আজ সোমবার | ২০ আগস্ট২০১৮ | ৫ ভাদ্র১৪২৫
মেনু

দিনমজুরি করে আলমাছের এইচএসসি পাশ করার গল্প

পাবনা প্রতিনিধি | ২৪ জুলা ২০১৮ | ৪:০৫ অপরাহ্ণ

আলমাছ ও তার মা সালেহা খাতুন

গরিব ঘরে জন্ম বলে ছোট বেলা থেকেই হাতে উঠেছে কাস্তে, খুন্তি, কোদাল। ভোর বেলা হলেই বেড়িয়ে পড়তো কাজের সন্ধানে। কখনও নির্মাণ শ্রমিক আবার কখনও বা মাটি কাটার কাজ করেছে সে। দিনমান হাড় ভাঙ্গা পরিশ্রমের পর রাতে বসতো পড়তে। পুরানো বই কিনে পড়াশোনা করেছে। মাঝে বাবা মারা যাওয়ায় পুরো সংসারের দায়িত্ব এসে পড়ে তার ওপর।

এত কষ্টেও দমেনি মনোবল। সাধনা করেছে, ফলও মিলেছে। বলছি পাবনার চাটমোহর উপজেলার মূলগ্রাম ইউনিয়নের বালুদিয়ার গ্রামের মৃত আবুল কাশেমের ছেলে আলমাছ হোসেনের কথা। এবার এইচএসসি পরীক্ষায় চাটমোহর ডিগ্রি কলেজ থেকে মানবিক বিভাগে পেয়েছে জিপিএ-৫। অদম্য মেধাবী আলমাছকে দমাতে পারেনি দারিদ্রতা। তবে মা সালেহা খাতুন ও প্রতিবেশীরা প্রতিনিয়ত উৎসাহ দিয়েছেন আলমাছকে।

এই প্রতিবেদকের সাথে কথা হয় আলমাছের। সে জানায় তার কষ্ট গাঁথা জীবনের কথা। ২০১৪ সালে বাবা আবুল কাশেম মারা যান। তিনি পেশায় ছিলেন রিকশা চালক। বাবার রেখে যাওয়া ৫ শতক জায়গার ওপর একটি টিনের ছাপড়া ঘরে মা ও ছোট ভাইকে নিয়ে জীবনযুদ্ধ শুরু হয় আলমাছের। বড় দুই বোনের বিয়ে হয়েছে। বড় ভাই বিয়ে করে পরিবার নিয়ে আলাদা থাকেন।

পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণীতে আলমাছ পেয়েছিল ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি। ২০১৬ সালে মথুরাপুর সেন্ট রিটাস স্কুল থেকে বিজ্ঞান বিভাগে গোল্ডেল জিপিএ-৫ পেয়ে এসএসসি পাশ করে। স্বপ্ন ছিল নটেরডেম কলেজে ভর্তি হওয়ার। কিন্তু সংসারের হাল ধরতে গিয়ে সে স্বপ্ন ফিকে হয়ে যায়। ভর্তি হয় চাটমোহর ডিগ্রি কলেজে বিজ্ঞান বিভাগে। টিউশন ফি জোগাড় করতে না পেরে চার মাস পর মানবিক বিভাগে চলে যেতে হয় তাকে।

তবে ভাল রেজাল্ট করার আনন্দ ভাসিয়ে নিয়ে গেছে আলমাছের সমস্ত কষ্টের গ্লানি। এবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার স্বপ্ন দেখছে স্বপ্নবাজ আলমাছ। এজন্য অতিসম্প্রতি দীর্ঘদিনের সঙ্গী বাই সাইকেল ও পড়ার টেবিল চেয়ার বিক্রি ও প্রতিবেশী এক ভাবীর কাছ থেকে ৩ হাজার টাকা ধার নিয়ে মোট ১০ হাজার টাকা দিয়ে ঢাকার ফার্মগেট এলাকার আইকন প্লাস কোচিং সেন্টারে ভর্তি হয়েছে। তবে দুঃশ্চিন্তা গ্রাস করেছে আলমাছকে। আদো ভর্তি হতে পারবে কি স্বপ্নের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে? কিভাবে চলবে তার মা ও ছোট ভাই? এখন এমন চিন্তাই কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে আলমাছকে।

কাউরো অনুগ্রহে নয়, যোগ্যতা দিয়ে লক্ষ্যে পৌঁছাতে চাই এমনটা জানিয়ে এই প্রতিবেদককে আলমাছ বলে, ‘ছোট বেলা থেকে অনেক কষ্ট করেছি। আমার স্বপ্ন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া। ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার স্বপ্ন কখনই ছিল না। ছোট বেলায় বন্ধুদের বলতাম আমি বড় হয়ে ডিসি হব। সত্যিই আমি একদিন ডিসি হব।’

আলমাছের মা সালেহা খাতুন বলেন, ‘চোখের সামনে ছেলেকে (আলমাস) অনেক কষ্ট করতে দেখেছি। নতুন বই কিনতে পারেনি। মা হয়ে সব সহ্য করতে হয়েছে। ও না থাকলে আমাদের খাবার জুটতো না। সবাই আমার ছেলে জন্য দোয়া করবেন।’

প্রতিবেশী আয়েন উদ্দিন নামে এক ব্যক্তি বলেন, ‘আলমাছ দারদ্রিতাকে খুব কাছ থেকে দেখেছে। আমরা ভেবেছিলাম ওর পড়াশোনা হবে না। কিন্তু সে আমাদের গ্রামের মুখ উজ্জ্বল করেছে। আমরা তার সফলতা কামনা করি।’

Comments

comments

x