বৃহস্পতিবার ২১শে অক্টোবর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ | ৫ই কার্তিক, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

শিরোনাম >>

বিদায়, বাংলাদেশের ‘মিষ্টি মেয়ে’

শেখ ইউসুফ হারুন   |   রবিবার, ১৮ এপ্রিল ২০২১ | 433 বার পঠিত | প্রিন্ট

বিদায়, বাংলাদেশের ‘মিষ্টি মেয়ে’

সারাহ্‌ বেগম কবরী (১৯৫০-২০২১)

শ্রদ্ধাঞ্জলি

বাংলা চলচ্চিত্রে ‘মিষ্টি মেয়ে’খ্যাত কবরী নেই খবরটি পড়ে ব্যথিত হলাম। চট্টগ্রামের বাঁশখালীর মেয়ে মিনা পাল চলচ্চিত্রের আরেক কিংবদন্তি সুভাষ দত্তের হাত ধরে চলচ্চিত্রে প্রবেশ করেন, তখন তার বয়স ১৪ বছর। ‘সুতরাং’ ছবির মধ্য দিয়ে তার চলচ্চিত্রে আগমন। তারপর জুটি বেঁধেছেন রাজ্জাক, ফারুক, বুলবুল আহমেদ, সোহেল রানা, উজ্জলের মতো নায়কদের সঙ্গে।

স্বাধীনতা-উত্তর ও পরে ‘রাজ্জাক-কবরী’ জুটি জনপ্রিয় হয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধের সময় কবরী ভারতে পাড়ি জমিয়ে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র, আগরতলা থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের অনুপ্রেরণার জন্য বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশ নিতেন। স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালে ঋত্বিক ঘটক পরিচালিত ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ ছবিতে অভিনয় করে খ্যাতি অর্জন করেন। ‘রংবাজ’, ‘নীল আকাশের নীচে’, ‘দীপ নেভে নাই’, ‘সুজন সখী’, ‘সারেং বৌ’য়ের মতো ছবিতে তিনি অভিনয় করে এ দেশের চলচ্চিত্রপ্রেমী দর্শকদের মনে স্থান করে নিয়েছেন। ১৯৭৮ সালে ‘সারেং বউ’ ছবিতে জয়তুন চরিত্রে অভিনয়ের জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারপ্রাপ্ত হন।

২০০৮ সালে কবরী নারায়ণগঞ্জ-৪ (ফতুল্লা-সিদ্ধিরগঞ্জ ও সদর) এলাকা থেকে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের মনোনয়নে বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। জাতীয় সংসদ সদস্য হিসেবে তিনি সে সময় রাজনীতিতে পারিবারিক বিরোধিতার সম্মুখীন হলেও সাহসিকতার সঙ্গে সবকিছু মোকাবিলা করেছেন। তিনিই প্রথম চলচ্চিত্র থেকে আসা সরাসরি জনগণের ভোটে নির্বাচিত সংসদ সদস্য।

২০১৩ সালে আমি ঢাকার জেলা প্রশাসক। একদিন কবরী আমাকে ফোন করলেন। তিনি আমাকে বললেন, ‘ভাই, আমি কবরী সারোয়ার, এমপি বলছি। আপনার সঙ্গে একটু কথা বলতে চাই।’

