• শিরোনাম

    রবীন্দ্রনাথ কেন বিশ্বকবি

    আব্দুর রশীদ | ০৭ আগস্ট ২০১৬ | ২:৩৬ অপরাহ্ণ

    রবীন্দ্রনাথ কেন বিশ্বকবি

    বিশ্ব সাহিত্যর অঙ্গনে হাজার বছরের ইতিহাসে বহু কবি মহাকবির আগমনের কথা আমরা জানি । আমাদের কিঞ্চিত পরিচয়ও ঘটেছে সেই সকল কবি-মহা কবির সৃষ্টির সাথে। সেই সকল কালজয়ীদের নাম বিশ্বের মাঝে আজও উজ্জ্বল। আমরা নাম করতে পারি গ্যেটে-হোমারের, আমরা আরও জানি টলষ্টয়, গোর্কি, মিল্টন, কীট্স, শেলী, বায়রন, বেতোফেন, মোৎসার্ট এর কথা। আমরা জানি সার্ত্র, পুশকিন, চেখেভের কথা। এই ভারতবর্ষে আমরা জানি বাল্মিকি, বেদব্যাস, বিদ্যাপতি, কালিদাসের কথা। আমরা আরও জানি বঙ্কিম, মধুসূদন, নজরুল, জীবনান্দ দাসের কথা। কিন্তু এতসব নামের সাথে আমরা একজনকে জানি, যিনি বিশ্ব মানবের তরে এক মহাকবি, এক মহান সুরস্রষ্টা- তিনি আমাদেরই কবি, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তিনি বাঙালির কবি, তিনি ভারতবাসীর কবি, তিনি বিশ্বের কবি।

    আজিকার এইদিনে তাঁর স্মরণে আমরা সমবেত হয়েছি তাঁর প্রেমে, তাঁর সৃষ্টির অমৃতরস গ্রহণের আশায়। কিন্তু তাকে এমন করে স্মরণ তিনি কি শুধুই বাঙিিল বলে, নাকি সূদুর অতীত কালের কবি নন বলে ? তাকে আমরা বলছি বিশ্বকবি। সে কি শুধুই আবেগ! না, সে আবেগ দিয়ে মানুষকে সাময়িক ভুলানো যায় কিন্তু তা চিরকালের নয়। তিনি বিশ্ব কবিই। তিনি বাঙালি এবং ভারতবাসীর জন্য তাঁর হৃদয়ের আবেগ, ভালোবাসা সকলই দিয়েছেন, সে সত্য। কিন্তু বাঙালির, ভারতবাসীর মুক্তির সাথে বিশ্ব মানবের মুক্তিকে একসূত্রে গেঁথে দেখেছেন , পক্ষপাত বা খন্ডিত করেননি। “বুদ্ধদেব” গ্রন্থে তিনি লিখেছেন “কেবল পূর্ণ মনুষ্যত্বের প্রকাশ তাঁরই, সকল দেশের সকল কালের সকল মানুষকে যিনি আপনার মধ্যে অধিকার করেছেন, য়াঁর চেতনা খন্ডিত হয় নি রাষ্ট্রগত জাতিগত দেশকালের কোন অভ্যস্ত সীমানায় ”।

    কবির এই উচ্চারন নিজের জীবনে সত্য প্রমান করেছেন তারঁ সমগ্র জীবনের কর্ম দ্বারা। বিশ্বকে দানে, ত্যাগে, কর্মে, প্রেমে, সৃজনে করেছেন আপন। আর ত্যাগের দ্বারা, সৃজনের দ্বারা, প্রেমের দ্বারাই তিনি বিশ্বকে পেয়েছেন-নিছক এই বিশ্বে জন্মেছেন বলেই বিশ্ব তাঁর নয়,নন বিশ্বকবি। ভারতে জন্মে তিনি শুধু ভারতীয় যেমন নন, তেমনই বাংলায় জন্মে নন শুধুই বাঙালি। তাঁর “তপোবন” প্রবন্ধে তিনি উচ্চারণ করেছেন , “তাই আজ আমাদের অবহিত হয়ে বিচার করতে হবে যে, যে সত্যে ভারতবর্ষ আপনাকে আপনি নিশ্চিতভাবে লাভ করতে পারে সে সত্যটি কী। সে সত্য প্রধানত বণিগ্বৃত্তি নয়, স্বরাজ্য নয়, স্বাদেশিকতা নয়, সে সত্য বিশ্ব-জাগতিকতা”। কবির এই উচ্চারন ছিল ১৯০৯ সালে, আজ থেকে শত বছরেরও অধিককাল পূর্বে। কিন্তু তাঁর সেই উচ্চারণ আজিকার বিশ্বের জন্যও কী চরম প্রাসঙ্গিক।

