• শিরোনাম

    রাজ্যেশ্বরী

    কাজী লাবণ্য | ১৯ অক্টোবর ২০১৫ | ১২:৩৫ অপরাহ্ণ

    রাজ্যেশ্বরী

    দশদিনের একটা অফিসিয়াল ট্যুরে আমরা সাত জন সিনিয়র/জুনিয়র কলিগ এসেছি উন্নত বিশ্বের এই উন্নত দেশে। আমাদের থাকা খাওয়া কাজের জায়গায় নিয়ে যাওয়া নিয়ে আসা সবকিছুই কত্রিপক্ষের সুব্যবস্থাপনায় হচ্ছে। গত সাত দিন ছিল একেবারে টাইট প্রোগ্রাম। সকাল সকাল নাস্তা সেরে রেডি হয়ে বেড়িয়ে গিয়ে ফিরেছি বেশ রাত করে। আজই প্রোগ্রামের শেষ দিন ছিল, আজ হোটেলে ফিরেছি সন্ধ্যা নাগাদ। আমার সাথের কলিগরা ওখান থেকেই শপিং মল বা দর্শনীয় স্থানে চলে গেছে তারা নাকি আজ সারারাত শপিং করবে বা ঘুরে বেড়াবে। কেবল আমি একাই হোটেলে ফিরেছি। আজকের রাতে আমার একটি একান্ত কাজ সেরে ভেবে রেখেছি আগামিকাল আমি পরিবারের জন্য কেনাকাটা করব বা অন্য কিছু করব। বউ ও ছেলে মেয়ে দুটোর জন্য কিছু কেনা কাটা করব, কিছু দর্শনীয় স্থান ঘুড়ে দেখব। একদিনে যতটুকু পারা যায়। পরশুদিনেই আমাদের ফিরতি ফ্লাইট।

    আমাদের থাকার ব্যবস্থা হয়েছে চমৎকার একটি অত্যাধুনিক হোটেলে। এই মুহুর্তে হোটেলের রুমে আমি একা। আমার রুমে ছিল ফিরোজ, আমার সহকর্মী।

    আমি ওয়াশরুমে গিয়ে সেভ করে বেশ জম্পেশ একটা হটশাওয়ার নিয়ে বের হলাম, আয়নার খুব কাছে মুখ এনে দেখলাম আমার গাল দুটো নীলচে নীলচে লাগে কিনা, একজন নীলচে গাল খুব পছন্দ করে। বক্স খুলে শার্ট নিতে গিয়ে দেখি কোনটা পরব ঠিক করতে পারছিনা। উলটে পালটে দেখলাম একটিও নীল বা নীলাভ রঙের শার্ট আনা হয়নি। জীবনে যা কোনদিন করিনি তাই করে মানে প্রত্যেকটি শার্ট গায়ে ফেলে ফেলে দেখে তারপর নীল সাদার কাছাকাছি স্ট্রাইপ একটি শার্ট পরে বডি স্প্রে, পারফিউম মেরে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে নিজেকে দেখলাম নাহ, বেশ ভালই লাগছে। যদিও শরীরের মধ্যপ্রদেশ কিছুটা ফোলা ফোলা লাগছে, আর জুতো জোড়া আরো একটু চকচকে হলে মনে হয় ভালো হত, এমন খুঁতখুঁতে মন নিয়ে আপুনির দেয়া প্যাকেটটা হাতে নিয়ে বের হয়ে পড়লাম।

    আমার গন্তব্য আপুনির ফ্রেন্ডের বাসা, আপুনি একটা প্যাকেট দিয়েছে তাকে দেবার জন্য। উনার সাথে আমার কথা হয়েছে- সে তার বাসার রাস্তা, ট্রান্সপোর্ট খুব ভালো ভাবে, স্পষ্ট করে গুছিয়ে বলে দিয়েছে, আবার পুরো এ্যাড্রেস লিখে এস এম এসও করে দিয়েছে।

    আমি রাস্তায় নেমে ফিরোজকে জানিয়ে দিলাম আজ রাতে আমি নাও ফিরতে পারি।

    অতঃপর আমি নির্দিষ্ট বাসার সামনে এসে দাঁড়ালাম। আবার এ্যাড্রেস মিলিয়ে নিলাম, নাহ সব ঠিকাছে। আমার আসা উপলক্ষে সে নাকি আরো দুচার জনকে আসতে বলেছে, যদিও আমি মনে মনে চেয়েছিলাম…

