আজ রবিবার | ১৬ ডিসেম্বর২০১৮ | ২ পৌষ১৪২৫
মেনু

ঢাকা পম্পেই নগরীর ভাগ্য বরণ করুক তা চাই না

আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী | ৩১ জুলা ২০১৮ | ২:৩২ অপরাহ্ণ

গত ২৩ জুলাই সোমবার দেশের মাটিতে পা রেখেছি। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পা রেখেই মনটা জুড়িয়ে গেছে। বিমানবন্দরে আসা পরিচিতজনের মুখদর্শণে ভ্রমণক্লান্তি চলে গেছে। ঢাকায় রওনা দেওয়ার আগে শুনেছিলাম, দেশে বেজায় গরম। রোদে চাল রাখলে তা ভাত হয়ে যাবে; কিন্তু পৌঁছেই দেখলাম অঝোর বৃষ্টিতে শহর স্নাত। তাপমাত্রা কমে গেছে। এটা যেন আমার প্রতি স্নেহাতুর স্বদেশের সাদর সম্ভাষণ।

কিন্তু বিমানবন্দরের বাইরে বৃষ্টিস্নাত শহরে বেরিয়ে বুঝলাম, স্বদেশের প্রকৃতি আমার প্রতি যতটা স্নেহপরায়ণ, ঢাকার রাজপথ ততটা নয়। হাসিনা সরকার শহরে এত উড়াল সেতু তৈরি করেছে; কিন্তু যানজট ‘যথা পূর্বং, তথা পরং’। কখনো বুঝতে পারিনি, বিমানবন্দর থেকে ঢাকা ক্লাব পর্যন্ত পৌঁছতে চার ঘণ্টা লাগবে। লন্ডন থেকে ঢাকায় এসেছি ১২ ঘণ্টায়। আর ঢাকার বিমানবন্দর থেকে শহরে আমার বাসস্থানে পৌঁছতে লেগেছে চার ঘণ্টার ওপর। সেলুকাস বলেছিলেন বিচিত্র এ বাংলাদেশ। তাঁর বলার বহু শতক পর ঢাকার রাজপথে চার ঘণ্টা অবরুদ্ধ থেকে আমার মনে হলো সে কথা এ যুগেও সত্য।

পঞ্চাশের দশকে পণ্ডিত নেহরু কলকাতা শহরকে দেখে বলেছিলেন, দুঃস্বপ্নের নগরী (পরঃু ড়ভ হরমযঃসবত্ব)। কলকাতা শহর এখন আর দুঃস্বপ্নের নগরী নয়। তেমনি ঢাকা শহরও আর পঞ্চাশের দশকের ভিলেজ সিটি নয়। তার আয়তন যেমন বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে বহুমাত্রিক চেহারা। উন্নয়নের ছোঁয়া লেগেছে সর্বত্র। কিন্তু পরিকল্পিত উন্নয়ন হয়নি বলে ঢাকা শহরকে এখন বলা চলে কংক্রিটের কঙ্কাল। রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের কি অর্থের অভাব, না সুষ্ঠু পরিকল্পনার অভাব? শহরে অপরিকল্পিত বহুতল ভবন ও রাস্তাঘাটের অবস্থা দেখে তাই মনে হলো।

শুক্রবার ছুটির দিন। সুতরাং রাজপথগুলো একটু সুনসান থাকবে ভেবেছিলাম। প্রথমে যাব আজিমপুর গোরস্তানে, তারপর মিরপুরে শহীদ বুদ্ধিজীবীদের সমাধিতে। তারপর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় এক বন্ধুর বাসায়। কিন্তু শুক্রবার হলে কী হবে, রাস্তায় তেমনি যানজট। মনে হলো, সকালে রওনা হলেও এই তিন জায়গা ঘুরে ঢাকা শহরের যেখানে থাকি, সেখানে ফিরে আসতে সন্ধ্যা হয়ে যেতে পারে। বসুন্ধরা এলাকার রাস্তা ভালো; কিন্তু তার আগের রাস্তাগুলো বেজায় খারাপ। ভাঙাচোরা তো রয়েছেই। তার ওপর বৃষ্টিতে কাদামাটি মিশে এক ভয়ংকর অবস্থা। আমার গাড়ির চাকা মাঝে মাঝেই গর্তে পড়ছিল। আর ভীষণ ঝাঁকুনিতে মনে হচ্ছিল এই বুঝি হাড়গোড় ভাঙে।

