বুধবার ২২শে সেপ্টেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ | ৭ই আশ্বিন, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

শিরোনাম >>

ইদানীং এক ধরনের নির্লিপ্ততায় আক্রান্ত আমি। সব কিছুই চলছে জীবনের নিয়মে। কিন্তু তারপরও মনে হয় এই চলার কোনো অর্থ নেই। এই চলার কোনো শেষ নেই। শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে থামবে এই চলা! যে রাতে আকস্মাৎ মায়ের মৃত্যু সংবাদ শুনলাম সে মুহুর্তটার কথা কখনও ভোলার মতো না। মায়ের মৃত্যু আমাকে শূণ্য করে দিয়েছে। আচমকা সে রাতে চোখের সামনে নির্ভুল কুয়াশা দেখতে পেলাম। ঘন সাদা কুয়াশা। দুটো সরু রেল লাইন সেই কুয়াশায় উধাও হয়ে গেছে। আবছায়া একটা সিগন্যাল পোস্ট। ঝিক করে সিগন্যাল ডাউন হল। কুয়াশার ভিতরে কিছু দেখা যায় না। শুধু একটা রেলগাড়ি এগিয়ে আসার শব্দ পাওয়া যায়। ঝিক ঝিক ঝিক ঝিক। শরীরে একটা কাঁপুুনি উঠে আসছে। কাঁপন ছড়িয়ে যাচ্ছে সর্বাঙ্গে। শ্রবন ক্ষীন হয়ে এলো। ঝিক ঝিক ট্রেনের শব্দের সঙ্গে এক তালে। আমার স্ত্রী আমাকে দুহাতে জড়িয়ে ধরে। তারপরও সমস্ত শরীর হাড়কাঠে ফেলা বলির পাঁঠার মতো নির্জীব আত্মসমর্পনের দিকে ঢলে পড়ছে। চোখের সামনে কুয়াশা আর কুয়াশা। একটা রেলগাড়ির ঝন ঝন শব্দ। তারপর সব মুছে যাওয়া।

এরপর প্রায় রাতেই মা আসে। কখনও স্বপ্নে। কখনও অবচেতনে। খাটের ওপর পড়ে থাকা মায়ের স্মৃতি ভেসে ওঠে। মায়ের শরীরে মাংস দেখা যায় না। হাড় ক’খানা অবশিষ্ট আছে। মুখটা হা করা, চিৎ হয়ে ঘুমিয়ে আছে। নির্জীব হয়ে। মাঝে মাঝে মনে হয় মা ঘুমোচ্ছেন। খুব রোগা একটা মানুষ। অথচ কিছুদিন আগেও মা সব পারত। বুড়ো হয়ে গেলে মানুষ কতটা অসহায় হয়ে যায় তা মাকে দেখে আমার মনে হয়েছে। আজকাল সব সময় মনে হয় মার জন্য আরো অনেক কিছু করার ছিল। যখন একা থাকি তখন নানা ভাবনা মাথার মধ্যে গিজ গিজ করতে থাকে। মনে মনে বলি, মা আপনি জানেন না আপনাকে আমি কত ভালবাসি। আমি কতখানি একা হয়ে গেছি। আপনি ছাড়া আমার কেউ ছিল না। আপনি চলে যাওয়ায় পর আমার বল ভরসার জায়গাটা নষ্ট হয়ে গেছে।একবার একজন আমাকে বলেছিল, ’যুগটা হচ্ছে ভাগের যুগ। মা কারও কাছে বোঝা, কারও কাছে মাথার মনি। আজকাল মা-বাপকে ছেলেমেয়েরা তেমন ভালবাসতে পারে না। ফলে কাউকেই পারে না। এটা হল একটা পিকিউলিয়ার লাভলেসনেসের যুগ। আজকাল মা-বাপ মরলেও সন্তানরা তেমন কাঁদে না। সেন্টিমেন্টটা যেন কমে গেছে।’ আমার মা যখন ভীষন অসুস্থ হয়ে পড়েছিল তখন মনে হয়েছিল, মায়ের আর বেঁেচ থাকার দরকার কী? ওরকম মনে হওয়ার কারন, মা বড্ড কষ্ট পাচ্ছিল। শরীরে, মনে। মায়ের সেই কষ্ট মেনে নিতে পারছিলাম না।