    দরজার সামনে দাঁড়িয়ে দোরঘন্টিতে হাত রাখার আগেই দেখি দরজা খোলাই আছে, মানে আমার আগে আগেই কেউ একজন ঢুকেছে। আর দরজার সামনেই আলোকিত করে দাঁড়িয়ে আছে দুয়ার খোলা এবং না খোলা যার হাতে স্বয়ং সেই। তাকে দেখে আমি কোন কথা বলতে পারলাম না। সেই আমাকে দেখে সত্যিকারের খুশি হয়ে উঠল। উচ্ছসিত স্বরে বলে উঠল-

    -শুভ তুমি এসে গেছ! বাহ! আসতে কোন প্রবলেম হয়নিত! এসো এসো ভেতরে এসো-

    ভেতরে আরো দু/তিনজন বসে ছিলেন আমার সঙ্গে তাদের পরিচয় হল। দেশ থেকে কেউ এলে এরা সবাই ঝাঁপিয়ে পরে দেশের কথা শোনার জন্য, খুব অল্প সময়ের মধ্যেই এদের সাথে আমার বেশ জমে গেল।

    আপুনির ফ্রেন্ড আমার কাছে বসে আপুনি, ওর ছেলে মেয়ে কেমন আছে, আমার বউ বাচ্চা কেমন আছে, ইত্যাদি খোঁজ খবর নিয়ে আবার উঠে গিয়ে এক গ্লাস জুস এনে আমার হাতে ধরিয়ে দিতে দিতে বলল –

    -ডিনার দেব আর একটু পরেই তোমার কি ক্ষিধে পেয়েছে ? তোমাকে কি হালকা কিছু খাবার দেব?

    আমাদের দেশের মানুষ ক্ষিধে লাগলেও মুখ ফুটে বলবে না যে ক্ষিধে লেগেছে, কিন্তু এদেশের মানুষ সব ব্যাপারেই অকপট। এ বাড়ির গৃহকত্রীও বহু বছর ধরে এখানে থাকতে থাকতে এখানকার সব কিছুতেই অভ্যস্ত হয়ে উঠেছেন, কিন্তু আমি ত না। তাছাড়া সত্যি বলতে কি আমার ক্ষিধে লাগেওনি। আবার এতবড় ঢাউস সাইজের একগ্লাস জুস খাওয়ার পর আমি ডিনার করব কিভাবে তাও বুঝলাম না। গ্লাসটি হাতে নিলাম, সে বলল-

    -শুভ তুমি এদের সাথে গল্প কর আমি একটু কিচেন থেকে ঘুড়ে আসি। তার কথা শেষ না হতেই ওদিক থেকে কেউ একজন গলা বাড়িয়ে বলে উঠলেন

    -রান্নাঘরে কাউকে আসতে হবেনা, সব ত হয়েই গেছে বাকি টুকু সেরে আমিও আসছি। রিয়া তুই শুভর সাথে গল্প কর ।

    বলতে বলতে রান্নাঘরের দরজায় গলা বাড়িয়ে বললেন-

    -শুভ আমি তোমাকে চিনি, রিয়ার কাছে তোমাদের কথা শুনেছি, আমি রিয়ার ফ্রেন্ড। তোমরা গল্প কর- এই একটু পরেই আমিও যোগ দিচ্ছি। আমি হেসে ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানালাম। মনে মনে ভাবলাম এদের সব কিছু কী সাবলীল, কী স্বাভাবিক, অপ্রতিভ হবার কোন চান্স নেই, সকলের প্রাণবন্ত আচরণ দেখে আমারও সহজ হতে সময় লাগল না।

    রিয়া হাসতে হাসতে উঠে রান্নাঘরের দিকেই গেল এই প্রথম আমি পুর্ণ দৃষ্টি মেলে তাকে দেখলাম-

    কী ছন্দময় লঘু পায়ে চলা! সে পড়েছে একটি হালকা এবং গাঢ় নীলের জামদানী, ম্যাচিং ব্লাউজ সংগে খুব সামান্য অরনামেন্টস।

    ইতিপুর্বে আমি তাকে শাড়ি পরা খুব কম দেখেছি, যতবার দেখেছি, বেশিটাই সালোয়ার কামিজ পরা দেখেছি।

    আমি আঙ্গুল গুনে হিসেব ছাড়াও বলে দিতে পারি এই নারীকে আমি কতদিন পরে আজ দেখছি। কিন্তু আমার মনে হচ্ছে এই মাত্র ক মাস আগেই আমার সাথে তার কথা হয়েছে দেখা হয়েছে। তার বড় পরিবর্তন যা চোখে পড়ল তা হচ্ছে সালোয়ার কামিজের জায়গায় শাড়ি আর তার সেই জল প্রপাতের মত কৃষ্ণকুন্তল যা অত্যন্ত আকর্ষনীয় ছিল তা আর নেই। চুলটা কেটে ছোট করা হয়েছে, আর এখন সেটা পনিটেইল করে পেছনে বেঁধে রাখা, এবং কিছু অবাধ্য চুর্ণ কুন্তল ঘাড়ে কপালে কানের পাশে পরে সৌন্দর্যকে যেন আরো ফুটিয়ে তুলেছে।

