প্রথমেই জানিয়ে দেই, সরকারি চাকরি নিয়ে আমি বিন্দুমাত্র কনসার্নড না। হবো আইনজীবী। তাই কোটা সংস্কার নিয়ে আমার ব্যক্তিগত প্যারা ছিল না। তবুও গতকাল রাত ১১:৩০-১২ টার মধ্যে যখন আমাদের হলের গেট ভেঙে বের হওয়ার জন্য নিচে আহ্বান জানালো, তখন দ্বিতীয়বার ভাবিনি। কারণ ছিল একটাই। কিছু প্রশ্নের উত্তর দাবি করা। ক্যাম্পাসে পুলিশ কেন ঢুকেছে? সেন্ট্রাল লাইব্রেরির সামনে গুলি চালানোর সাহস কোত্থেকে আসে? আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাই-বোনেরা যখন শান্তিপূর্ণ ছিল, তখন তাদের উপর টিয়ারশেল মারা হলো কেন?

চাকরিতে কোটা নিয়ে প্যারা থাক বা না থাক, উপরের প্রশ্নগুলোর উত্তর পাওয়ার জন্য প্যারা নেওয়া ছাড়া উপায় নাই।
পরের ঘটনায় আসি।
নিচে যখন কলাপসিবল গেটের তালা ভাঙা হচ্ছিল, আমাদের হলের ছাত্রলীগ প্রেসিডেন্ট আপু ছাত্রীদের সামনে গিয়ে তাকে কিছু কথা বলতে দেওয়ার অনুরোধ করলো। কিন্তু কেউ তাকে সেই সুযোগ দিল না। কারণ পলিটিক্যাল মেয়েদের কাছ থেকে আমরা আগেই জানতে পেরেছি, ছাত্রলীগ প্রেসিডেন্ট হল থেকে মেয়েদের বের হয়ে আন্দোলনে যাওয়ার পক্ষপাতী নয়। তাই ধরেই নিয়েছিলাম, প্রেসিডেন্ট এর কথা মেনে কোনো পলিটিক্যালভাবে সিট পাওয়া মেয়ে আজ রাতে হল থেকে বের হচ্ছে না। হতভম্ব হয়ে গেলাম তালা ভাঙার পর। সবার আগে বের হয়েছে পলিটিক্যাল মেয়েরাই, নেতার কথার ধার ধারে কে, যদি মনের ভেতর থেকে উলটো দিকের ডাক আসে?

পাশাপাশি দুটো হলের মেয়েরা যখন বিশাল মিছিল নিয়ে ক্যাম্পাসে ঢুকলো, তখন গার্ড অফ অনার দেওয়ার মতো করে রাস্তার দুই পাশে সারিবদ্ধভাবে আমাদের ভাই, সহপাঠীরা দাঁড়িয়ে ছিল। তারা তালি দিয়ে আমাদের অভিনন্দন জানাচ্ছিল। ক্যাম্পাসে ঢুকে আন্দোলনকারীদের চেহারা দেখে আমার আরো অবাক হওয়ার পালা। আমার ডিপার্টমেন্ট এর ছাত্রলীগ করা অধিকাংশ সহপাঠী ও বড় ভাই, আরো অনেক ছাত্রলীগের চেনা বড় ভাই, তারা সবাই দেখি আন্দোলনে। খুব আনন্দ লাগলো এই ভেবে যে, যাক, এবার ছাত্রলীগ বিরোধিতা করবে না, হামলা তো না বটেই।

হাহ! আফসোস…। রাত আনুমানিক ২ টার দিকে আমরা সব মেয়ে স্বোপার্জিত স্বাধীনতা চত্ত্বরে বসে স্লোগান দিচ্ছিলাম। ছেলেরা আমাদের ঘিরে দাঁড়িয়ে ছিল, বোঝা যাচ্ছিল, তারা খারাপ কিছুর জন্য প্রিপেয়ার্ড। সেই খারাপ কিছুটা কী, সেটা একটু পরেই বুঝতে পারলাম। রোকেয়া হলের সামনে গণ্ডগোলের বাতাস পাওয়া যাচ্ছিল। দেখলাম সেখানে ছাত্রলীগ কর্মী জড়ো করছে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে। দারুণ অবাক হলাম! আজ তো আর তাদের পক্ষে কর্মী পাওয়া যাওয়ার কথা না। মোটামুটি সবাই আন্দোলনে।
তবে?
কী জানলাম ও দেখলাম, জানেন? নিজের বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মীর অভাবে ছাত্রলীগ ঢাকা কলেজের কর্মী নিয়ে এসেছে, সাথে আরো ভাড়া করা বাইরের পোলাপাইন।

