অর্থনৈতিক সম্ভাবনার প্রশ্ন। আজ যে নীরব ক্ষয় প্রতিনিয়ত ঘটছে, তা ভবিষ্যতে ভয়াবহ রূপ নিতে বাধ্য। ঢাকা দেশের অর্থনীতির ৪০ শতাংশের বেশি উৎপাদন করে। যদি এই শহরের শ্রমজীবী মানুষ প্রতিদিন একটু একটু করে সক্ষমতা হারায়, তাহলে ভবিষ্যতের জিডিপি হয়তো বাড়বে কাগজে, কিন্তু তার ভেতরে থাকবে না জীবনের গুণগত উন্নয়ন।

আমরা প্রায়ই শহরের সমস্যাগুলোকে (যানজট, দূষণ, ডেঙ্গু, শিক্ষা ও দারিদ্র্য) বিচ্ছিন্ন করে দেখি। কিন্তু বাস্তবে এগুলো পরস্পর সম্পর্কিত, একে অপরকে জ্বালানি জোগায়, আর সম্মিলিতভাবে তৈরি করে এক ধরনের বৈষম্যনির্ভর সমাজব্যবস্থা। এই বৈষম্য শুধু হতাশা নয়, জন্ম দেয় অবিশ্বাস, বঞ্চনা ও অস্থিতিশীলতা। যদি আমরা আজও এসব সমস্যাকে ‘চিরাচরিত নগর-দুর্ভোগ’ বলে অবহেলা করি, তাহলে ভবিষ্যতে যখন এর ভয়াবহতা বুঝতে পারব, তখন আফসোস করা ছাড়া কিছুই করার থাকবে না।

তাই এখনই সময় সবার জন্য নাগরিক সুযোগ-সুবিধা, স্বাস্থ্যসেবা এবং চলাফেরার ন্যায্য ব্যবস্থা গড়ে তোলার। এই শহর শুধু ধনী ও সামর্থ্যবানদের জন্য হতে পারে না, এটি একটি দেশের প্রাণকেন্দ্র, যেখানে প্রতিটি শ্রেণির মানুষ দিনরাত শ্রম দিয়ে উৎপাদনশীলতা ধরে রাখছে। যদি সেই শহরের বেশির ভাগ মানুষের কর্মক্ষমতা প্রতিদিন একটু একটু করে নষ্ট হয়, তাহলে তার চূড়ান্ত মাশুল দেবে গোটা সমাজ ও রাষ্ট্র। আর এই মাশুল কেবল অর্থনৈতিক হবে না, এটি হবে সামাজিক, রাজনৈতিক ও প্রজন্মগত। কারণ একটি শহরের উপেক্ষিত জনগোষ্ঠী মানে একটি জাতির অপূর্ণ সম্ভাবনা।

লেখক : প্রাবন্ধিক

Facebook Comments Box

Posted ৩:৫৭ অপরাহ্ণ | মঙ্গলবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫

manchitronews.com |

সম্পাদক
এ এইচ রাসেল
Contact

5095 Buford Hwy. Atlatna Ga 30340

17709121772

deshtravels7@gmail.com

error: Content is protected !!