    আমি নিজে যখন ২৭/২৮ ছিলাম ভাবতাম চল্লিশে মানুষের বার্ধক্যের শুরু হয়ে যায়, আর একটু বেশি হলেই মনে হত তারা একদম জ্যাঠা মামা খালুদের দলে। এখন অবশ্য সেসব কিছু মনে হয়না। এখন প্রায়ই অনেকের মত মনে মনে বলি- “লাইফ বিগনস এ্যাট ফরটি”।

    সে যাই হোক এই নারীর বয়স কত আমি জানি। কিন্তু তাকে তো কিছুতেই অত বয়সের মনে হচ্ছে না। এখনও সেই অপার্থিব সৌন্দর্য্য একেবারে অমলিন। এখনও এত নিখুঁত শরীরের গড়ন! এখনও এত রূপ! কিন্তু কিভাবে! সে কি করে এমন স্থির যৌবনা হলো, এটা কি একটা ম্যাজিক? কি করে এটি সম্ভব ?

    আমি এদেশ সেদেশ বিদেশ মিলিয়ে এত রূপসী নারী সত্যিই দেখিনি। রিয়া প্রথাগত ভাবেই সুন্দরী, আর সেই সৌন্দর্য্যকে অলৌকিক উপায়ে সে ধরেও রেখেছে।

    এই রিয়া আমার বড় বোন, আমার আপুনি রুনুর খুব ক্লোজ ফ্রেন্ড। তাকে প্রথমদিন দেখে প্রথম মুহুর্তেই আমি তার প্রেমে পরে যাই এবং সেই প্রেম থেকে আমার আর মুক্তি মেলেনি।

    (২)

    সামনে আমার ভর্তি পরীক্ষা। দিনরাত কেবল পড়ি আর পড়ি। এস এস সি, এইচ এস সি তে ভালো রেজাল্ট ছিল, এই পরীক্ষায় ভালো করলে আমি আমার এবং আমার বাবার স্বপ্ন পুরণ করতে পারব। আমার বিশ্বাস আছে আমি তা পারবই। লেখাপড়া করতে আমার খারাপ লাগে না, বিশেষ করে অংক করতে আমার দারুণ লাগে। সব ধরনের অংকই আমি আনন্দের সাথে করি।

    তাছাড়া বাবা আমাদের জন্য এত কষ্ট করে, আমি পাশ করে বাবার পাশে দাঁড়াতে চাই, সংসারের হাল ধরতে চাই। মা এবং আমরা দু ভাই বোন মালিবাগের একটি ভাড়া বাসায় থাকি, আর বাবা ঢাকার বাইরে একটি জেলা শহরের সরকারী কলেজে পড়ান। প্রতি সপ্তাহে সম্ভব হয়না, মাঝে মাঝেই বাবা বাসায় আসেন। তখন আমরা ভালো কিছু খাই, সবাই মিলে আড্ডা দেই আনন্দে সময় কাটাই। আপুনি ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে চান্স পেয়েছে, আমিও কদিন পড়েই ভার্সিটিতে চলে যাব কিন্তু বাবা এখনও আমার এবং আপুনির লেখা পরার খোঁজখবর রাখেন আবার মাঝে মাঝেই অংক করাতে বসে যান। এখন আর আপুনি কিছুতেই বসেনা কিন্তু আমি বসি, বাবার কাছে অংক করতে আমার খুব ভালো লাগে, অংকের ফাঁকে ফাঁকে বাবা কত গল্প করেন জীবন সম্পর্কে কত কিছু বলেন । এমন ভাবে গল্পের ছলে বলেন যে উপদেশ মনে হয়না, আমি খুব মন দিয়ে বাবার কথা শুনি। বাবা আমার জীবনের আদর্শ, এই স্বল্পভাষী, সত্যিকারের জ্ঞানী, অসাধারণ স্নেহশীল মানুষটিকে আমি খুব ভালোবাসি।

    এই সময়ই একদিন বেলা ১২ টার দিকে আপুনির সাথে আমাদের বাসায় আসে রিয়া। আমি তখন জেনারেল ম্যাথ হায়ার ম্যাথের ধাঁধাঁয় ঘুরপাক খাচ্ছি। কলিং বেলের শব্দে মা দরজা খুলে দিলে দেখলাম প্রথমে আপুনি এবং পেছনে এক জ্যোতির্ময় মুর্তি প্রবেশ করল।

    প্রথম দেখায় যে কথাটি আমার মনে এলো তা হচ্ছে-

    -এ কে! এ এখানে কেন!!