    বিশ্ব মানবতা আজ যে পথ খুঁজছে সেতো কবির শতবছর আগেরই আহবান। জন্মসূত্রে ভারত ছিল তারঁ প্রত্যক্ষ কর্মক্ষেত্র-সাধনাক্ষেত্র কিন্তু তিনি তাঁর কর্মকে কোন রাষ্ট্রীয় সীমানা প্রাকারে বাঁধেননি। ১৯১৬ সালে আমিরিকা প্রবাস থেকে লিখেছিলেন “শান্তিনিকেতন বিদ্যালয়কে বিশ্বের সঙ্গে ভারতের যোগের সূত্র করে তুলতে হবে।ঐখানে সর্বজাতিক মনুষ্যত্ব -চর্চার কেন্দ্র স্থাপন করতে হবে-স্বাজাতিক সংকীর্ণতার যুগ শেষ হয়ে আসছে-ভবিষ্যতের জন্য যে বিশ্বজাতিক মহামিলনযজ্ঞের প্রতিষ্ঠা হচ্ছে , তার প্রথম আয়োজন ঐ বোলপুরের প্রান্তরেই হবে”। সারাবিশ্ব পরিভ্রমণ করেছেন তিনি তাঁর বিশ্বশান্তি বিশ্ব মানবতার আকুতি বুকে নিয়ে-বৃটেন, আমেরিকা, চীন, জাপান, রাশিয়া, ইরাক, ইরান, জাভা,ইতালি, ফ্রান্স,নেদারল্যান্ড, সুইজারল্যান্ড সহ অসংখ্য দেশ তিনি ঘুরেছেন মানুষে মানুষে সম্মিলনের জন্য। এতো বিশ্বকবিরই কাজ।

    পৃথিবীতে আর কোনো কবি এমন করে বিশ্বকে পেয়েছেন বলে আমাদের কাছে খুব একটা খবর নেই। নিন্দা-অপমানের সাথে বিশ্বের মহৎ হৃদয় মানুষ ও রাষ্ট্র তাকে সম্মানও দিয়েছেন অকৃপনভাবে- এই স্বল্প পরিসরে তার একটি উদাহরণ দেয়া গেল। ১৯২০ সালে কবি আমন্ত্রণ পেয়ে নেদারল্যান্ড গিয়েছিলেন, ১৫ দিন ছিলেন সেখানে। সে দেশে নাকি তখন একটা কথা চালু হয়েছিল ‘স্পিরিট অব টেগোর’। নেদারল্যান্ডের ঐ ভ্রমণে কবিকে সবচেয়ে সম্মান দিয়েছিল রর্টাডাম্বাসী, নগরের প্রধান চার্চের বেদি থেকে কবিকে ভাষণ দেবার ব্যবস্থা করে। এ পর্যন্ত কখনও কোনো অখৃস্টানকে তারা এ সম্মান দেয়নি। সারা বিশ্ব তাঁকে কবি, ব›দ্ধু মেনেছে কারন তিনি বিশ্ব মানবের মাঝে নিজেকে সমর্পন করেছেন। তাঁর সৃষ্টিকে কৃপণের ভান্ডারের মত শুধু বাঙালি কিম্বা ভারতবসীর করে রাখতে চাননি। তাঁর জীবনের শেষ প্রান্তে এসে “সভ্যতার সংকট” প্রবন্ধে যা লিখেছেন তাহা বিশ্ব মানবতার ইশ্তেহার, যা মানব সভ্যতার দলিল হিসেবে হয়ত বহুশত বৎসর প্রাসঙ্গিক থাকবে। “সভ্যতার সংকট” প্রবন্ধে তিনি লিখেছেন “মানুষের মধ্যে যা-কিছু শ্রেষ্ঠ তা সংকীর্ণভাবে কোনো জাতির মধ্যে বদ্ধ হতে পারে না, তা কৃপণের অবরুদ্ধ ভান্ডারের সম্পদ নয়”। একই প্রব›েদ্ধ মানুষের-মনুষ্যত্বের জয়ের প্রতি অবিচল আস্থা রেখে লিখেছেন “আর-একদিন অপরাজিত মানুষ নিজের জয়য়াত্রার অভিযানে সকল বাধা অতিক্রম করে অগ্রসর হবে তার মহৎমর্যাদা ফিরে পাবার পথে। মনুষ্যত্বের অন্তহীন প্রতিকারহীন পরাভবকে চরম বলে বিশ্বাস করাকে আমি অপরাধ মনে করি”।