আমাদের ক্যাম্পাসের ছাত্র-ছাত্রীদের, বহিরাগত ছাত্রলীগ দিয়ে ধাওয়া করিয়ে টিএসসিতে ঢোকানো হলো। যারা ধাওয়া করেছিল, তাদের হাতে রামদা, রড, ইট ছিল। বৃষ্টির মতো ইট পড়ছিল আমাদের গায়ে। হুড়োহুড়ি করে টিএসসিতে ঢোকার সময় ৭-৮ জন মেয়ে পড়ে যায়। পদপিষ্ট হয়ে তাদের যে কী অবস্থা হয়, তা না বললেও বুঝতে পারার কথা। এরা যে বেঁচে ফিরলো কী করে, সেটা ভেবেই আমি আশ্চর্য হয়ে যাই। তবে সবাই এতোটা লাকি না। আমার হলের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বড় আপু, যার সাথে সম্পর্ক আপন বড় বোনের চেয়ে কম নিবিড় না, তার হাত ভেঙে যায় ইট লেগে। বান্ধবীর রুমের আরেক বড় আপুর মাথা ফেটে যায়। কীভাবে জানেন? তার জুনিয়র ভাইদের রড দিয়ে ওরা মারতে এসেছিল, ভাইদের আড়াল করতে গিয়ে। একটা মেয়েকে দেখে ওরা রড না মেরে ইট মারলো। আপুর মাথায় ষোলটা সেলাই পড়েছে।

এরপর আরেক সার্কাস শুরু হলো। বাইরে থেকে টিয়ারশেলের গন্ধ আসছিল টিএসসিতে। সবাই নাকে কাপড় চেপে আগুন ঘিরে বসে আম্বুলেন্সের জন্য ওয়েট করছিল, আহতদের হাসপাতালে নিতে হবে। সেই এম্বুলেন্স আর আসেই না, ঢামেক থেকে বলা হয়, “এই ঝামেলার মধ্যে সময় লাগছে ইত্যাদি ইত্যাদি”। এম্বুলেন্স শেষ পর্যন্ত এসেছিল আমাদের ‘মহামান্য’ প্রক্টর সাহেব টিএসসিতে আসার পর।
প্রক্টর এসেই বললেন, “দেখ, আমি লাইফ রিস্ক নিয়ে এসেছি!” জী স্যার! উদ্ধার করেছেন। যেখানে আমরা পুষ্পরাজির মধ্যে আরাম করছিলাম, সেখানে আপনি লাইফ রিস্ক নিয়ে এসেছেন, আমরা ধন্য।

ভিসির আলমারির ভাঙা ছবি দিয়ে যারা মায়াকান্না করছেন, তাদের কাছে প্রশ্ন, ভিসিকে একটা বিশাল বাসভবন দিয়ে ক্যাম্পাসে কেন রাখা হয়? উত্তর যদি হয়, ‘ছাত্রদের জন্য’– তাহলে কীভাবে তিনি শান্তিপূর্ণ ছাত্রদের উপর হামলা করার জন্য পুলিশকে ক্যাম্পাসে আসার অনুমতি দেন!!!!

ছাত্ররা পুলিশের জন্য ফুল নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল, পুলিশ ফুলের উপর মুতে দিয়ে ছাত্রদের থেকে রক্ত নিল। যাদের ভিসির বাড়ির আলমারি বা ফ্রিজের খাবারের জন্য বুক ফেটে যাচ্ছে, তাদের কাছে প্রশ্ন, ঢাবি’র একজন শিক্ষার্থীর চোখ, শত শত শিক্ষার্থীর রক্তের চেয়েও কি ওই আলমারির মূল্য বেশি?

একজন ছাত্র মৃতপ্রায় হওয়ার পর ছাত্ররা ক্ষেপে গেলে, আপনারা তাদের জামাত-শিবির বলেন, বহিরাগত বলেন। আর মাত্র কয়েক ঘন্টা আগেই এই ছাত্ররাই যখন শান্ত ছিল, আর তাদের শান্তিকে মিডল ফিঙ্গার দেখিয়ে পেটোয়া বাহিনী যখন ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, তখন কোথায় ছিলেন আপনারা? আর আপনাদের অসহিংসতা? আপনাদের মনুষ্যত্বহীন রাজকীয় চামচামোকে লাল-নীল-সবুজ-হলুদ-বেগুনী রঙের সালাম দিলাম।

রাতটা বিভীষিকার ছিল। কিন্তু বিশ্বাস করুন, আমাদের সবার মনের মধ্যে একটা প্রচণ্ড সাহস কাজ করছিল। কারণ আমাদের সবার জন্য আমরা সবাই ছিলাম। আমি ব্যক্তিগতভাবে ভাবতাম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মরে গেছে, সবার মেরুদণ্ড প্লাস্টিকের হয়ে গেছে। সেই আমি যখন ব্লকের রান্নাঘরে মাথায় ওড়না দিয়ে চাল ধুতে আসা অসম্ভব নিরীহ মেয়েটাকে নিজের পাশে দাঁড়িয়ে শ্লোগান দিতে দেখি, ‘আমার ভাইয়ের রক্ত, বৃথা যেতে দেব না’– তখন গর্ব হয়। নিজের চিন্তা ভুল প্রমাণিত হওয়ার এতো যে আনন্দ, তা কে জানতো!!!