    একি সদ্য ঘুম থেকে উঠেই চলে এসেছে! এত পবিত্র এত সতেজ কোন মানুষের মুখ হতে পারে! যেন এক অলীক জ্যোতির্ময়ী!

    কিংবা এক শুভ্র রাজহংসী, পরিষ্কার টলটলে জল ছেড়ে এই রাজহংসী এখানে কেন ?

    সেদিন একটু পরেই যাবার কথা থাকলেও সে বিকেল পর্যন্ত থাকল আমাদের বাসায়। দুপুরে আমরা একসঙ্গেই খেলাম। সন্ধ্যার আগে আগে সে চলে গেল। বাসা থেকে গাড়ি এসে তাকে নিয়ে গেল।

    প্রথম দিনেই এই নারী কি করে কি ভাবে যেন আমার অজান্তে আমার মাথার ভেতরে এক স্থায়ী জায়গা করে নিল। তাকে দেখে যে ভাবনাটি আমার মাথায় এসেছিল, তা থেকে এক নামও মাথায় এলো- “জ্যোতির্ময়ী”। বহুদিন পর্যন্ত কল্পনায় আমি তাকে জোতির্ময়ীই বলতাম, খাতায় অজস্র বার লিখতাম জ্যোতির্ময়ী, জ্যোতির্ময়ী, জ্যোতির্ময়ী…।

    অনেক পরে যখন আমি সব কিছু বুঝি, আবেগ নয় যুক্তি দিয়ে বিচার বিশ্লেষণ করতে পারি, যখন আমি জেনে গেছি তাকে না পেলেও তার কাছ থেকে আমার মুক্তি নেই, তখন আমি তার নাম দিলাম ‘রাজ্যেশ্বরী’।

    না, তার জন্য আমার লেখা পড়ার এতটুকু হের ফের হয়নি, বরং উল্টোটা হয়েছে, তার কথা ভেবে, অতি গোপনে সুপ্ত এক বাসনা থেকে আমি আরো বেশী করে পড়েছি, ফিজিক্স, কেমিস্ট্রি, অংক, সব জানা জিনিস বার বার করে রিভাইজ করেছি। এর মাঝে তার সাথে আমার বহুবার দেখা হয়েছে, কথা হয়েছে। আমি যে তাকে কত ভাবে দেখেছি, কত নিবিড় ভাবে দেখেছি, আমি দেখেছি তার টাটকা ঘিয়ের মতো গায়ের রঙ, উড়ন্ত পাখির ডানার মতো ঠোঁটের ভংগী, যেখানে সব সময় এক দুষ্টু-মিষ্টি হাসি লেগেই থাকত।

    আমাদের বাসা বা আপুনিকে ছাড়াও তার সাথে আমার দেখা হয়েছে, দেখা হয়েছে সম্পুর্ণ অপ্রত্যাশিত সব জায়গায় বা সময়ে। আমার ক্লাসমেটের বাসায় দাওয়াত, সেখানে গিয়ে দেখি রাজ্যেশ্বরী। তাদের সাথে কেমন যেন আত্মীয়তা। কী সাবলীল তার চলন, বলন, হাসি, কথাবলা। ক্রিম সিল্কের ড্রেসে তাকে যেন অপার্থিব দেখায় আর আমার মস্তিষ্ক দখল করে নেয় তার কিছু উজ্জ্বল স্থায়ী ছবি।

    একদিন হল থেকে বাসায় ফিরছি ঝুম বৃষ্টি এলো, একটু আগেও রোদ ছিল, শাহবাগ এর কাছাকাছি আসতেই আসমান ভেঙে বর্ষন শুরু হল। একটা ভবনের গাড়ী বারান্দায় দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছি কখন বৃষ্টি থেমে যাবে বা কমে আসবে। দেখতে দেখতে রাস্তায় হাঁটু জল জমে গেল, রাস্তার লোকজন সব দোকানে, এখানে ওখানে আশ্রয় নিল। কখন বাসায় যাব, ক্ষিধেয় পেট চোঁ চোঁ করছে এমন সময় আমি রাজ্যেশ্বরীকে দেখতে পাই সে আর দুজন মেয়ে সহ হাঁটুজলের মধ্যে ভিজতে ভিজতে হাসি মুখে কথা বলতে বলতে এগিয়ে যাচ্ছে। আমাকে ডাকতে হয়নি, সেই আমাকে দেখে চেঁচিয়ে বলল- এ্যাই শুভ, ওখানে কি কর এসো এসো বৃষ্টিতে ভিজি। আমি ছাদের তলা থেকে নেমে বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে রিয়ার সাথে হাঁটতে লাগলাম। অথচ কিছুক্ষণ আগেও আমার মনে আসেনি ভিজে ভিজে বাড়ি ফেরার কথা। কিছুদূর হাঁটার পর সাথের মেয়ে দুটি চলে গেলে আমি আর সে বহুদূর পর্যন্ত একসাথে হাঁটলাম। রিয়ার পেটে এত কথা থাকে, হেসে হেসে সে চমৎকার গল্প করে, হাত নেড়ে গল্প করতে গিয়ে কতবার তার শাড়ী সরে গিয়ে পাকা পেয়ারার মতো ভেজা পেট দেখা যায় যা আমার কাছে স্বর্গের অপ্সরীর মত লাগে, তার কানের লতিতে আটকে থাকা জলের ফোঁটা হীরক বিন্দুর মত লাগে। তার উপস্থিতি আমার কাছে স্বপ্নের মতো মনে হয়। তখন আমি আর আমার মধ্যে থাকিনা।