    নিজে প্রবল দুঃসহ বৃটিশ শাসনের মধ্যে জীবন কাটিয়েছেন। স্বজাতীয় মানুষের প্রতি বৃটিশদের নিষ্ঠুরতা-অমানবিকতা তাকে করেছে বৃটিশদের প্রতি তথা ইউরোপীয় সভ্যতার প্রতি আস্থাহীন। সারজীবন তিনি সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ, নিষ্ঠুরতা, ইউরোপীয় সভ্যতার আড়ালের বর্বরতার বিরুদ্ধে ছিলেন উচ্চকন্ঠ। কিন্তু তাহা সত্বেও জাতীয়তাবাদের সংকীর্ণতা তাঁকে মৃত্যুর আগ পর্যন্তও স্পর্শ্ব করতে পারেনি। আস্থা রেখে গিয়েছেন বিশ্ব মানবতা ও মনুষ্যত্বের প্রতি। ১৯৩১ সালে ‘শিক্ষার মিলন’ প্রবন্ধে লিখেছেন “স্বাজাত্যের অহমিকা থেকে মুক্তিদান করার শিক্ষাই আজকের দিনের প্রধান শিক্ষা। কেননা কালকের দিনের ইতিহাস সার্বজাতিক সহযোগীতার অধ্যায় আরম্ভ করবে। যে সকল চিন্তার অভ্যাস ও আচার পদ্ধতি এর প্রতিকুল তা আগামীকালের জন্যে আমাদের অযোগ্য করে তুলবে”। ঐ প্রবন্ধে আরও লিখেছেন “যে গৃহস্থ কেবলমাত্র আপন পরিবারকে নিয়েই থাকে, আতিথ্য করতে যার কৃপণতা, সে দীনাত্মা। শুধু গৃহস্থের কেন, প্রত্যেক দেশেরই কেবল নিজের ভোজনশালা নিয়ে চলবে না, তার অতিথিশালা চাই যেখানে বিশ্বকে অভ্যর্থনা করে সে ধন্য হবে”। এই আমাদের বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ।

    [২২ শ্রাবণ, ১৪২৩ সন্ধ্যা।]

    Comments

    comments

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    অসমাপ্ত প্রেমের গল্প

    ২৬ অক্টোবর ২০১৮

    রাজ্যেশ্বরী

    ১৯ অক্টোবর ২০১৫

    কাঠবেড়ালি

    ২৪ মে ২০১৮

    আর্কাইভ

    সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
     
    ১০১১১২১৩১৪১৫
    ১৬১৭১৮১৯২০২১২২
    ২৩২৪২৫২৬২৭২৮২৯
    ৩০৩১  
  • ফেসবুকে আমরা