• শিরোনাম

    ‘ময়নামতীর চরে’র কবি বন্দে আলী মিয়া

    মানচিত্র প্রতিবেদক | ০৩ আগস্ট ২০১৫ | ৩:০৩ অপরাহ্ণ

    ‘ময়নামতীর চরে’র কবি বন্দে আলী মিয়া

    গল্প, উপন্যাস, নাটক, শিশু-কিশোরতোষ প্রভৃতি বিচিত্র মাধ্যমে সাহিত্যচিন্তার প্রকাশ ঘটালেও বন্দে আলী মিয়ার স্বচ্ছন্দবিচরণ ছিল কবিতাঙ্গনেই। তিনি আদতে কবিই ছিলেন। জীবিকার তাগিদে বহুবিধ পথে সাহিত্যচর্চা করেছেন। কিন্তু তার চিত্তজগৎ কাব্যবলয়ে সুস্থিত ছিল সকল সময়ে। স্বল্পপরিসরে হলেও তার কবি পরিচিতি ওই বিশেষ প্রবণতারই প্রমাণ বহমান। ‘ময়নামতীর চরে’র কবি বন্দে আলী মিয়ার সেই পরিচয়কে আরো বিস্তৃত করে। আরো বুনিয়াদী করেছে। জীবনের কবি বন্দে আলী মানুষের চিন্তা আর সংপৃক্ততার অপরিহার্যতাকে অগ্রাহ্য করতে পারেননি। তাঁর পুরো কবিতাবলয় এই নিবিড় সংলগ্নতাকে আশ্রয় করে মুক্তি আর উত্তরণের পথ খুঁজেছে নিরন্তর।
    নোবেল বিজয়ী কবি বিশ্ববিশ্রুত ব্যক্তিত্ব রবীন্দ্রনাথের অভিমত ও মূল্যায়ন ভাষ্যও জুটেছে তার ভাগ্যে। বন্দে আলীর কবি-অভিব্যক্তিকে আন্দোলিত করে কাব্যজীবনের সূচনালগ্নেই। রবীন্দ্রনাথ ‘ময়নামতীর চর’ সম্পর্কে লিখেছেনÑ‘তোমার ময়নামতির চর কাব্যখানিতে পদ্মাচরের দৃশ্য এবং তার জীবনযাত্রার প্রত্যহ ছবি দেখা গেল। তোমার রচনা সহজ ও স্পষ্ট, কোথাও ফাঁকি নেই। সমস্ত মনের অনুরাগ দিয়ে তুমি দেখেছ এবং কলমের অনায়াস ভঙ্গিতে লিখেছ। তোমার সুপরিচিত প্রাদেশিক শব্দগুলো যথাস্থানে ব্যবহার করতে তুমি কুণ্ঠিত হওনি। তাতে করে কবিতাগুলো আরো সরস হয়ে উঠেছে। পদ্মাতীরের পাড়াগাঁয়ের এমন নিকটস্পর্শ বাংলা ভাষায় আর কোনো কবিতায় পেয়েছি বলে আমার মনে পড়ছে না। বাংলা সাহিত্যে তুমি আপন বিশেষ স্থানটি অধিকার করতে পেরেছ বলে আমি মনে করি।’ (২৬ জুলাই ১৯৩২)। প্রথম গ্রন্থ সম্পর্কে অপরিণত বয়সে(!) এই মূল্যায়ন প্রাপ্তি কি বন্দে আলীর জন্য বিরাট স্বীকৃতি এনে দিয়েছিল। আর তার পরের বন্দে আলী অনেক কবির ভিড়ে, অনেক কবিতার লুকোচুরি খেলায় আমরা আজ ভুলতে বসেছি কবি বন্দে আলী মিয়াকে। অনেক তো সময় গেল। এখন সময় বন্দে আলীদের নতুন করে পাঠকসমাজের সামনে হাজির করার। আর সে দায়ীত্ব সাহিত্যিক, সাংবাদিক, সাহিত্যানুরাগী, সাহিত্য পাঠকের, সাহিত্যভক্তের, কবিতাপ্রেমীদের।
    সমকালীনতা, নাগরিক যন্ত্রণা কিংবা সভ্যতার দাগ বন্দে আলীর কবিতায় ঠিক সরাসরি কোনো প্রভাব কিংবা প্রলেপ ফেলেনি। তাঁর কবিতার কথামালায় আছে চরজীবন নিসর্গ আর গ্রামীণ মানুষের জীবনধারার বর্ণনার কারুকার্য। যতীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত যেমন দুঃখ বর্ণনার কবি। বন্দে আলী মিয়া তেমনি গ্রামীণদৃশ্য বর্ণনার কবি। মোহিতলালের প্রেমনির্ভরতা কিংবা নজরুলের বিদ্রোহ চিন্তা তাঁকে প্রভাবিত করতে পারেনি। আকর্ষণ করেনি তিরিশি কবিতার রূঢ়বাস্তবতা-ঘনিষ্ঠতার জোয়ার। তাই বন্দে আলীর কথা মনে পড়লেই আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে চিরচেনা গ্রামের চিরন্তন ছবি। আর অবধারিত ভাবে ময়নামতির চর।