সব সংসারই একটা অন্যটার কার্বন কপি। কোনও সংসারই তেমন পিসফুল নয়। আন্ডারকারেন্ট, পরষ্পরের প্রতি বিদ্বেষ. ঘেন্না, জেলাসি। পরিবার থেকে ওটা ধীরে ধীরে সমাজেও সংক্রামিত হয়ে যায়। গল্পটা মোটামুটি একই রকমের। সব মা এখন ভাগের মা। এখন দেশও ভাগের মা, পৃথিবীও ভাগের মা। লোকে কত ভালবাসার কথা বলে, কিন্তু ভালবাসা কাকে বলে তা তার জানা নেই। প্রেমিক প্রেমিকারা কত ভালবাসার কথাটথা বলে ঘর বাঁধে, তারপর তাদের ঝগড়ার জ্বালায় বাড়িতে কাকপক্ষী বসতে পারে না। ভালবাসার গভীরতায় যেতেই পারেনা তারা।ছোটবেলার স্মৃতিগুলো এখন হানা মারে। মামা বাড়ি যেতাম মায়ের সাথে। কখনও ভরা বর্ষায়, কখনও শীতের সময়। আমি সবার ছোট ছিলাম বলে মায়ের সাথে সাথে থাকতাম। অথচ সেই আমি ক্রমেই মায়ের কাছে থেকে দূরের হয়ে গেলাম। বরিশাল থেকে একদিন ঢাকা পাড়ি জমালাম পড়তে। আর সেভাবে ফেরা হলোনা। তারপর আরো বহু দূর। যেখান থেকে ইচ্ছে করলেও যখন তখন মায়ের পাশে গিয়ে বসতে পারিনি। অথচ আশ্চর্যের ব্যাপার হচ্ছে আমি ছাড়া আর কেউই মায়ের কাছ থেকে এত দুরে থাকেনি।সেটা ছিল এক বৃষ্টি মুখর দিন। আমি ঠায় বসে আছি। আমার কোথাও যাওয়ার নেই। কোনও ষ্টেশনেই নামবার নেই। বৃষ্টিভেজা দিনে ভাঙাচোড়া মনে সম্পর্কহীন একা। বড় আনমানা। বাইরের দিকে চেয়ে পৃথিবীর সঙ্গে আমার ও মানুষের সম্পর্কের বুননটা আবিষ্কারের চেষ্টা করি। পারি না। আমার চারদিকে একটা গুটিপোকার খোলস আছে। প্রকৃত আমি বাস করি সেই খোলের মধ্যে। সেখানে শক্ত হয়ে থাকি। বাইরের কারও সঙ্গেই আমার সম্পর্ক রচিত হতে চায় না সহজে। এমনকি ভাই বোন স্ত্রী সন্তারদের সাথেও না। কাউকেই আমি ভাল চিনি না। এর কারণ অন্য কিছু নয়, বাক্য। অভাব ভাব প্রকাশের। আমার অতি আপনজনরাও যখন আমাকে বাক্যবাণে জর্জরিত করে বা ছিঁড়ে খুরে ফেলে আমি কিছু করতে পারি না। কিন্তু মা আমাকে বুঝত। খুব বুঝত।আমি নিজেকে এক জায়গায় জড়ো করতে পারিনি। এখানে ওখানে টুকরো-টাকরা পড়ে আছে। অনেকটাই পড়ে আছে এক অজ গ্রামে। যেখানে আমি মায়ের সাথে থেকেছি। টিনের ঘর, দারিদ্রের ক্লিষ্ট ছাপ, প্রতি পদক্ষেপে এক পয়সা দু’পয়সার হিসাব। তবু সেখানে আমার অনেকটা পড়ে আছে। আজ এই চক চকে শহর, উন্নত বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও সভ্যতার দেশে থেকেও মনে হয় ঢাপরকাঠির সেই অজ পাড়াগাঁ আমার সঙ্গেই আছে। কাঁদা মাখা পা, উড়ো খুরো চুল, চোখে স্বপ্ন, বিস্ময়ের পর বিস্ময়।

