বুধবার ৪ঠা ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২১শে মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

জলপাইগুড়ির পুতুল থেকে খালেদা জিয়া হয়ে ওঠার গল্প

  |   বুধবার, ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫   |   প্রিন্ট   |   200 বার পঠিত

জলপাইগুড়ির পুতুল থেকে খালেদা জিয়া হয়ে ওঠার গল্প

১৫ আগস্ট ১৯৪৬। বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞের দগদগে ক্ষত শুকায়নি। হিরোশিমা-নাগাসাকির ছাই বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে। ঠিক সেই সময়ে জলপাইগুড়ির নয়া বাজারের মজুমদার বাড়িতে জন্ম নিল এক কন্যাশিশু। ডাকনাম রাখা হলো পুতুল। তার বাবা ইস্কান্দার মজুমদার তখন ব্যবসা টিকিয়ে রাখার সংগ্রামে ব্যস্ত। আর মা তৈয়বা মজুমদার সংসারের দায়িত্ব সামলাচ্ছিলেন। সেই ছোট্ট শিশু ধীরে ধীরে পরিবারের উষ্ণতায় এবং মায়ের কোলে নিজের আলোর রেখা ছড়াতে শুরু করল।

জন্মের প্রথম দিনের মধুর স্মৃতি এখনো সজীব। ফুটফুটে পুতুলকে সবাই মধু খাইয়ে দিলেন, যেন তার ভবিষ্যৎও মধুর মতো মিষ্টি হয়। খুশির খবর পেয়ে ইস্কান্দার মজুমদারের বন্ধু ও পারিবারিক ডাক্তার ড. অবনীগুহ নিয়োগি বললেন, ‘মেয়ে এমন সময় জন্ম নিয়েছে যখন সর্বত্র শান্তি। এই মেয়ের নাম রাখা হোক শান্তি।’ জন্মের সাতদিন পর বাবা ইস্কান্দার মজুমদার তার তৃতীয় কন্যার নাম রাখলেন খালেদা খানম। তবে ডাকনাম ঠিক করতে দেখা গেল বিপত্তি। শান্তি, তিসি নাকি পুতুল? অবশেষে মেজো বোন বিউটির পছন্দ অনুযায়ী ডাকনাম হয়ে গেল পুতুল। সেই পুতুলই পরবর্তী সময়ে দেশের ইতিহাসে পরিচিত হলেন খালেদা জিয়া নামে।

দুই বছর পর, ১৯৪৭-এর দেশভাগ। কত মানুষকে ছাড়তে হয়েছিল বসতভিটা। পুতুলের পরিবারও জলপাইগুড়ির শেকড় ছেড়ে পাড়ি দিলেন দিনাজপুরে। নতুন শহর, অচেনা পথ, অচেনা বাড়ি। এখানে ইস্কান্দার মজুমদার ব্যবসা পুনরায় শুরু করলেন শূন্য থেকে। মা তৈয়বা মজুমদার এক অনন্য দৃঢ়তায় সংসারের হাল ধরে রাখলেন। কিন্তু জলপাইগুড়ির টিনের চালার বাড়ি, গভীর কুয়া, ‘কিচেন গার্ডেন’ নামের উঠান-বাগান—এসব স্মৃতি পুতুলের প্রথম দুই বছরের সঙ্গে অম্লানভাবে জড়িয়ে রইল।

পুতুলের শৈশবের আসল গল্প শুরু হলো দিনাজপুরে। প্রথমে ঈদগাহ বস্তির বাড়ি, পরে ঘাসিপাড়া, এরপর মুদি পাড়া। প্রতিটি বাড়ি, উঠোন, আলো-ছায়া আর লালচে মাটির গন্ধ, সবকিছুই ছোট্ট পুতুলের ভেতরে এক কোমল, সংবেদনশীল পৃথিবী গড়ে তুলতে সাহায্য করেছিল।

তার স্কুলজীবন শুরু হয় দিনাজপুর মিশনারি কিন্ডারগার্টেন থেকে, পরে দিনাজপুর গার্লস স্কুলে। শান্ত স্বভাবের এ মেয়েটির মনে ছিল বুদ্ধিমত্তার দীপ্তি, আর খেলাধুলায় ছিল অদ্ভুত দক্ষতা। এছাড়া বাড়িতে সংগীত ও নৃত্যেরও তালিম দেয়া হয়েছিল তাকে। তবে পুরস্কার জিতলেও কখনো বড়াই করত না, কোনো কিছু নিয়েই খুব একটা চাহিদা ছিলনা পুতুলের। অন্য শিশুদের মতো বায়না করত না সে। এসবের মধ্য দিয়েই চিহ্নিত হলো তার চরিত্রের প্রকৃত ছাপ।