    এ দেশের মাটি ও মানুষের মূল ধারার কবি ছিলেন বন্দে আলী মিয়া। বহুগ্রাসী প্রতিভার অধিকারী পাবনার কৃতী সন্তান কবি বন্দে আলী মিয়া। তিনি ছিলেন একাধারে গীতিকার, উপন্যাসিক, গল্পকার, নাট্যকার, চিত্রশিল্পী ও অসংখ্য শিশুতোষ সাহিত্যের এক অনন্য লেখক। সেই সাথে ছিলেন জীবনীকার ও স্মৃতিকথার কুশলীব লেখক। কবি বন্দে আলী মিয়া সমস্ত জীবনজুড়ে বাংলা সাহিত্যের ভূবন আচ্ছাদিত ছিল। তাঁর অসাধারণ অথচ অতি সাধারন লেখনশৈলীতায় তুলে ধরেছেন সমাজের কথা দেশের কথা। তিনি আর্থিক দৈনদশায় নিমজ্জিত ছিলেন এমন সময়ও তাঁর গেছে। তার পরেও তিনি বাংলার প্রকৃতি, মাটি ও মানুষকে আপন করে নিয়ে সাহিত্য সৃষ্টির বিরল প্রতিভার অধিকারী কবি বন্দে আলী মিয়া ১৯৭৯ সালের ২৭ জুন মৃত্যুবরণ করেন। কবি বন্দে আলী মিয়া ১৯০৬ সালের ১৭ জানুয়ারী পাবনা শহরের রাধানগর মহল্লার এক নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম উমেদ আলী মিয়া ও মা নেকজান নেছা। পিতা-মাতার একমাত্র আদরের সন্তান ছিলেন তিনি। তাঁর শৈশব এবং কৈশোর কেঁটেছে পাবনাতেই। খুব অল্প বয়সে পিতা তাকে বাড়ির নিকটবর্তী মজুমদার একাডেমীতে ভর্তি করে দেন। লেখাপড়ার দিকে যত খেয়াল, তার চেয়ে বেশি ঝোঁক ছিল তার ছবি আঁকার দিকে। পরবর্তীতে ছবি আঁকার কাজে যতটা না তিনি পরিচিত হয়েছেন। তার চেয়ে বেশি খ্যাতি লাভ করেছেন কবি হিসেবে। বেশি খ্যতি এসেছে তার শিশুসাহিত্য রচনায়।
    তিনি রাধানগর মজুমদার একাডেমী থেকে ১৯২৩ সালে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন এবং সেখান থেকেই ১৯২৩ সালে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করে কলকাতা আর্ট একাডেমীতে ভর্তি হন। ১৯২৭ সালে তিনি ইন্ডিয়ান আর্ট একাডেমী থেকে চিত্রকলায় প্রথম বিভাগে ডিগ্রী অর্জন করেন। ১৯২৫-এ ইসলাম দর্শন পত্রিকায় সাংবাদিক হিসেবে যোগদানের মধ্য দিয়ে কর্মজীবন শুরু করেন। ১৯৩০ থেকে ১৯৪৬ পর্যন্ত কলকাতা কর্পোরেশন স্কুলে শিক্ষকতা করেন। দেশ বিভাগের পর তিনি কলকাতা জীবনে রবীন্দ্র-নজরুলের সান্নিধ্য লাভ করেন। তখন তাঁর প্রায় ২০০ টি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। সে সময় বিভিন্ন গ্রামোফোন কোম্পানীতে তাঁর রচিত পালাগান ও নাটিকা রের্কড আকারে কলকাতার বাজারে বিশেষ জনপ্রিয়তা অর্জন করে। ১৯৬৪ পর প্রথমে ঢাকা বেতারে ও পরে রাজশাহী বেতারে চাকরি করেন। তিনি জীবদ্দশায় নানা সমস্যা-জটিলতার সন্মুখীন হয়েছেন। সুখ যেমন তাঁর সাথী ছিল তেমনি দুঃখও ছিল নিত্যসঙ্গী।
