আজ মঙ্গলবার | ২০ নভেম্বর২০১৮ | ৬ অগ্রহায়ণ১৪২৫
মেনু

ভারতে ‘বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু’ ভাস্কর্য উদ্বোধন

মানচিত্র ডেস্ক | ৩১ অক্টো ২০১৮ | ২:৩৫ অপরাহ্ণ

ছবি-সংগৃহীত

বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু ভাস্কর্য ‘স্ট্যাচু অব ইউনিটি’ উদ্বোধন করেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। ২,৯৯০ কোটি রুপি ব্যয়ে ১৮২ মিটার (৫৯৭ ফুট) উচ্চতার ব্রোঞ্জের প্রলেপে মোড়ানো ভাস্কর্যটি ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতা সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলের স্মরণে নির্মিত হয়েছে। গুজরাটের কেড়ওয়াড়িতে নর্মদা নদীর তীরে এ ‘স্ট্যাচু অব ইউনিটি’ অসংখ্য পর্যটককে আকৃষ্ট করবে বলে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী আশাবাদ ব্যক্ত করলেও স্থানীয়রা একে ‘জনগণের টাকার অপচয়’ হিসেবে দেখছেন বলে জানিয়েছে বিবিসি।

যে পরিমাণ অর্থ খরচ করে বল্লভভাই প্যাটেলের এ ভাস্কর্য নির্মিত হয়েছে, তা আরও ভালো কাজে ব্যবহার করা যেত, বলছেন সাধারণ গুজরাটিরা। জাঁকজমকপূর্ণ উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ভাস্কর্যটি উন্মোচন করার পর মোদী এ ‘স্ট্যাচু অব ইউনিটি’কে ভারতের অখণ্ডতা ও দৃঢ়প্রতিজ্ঞার প্রতীক হিসেবে অ্যাখ্যায়িত করেছেন।

বিমানবাহিনীর দুটি হেলিকপ্টার থেকে পুষ্পবৃষ্টির মাধ্যমে ভারতীয় ভাস্কর রাম ভি সুতারের বানানো এ ভাস্কর্যটির উদ্বোধন হয় বলে জানিয়েছে আনন্দবাজার প্রত্রিকা। ‘একতার ভাস্কর্যের’ নির্মাণ ঘিরে অসন্তোষ, বিক্ষোভ ও সহিংসতাকে কেন্দ্র করে উদ্বোধনের আগেই গুজরাটজুড়ে কয়েক হাজার অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয় বলে জানিয়েছে স্থানীয় গণমাধ্যমগুলো।

মঙ্গলবারও ১৮২ মিটার দীর্ঘ এ ভাস্কর্য নির্মাণের প্রতিবাদ জানিয়ে বিক্ষোভ হয়েছে। পুলিশ ওই বিক্ষোভ থেকে কৃষক ও আদিবাসী আন্দোলনের বেশ ক’জন কর্মীকে আটক করে। স্মারক এ ভাস্কর্য নির্মাণসহ বেশ কয়েকটি প্রকল্পে সরকারের জমি অধিগ্রহণের ক্ষতিপূরণ চেয়ে কয়েক বছর ধরে হওয়া বেশিরভাগ কৃষক বিক্ষোভেরই মিলনস্থল ছিল ‘স্ট্যাচু অব ইউনিটি’।

এটি নির্মাণের অর্ধেক ব্যয়ই গুজরাটের রাজ্য সরকার বহন করেছে বলে জানিয়েছে স্থানীয় গণমাধ্যমগুলো; বাকিটা এসেছে কেন্দ্রীয় সরকারের তহবিল ও জনগণের চাঁদা থেকে। গুজরাটে জন্ম নেওয়া বল্লভভাই প্যাটেলের এ ভাস্কর্যটি নির্মাণের মূল পরিকল্পনাকারী মনে করা হয় মোদীকে। কংগ্রেসের নেতা হলেও ভারতের প্রথম স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও উপপ্রধানমন্ত্রী প্যাটেলকে পছন্দ করার কথা বেশ কয়েকবারই বলেছিলেন মোদী। ২০১০ সালে গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী থাকার সময় এ বিজেপি নেতাই প্রকল্পটির উদ্বোধন করেছিলেন।

