সোমবার, নভেম্বর ১৫, ২০২১

শিরোনাম >>
বরিশালের গর্ব

ফরচুন শুজ এর বিশ্বজয়

ডেস্ক রিপোর্ট   |   সোমবার, ১৫ নভেম্বর ২০২১ | 78 বার পঠিত | প্রিন্ট

ফরচুন শুজ এর বিশ্বজয়

১৯৯৬ সাল। বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলার মিজানুর রহমান চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। পরিবারের বড় ছেলে। টিউশনি করে পড়াশোনার খরচ মেটাতেন। হঠাৎ বাবার মৃত্যুতে সবকিছু ওলট-পালট হয়ে গেল। ছোট চার ভাইয়ের পড়াশোনা আর সংসারের খরচ কীভাবে চালাবেন, তা বুঝে উঠতে পারছিলেন না মিজানুর।

টিউশনি ছেড়ে জুতার কারখানায় চাকরি নেন। সেই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনাও চালিয়ে যান। কিছুদিন পর বন্ধুদের উৎসাহে চাকরির পাশাপাশি ছোট পরিসরে দরজার তালাসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম আমদানির ব্যবসা শুরু করেন। তাতে কিছু মুনাফা হয়। ২০০৪ সালে জুতার একটি ছোট এমব্রয়ডারি কারখানা দেন। এর মাধ্যমেই মূলত মিজানুর রহমানের উদ্যোক্তার জীবনের শুরু।

কেটে গেল আরও কয়ক বছর। এবারে মিজানুর বড় পরিসরেই বিনিয়োগ করতে চাইলেন। কিন্তু বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নিলেন যোগাযোগের অপ্রতুলতাসহ বিভিন্ন কারণে শিল্পবাণিজ্যে পিছিয়ে থাকা দক্ষিণাঞ্চলীয় বিভাগ বরিশালে। ২০১২ সালে বরিশাল বিভাগীয় শহরেই প্রতিষ্ঠা করলেন ফরচুন শুজ নামে রপ্তানিমুখী জুতার কারখানা। শুরুতে কারখানাটিতে কাজ করতেন ৪৭২ জন শ্রমিক। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি মিজানুর রহমানের। একে একে জুতার আরও পাঁচটি কারখানা করেন। ছয়টি কারখানার তিনটিই বরিশালে। বাকি তিনটি ঢাকার সাভার ও আশুলিয়া আর গাজীপুরে।

ফরচুন গ্রুপের জুতার কারখানাগুলো হচ্ছে ফরচুন শুজ, প্রিমিয়ার ফুটওয়্যার, ইউনি ওয়ার্ল্ড ফুটওয়্যার টেকনোলজি, সিন ইন ফুটওয়্যার টেকনোলজি, এম জে ইন্ডাস্ট্রিজ ও পশ ফুটওয়্যার। এ ছাড়া জুতা তৈরির বিভিন্ন সরঞ্জাম উৎপাদনের, অর্থাৎ সব ধরনের ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ ফ্যাক্টরি, তথা কারখানাও রয়েছে। সেগুলো হচ্ছে এমজে কার্টন ফ্যাক্টরি, এমজে ফোম প্ল্যান্ট, এমজে লেমিনেশন, এমজে কাটিং ডায়িং ও এমজে এমব্রয়ডারি।

ফরচুনের কারখানাগুলোতে প্রতিদিন সাড়ে ২২ হাজার জোড়া চামড়াবিহীন জুতা উৎপাদিত হয়। এই কাজে যুক্ত আছেন সাড়ে সাত হাজার শ্রমিক। আর ফরচুনের জুতা রপ্তানি হচ্ছে ইউরোপ, আমেরিকাসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে। স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বাজার মিলিয়ে প্রতিষ্ঠানটির বার্ষিক লেনদেনের পরিমাণ ৮০০ কোটি টাকার ওপরে। ২০১৫ সালে প্রতিষ্ঠানটি দেশের শেয়ারবাজারেও তালিকাভুক্ত হয়।