ঢাকায় যানজট নাকি নিত্যই ঘটে। পথযাত্রীদের, এমনকি গাড়ির আরোহীদেরও দুর্ভোগের অন্ত নেই। মনে মনে নগরবাসীর ধৈর্যের প্রশংসা করেছি। অন্য কোনো দেশে এ ধরনের ঘটনা বছরের পর বছর ঘটলে নগরপিতাদের খবর ছিল। আমেরিকার নিউ ইয়র্ক শহরে একসময় এ ধরনের অবস্থা ছিল। সে বহু বছর আগের কথা। শহরে ট্রাফিক আইন ছিল, কেউ মানত না। সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু ছিল নিত্যনৈমিত্তিক। আর ছিল সন্ত্রাস। সামাজিক সন্ত্রাস।

তখন আমি একবার নিউ ইয়র্কে গেছি। এক দিন বাসা থেকে বাইরে বেরোব, যে বন্ধুর বাসায় উঠেছি, তাঁর স্ত্রী বললেন, পকেটে কত টাকা আছে? বললাম, ২০০ ডলার। বন্ধুপত্নী বললেন, কিছু কেনাকাটা নেই তো? আমি না বলতেই তিনি বললেন, তাহলে দেড় শ ডলার আমার কাছে রেখে পঞ্চাশ ডলার নিয়ে বের হন। কারণ জিজ্ঞেস করতেই বললেন, রাজপথে কোনো সন্ত্রাসী যখন ছুরি উঁচিয়ে টাকা চাইবে, তখন টাকা না পেলে ছুরি মারবে। বাঁচার জন্য ওই পঞ্চাশ ডলার দেবেন। আপনাকে তল্লাশি করে ওরা আর কিছু পাবে না। যে কয় দিন নিউ ইয়র্কে ছিলাম, তত দিন তাঁর উপদেশ মেনে চলেছি।

এখন নিউ ইয়র্ক শহরের চেহারাই আলাদা। যানজট অনেকটাই সহনীয়। রাস্তাঘাটে চলাচল অনেকটাই নিরাপদ। বন্ধুদের জিজ্ঞেস করেছিলাম, এমন ‘মিরাকল’ ঘটল কী করে? বন্ধুরা বললেন, এক ইতালিয়ান বংশোদ্ভূত মার্কিন নাগরিকের কল্যাণে। তিনি নিউ ইয়র্কের মেয়র হওয়ার পর আইনের শাসন এমন কঠোর করেন যে মাত্র ছয় মাসের মধ্যে নিউ ইয়র্ক শহর যানজট ও জঞ্জালমুক্ত হয়, সন্ত্রাসমুক্ত হয়। কৃতজ্ঞ নগরবাসী তাঁর সম্মানে একটি বিমানবন্দরের নাম রেখেছে।

বন্ধুদের জিজ্ঞেস করেছিলাম, নিউ ইয়র্ক সিটি সন্ত্রাসমুক্ত হলো কী করে? যে শহরে প্রতি মিনিটে নাকি ৩০ ব্যক্তি খুন হতো। বন্ধুরা আমার কৌতূহল মেটাতে নিউ ইয়র্কের ওই মেয়র কর্তৃক গৃহীত যেসব ব্যবস্থার কথা বললেন, তা শুনে মনে হলো, এমন ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষমতা ঢাকার মেয়রদের নেই এবং তাঁরা এই ক্ষমতা প্রয়োগ করতে গেলে আমাদের তথাকথিত সুধীসমাজ, মানবতা প্রেমিকরা হায় হায় করে উঠতেন। যেমন হায় হায় করছেন বর্তমান সরকারের অবৈধ মাদক ব্যবসা উচ্ছেদ অভিযানে।