    আমার সামনে যখন বুয়েট ফাইনাল এক্সাম তখন এক ঘন বর্ষা কালে রিয়ার বিয়ে হয়ে গেল। এক রাজার কুমার উড়ে এলো, এমন রাজকুমাররা অহরহই আসে, তারা আসে বিলেত, আমেরিকা, জার্মান থেকে। এই রাজকুমার এলো আমেরিকা থেকে সে যেমনি রূপবান, তেমনি তার জাগতিক যোগ্যতা। বিয়ের পর রাজ্যেশ্বরীকে নিয়ে উড়ে চলে গেল সে। রাজ্যেশ্বরী ও তার মা এসে আমাদেরকে বিয়ের দাওয়াত দিয়ে গেল। যাওয়ার জন্য সবাইকে আলাদা আলাদা করে বার বার করে বলে গেল। আপুনি তো বিয়ের আগের দিন থেকেই ওখানে থেকে গেল।

    জাঁকজমক পুর্ণ বিয়ের অনুষ্ঠানে অনিচ্ছা স্বত্বেও আমি মাকে নিয়ে গেলাম। তাকে দেখলাম। যেন এক রাজেন্দ্রাণী বসে আছে, এমন রূপের জেল্লা আর চারদিকের জৌলুস দেখে মনে মনে বলেছিলাম রাজ্যেশ্বরীকে এমনই মানায়। এমন আয়োজন ঘিরে থাকুক তার জীবনভর। আমি এখানে বড়ই বেমানান। আর তার বর, সে যেন গ্রিক পুরুষের মত সুদর্শন। বিয়ে পড়ানোর পরে যখন বরকে এনে তার পাশে বসানো হলো আমার ভেতরে আমার পৌরুষ যেন চুর্ণ বিচুর্ণ হতে লাগল। কেবল তাই নয় আমার পুরো অস্তিত্ব যেন হুমকির মুখে পরে গেল, মনে হল এই নারী কেবলই আমার অথচ সামান্য কিছু বৈষম্যের জন্য দাবির হাত আমি বাড়াতে পারিনি। আমি আর পারলাম না। সকলের অগোচরে পালিয়ে এলাম। ফাঁকা বাসায় এসে পাগলের মত হাউমাউ করে কাঁদলাম। সেইযে স্কুলে পড়াকালীন আমার অত্যন্ত প্রিয় ফুটবলটি যখন কেবল আমার চেয়ে বয়সে এবং শারীরিক উচ্চতায় বড় হওয়াতে একজন আমার কাছে থেকে কেড়ে নিয়েছিল বলে সেদিন কী তীব্র অপমানে, রাগ, দুঃখে কেঁদেছিলাম, তেমনিভাবে খুব কাঁদলাম। সেটাই ছিল রাজ্যেশ্বরীকে ঘিরে আমার কান্নার শুরু। সারাজীবন আমি তার জন্য কেঁদেই যাচ্ছি, যেন এ থেকে আমার আর মুক্তি নেই।

    পরবর্তীতে, চাইলে আমিও বিলেত আমেরিকা যেতে পারতাম, মাঝে মাঝে ইচ্ছে যে হয়নি তা নয়, তবে তা আর জোড়ালো হয়নি, আমি হতে দেইনি। আমার মনে হয়েছে- মানুষ আসলে জীবনে কি চায়, কতটা সাফল্য এলে জীবনকে সফল বলা যায়? ইঞ্জিনিয়ার হয়েছি, বিসিএস ক্যাডারে পরীক্ষা দিয়ে ক্লাস ওয়ান গভর্মেন্ট অফিসার হয়েছি, চাকুরি করছি, গভর্মেন্ট কোয়ার্টারের বিশাল বড় বাংলোতে থাকি। আর চাওয়ার কি থাকতে পারে!