শিল্প খাতে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ মিজানুর রহমানের ফরচুন শুজ মাঝারি শিল্প ক্যাটাগরিতে যৌথভাবে ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শিল্প পুরস্কার ২০২০’ পেয়েছে। এটি ছিল প্রথম পুরস্কার, যা গত মাসে দেওয়া হয়েছে। গত বছর যুক্তরাষ্ট্রের প্রখ্যাত সাময়িকী ফোর্বস-এর প্রকাশিত এশিয়ায় ১ বিলিয়ন বা ১০০ কোটি ডলারের কম সম্পদ থাকা শীর্ষ ২০০ কোম্পানির তালিকায় ফরচুন শুজ স্থান করে নেয়।

বরিশাল নগরের বিসিক শিল্প নগরীতে ফরচুন শুজের কারখানায় জুতা তৈরি করছেন শ্রমিকেরা।

সংগ্রাম ও সাফল্য:

মিজানুর রহমানের জন্ম বরিশালের বাবুগঞ্জে। পড়াশোনা করেছেন বাবুগঞ্জ পাইলট উচ্চবিদ্যালয়ে। মাধ্যমিক বা এসএসসি পাস করার পর ভর্তি হন চট্টগ্রাম সরকারি কলেজে। উচ্চমাধ্যমিক পাসের পর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হন। প্রথম বর্ষে পড়ার সময়ই তাঁর বাবা আবদুল আজিজ মারা যান।

ফরচুন গ্রুপের চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান বলেন, ‘বাবা ছোটখাটো চাকরি করতেন। তিনি যে বেতন পেতেন, তাতে সংসারে অভাব-অনটন লেগেই থাকত। তাই চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় টিউশনি করেই নিজের খরচ চালাতাম। তবে বাবা মারা যাওয়ার পর পুরো সংসারের দায়িত্ব আমার কাঁধে এসে পড়ে। তখন বিভিন্ন যন্ত্রপাতি আমদানি শুরু করি। তখন কিছু টাকাপয়সা হয়েছিল। সেই টাকা দিয়েই ছোট ছোট কারখানা করি। তারপরে জুতা উৎপাদন শুরু করি। এ ক্ষেত্রে চীনের সরবরাহকারীরা অনেক সহযোগিতা করেছেন।’

২০০৪ সালে মিজানুর রহমান এমব্রয়ডারি কারখানা করেন। ভালোই ক্রয়াদেশ পাচ্ছিলেন। দুই বছর পর করেন কার্টন ও বক্স কারখানা। এগুলো ছিল ছোট উদ্যোগ। ২০০৮ সালে জুতার কারখানার চাকরিটা ছেড়ে দিলেন। ওই বছরই চট্টগ্রাম ইপিজেডে কোরিয়ান একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথভাবে জুতার কারখানা করলেন। তবে সেটা বছর দেড়েকের বেশি টেকেনি। তবে মিজানুরের হাতে তখন প্রচুর ক্রয়াদেশ। অন্য প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সেসব ক্রয়াদেশের পণ্য তৈরি করে রপ্তানি করলেন। ওই সময়ই মিজানুর রহমান সিদ্ধান্ত নেন, একক মালিকানায় জুতার কারখানা করবেন এবং সেটা নিজের জন্মস্থান বরিশালে। যেই ভাবা, সেই কাজ। ২০১০ সালে চট্টগ্রাম থেকে বরিশালে চলে এলেন মিজানুর রহমান।

বরিশাল বিসিকে জমি বরাদ্দ নিয়ে ২০১২ সালে ফরচুন শুজের কারখানা স্থাপন করেন মিজানুর রহমান। শুরুতে কর্মী ছিলেন মাত্র ৪৭২ জন, যা বেড়ে বর্তমানে সাড়ে সাত হাজার হয়েছে। ফরচুন শুজ বর্তমানে ইউরোপ, আমেরিকাসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে জুতা রপ্তানি করি। ফিলা, ডিজনি ডিচম্যান, স্লাজেঞ্জার, জেমো, মার্কেল, আম্ব্রো, এয়ারনেস, স্টিভ ম্যাডেন, ডানলপ, রেডটেপ, লিডল, বন্ড স্ট্রিট, প্রাইমার্কের মতো ইউরোপ-আমেরিকার খ্যাতনামা ব্র্যান্ডগুলোর জুতা তৈরি হচ্ছে ফরচুনের কারখানায়।