আমি বিস্মিত এবং আশ্চর্য এ কারণে যে, একসময়ের সাড়া জাগানো চলচ্চিত্রের অভিনেত্রী আমার সঙ্গে কথা বলতে চান। তিনি তো আমার স্বপ্নের নায়িকা। গ্রামের স্কুলে পড়ালেখা করে শহরে আসার সুযোগ কম থাকায় সিনেমা দেখার তেমন সুযোগ পাইনি। তবে সে সময়ে সিনেমা-সংক্রান্ত জনপ্রিয় দুটি পাক্ষিক ‘চিত্রালী’ ও ‘পূর্বাণী’ পড়ে বাংলাদেশের সব নায়ক-নায়িকার ছবির নাম মুখস্থ ছিল। সব মুক্তিপ্রাপ্ত চলচ্চিত্রের সংক্ষিপ্ত কাহিনি বলতে পারতাম। সে সময় রাজ্জাক-কবরী জুটি ছিল অসাধারণ। কবরী মানুষের মনে স্থান করে নিয়েছিলেন তার অপরূপ সহজ-সরল মুখাবয়ব, হাসিতে গালের টোল, টানা টানা চোখ, স্পষ্ট উচ্চারণ ও খুনসুটির কারণে। কবরী যেন গ্রামের সহজ-সরল নারীদের প্রতিনিধি হয়ে চলচ্চিত্রে আবির্ভূত হয়েছেন। তিনি জয় করেছেন চলচ্চিত্রকে।

আমি উত্তরে বললাম,

-বলুন।

তিনি বললেন,

-আপনি যদি সময় পান তবে আমার সঙ্গে একটু দেখা করলে ভালো হয়।

আমি বললাম,

-কী কারণে একটু দয়া করে বললে আমি সে বিষয়ে প্রস্তুতি নিয়ে আসতাম।

উনি বললেন,

-তার দরকার হবে না। আপনি যদি আগামীকাল সকাল ৮টায় আসেন, আমি খুশি হবো। আমার বাসার ঠিকানা এসএমএস করে দেবো।

আমি কথায় একটু অনীহা প্রকাশ করলেও মনে মনে আমার ছোটবেলার নায়িকা কবরীকে সামনে থেকে দেখতে পাব সেটি ভেবে পুরোনো দিনে ফিরে যাই। যা হোক পরের দিন সকালে আমি, ড্রাইভার আর গানম্যান গুলশান-২-এ কবরীর লেক রোডের বাসায় যাই। দেখলাম তিনি আমার জন্য অপেক্ষা করছেন। আমি ঢুকতেই তিনি বললেন,

-আপনি নাশতা করেছেন?

আমি বলি,

-হ্যাঁ।

উনি বললেন,

-যতই নাশতা করুন, আমার এখানে নাশতা খেতে হবে।

একটু অপেক্ষা করতেই তিনি নিজ হাতে পরোটা, ডিম ভাজি নিয়ে আমার সামনে হাজির হলেন। আমি দ্বিতীয়বার নাশতা করতে বাধ্য হলাম। এরপর নিজ হাতে চা এনে দিলেন। তার ব্যবহারে আমি মাতৃস্নেহের পরশ পেয়েছি। কথায় কথায় তিনি বললেন, তার ছেলেরা কানাডা-আমেরিকায় থাকে। তিনি একটি প্রতিবন্ধী ছেলেকে নিয়ে ঢাকায় থাকেন।

যাই হোক নাশতা শেষে তিনি বললেন, ঢাকা শহরে তার একখণ্ড ভূমি রয়েছে সেটি নামজারি দরকার, কিন্তু প্রতিপক্ষের আপত্তির কারণে সেটি হচ্ছে না। আপনি কাগজপত্র দেখে এসিল্যান্ডকে বলে দিলে নামজারিটি হতে পারে।

আমি বলি, আমি দেখব। কাগজপত্র এবং দখল ঠিক থাকলে আপনার নামজারি হবে।

এরপর তিনি তার রাজনৈতিক বিরোধিতার প্রসঙ্গ তুললেন। তিনি বললেন, অনেক প্রতিকূলতার মধ্যে তিনি নারায়ণগঞ্জে রাজনীতি করেন। পরিবার থেকে বিরোধিতার সম্মুখীন হচ্ছেন, সে কথাটিও বললেন। সবশেষে তিনি বললেন, আমার নিরাপত্তার খুব অভাব। নিরাপত্তার জন্য একটি পিস্তল কিনেছি। কিন্তু সেটি চালাতে পারি না। আপনি যদি একটু সাহায্য করেন।

আমি বলি- কীভাবে?