    বাবা মা বেঁচে থাকতেই ভাল পরিবারের শিক্ষিত সুন্দরী মেয়ে দেখে আমার বিয়ে দিয়েছেন বাবা। আমার স্ত্রী খুব সংসারী মেয়ে তাকে আমি ভালোবাসি, আমাদের দুটি ছেলেমেয়ে। স্বামী সন্তানের মঙ্গল চিন্তায় কাটে আমার স্ত্রীর দিবস রজনী। আপুনির পরিবার আমার পরিবার মিলে মাঝে মাঝে আমাদের গ্রামে বেড়াতে যাই, গ্রামের সহজ জীবনের সাথে বাচ্চাদের পরিচয় করিয়ে দেই, তারা প্রকৃতি দেখে আনন্দ করে ঘুরে ফিরে বেড়ায়। গ্রামের মানুষের সুখে দুঃখে তাদের পাশে থাকার চেষ্টা করি।

    রিটায়ারমেন্টের পর বাবা মাকে আমি আমার কাছে রেখেছি, তাদের সব ধরনের শখ আহ্লাদ মেটানোর চেষ্টা করেছি, তাঁদের চিকিৎসা, সেবা, যত্ন আমি নিজ হাতে করেছি, তাঁদের ইচ্ছে অনুযায়ী দুজনে মিলে হজ্ব করে এসেছেন। যদিও হজ্বে যাবার খরচ বাবা আমার কাছ থেকে নেননি।

    শেষে প্রিয় পুত্রের কোলে মাথা রেখেই বাবা শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। কী পরম নিশ্চিত ছিল সেই চির প্রস্থান, মাওও ঠিক তাই। জীবনের শেষের দিকে এসে উনাদের কোন আফসোস আক্ষেপ ছিলনা। এইসব কি আমার জীবনের পাওয়া নয়!

    আমার সুখের সংসার। আর দশটি পরিবারের মতই আমার পরিবার ভাল মন্দে সুখে অসুখে কেটে যায়। বরং বলা যায়, আমরা বেশ সুখেই আছি। কেবল মাঝে মাঝে একদম হঠাত হঠাত আমার কি যেন হয়, আমার উপর আমার কোন নিয়ন্ত্রণ থাকে না। হয়ত আমি অফিসে খুব ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছি, ফাইল দেখছি, লোকজন আসছে কথা বলছি, ফোনে কাউকে ডিরেকশন দিচ্ছি, এমন মুহুর্তে আমার সমস্ত কিছু থেমে যায়, আমার কলম ধরা হাত থেমে যায়, আমার সমস্ত শরীর থেমে যায়, মাঝেমাঝে মনে হয় সেই মুহুর্তে হার্টবিটও বুঝি থেমে থাকে- আমার চোখের পর্দায় ভেসে ওঠে সেই মুখ, জোতির্ময়ী বা রাজ্যেশ্বরীর সেই অমলিন মুখ। আমি স্পষ্ট দেখতে পাই তাকে- ঐ যে তার কানের লতিতে হীরার মত বৃষ্টিফোঁটা, ঐ যে বড়পার সাথে গল্প করতে করতে হাসিতে ভেঙ্গে পড়া, ঐ যে বৃষ্টির দিনে তার ভেজা কোমর পেটের দুধ সাদা অংশ, আহ! আমার কোথায় যেন কেমন এক তীব্র অবর্ননীয় কষ্ট হতে থাকে, এত কষ্ট! এত কষ্ট! আমার চোখের কোল বেয়ে অবিরাম জলের ধারা নামে। বেশ কিছুক্ষণ এমন হবার পর ধীরে ধীরে আমার মাথা মন শরীর সব শান্ত হয়ে আসে। কর্তব্য, দায়িত্ব, সামাজিক সম্মান ইত্যাদি আবার আমাকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে নিয়ে আসে। আমি উঠে ওয়াশ রুমে গিয়ে চোখে মুখে জল দেই, চুল আঁচড়াই, বের হয়ে পিওনকে চা বা কফি দিতে বলি, আবার স্বাভাবিক কাজ করি। অফিস শেষে বাসায় যাওয়ার পথে স্ত্রী সন্তানদের জন্য খাবার কিনি, কখনও স্ত্রীর জন্য ফুল কিনি। একদম স্বাভাবিক লাইফ লিভ করি।

    কিন্তু মাঝে মাঝেই এমন হয়। এমনকি ঢাকার বিশৃঙ্খল ট্র্যাফিক, গাড়ির জানালায় ভিক্ষুকের অসহিস্নু টোকা কোন কিছুই আমায় স্পর্শ করেনা, আমার মাথার মধ্যে কেবল পুড়নো পরিচিত গানের কলির মত বা বহু আগে দেখা কোন সিনেমার দৃশ্যের মত ভেসে উঠে এক মুখ সে মুখ রাজ্যেশ্বরীর মুখ।