নিউ ইয়র্কে অবস্থিত স্ট্যাচু অব লিবার্টির দ্বিগুণ উঁচু এ ‘স্ট্যাচু অব ইউনিটি’ চীনের স্প্রিং টেম্পল বুদ্ধকে পেছনে ফেলে বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু ভাস্কর্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর আগ পর্যন্ত ১২৮ মিটার লম্বা টেম্পল বুদ্ধই ছিল বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু ভাস্কর্য। তবে ‘স্ট্যাচু অব ইউনিটিও এ পরিচয় বেশিদিন রাখতে পারতে না বলে ধারণা করা হচ্ছে। মারাঠা বীর শিবাজীর স্মরণে মহারাষ্ট্রে যে ভাস্কর্য তৈরি হচ্ছে, উচ্চতায় তা বল্লভভাই প্যাটেলের ভাস্কর্যকেও পেছনে ফেলে দেবে বলে অনুমান করা হচ্ছে। শিবাজির ওই ভাস্কর্যটি ১৯০ মিটার লম্বা হবে বলেই মনে করা হচ্ছে।

ভারতের স্বাধীনতার পরপরই বেশ কিছু সামন্ত রাজ্যকে ভারতীয় ভূখণ্ডের অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন তৎকালীন উপপ্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বল্লভভাই প্যাটেল। সেই ‘লৌহমানব’ বল্লভভাই প্যাটেলের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার নিয়ে কংগ্র্রেস ও বিজেপির মধ্যে নীরব যুদ্ধ চলছে। ২০১৩ সালের নির্বাচনি প্রচারের সময় মোদী বলেছিলেন, “সর্দার প্যাটেল ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী না হওয়ায় সব ভারতীয়রই খেদ রয়েছে।”

কংগ্রেস বলছে, বল্লভভাই প্যাটেল তাদের দলের নেতা ছিলেন। অন্যদিকে বিজেপির মতে, স্বাধীনতা সংগ্রামীদের উত্তরাধিকারে কারওই একচ্ছত্র প্রভাব থাকতে পারে না। গুজরাটের প্রধান শহর আহমেদাবাদ থেকে ২০০ কিলোমিটার দূরে নির্মিত এ ‘স্ট্যাচু অব ইউনিটি’ প্রতিবছর প্রায় ২৫ লাখ পর্যটককে আকৃষ্ট করবে, যা স্থানীয় অর্থনীতির সমৃদ্ধিতেও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রাখবে বলে প্রত্যাশা ভারতীয় কর্মকর্তাদের।

তীব্র বাতাস ও শক্তিশালী ভূমিকম্পেও দাঁড়িয়ে থাকতে সক্ষম এ ভাস্কর্যটি ৬৭ হাজার টন ভারী। এর বাইরের অংশে যে ১২ হাজার ব্রোঞ্জ প্যানেল ব্যবহৃত হয়েছে, তারও ওজন প্রায় এক হাজার ৮৫০ টন।

২০ হাজার বর্গমাইল এলাকাজুড়ে নির্মিত এ প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে ১২ কিলোমিটারের একটি কৃত্রিম হ্রদও। পর্যটকরা ভাস্কর্যটির বুকের কাছে ১৫৩ মিটার উঁচুতে অবস্থিত গ্যালারি পর্যন্ত উঠতে পারবেন বলেও জানিয়েছে বিবিসি। সরকারি কর্মকর্তারা এ ভাস্কর্যকে ঘিরে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির কথা বললেও তা নিয়ে সন্দেহের কথা জানিয়েছেন স্থানীয় কৃষকরা।

“দানবীয় এ মূর্তির পেছনে অর্থ খরচ না করে সরকারের উচিত ছিল তা এখানকার কৃষকদের পেছনে ব্যয় করা,” বলেন নির্মাণ কাজের সময় গাড়িচালকের কাজ করা কৃষক বিজেন্দ্র তাদভি।৩৯ বছরের এ কৃষক তার তিন একর ফসলি জমিতে সেচের ব্যবস্থা করতে রীতিমত হিমশিম খাচ্ছেন।

ভারতের অন্যান্য অঞ্চলের মত গুজরাটের কৃষকরাও সেচের জন্য বৃষ্টি ও পাম্প দিয়ে মাটির নিচ থেকে তোলা পানির উপর নির্ভরশীল। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে গুজরাটে টানা খরা এবং অনাবৃষ্টির কারণে মাটির নিচের পানির স্তরের উচ্চতা কমে গেছে। যে কারণে বেশিরভাগ পাম্প দিয়ে পানি উঠছে না।

সেখানে এমনকি প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থাতেও ধস নেমেছে। কয়েকটি এলাকা দুর্ভিক্ষের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে। ২০১৬ সালে রাজ্য সরকার প্রকাশিত এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, গুজরাটের অনেক জেলায় কৃষকদের আয় এতটাই কমে গেছে যে তারা পরিবারের জন্য দু’বেলা আহার যোগাড় করতে পারছেন না।
প্রকল্প বাস্তবায়নে আদিবাসীদের জমি নিয়ে সামান্য কিছু আর্থিক সাহায্য দিলেও বিকল্প জমি বা চাকরিরর প্রতিশ্রুতিও পূরণ করেনি গুজরাটের রাজ্য সরকার।

Comments

comments

x