তিনি বললেন, ঢাকা রাইফেল ক্লাবের সভাপতি হিসেবে আপনি যদি একটু সুপারিশ করেন তবে জাতীয় শুটিং ফেডারেশনের শুটিং রেঞ্জে প্র্যাকটিস করতে পারি।

আমি তাৎক্ষণিকভাবে সাধারণ সম্পাদককে টেলিফোন করে প্র্যাকটিসের ব্যবস্থা করি। তিনি আমাকে ধন্যবাদ দেন। এরপর তিনি যতবার শুটিং রেঞ্জে গেছেন, প্রতিবার আমাকে টেলিফোন করে ধন্যবাদ দিয়েছেন। বিভিন্ন সময়ে অনেকবার তিনি আমাকে টেলিফোন করেছেন বিভিন্ন কাজে। বৈষয়িক বিষয়ে পরামর্শ চেয়েছেন। আমি খুশি মনে পরামর্শ দিয়ে ধন্য হয়েছি। এই তো সেদিন করোনায় আক্রান্ত হওয়ায় এক সপ্তাহ আগে হঠাৎ আমার চেম্বারে উপস্থিত। একজন কর্মকর্তার বদলির বিষয়ে কথা বলতে এসেছিলেন। অনেকক্ষণ ছিলেন। আমি ও আমার কর্মকর্তাদের সঙ্গে বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা করেন।

বাংলা চলচ্চিত্রের এক কিংবদন্তি সারাহ্‌ বেগম কবরী। ৫০ বছর ধরে চলচ্চিত্রে অভিনয় করছেন। তার অভিনীত চলচ্চিত্রে গ্রামবাংলার সাধারণ মানুষের জীবন ফুটে উঠেছে। সে সময় কবরীর প্রতিটি ছবি বক্স অফিস হিট করত। সিনেমা হলগুলোতে থাকত প্রচণ্ড ভিড়। বর্তমান আকাশ সংস্কৃতির যুগে সিনেমা হলে ছবি দেখা তো একেবারে বন্ধ। অনেক সিনেমা হল বন্ধ হয়েছে। চলচ্চিত্রে অশ্নীলতা চলে আসার পর এখন আর ভালো অভিনেতাদের কদর নেই। বাংলা চলচ্চিত্রে রাজ্জাক-কবরী যে ধারা তৈরি করেছিলেন, তা কখনও ভুলবার নয়। চলচ্চিত্রের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস বলতে হলে সেখানে কবরীর অবদান অনস্বীকার্য। তার অবদানকে কোনোভাবেই অস্বীকার করা যাবে না।

২০২০ সালের ৮ মার্চ বাংলাদেশে প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হয়। বাংলাদেশ এরপর কত জ্ঞানী-গুণীজন হারিয়েছে তার শেষ নেই। যারা একদিন বাংলাদেশ বিনির্মাণে অবদান রেখেছেন, তাদের আমরা হারাচ্ছি। এ ক্ষতি একটি জাতির জন্য অপূরণীয়। আসলেই কি আমরা অভিভাবকশূন্য হয়ে যাচ্ছি। যখনই বাংলা সিনেমার সোনালি দিনের কথা উচ্চারিত হবে, তখনই কবরীর নাম স্মরিত হবে। কবরীর জীবন ও কর্ম থেকে উৎসারিত হবে বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাস।

সিনিয়র সচিব, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়
(সংগৃহীত)

Facebook Comments Box
advertisement

Posted ৪:০২ অপরাহ্ণ | রবিবার, ১৮ এপ্রিল ২০২১

manchitronews.com |

advertisement
advertisement
advertisement

আর্কাইভ

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০
১১১২১৩১৪১৫১৬১৭
১৮১৯২০২১২২২৩২৪
২৫২৬২৭২৮২৯৩০৩১
A H Russel Chief Editor
বার্তা ও সম্পাদকীয় কার্যালয়

5095 Buford Hwy, Suite H Doraville, Ga 30340

E-mail: editor@manchitronews.com