আজ মঙ্গলবার | ২২ মে২০১৮ | ৮ জ্যৈষ্ঠ১৪২৫
মেনু

ফেসবুকিং আর সাংবাদিকতা এক জিনিস নয়

আমীন আল রশীদ | ০৭ এপ্রি ২০১৮ | ৯:২১ পূর্বাহ্ণ

ছবি-আমীন আল রশীদ

ফেসবুকিং আর সাংবাদিকতা যে এক জিনিস নয়, সেটি আমাদের আরও একবার চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলো একজন কথিত বিসিএস ক্যাডারের বৃদ্ধা মাকে রেলস্টেশনে ফেলে রেখে যাওয়ার ছবি এবং একটি চিঠি। ইতোমধ্যে প্রমাণ হয়েছে যে, ওই বৃদ্ধা এবং চিঠিটি ভুয়া। কিন্তু দুঃখজনক বিষয়, ওই ভুয়া ছবি ও চিঠির বরাতেই সংবাদ পরিবেশন করে দেশের অন্যতম দুটি ‘শীর্ষ’ দৈনিক পত্রিকা।

বিকল্প গণমাধ্যম হিসেবে ফেসবুক এরইমধ্যে অনেকগুলো ইতিবাচক উদাহরণ যেমন তৈরি করেছে, তেমনি মাঝেমধ্যেই এরকম ভুয়া খবর ও তথ্য এমনভাবে রাষ্ট্র হয়ে যাচ্ছে যে, এতে করে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ ও প্রশ্নের মুখে পড়ছে মূলধারার সাংবাদিকতার পেশাদারিত্ব।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কোনো সংবাদের প্রাথমিক উৎস হতেই পারে, কিন্তু সেটি যে কোনো অর্থেই গণমাধ্যম নয় এবং এখানে পরিবেশিত যেকোনো তথ্যই যে যাচাই-বাছাইয়ের দাবি রাখে, সে বিষয়ে বোধ করি আমাদের আরও বেশি সচেতন হওয়ার সময় এসেছে। কারণ, মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সিলর অং সান সুচির হিজাব পরিহিত ছবি দিয়ে তিনি মুসলমান হয়ে গেছেন এমন খবরও ফেসবুকে প্রচার হয়েছে। রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ওপর সে দেশের সেনাবাহিনী নিধনযজ্ঞ চালালেও সেখানের অনেক ভুয়া ছবি ফেসবুকে এসেছে। সেসব ছবির নিচে হাজার হাজার প্রতিক্রিয়াও দেখা গেছে। সমস্যা হলো মূলধারার অনেক গণমাধ্যমও এইসব জিনিস যাচাই-বাছাই না করেই প্রকাশ ও প্রচার করেছে।

আমাদের খুব পরিস্কারভাবে যে জিনিসটি উপলব্ধি করা দরকার তা হলো, সোশ্যাল মিডিয়া বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, বিশেষ করে বাংলাদেশে সর্বাধিক ব্যবহৃত ফেসবুক যারা ব্যবহার করেন, তাদের কারোরই কোনো প্রাতিষ্ঠানিক দায়বদ্ধতা নেই। তথ্যপ্রযুক্তি আইন এবং আসন্ন ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের কারণে তাদের কিছু জায়গায় আইনি দায়বদ্ধতা আছে; যেখানে ইন্টারনেটে ধর্মীয় বা সাম্প্রদায়িক উসকানি বা কারো ব্যক্তিগত চরিত্রহননের শাস্তির বিধান রয়েছে। কিন্তু মূলধারার গণমাধ্যমের সঙ্গে এই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মূল পার্থক্য এর পেশাদারিত্বে, এর প্রাতিষ্ঠানিক দায়বদ্ধতায়।