পুতুলের মায়াবোধও স্পষ্ট। পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে পুতুল তৃতীয়। ছোট ভাই সায়েদ ও শামীম, বোন বিউটি ও চকলেট, সবাইকে তিনি নিজের হাতে আগলে রাখতেন। বাড়ির ছোটখাটো কাজ—রান্নাঘরে সাহায্য, শীতের সকালে ফুল কুড়ানো, ছোটদের খেলাধুলায় নেতৃত্ব—সবই তাকে কোমল এবং দায়িত্বশীল বানিয়েছিল। মা তৈয়বা মজুমদার বলতেন, ‘পুতুল খুব গোছানো মেয়ে।’ সত্যিই, নিজের খাট, থালাবাসন, এমনকি বাড়ির বসার ঘর—সবই সে নিজ হাতে সাজিয়ে রাখত।

পরিবারের সবার ভীষণ আদরের ছিল পুতুল। বাবার অপেক্ষাতেই বেশির ভাগ বিকালগুলো কাটত তার। বাবা ফিরলেই কোলে নিয়ে জিজ্ঞেস করতেন, ‘কেউ বকেছে কিনা?, ‘কেউ পুতুলকে কোনো কষ্ট দিয়েছে কিনা?’ পুতুলের খেলা, ঘুড়ি ওড়ানো, মাছ ধরা, রান্নাঘরের হাঁড়িতে উঁকি—সব মিলিয়ে তার শৈশব ছিল রঙিন, জীবন্ত এবং আনন্দে ভরা।

ছুটির দিনগুলোতে পরিবার যেত ফেনীর ফুলগাজীতে। সেখানে পুতুলের পরিবারের শেকড়। ফুলগাজীর বিখ্যাত মজুমদার পরিবারের সন্তান ছিলেন খালেদা জিয়ার বাবা ইস্কান্দার মজুমদার। দাদা হাজি সালামত আলী ছিলেন ধার্মিক, দানশীল এবং ধর্মভীরু। খালেদা জিয়ার চাচা জামশেদ হোসেন মজুমদার জানান, তারা মীর জুমলার বংশধর। তাদের পূর্বপুরুষরা আরব থেকে এসেছিলেন, প্রায় ১০ প্রজন্ম আগে।

ফুলগাজীর পুকুর, গভীর কূপ, একতলা টিনের ঘর, গ্রামের গন্ধ—পাঁচ বছরের পুতুলকে আনন্দ দিত। মা তৈয়বা মজুমদার গরিব নারীদের সেখানে প্রশিক্ষণ দিতেন, আর পুতুল ছোটবেলায় সেই কাজ দেখত। সম্ভবত তখনই সমাজকে বোঝার এবং মানুষের প্রতি সহানুভূতির বীজ জন্ম নিল তার হৃদয়ে।

ইস্কান্দার মজুমদারের ব্যবসায়িক ব্যস্ততা তাকে অনেক সময় দূরে রাখত, তাই পুতুল বড় হয়েছিলেন মায়ের স্নেহ, শাসন ও নীরব দৃঢ়তায়। মায়ের সঙ্গে সখ্য বেশি থাকলেও ১৫ নভেম্বর ১৯৮৪ সালে তার বাবার মৃত্যু গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল তাকে।

পুতুলের শৈশব ছিল বাড়ি বদল, সংগ্রাম, বাবা-মায়ের পরিশ্রম, ভাইবোনদের উচ্ছ্বাস—সব মিলিয়ে ভীষণ সুন্দর। সেই অভিজ্ঞতাই তাকে গড়ে তুলেছিল দৃঢ়, শৃঙ্খলাবদ্ধ, সংবেদনশীল এবং মানবদুঃখ বোঝার ক্ষমতাসম্পন্ন করে। শৈশবের এ মৌলিক গুণাবলিই তাকে পরবর্তী সময়ে দেশের সর্বোচ্চ রাজনৈতিক মঞ্চে দাঁড় করিয়েছিল।

 

Facebook Comments Box

Posted ৭:০৪ পূর্বাহ্ণ | বুধবার, ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫

manchitronews.com |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক
এ এইচ রাসেল
Contact

5095 Buford Hwy. Atlatna Ga 30340

17709121772

deshtravels7@gmail.com

error: Content is protected !!