ঢাকা শহরের এই যানজট এবং নিত্য সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু—এই সমস্যা সমাধানের কি কোনো ব্যবস্থা নেই? আছে। এ সম্পর্কে আগে একটি গল্প বলি। রাশিয়ার নেতা তখন ক্রুশ্চেভ এবং আমেরিকার প্রেসিডেন্ট আইসেনহাওয়ার। ক্রুশ্চেভ নিউ ইয়র্কে এসেছেন জাতিসংঘের বিশেষ অধিবেশনে যোগ দিতে এবং আইসেনহাওয়ারের আতিথ্য গ্রহণ করেছেন। যে দিন তাঁরা জাতিসংঘ ভবনে যাবেন, সে দিনও নিউ ইয়র্কের রাস্তায় ভয়াবহ যানজট। সে দেশে পুলিশের ‘বাঁশি ফুঁকিয়ে রাস্তাঘাট ব্যারিকেড দিয়ে জনশূন্য করে, জনজীবনে নিদারুণ দুর্ভোগ ঘটিয়ে প্রেসিডেন্টের গাড়িরও যাতায়াতের সুবিধা নেই। এদিকে দুই দেশের নেতারই সময়মতো জাতিসংঘ ভবনে যেতে হবে।

তখন হেলিকপ্টার আনা হলো। ক্রুশ্চেভ বাড়ির ছাদে দাঁড়িয়ে শহরের যানজট দেখছিলেন। তিনি আইসেনহাওয়ারকে বললেন, ‘আমরা মস্কোতে গাড়ির সংখ্যা বাড়তে দিই না। মন্ত্রী, পার্লামেন্ট সদস্য, উচ্চপদের সরকারি কর্মচারীদের জন্য আরামদায়ক বাসের ব্যবস্থা আছে। লাক্সারি কারের ব্যবস্থা নেই। আর আছে সাইকেল। তাতে মস্কোর রাস্তায় কোনো যানজট নেই।’

আইসেনহাওয়ার হেসে বলেছেন, ‘কমরেড, আপনার সোশ্যালিজম এবং আমার ক্যাপিটালিজমের অবস্থা সম্পূর্ণ বিপরীত। আপনি সমাজতন্ত্রে যা পারেন, আমি ধনতন্ত্রে তা পারি না। মার্কিন নাগরিকদের প্রতিটি পরিবারে প্রত্যেক সদস্যের জন্য গাড়ি থাকার ব্যবস্থায় হাত দিয়ে কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্টই গদি রক্ষা করতে পারবেন না।’

নিউ ইয়র্কের বহুদিন আগের কথা লিখলাম। এখন বাংলাদেশের ঢাকা শহরের অবস্থা তাই। সরকারের উন্নয়নের ছোঁয়ায় দ্রুত শহরের আয়তন বাড়ছে, রাস্তা সম্প্রসারিত হচ্ছে। কিন্তু তার তুলনায় অনেক বেশি বাড়ছে গাড়ি আমদানি। নব্য ধনীদের বিলাসিতার ক্ষুধা মেটানোর জন্য শহরের আয়তন ও রাস্তাঘাটের অবস্থা বিবেচনা না করে প্রতিবছর দেদার নতুন গাড়ি আমদানির লাইসেন্স দিতে হয়। অন্যদিকে পুরনো ও অচল গাড়িগুলোকে রাস্তা থেকে প্রত্যাহারের ব্যবস্থা কম। রাজপথে ট্রাফিক আইন মেনে চলার উদাহরণ বেজায় কম। তার ওপর আছে এক শ্রেণির পুলিশের বাস ও লরির চালকদের কাছ থেকে চাঁদাবাজির ব্যবস্থা। সব মিলে দেশে যে শক্তিশালী কায়েমি স্বার্থ গড়ে উঠেছে, তাতে কোনো গণতান্ত্রিক সরকারের হাত দেওয়া হবে খুবই বিপজ্জনক।