মিজানুর রহমান বলেন, ‘বরিশালে কারখানা স্থাপনের পর মুশকিলে পড়লাম। উৎপাদন শুরু করার জন্য কেউ টাকা দিচ্ছিল না। তখন আমার কাছে যন্ত্রপাতি ছিল। টাকার জন্য সরকারি-বেসরকারি ব্যাংকের দ্বারে দ্বারে ঘুরেছি। কাজের কাজ কিছু হচ্ছিল না। সর্বশেষ ইসলামী ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা আমাকে চলতি মূলধনের ব্যবস্থা করে দিলেন। পরে ধীরে ধীরে অনেক ব্যাংক সহযোগিতার হাত বাড়ায়।’

সংকট ও ঘুরে দাঁড়ানো:

ফরচুনের ব্যবসা যখন ধীরে ধীরে বড় হচ্ছিল, তখন হোঁচট খায় ফরচুন। বিশেষ করে ২০১৪ সালে রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে ফরচুনের অন্তত ২৫ কনটেইনার রপ্তানিমুখী পণ্য বন্দরে আটকা পড়ে। প্রতিষ্ঠানটির কর্মীদের আনা-নেওয়ার কাজে নিয়োজিত চারটি বাস ও একটি ব্যক্তিগত গাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া হয়। সব মিলিয়ে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়ে ফরচুন। কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রমও হয়েছিল। কারণ, অনেক ক্রয়াদেশ বাতিল হয়ে গিয়েছিল।

মিজানুর রহমান বলেন, ‘আমি কখনো হাল ছেড়ে দিইনি। সব সময় ধৈর্য ধরে, আর পণ্যের গুণমান বজায় রেখে পরিস্থিতি মোকাবিলা করেছি। এটা ঠিক যে তখন অনেক ক্রয়াদেশ বাতিল হয়েছিল। তবে পরবর্তী সময়ে আমরা আরও বেশি ক্রয়াদেশ পাই। অনেক নতুন ক্রেতা প্রতিষ্ঠান আমাদের সঙ্গে ব্যবসা করার জন্য আসে। এভাবেই আমরা আবার দাঁড়াতে শুরু করি।’

 

মিজানুর রহমান চেয়ারম্যান, ফরচুন শুজ।

এক দশকের কম সময়ের মধ্যেই ব্যবসায় বড় ধরনের সাফল্য পান মিজানুর রহমান। ব্যক্তিজীবনের কর্মব্যস্ততা সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘আমার পারসোনাল লাইফ বলে কিছু নেই। ফরচুনই আমার ধ্যানজ্ঞান। যেমন ধরুন, চীনে আমাদের নিজস্ব অফিস আছে। সেখানে বাংলাদেশের আগে দিনের কার্যক্রম শুরু হয়। সে জন্য আমাকে সকাল সাতটায় কাজ শুরু করতে হয়। নাশতা করতে করতেই কাজ শুরু করি। আবার রাত দুইটায় আমেরিকার সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে হয়। লন্ডনেও আমাদের অফিস আছে। তাই ঘুমানোর আগপর্যন্ত রাত দুইটা পর্যন্ত আমি কাজের মধ্যেই থাকি। আমার পরিবার, বিশেষ করে স্ত্রী রোকসানা রহমান এক্ষেত্রে আমাকে বেশ সহযোগিতা করেন।’

♦ শ্রমিকবান্ধব কারখানা:

বরিশাল নগরের বিসিক শিল্প এলাকায় ফরচুনের কারখানায় কর্মরত শ্রমিকের বেশির ভাগই আশপাশের এলাকার বাসিন্দা। তাঁদের আবার ৯০ শতাংশ নারী। প্রশিক্ষণ দিয়ে তাঁদের দক্ষ কারিগর হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছে।