    জীবন যুদ্ধে তিনি বার বার পরাভূত হয়েও জয়ী হয়েছেন। জনশ্রুতি রয়েছে যে, আর্থিক টানাপড়েনে কবি মাত্র ৫০ টাকার বিনিময়ে প্রকাশকের কাছে বই বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছেন। তার অনেক রচনাবলী এখনো বিক্ষিপ্ত ভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। তাঁর রচিত এমন অনেক গুলো বই রয়েছে যে তার একটি কপিও তার কাছে ছিল না। বহুমাত্রিক প্রতিভার অধিকারী কবি বন্দে আলী মিয়া ব্যক্তিজীবনে ছিলেন প্রকৃতির মতই সহজ সরল। সাহিত্যের সব শাখায় তিনি বিচরণ করেছেন। সাহিত্য ভুবনে কবি বন্দে আলী মিয়ার উজ্জ্বলতা কম ছিল না। পল্লীর রুপ-সৌন্দর্য বর্ণনায় নৈপুন্যের পরিচয় দিয়ে গেছেন তিনি।
    তাঁর প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা শতাধিক। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ৯ টি কাব্যগ্রন্থ, ১০ টি উপন্যাস, ৩ টি ছোট গল্প, ১১ টি নাটক এবং সঙ্গীত ভিত্তিক ২ টি রচনা রয়েছে। এ ছাড়া তার “জীবনের দিনগুলি’’ একটি বিশেষ রচনা। কবি বন্দে আলী মিয়ার সব চেয়ে উল্লেখযোগ্য কাব্য গ্রন্থ ‘ময়নামতির চর’। ময়নামতির চর কাব্যগ্রন্থই তার কবি খ্যাতি এনে দেয়। বাংলার শাশ্বত সৌন্দর্যকে ভাষার ব্যঞ্জনায় চিত্রায়িত করেছিলেন তিনি এ কাব্যগ্রন্থে। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থসমূহঃ-১। ময়নামতির চর, ২। অরণ্য, ৩। গোধূলী, ৪। ঝড়ের সংকেত, ৫। নীড়ভ্রষ্ট, ৬। জীবনের দিনগুলো ৭। অনুরাগ ইত্যাদি। শিশুতোষ রচনায়ও কবি বন্দে আলী মিয়া কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখেন। বাংলা শিশুসাহিত্যের ইতিহাসে কবি বন্দে আলী মিয়ারই বইয়ের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। শ্রম, নিষ্ঠা, অধ্যবসায়, সাধনা ও অনলস চর্চার জন্য তিনি আমাদের শিশুসাহিত্যে এক বিরল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবেন। কঠিন ও গম্ভীর জিনিসকে সহজ ও সরলভাবে প্রকাশ ও পরিবেশনের জন্যও তিনি স্মরণীয় হয়ে থাকবেন। তার শিশুসাহিত্যে সবচেয়ে বড় অবদান হলো-ছোটদের উপযোগী জীবনীগ্রন্থ। মহৎ মানুষদের জীবনী যে মানুসের চরিত্র ও মনুষ্যত্ব অর্জনে বড় অবলম্বন তা হয়তো বন্দে আলী মিয়া বিশেষভাবে অনুধাবন করেছিলেন। তাই তিনি ইতিহাস থেকে বিখ্যাত মনীষী, মহামানব, কবি-সাহিত্যিক, বৈজ্ঞানিক, সমাজসেবক, রাজনীতিবিদ প্রভৃতির জীবনতথ্য অবলম্বনে প্রচুর শিশুতোষ জীবনী লিখেছেন।