রাষ্ট্রের যেকোনো নাগরিকই ফেসবুকে যা খুশি তাই লিখে দিতে পারেন। তিনি কী দিয়ে দুপুরে ভাত খেলেন, কার আচরণে কষ্ট পেলেন ইত্যাদি ব্যক্তিগত অভিব্যক্তির বাইরে গিয়ে রাজনীতি, সমাজ, অর্থনীতি এমনকি মহাকাশ বিষয়ে তার নিজের ভাবনা শেয়ার করতে পারেন। কিন্তু একজন গণমাধ্যমকর্মী চাইলেই নিজের ভাবনাটা তার গণমাধ্যম সেটি হোক মুদ্রিত সংবাদপত্র, টেলিভিশন, রেডিও বা অনলাইন সংবাদপত্রে প্রকাশ বা প্রচার করতে পারেন না।

তিনি কী প্রকাশ ও প্রচার করতে পারবেন, তার নীতিমালা আছে। তাকে প্রাতিষ্ঠানিক দায়বদ্ধতা ও নিয়ম-নীতি মেনে লিখতে হয়। মনে যা এলো তা লিখে দেয়ার সুযোগ নেই। কোনো একটা কানকথা শুনেই সেটি প্রচার বা প্রকাশ করে দেয়া মূলধারার গণমাধ্যমের জন্য গুরুতর অপরাধ। এখানে ক্রসচেক বা যাচাই-বাছাই প্রথম শর্ত। এখানে সূত্র উল্লেখ করতে হয়। তথ্যটি তিনি কোথায় পেলেন, অর্থাৎ তার সোর্সের নাম যদি নিরাপত্তার খাতিরে গোপনও রাখতে হয়, তারপরও তাকে এমন কিছু ইঙ্গিত দিতে হয় যাতে পাঠক-দর্শক-শ্রোতা বুঝতে পারেন যে, তথ্যটি সঠিক। কিন্তু ফেসবুকে আপনি যা খুশি লিখতে পারেন, যতক্ষণ না সেটি অন্যের সম্মানহানির কারণ হয়।

এই তর্কের ভেতরে এখন একটি বড় প্রশ্ন উঠছে যে, কেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা ফেসবুককেও মানুষ গণমাধ্যমের বিকল্প ভাবছে বা ফেসবুকে কিছু একটা লিখলেই সেটি অনেকে বিশ্বাস করছে? এখানে সম্ভবত মূলধারার গণমাধ্যমের ব্যর্থতা ও সীমাবদ্ধতা একটা বড় কারণ। মূলধারার গণমাধ্যম যখন নানাবিধ রাষ্ট্রীয় ভীতি, ব্যবসায়িক স্বার্থ, বিজ্ঞাপনদাতা তথা করপোরেট স্বার্থ দেখতে গিয়ে অনেক খবরই ব্ল্যাকআউট করে বা চেপে যায়, তখন মানুষের কাছে সোশ্যাল মিডিয়া, বিশেষ করে ফেসবুকে প্রকাশিত তথ্যই জনপ্রিয় এবং কখনও কখনও বিশ্বাসযোগ্য হয়ে ওঠে। মূলধারা যখন সমাজের সব শ্রেণিপেশা ও সব অংশের মানুষকে সমানভাবে উপস্থাপনে ব্যর্থ হয়, তখনই আসে বিকল্প গণমাধ্যমের ভাবনা। তখনই সমাজের বঞ্চিত জনগোষ্ঠী নিজেদের অস্তিত্বের প্রয়োজনে অলটারনেটিভ বা বিকল্পের সন্ধান করে।

এখন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বা বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া সম্পর্কে ১০০ ভাগ ভুয়া কোনো তথ্যও যদি ফেসবুকে কেউ একজন ছড়িয়ে দেন, হাজার হাজার মানুষ তা বিশ্বাস করবে। যদিও যিনি এই তথ্যটি ছড়ালেন, তিনি তথ্যটি কোনো ধরনের যাচাই-বাছাই করেননি। কিন্তু এই একই তথ্য মূলধারার গণমাধ্যমে প্রকাশিত বা প্রচারিত হতে গেলে অনেকগুলো ধাপ পেরোতে হয়। চ্যালেঞ্জটা সেখানেই।