    এমন ঘটনা একবার নয় বহুবার ঘটেছে- অফিসে, গাড়িতে, বাসায় এমন কি স্ত্রীর সঙ্গে একান্তে কাটানো সময়েও মাঝে মধ্যে ঘটেছে তখন আমি মনে মনে বিব্রত হয়েছি, গ্লানিবোধ হয়েছে, স্ত্রী উদ্বিগ্ন হলে উত্তরে বলেছি- শরীর খারাপ লাগছে।

    আগে খুব ভয় পেতাম, ভাবতাম আমার বুঝি কোন অসুখ করেছে। কিন্তু এখন আমি জানি এটা আমার কোন অসুখ নয় এ এমন এক ব্যপার যা আমার অস্তিত্বের সাথে মিশে গেছে, এ থাকবে। এ থেকে আমার মুক্তি নেই । তাছাড়া আমার অবচেতন মন এ থেকে হয়ত মুক্তি চায়ওনা। মনে হয় এটাকে থাকতে হবে এরকম থাকলে মনে হয় – কিছু একটা আছে, যা একান্তই আমার, এই থাকার বোধটাই জীবনকে উদ্দীপ্ত করে, জীবনকে এগিয়ে নিয়ে যায়। সুস্থ্য ভাবে আনন্দের সাথে বেঁচে থাকার ইচ্ছেটাকে জাগিয়ে রাখে।

    আমি জানি, আমি বিশ্বাস করি রাজ্যেশ্বরী আমার। তার জন্মই হয়েছে কেবল আমার জন্য। কিন্তু তাকে আমি পাইনি। তবে তাকে নিয়েই যে আমার সংসার করতে হবে, তাকেই আমার সন্তানের মা হতে হবে এখন আর আমি তা মনে করিনা। এমন গতানুগতিক ভাবনা আর ভাবিনা, তাকে আমি ভালোবাসি, আমার সমস্ত অস্তিত্ব থেকে উচ্চারিত হয় তার নাম এটাই চিরন্তন সত্য। কেবল আফসোস হয় এর বিন্দু বিসর্গ সে জানেনা। বাতাসের তরঙ্গে আমি সব সময় এক বারতা ওর কাছে পাঠানোর চেস্টা করি-

    ‘রাজ্যেশ্বরী তুমি অমলিন থেকো’ ।

    আর এও ঠিক আমার জন্মও হয়েছে কেবল ওকেই ভালোবাসার জন্য।

    সাতসাগর তের নদী ওপারে থাকলেও আমি তার সব খবরই পেতাম, রাখতাম। অতঃপর যখন তার কাছাকাছি যাবার সুযোগ এলো আমি বহুদিন পর মন থেকে খুশি হয়ে উঠেছিলাম। ভেবেছিলাম হয়ত এক নিমিষের জন্য তাকে আমি বুকে জড়িয়ে ধরতে পারব, তার কানে কানে একবার বলতে পারব- “রাজ্যেশ্বরী, তুমিই আমার রাজ রাজ্যেশ্বরী”

    (৩)

    আড্ডা হাসি গান খানা পিনার ফুলঝুরি এক সময় স্তিমিত হয়ে এল, মিলন মেলা ভাঙলে এক এক করে সবাই চলে গেল, সবাই বলতে লাগল- ওয়েদার ভালো থাকলে আর কিছু সময় থাকা যেত। সর্বশেষের জনকে বিদায় জানিয়ে রিয়া এসে বসল আমার মুখোমুখি। আগের মতই সে উচ্ছল গল্প কথায় মেতে উঠল। আমি কেবল সর্বগ্রাসি ক্ষুধার্তের মত তার উপস্থিতিকে গিলতেছিলাম আর সুযোগ খুঁজছিলাম…

    একসময় সে কিছুক্ষণের জন্য থেমে যায় আর সেই ক্ষণিক দুর্লভ নৈশব্দের মাঝে আমি বললাম- বাইরের ওয়েদার ভালো নয় রাতটা আমি এখানেই থেকে যাই… সে সামান্যতম অপস্তুত না হয়ে বলে উঠল-

    -কেন নয়, তুমি এখানেই থাক, আমার ছেলে এ সপ্তাহে বাসায় নেই, তুমি ওর রুমে অনায়াসেই ঘুমাতে পারবে। হ্যাঁ, ওর ট্রাউজার তোমার হবে। চল চল তোমায় সব দেখিয়ে দেই, আশ্চার্য্য তোমার আপুনি আর আমি কি আলাদা ? বড় বোনের বাসায় থাকবে তার আবার বলতে হবে…