গত বৃহস্পতিবার সরেজমিন ফরচুন শুজের কারখানায় গিয়ে দেখা যায়, ব্যাপক কর্মযজ্ঞ চলছে। শ্রমিকেরা যে যাঁর কাজে ব্যস্ত। তাঁদের কেউ সোল কাটিং করছেন, কেউ পেস্টিংয়ে মনোযোগী, কেউ জুতার টপ বানাচ্ছেন, আবার কেউ ফিনিশিংয়ের কাজে নিমগ্ন।

শ্রমিক শারমিন আক্তার বলেন, ‘ফরচুনে কাজ করে একধরনের মানসিক শান্তি পাই। কারখানার পরিবেশ, মজুরি, সুযোগ-সুবিধা—সবকিছুই উন্নত। আমরা অসুস্থ হলে বিনা মূল্যে চিকিৎসা পাই। কোনো শ্রমিকের বড় ধরনের অসুখ হলে মালিকপক্ষ আর্থিক সহায়তা দেয়।’

বর্তমানে শারীরিকভাবে অক্ষম শ্রমিক সিরাজুল ইসলামের বক্তব্যে শারমিন আক্তারের কথার সত্যতা পাওয়া যায়। তিনি বলেন, ‘ব্রেইন স্ট্রোকের পর কাজ করতে না পারলেও, দুই বছর ধরে আমাকে এখনো টেকনিশিয়ান পদের চাকরিতে বহাল রেখে বেতন-ভাতা দিচ্ছে কর্তৃপক্ষ। অসুস্থতার সময়ও আমাকে আর্থিক সহায়তা দিয়ে চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছে কোম্পানি।’ আলাপকালে জানা গেছে, সিরাজুল ইসলামের মতো অন্তত ৫০ জন কর্মী ফরচুন শুজে আছেন, যাঁরা নানা অসুখে কর্মক্ষমতা হারিয়েও চাকরিতে বহাল আছেন।

ফরচুনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মোহাম্মদ রেদোয়ান  বলেন, ফরচুনের কর্মীরা কারখানায় যাতায়াতের জন্য বিনা মূল্যে বাস সার্ভিস পান। এ ছাড়া প্রতিটি কারখানায় একজন চিকিৎসক ও দুজন নার্স রাখা হয়েছে। পাঁচ বছর কাজ করার পর কোনো কর্মী চাকরি ছেড়ে দিলে ভবিষ্য তহবিলের দ্বিগুণ অর্থ পরিশোধ করা হয়। এ ছাড়া শ্রমিকদের জন্য নানা সুরক্ষামূলক কর্মসূচি চালু আছে বলে জানান তিনি।

♦ ক্রিকেট প্রীতি :

সারাক্ষণ ব্যবসায়িক কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকলেও ক্রিকেটের প্রতি ভালোবাসা রয়েছে মিজানুর রহমানের। যখন অবসর পান, তখন ক্রিকেট খেলেন অথবা ক্রিকেট খেলা দেখেন। বিদেশে গেলে অবসর সময়ে পুরোনো খেলা দেখে সময় কাটান। অবশ্য শুধু খেলা দেখা নয়, ক্রিকেটের সঙ্গে অন্যভাবেও নিজেকে সম্পৃক্ত করেছেন। মিজানুর বলেন,বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগে (বিপিএল) ফরচুন বরিশাল নামে একটি ক্রিকেট টিম আছে।

Facebook Comments Box
advertisement

Posted ২:৪৭ পিএম | সোমবার, ১৫ নভেম্বর ২০২১

manchitronews.com |

advertisement
advertisement
advertisement

এ বিভাগের আরও খবর

A H Russel Chief Editor
বার্তা ও সম্পাদকীয় কার্যালয়

5095 Buford Hwy, Suite H Doraville, Ga 30340

E-mail: editor@manchitronews.com