সম্প্রতি একজন কথিত বিসিএস ক্যাডার তার মাকে রেলস্টেশনে একা ফেলে চলে গেছেন এবং ব্যাগের ভেতর থেকে একটি আবেগঘন চিঠি উদ্ধারের যে খবর ফেসবুকে ছড়িয়ে দিলেন একজন, সেটি যাচাই-বাছাই ছাড়াই প্রকাশ করে দেয় আমাদের একাধিক সংবাদপত্র, যার মধ্যে দুটি সংবাদপত্র অত্যন্ত স্বনামধন্য এবং পাঠকপ্রিয়। এই ছবি ও সংবাদের বিষয়ে ফেসবুকেই নানা মহল থেকে সমালোচনা এসেছে। এর বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

কেউ কেউ লিখেছেন, নূন্যতম নিউজ সেন্স থাকলে বিসিএস কর্মকর্তা তার ম্যাজিস্ট্রেট বউয়ের পরামর্শে মাকে রেল স্টেশনে ফেলে গেছেন, এ নিউজ আমরা করতে পারি না। কারণ প্লাটফর্মটা দেখলেই বোঝা যায় এটি কোন স্টেশন। তাছাড়া কবে এমন ঘটনা ঘটেছে, স্ট্যাটাসে তারও উল্লেখ নেই। কোন বৃদ্ধাশ্রমে মাকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে সে বিষয়ে কোনো তথ্য নেই। ব্যারিস্টার পরিচয়ধারী লোকের আইডি থেকে স্ট্যাটাসটি দেয়া হয়েছে, সেটি ভুয়া কিনা তা সহজেই যাছাই করা যেত। তার মেসেঞ্জারে যোগাযোগ করা যেত। কিন্তু এসব না করেই যখন দুটি শীর্ষ দৈনিক পত্রিকা খবরটি ছেপে দিলো, তখন প্রথমেই প্রশ্নবিদ্ধ হয় সাংবাদিকতার পেশাদারিত্ব।

এটা ঠিক যে, ফেসবুকের শক্তি এরইমধ্যে আমরা নানা ঘটনায় দেখেছি। সিলেটের শিশু রাজনকে পিটিয়ে হত্যার দ্রুত বিচার, দেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসের সবচেয়ে বড় গণজমায়েত গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলনসহ অনেক বড় ঘটনার জন্ম দিয়েছে ফেসবুক। প্রশ্নপত্র ফাঁস নিয়ে গণমাধ্যমের খবরেরও প্রধান উৎস ফেসবুক। মুমূর্ষু রোগীকে বাঁচানোর জন্য রক্ত চেয়ে আবেদন কিংবা এরকম মানবিক প্রয়োজনে জরুরি সাড়াদানের মতো ঘটনা প্রতিনিয়তই ফেসবুকের মাধ্যমে ঘটছে। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে, ফেসবুক গণমাধ্যমের বিকল্প।

অর্থাৎ ফেসবুকে আমি কিছু একটা লিখে দিলাম বা কোনো তথ্য দিলাম মানেই সেটি সংবাদ হয়ে গেলো কিংবা নিজের চোখে কিছু একটা দেখে সে বিষয়ে লিখে দিলাম বলেই আমি সাংবাদিক হয়ে গেলাম, ব্যাপারটা এত সরল নয়। কিন্তু এখন অনেকে যেকোনো তথ্য যাচাই-বাছাই ছাড়াই ফেসবুকে দিয়ে যেমন নিজেকে সাংবাদিক বা আরও সুনির্দিষ্ট করে বললে সিটিজেন জার্নালিস্ট বা নাগরিক সাংবাদিক ভাবছেন, তেমনি ফেসবুকে পাওয়া ওই তথ্য যাচাই-বাছাই না করেই সংবাদের সোর্স হিসেবে ব্যবহার করছেন মূলধারার অনেক সাংবাদিকও। দুটিই বিপজ্জনক। কারণ আবারও বলি, ফেসবুকিং আর সাংবাদিকতার মধ্যে ফারাক বিস্তর। তাই ফেসবুকে আমি কী লিখছি সেটি যেমন জরুরি, কী লেখা উচিত নয়, সেই ভাবনাটা আরও জরুরি।

আমীন আল রশীদ- সাংবাদিক, লেখক, গবেষক। যুগ্ম বার্তা সম্পাদক, চ্যানেল টোয়েন্টিফোর।

Comments

comments

x