    সে খুব সাবলীল ভাবে কথা বলে যেতে লাগল- আমি চুপ করে তার দিকে তাকিয়ে রইলাম। জীবনের উন্মেষকাল থেকে যে নারী আমার স্বপ্নের নারী, আমার মানস কন্যা তার এমন কথা আমার কানে একদম বেসুরো লাগল। তাকে নিয়ে আমার স্বপ্নের সাথে মিশে আছে কামনা- বাসনা আর সে কিনা বলে সে আমার বড়বোন! আমার সকল উত্তেজনা বরফ হয়ে গেল।

    বড়বোন! হা হতোম্মি! এই নারী বলে কি! সে আমার বড় বোন! ন্যাকা, আদিখ্যেতা আর বলে কাকে! মন মেজাজ খিঁচরে একেবারে তিতা হয়ে গেল। যাকে আমি এত করে সমস্ত জীবনভর চাইলাম সে এসব কি বলে!

    মাঝরাত পেরিয়ে আমি সিদ্ধান্ত নিলাম এখানে আর এক মুহুর্তও নয়। রিয়ার দেখিয়ে দেওয়া ঘরে ঢুকে আমি কতক্ষণ দাঁড়িয়েছিলাম জানিনা। পুরো সময় দাঁড়িয়েই ছিলাম, শোয়া ত দুরের কথা চেয়ারে বসিওনি। এক সময় খুব সন্তপর্ণে তার ঘরের দরোজা খুলে লক টিপে দিয়ে আমি বেড়িয়ে এলাম।

    বাইরে হাড় বেঁধানো ঠান্ডা। মাইনাস ডিগ্রি তাপমাত্রায় আমি বের হয়ে একদিকে হাঁটতে লাগলাম। কোনদিকে যাচ্ছি, কোথায় কি কিচ্ছু জানিনা, তাতে আমার কিচ্ছু যায় আসে না। হাঁটতে হাঁটতে কিছু গাছপালা চোখে পড়ল এদের গাছ আমি চিনিনা হতে পারে এগুলি পাইন, বার্চ, মেপল, সুইট বা কিছু একটা। একটি গাছের নিচে দাঁড়ালাম ভিতর থেকে এক সীমাহীন হাহাকার এসে আমায় ভাসিয়ে নিয়ে যেতে লাগল, আমার বুকের ভেতরটা কেউ যেন ধারালো ছুড়ি দিয়ে ফালা ফালা করে দিচ্ছিল- আহ! এত যন্ত্রনা! এত কষ্ট! আমার সমস্ত লজিক এলোমেলো হয়ে গেল। অবুঝ শিশু, বদ্ধ উম্মাদ, বা পাঁড় মাতালের মতো কি করছি আমি নিজেই বুঝতে পারছিলাম না।

    পুর্ণ বয়সের একজন মানুষ আমি বিদেশ বিভূঁইয়ের অজানা অচেনা জায়গার মাইনাস ডিগ্রি তাপমাত্রায় রাতের নিস্তবতায় হাঁটুভেঙ্গে বসে হুহু করে কেঁদে উঠলাম। এক সময় চিৎকার করে বলতে লাগলাম-

    -আমার সমস্ত জীবনে আমি এক মুহুর্তের জন্য অন্য কোন নারীকে ভালোবাসিনি ভালোবাসতে পারিনি, কারো প্রতি কোন আকর্ষন বোধ করিনি, তোমাকে, শুধু তোমাকেই ভালবেসেছি রাজ্যেশ্বরী…

    কিন্তু তুমি আমার জীবনে প্রেম হয়ে আসনি, তুমি এসেছ এক নিষ্ঠুর অভিশাপ হয়ে, আর আমি তোমায় ভালোবাসবনা, শুনতে পাচ্ছ! হে আমার রাজ, হে আমার ঈশ্বরী…

    “আজ থেকে আমি তোমায় ঘৃণা করি, ঘৃণাআআআআআআআ”…

    কিন্তু মনের ভেতরে যে মন, অস্তিত্বের ভেতরে যে অস্তিত্ব সেখানে ঠিকই জানে যে এই অস্পৃশ্য, অনাঘ্রাতা না পাওয়া নারীর আকর্ষণ মৃত্যুর আগ পর্যন্ত এতটুকু ম্লান হবেনা।

    Comments

    comments

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    অসমাপ্ত প্রেমের গল্প

    ২৬ অক্টোবর ২০১৮

    কাঠবেড়ালি

    ২৪ মে ২০১৮

    আর্কাইভ

    সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
     
    ১০১১১২১৩১৪১৫
    ১৬১৭১৮১৯২০২১২২
    ২৩২৪২৫২৬২৭২৮২৯
    ৩০৩১  
  • ফেসবুকে আমরা