    কবি বন্দে আলী মিয়া ইতিহাসের বিষয়, উপাদান ও ঘটনাকে কেন্দ্র করে তিনি রচনা করেছেন অনেকগুলো গ্রন্থ। তার মধ্যে ‘কোহিনূর’, ‘ছোটদের বিষাদ সিন্ধু’, ‘ছোটদের মীর কাসিম’, ‘তাহমহল’, ‘কারবালার কাহিনী’ প্রভৃতি গ্রন্থে শিক্ষণীয় দিক তুলে ধরা হয়েছে। তিনি কোরান, হাদিস ও গুলিস্তাঁর গল্প লিখেছেন। আরো লিখেছেন ‘ইরান-তুরানের গল্প’, ‘ঈশপের গল্প’, ‘দেশ বিদেশের গল্প’, ‘শাহনামার গল্প’। তিনি লোককাহিনী, রোমাঞ্চকর ও রূপকথার কাহিনী অবলম্বনে গ্রন্থ রচনা করেছেন। তেমনি বাস্তব সংসার সমস্যা নিয়েও শিশু উপযোগী বহু গ্রন্থ রচনা করেছেন। তাঁর রচিত শিশুতোষ গ্রন্থ আজও অমর হয়ে আছে।
    তার রচিত শিশুতোষ গ্রন্থঃ- ১। চোর জামাই(১৯২৭), ২। মেঘকুমারী(১৯৩২), ৩। মৃগপরী(১৯৩৭), ৪। বোকা জামাই(১৯৩৭), ৫। কামাল আতার্তুক (১৯৪০), ৬। ডাইনী বউ(১৯৫৯), ৭। রূপকথা(১৯৬০), ৮। কুঁচবরণ কন্যা(১৯৬০), ৯। ছোটদের নজরুল(১৯৬০), ১০। শিয়াল পন্ডিতের পাঠশালা(১৯৬৩), ১১। বাঘের ঘরে ঘোগের বাসা উল্লেখযোগ্য।
    বন্দে আলী মিয়ার অবদানের স্বীকৃতি ও সম্মান জানানোর জন্য ১৯৬২ সালে শিশুসাহিত্যে তাকে বাংলা একাডেমী পুরস্কার প্রদান করা হয়। ১৯৬৫ সালে বিশেষ অবদানের জন্য তিনি প্রেসিডেন্ট পুরস্কার পাওয়ার গৌরব অর্জন করেন। এছাড়াও দেশের বিভিন্ন সাহিত্য-সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে তাকে পুরস্কার ও সম্বর্ধনা জানানো হয়। ১৯৮৮ সালে কবিকে মরনোত্তর একুশে এবং ও ১৯৯০ সালে স্বাধীনতা পদকে সম্মানিত করা হয়। জীবনের শেষ দিনগুলোতে তিনি রাজশাহীতে অবস্থান করেন। তখন রাজশাহী রেডিওর সাথে জড়িত ছিলেন। ১৯৭৭ সালে নাটোর টেলিভিশন উপ-কেন্দ্রের তিনি উদ্বোধন করেন। বাংলা সাহিত্যের এই শক্তিমান কবি ১৯৭৯ সালের ২৭ জুন সকাল ১১.২০ মিনিটের সময় রাজশাহীর কাজীহাটার বাসভবনে পরলোকগমন করেন।
    পাঠকদের জন্য ভালো লাগা ও ছোট বেলার পাঠ্য বন্দে আলী মিয়ার কবিতা যেখানে তিনি স্বপ্নলোকের কথা, গাঁয়ের মেঠোপথে ফিরে যাওয়ার কথা বলেছেন। সেই ‘‘আমাদের গ্রাম’’ কবিতাটি এখানে সংযুক্ত করা হলো।
    আমাদের ছোট গাঁয়ে ছোট ছোট ঘর,/ থাকি সেথা সবে মিলে নাহি কেহ পর৷/ পাড়ার সকল ছেলে মোরা ভাই ভাই,/এক সাথে খেলি আর পাঠশালে যাই৷/আমাদের ছোট গ্রাম মায়ের সমান,/আলো দিয়ে, বায়ু দিয়ে বাঁচাইয়াছে প্রাণ৷/মাঠ ভরা ধান তার জল ভরা দিঘি, /চাঁদের কিরণ লেগে করে ঝিকিমিকি৷/আম গাছ, জাম গাছ, বাঁশ ঝাড় যেন,/মিলে মিশে আছে ওরা আত্মীয় হেন৷/সকালে সোনার রবি পুব দিকে ওঠে,/পাখি ডাকে, বায়ু বয়, নানা ফুল ফোটে৷’’

    Comments

    comments

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    অসমাপ্ত প্রেমের গল্প

    ২৬ অক্টোবর ২০১৮

    রাজ্যেশ্বরী

    ১৯ অক্টোবর ২০১৫

    কাঠবেড়ালি

    ২৪ মে ২০১৮

    আর্কাইভ

    সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
     
    ১০১১১২১৩১৪১৫
    ১৬১৭১৮১৯২০২১২২
    ২৩২৪২৫২৬২৭২৮২৯
    ৩০৩১  
  • ফেসবুকে আমরা