মনে আছে তখন ছাতা ছিল না। কচুপাতা বা টোকা আটকাতে পারত না বৃষ্টিকে। ভেজা গায়ে ঘুরে বেড়াতাম। সারাদিন ভেজা জামা প্যান্ট গায়েই শুকাতো। সর্দি লাগতো না। শরীর সব সয়ে নিত। এক জোড়া সস্তা জুতো ছিল, শীত গ্রীস্মে পড়া হতো। না হলে খালি পায়ে হাঁটতে হতো। তবু সেই সব দিনের স্মৃতি কেন কেবলই আনন্দের শিহরন বয়ে আনে!
যখন নির্জন ফাঁকা রাস্তা দিয়ে হাঁটি তখন নিবিড় ঝিম ঝিম, অনুত্তেজক নৈশব্দ ঘিরে ধরে আমাকে। ঘিরে ধরে ভেজা মাটির গন্ধ। ঘিরে ধরে গাছপালা। মনে হয় এরাই আমার বন্ধু। মানুষেরা আমার কেউ না। প্রতিটি বৃক্ষ, কীটপতঙ্গ, তৃণভূমি, নদী, পশুপাখি সব আমার বন্ধু। মনে মনে ভাবি একদিন আমি শহরের বাস ঘুচিয়ে চলে যাব গাঁয়ে। গরুর গাড়ি, ডোবার গর্ত, পানিতে ভরভরন্ত, খানাখন্দ ভেঙে, কাদা ঘেঁটে হাঁটব, মাটি মাখব, ভাব করব পৃথিবীর সঙ্গে। আল পথ দিয়ে মাইলের পর মাইল হেঁটে চলে যাবো। ক্ষেতগুলো ডুবে থাকবে পানিতে, চিনে জোক রক্ত চুষে নেবে, ক্রমে নিবিড় থেকে নিবিড়তর গাঁয়ের মধ্যে চলে যেতে যেতে দু’খানা চোখ রুপমুগ্ধ সম্মোহিত হয়ে মাকে খুঁজে বেড়াবে। আমরা প্রত্যকটা মানুষ এই পৃথিবীর কাছে নানাভাবে ঋণী। যে যেমনই হোক, যত বড় বা ছোট, তার উচিত সেই ঋণ একটু করে শোধ করা। রোজ শোধ করা।

বস্তুত আমি আমার মায়ের কাছে ছিলাম খুব অল্প সময়। খুব কৈশোরে বরিশাল ছাড়া বাইরের জগত কিছুই জানতাম না। কিভাবে যে একদিন আমি বেড়িয়ে পড়লাম! ওখানকার জল-হাওয়া-মাটি আমাকে কিছু বলতে চাইত। আমার বন্ধুর মতো ছিল সব। আমি গাছের সঙ্গে, পোকামাকড়ের সঙ্গে, কুকুর-বেড়াল-গরুর সঙ্গে. পাখির সঙ্গে কথা বলতাম। সবসময় যেন আনন্দ একটা নদীর মতো কুলকুল করে বয়ে যেত বুকের ভিতর দিয়ে। তখন খুব মনে হত, আমি কখনও একা নই। আমার সঙ্গে গাছপালা, পশুপাখি সবাই আছে। আর আছে আমার মা। এখন এতটা বয়সেও এক যুক্তিহীন বাচ্চা ছেলে আমাকে হাত ধরে কেবলই টান। খুব টানে।
ঢাপরকাঠি গ্রামটার তেমন কোনো সৌন্দর্য ছিল না। তবু ওখানকার মাটির ভিতর দিয়ে একটা প্রাণের স্পন্দন আমার শরীরে উঠে আসত। বর্ষাকালে ভীষণ বাজ পড়ত, ঝড়-বাদল তো ছিলই। মাঠ ঘাট পানিতে টইটুম্বুর হয়ে যেতো। কিন্তু ভয় করত না। খোলা মাঠের মধ্যে, ঝড়-বাদলে, বজ্রপাতের মধ্যে খুব তুচ্ছ লাগত নিজেকে। মনে হত, এই তো এইটুকু আমি। আমি মরে গেলেও তো কিছু নয়। ওই বিরাট আকাশ, ভীষণ বৃষ্টি, মস্ত নীল আগুনের ঝলক এত ঘটনার মধ্যে আমার মৃত্যু এমন কীই বা! মৃত্যু একটি মহান ঘুম, এর বেশী কিছুতো না!
১ জুন ২০১১

Facebook Comments Box

আর্কাইভ

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১২
১৩১৪১৫১৬১৭১৮১৯
২০২১২২২৩২৪২৫২৬
২৭২৮২৯৩০  
A H Russel Chief Editor
বার্তা ও সম্পাদকীয় কার্যালয়

5095 Buford Hwy, Suite H Doraville, Ga 30340

E-mail: editor@manchitronews.com