• শিরোনাম

    ১৩৫ দেশ ভ্রমণ করে রেকর্ড গড়লেন নাজমুন

    মানচিত্র ডেস্ক | ২৪ অক্টোবর ২০১৯ | ২:১৫ অপরাহ্ণ

    ১৩৫ দেশ ভ্রমণ করে রেকর্ড গড়লেন নাজমুন

    নাজমুন নাহার - ছবি সংগৃহীত

    বাংলাদেশের লাল-সবুজের পতাকা হাতে বিশ্বের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে একাই ছুটে বেড়াচ্ছেন লক্ষ্মীপুরের সাহসী কন্যা নাজমুন নাহার। তিনি বাংলাদেশ তথা পৃথিবীর এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। ইতিমধ্যেই লাখো তরুণের স্বপ্নের দিশারি হয়ে উঠেছেন এই নারী। এবারের বাংলাদেশ সফরে পেয়েছেন অনন্যা অ্যাওয়ার্ড, জন্টা ইন্টারন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ড, অতীশ দীপঙ্কর অ্যাওয়ার্ডসহ বেশ কিছু সেরা অ্যাওয়ার্ড।

    তিনি পরবর্তী প্রজন্মের জন্য এক নতুন পথ সৃষ্টি করে দিয়ে যাচ্ছেন। ছোটবেলা থেকেই প্রকৃতির প্রেমে পড়েছিলেন। সে থেকে ভ্রমণই তার নেশা। উৎসাহ দিয়েছিলেন তার বাবা। বাবার অনুপ্রেরণায় ডানা মেলেছেন শৈশবেই। উড়ছেন এখনো। লাল-সবুজের পতাকাকে সারা বিশ্বে পৌঁছে দেয়ার সংগ্রামে চাপা পড়েছে তার সংসার স্বপ্নও।

    বিশ্বরূপ দেখতে গিয়ে মানুষের মাঝে পরিচয় করে দিয়েছেন বাংলাদেশের লাল-সবুজের পতাকাকে। দেশ-দেশান্তরে শিশুদের মাঝে পৌঁছে দিয়েছেন জীবনদর্শনের শান্তির বার্তা। নাজমুন নাহার লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার গঙ্গাপুর গ্রামের মোহাম্মদ আমিন ও তাহেরা আমিন দম্পতির আট সন্তানের ছোট সন্তান।

    শীঘ্রই ১৩৬তম দেশ হিসেবে ভেনিজুয়েলা ভ্রমণের ঐতিহাসিক রেকর্ড গড়তে যাচ্ছেন বাংলাদেশের পতাকাবাহী প্রথম বিশ্বজয়ী নাজমুন নাহার! লাল-সবুজের পতাকা ওড়ানোর মাধ্যমে ভেনিজুয়েলা হবে তার ১৩৬তম দেশের সাক্ষী! প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে এটি হবে তার বিশ্ব ভ্রমণের ঐতিহাসিক রেকর্ড। আপাতত ভ্রমণযাত্রা বিরতিতে তিনি নিউইয়র্ক অবস্থান করছেন। ফেসবুক মেসেঞ্জারে নাজমুন নাহারের সাথে কথা হয় দৈনিক জাগরণ সংবাদদাতার।

    এখন পর্যন্ত ১৩৫টি দেশ ঘুরেছেন। শিগগিরই তিনি সফর করবেন ভেনিজুয়েলা, ত্রিনিদাদ ও টোবাগো। লক্ষ্য আরো বিশাল। আশা তার বাকি দেশগুলোও ঘুরবেন। বিশ্বের সব দেশে পড়বে তার পা। সেই লক্ষ্যে ছুটে চলেছেন সর্বক্ষণ।

    নাজমুন নাহার জানান, প্রথম শুরুটা হয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে। ২০০০ সালের শুরুর দিকের কথা। তখন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় বর্ষে উঠেছেন মাত্র। সুযোগ এল ভারতে যাওয়ার। ৮০টি দেশের গার্লস গাইড আর স্কাউট সম্মেলন। সেখানে দেশের হয়ে পতাকা ওড়ানোর দায়িত্ব পড়ল তার কাঁধে। অদ্ভুত ভালো লাগার একটা শিহরণ বয়ে গেল শরীরে।

    নিজের দেশের পতাকা অন্য দেশের মাটিতে ওড়ানোর সুখ পেলেন মনেপ্রাণে। ভারতের মধ্যপ্রদেশের পাঁচমারীতে কাটানো ১৬টি দিন তার স্বপ্নটাকে করে তুলল আরো বিশাল। তখন মনে হয়েছিল, বাংলাদেশের পতাকা যদি আমি বিশ্বের প্রতিটি দেশে নিয়ে যেতে পারতাম! বাবাকে হারিয়েছেন ২০১০ সালে। মাথার ওপর সব সময়ের ছায়াটা সরে গেলেও থেমে থাকেনি তার গল্প। বাবাকে হারিয়ে মায়ের সাথে সময় কাটানোটা বেড়েছে। মাকে নিয়ে ১৪টি দেশও ভ্রমণ করেছেন তিনি।