সরকার ঢাকা শহরে অসংখ্য উড়াল সেতু নির্মাণ করেছে। এখন চলছে মেট্রো রেল চালু করার পরিকল্পনা। তাতে যানজটের সাময়িক সমাধান হবে, স্থায়ী সমাধান হবে না। স্থায়ী সমাধান করতে হলে গ্রামাঞ্চল থেকে ঢাকামুখী জনপ্লাবন বন্ধের ব্যবস্থা করতে হবে। দেশের বর্তমান উন্নয়ন প্রধানত ঢাকাকেন্দ্রিক বা নগরকেন্দ্রিক উন্নয়ন। এই উন্নয়নকে প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চল পর্যন্ত ছড়াতে হবে। গ্রামাঞ্চলেই চাকরি, শিক্ষাদীক্ষার উন্নত ব্যবস্থা করতে হবে। নইলে মানুষ আয়-উপার্জন, শিক্ষা, চাকরির জন্য শুধু ঢাকার দিকেই ছুটবে।

লন্ডনে এ জন্য ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ হয়েছে। বড় বড় মন্ত্রণালয়, সরকারি দপ্তর, ব্যবসা-বাণিজ্যের কেন্দ্র লন্ডন থেকে আশপাশের দূরবর্তী শহরগুলোতে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ সরকার সব প্রশাসনিক দপ্তর, শিক্ষা, স্বাস্থ্যের সব ব্যবস্থা ঢাকাকেন্দ্রিক করে রেখেছে। মুখে তারা ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের কথা বলছে। কিন্তু কাজে তা করছে না। ক্ষমতার এই বিকেন্দ্রীকরণ ছাড়া ঢাকামুখী—এককথায় শহরমুখী জনস্রোত বন্ধ করা যাবে না। উন্নয়নের সব সাফল্য তৃণমূল পর্যায়ে জনগণের দুয়ারে পৌঁছে দেওয়া যাবে না।

ঢাকা শহর থেকে বিমানবন্দর আরো দূরে সরানো প্রয়োজন। প্রয়োজন ক্যান্টনমেন্ট শহরের বাইরে নেওয়া। ব্যাঙের ছাতার মতো এত বিশ্ববিদ্যালয় ঢাকায় দরকার নেই। কয়েকটি মন্ত্রণালয়ের সদর দপ্তরও চট্টগ্রাম, বরিশাল, সিলেট ও রাজশাহীতে সরিয়ে দেওয়া দরকার। তাতে উন্নয়নের ক্ষেত্রে আঞ্চলিক বৈষম্য হ্রাস হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ঢাকা শহরের ওপর থেকে ভয়াবহ চাপ কমবে। শহরকে পরিবেশদূষণমুক্ত করা যাবে এবং নাগরিকদেরও উন্নত শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া যাবে। ওয়াসার কল দিয়ে নর্দমার দূষিত পানির প্রবাহ বন্ধ করা যাবে। নগরীর ওপর অসহ জনসংখ্যা বৃদ্ধির চাপ কমানো যাবে।

সরকার এসব ব্যবস্থা করবে অথবা করতে পারবে কি না জানি না; নইলে ঢাকা শহরের যে ঊর্ধ্বমুখী সম্প্রসারণ চলছে, তাতে যা ঘটতে পারে, তার প্রতিচ্ছবি পাওয়া যাবে ‘লাস্ট ডেইজ অব পম্পেই’ উপন্যাসে। আমি চাই না, আমাদের এই প্রিয় শহর ঢাকা কোনো দিন পম্পেই নগরীর ভাগ্য বরণ করুক।

ঢাকা, সোমবার, ৩০ জুলাই ২০১৮

Comments

comments

x