    ‘আমার অর্থ নেই, সম্পদ নেই, এমনকি আমার স্বর্ণালঙ্কারও নেই কিন্তু আমার ইচ্ছাশক্তিই আমাকে পৃথিবীর পথে-প্রান্তরে নিয়ে যাচ্ছে। আমার জন্মই হয়েছে ভ্রমণ করার জন্য। ছোটবেলা থেকেই প্রকৃতি আমার পছন্দ।’ এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলছিলেন নাজমুন। তিনি আরো বলেন, জাম্বিয়া সরকারের কাছ থেকে পেয়েছেন ‘ফ্ল্যাগ গার্ল’ উপাধি।

    পৃথিবীর হাজার সাতেক শহর ঘুরেছেন এ অবধি। যত না দেখেছেন তার চেয়ে শিখেছেন অনেক বেশি। বতসোয়ানার ফ্রান্সিস টাউনে যাবার কালে মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত হয়েছেন তিনি। পেয়েছেন অসংখ্য স্মৃতিপত্র, স্মারক। সবচেয়ে বেশি যা পেয়েছেন তা হলো পৃথিবীজুড়েই আছে তার বন্ধুবান্ধব। স্কুল ড্রপার ফ্রিদা, জোহান্সবার্গের উপকারী বন্ধু ইতুমলেং, জাম্বিয়ান মেয়ে এঞ্জেলিকা, জাম্বিয়ার মার্গারেট, অস্ট্রেলিয়ার স্কা, গাম্বিয়ার সাফিলো-বিন্তা দম্পতি কিংবা সিয়েরা লিয়নের ডোরা। এ রকম বহু মানুষ আছে, যারা নিয়মিত তার খোঁজখবর রাখেন।

    আলাপ-আলোচনায় নাজমুন জানালেন বই পড়ার কথা। বাবা উপহার হিসেবে সব সময়ই বই দিতেন। একসময় নিজেকে আবিষ্কার করলেন বইয়ের পোকা হিসেবে। মূলত বইয়ের জগতের মধ্য দিয়েই প্রকৃতির প্রতি আকর্ষণের জন্ম। দাদা আরবের অনেক দেশ ভ্রমণ করে এসেছিলেন। সেটা ১৯২৬-১৯৩১ সালের ঘটনা। সেই গল্পও তাকে টেনেছে ছোটবেলায়।

    তার পরের গল্প শুধুই ছুটে চলার। সুউচ্চ পর্বত পেরিয়ে সাগর, মরুভূমি, গ্রাম, শহর, নগর সব চষে বেড়াচ্ছেন। পুরো পৃথিবীতেই পা ফেলার স্বপ্ন তার। ১০০তম দেশ হিসেবে পা ফেলেছেন জিম্বাবুয়েতে। সেখানে ভিক্টোরিয়া জলপ্রপাতের কাছে বাংলাদেশের পতাকা উড়িয়ে জাতীয় সংগীত গাইতে গাইতে কেঁদে ফেলেছিলেন তিনি।

    মনে হচ্ছিল পুরো বাংলাদেশ আছে তার সাথে। বিশেষ করে, মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের কথা মনে পড়ছিল বেশি। যারা একটি পতাকা দিয়ে গেছেন। সেই পতাকাকেই উড়িয়েছেন বিশ্বের ১৩৫টি দেশে। এ অর্জন যেন তার একার নয়। এ অর্জনের ভাগ তো সকল মুক্তিযোদ্ধার, মুক্তিযুদ্ধে প্রাণ হারানো সকল শহীদের। ১৬ কোটি মানুষের।

    পতাকা ওড়াতে গিয়ে ভালোবাসাও পেয়েছেন দেশের মানুষের। লাইবেরিয়ার মনরোভিয়ার সৈকতে ওড়াচ্ছিলেন বাংলাদেশের পতাকা। দুজন দৌড়ে এলেন। জিজ্ঞেস করলেন তিনি বাংলাদেশি কি না। উত্তর পাওয়ার পর একজন কেঁদে ফেলল। তারা বাংলাদেশি। যুদ্ধের সময় তাদের পরিবারের অনেকেই শহীদ হয়েছেন এবং জানা গেল এখানে বেশ কয়েকজন বাংলাদেশি আছেন। বিশাল এক কমিউনিটিতে নিয়ে গেল তারা। অনেক দিন পর দেশীয় রান্না মুখে দিয়ে কান্না চলে এসেছিল তার।

    বিশ্বের এতগুলো দেশ পাড়ি দিতে গিয়ে অনেকবার বিপদেও পড়েছেন নাজমুন নাহার। মৃত্যুও হতে পারত। অনেক অনেক ঘটনা আছে এমন। তবে মানুষের ভালোবাসা আর স্রষ্টার করুণায় ফিরেও এসেছেন বারবার। তিনি বিসাউ থেকে যাবেন কোনাক্রি। ৯ ঘণ্টার পথ। কিন্তু পথের এমন দশা যে একে পথ না বলাই শ্রেয়।

    যেমন পাথুরে তেমন ভাঙাচোরা আর রুক্ষ। আর যে গাড়িতে উঠেছেন সেটিকেও ঠিক গাড়ি বলা যাবে কি না তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে। এমন একটি গাড়ি, যার দরজা লাগাতেও হয় স্ক্রু-ড্রাইভার দিয়ে আবার খুলতেও হয় তা দিয়ে।

    এছাড়া বিকল্প কিছুও নেই এ পথে যাবার। যাচ্ছেন তো যাচ্ছেনই। ঘন জঙ্গলের মাঝ দিয়ে পথ। যেন শেষই হতে চায় না। দূর থেকে ভেসে আসে নানা হিংস্র পশুর ডাক। একটু পরপর গাড়ি যাচ্ছে নষ্ট হয়ে। তবুও তিনি ছুটছেন। যত কষ্টই হোক লক্ষ্য অর্জন করা চাই। তিনি একা একজন নারী হয়ে সারা বিশ্ব ঘুরবেন এই তো তার স্বপ্ন। হুট করে আবার গাড়ি নষ্ট হয়ে গেল।

    এবার একেবারেই নষ্ট হয়েছে। ড্রাইভার অনেক চেষ্টা করেও ঠিক করতে পারল না। এদিকে রাত হয়ে গেছে। জঙ্গলের মধ্যে যাওয়ারও পথ নেই। সঙ্গে থাকা কয়েকজন স্থানীয় মানুষকে নিয়েও হাঁটাপথ ধরলেন তিনি। ফোনে নেই চার্জ। কারো সাথে যোগাযোগ করারও উপায় নেই।

    এদিকে আবার ক্ষুধা-তৃষ্ণায় এতটাই কাতর হয়ে গেছেন যে ঠিকমতো হাঁটতেও পারছিলেন না। হঠাৎই চোখের সামনে একটি ছোট্ট কুঁড়েঘর দেখতে পেলেন। সেই ঘরের বাইরে কয়েকটি পাথর রাখা ছিল, সেখানেই গিয়ে শুয়ে পড়লেন। বাড়িতে একজন মহিলা ছিলেন, যিনি বের হয়ে এলেন।

    কেউ কারো ভাষা বোঝেন না। তবু অর্থ-বিত্তহীন সেই নারীর কোমল হৃদয়ের সন্ধান তিনি পেয়েছিলেন। তিনি তাকে ঘরে নিয়ে বসালেন। যদিও তার ঘরে কোনো খাবার বা পানীয় ছিল না, তবুও তার যতœ নেয়ার চেষ্টা করলেন। এখানে দীর্ঘ ২৬ ঘণ্টা আটকে থাকার পর তাদের গাড়ি ঠিক হয়েছিল। সেই ২৬ ঘণ্টায় তিনি শুধু এক টুকরো আলু খেয়ে বেঁচে ছিলেন।

    এমনই আরেক ঘটনা ঘটেছিল উগান্ডা থেকে রুয়ান্ডা যাওয়ার পথে। সেদিন প্রচণ্ড বৃষ্টিতে আটকে ছিলেন এক বৃক্ষের নিচে। বেশ ভয়ই পেয়েছিলেন সেদিনটিতে। অবশ্য এর যথেষ্ট কারণও ছিল। যে জায়গায় আটকে ছিলেন, সেটার বেশ দুর্নামও ছিল ছিনতাইয়ের।

    সবচেয়ে আনন্দ পান যখন দেখেন তাকে দেখে কেউ উৎসাহী হচ্ছে নিজের বন্দিত্ব ভাঙতে। আইভরি কোস্টের মেয়ে ইভানাতো তার কারণে আত্মহত্যার হাত থেকে ফিরে এসেছে। নতুন করে স্বপ্ন দেখছে এখন সে।

    Comments

    comments

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    পৃথিবীর যে দেশে কোন সাপ নেই?

    ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯

    আর্কাইভ

    সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
     
    ১০
    ১১১২১৩১৪১৫১৬১৭
    ১৮১৯২০২১২২২৩২৪
    ২৫২৬২৭২৮২৯৩০  
  • ফেসবুকে আমরা