আজ রবিবার | ২৫ ফেব্রুয়ারি২০১৮ | ১৩ ফাল্গুন১৪২৪
মেনু

ছাত্রলীগের সেরূপ-এরূপ !

রাজু আহমেদ | ২৬ জানু ২০১৮ | ১০:৩০ অপরাহ্ণ

হালের আলোচিত-সমালোচিত প্রসঙ্গ শিক্ষাঙ্গনে ছাত্রলীগের বেপারোয়া ভূমিকা । ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারিতে প্রতিষ্ঠা প্রাপ্ত এ সংগঠন, যা সময়ের দিক থেকে আওয়ামীলীগেরও অগ্রজ, বাংলাদেশের প্রত্যেকটি প্রাপ্তিতে যাদের সোনালী অধ্যায়ের ইতিহাস, শেখ মুজিবকে যে সংগঠন জাতির জনকের ভূমিকায় পরিণত হতে অভিজ্ঞতা দিয়েছে সেই সংগঠনটির বর্তমান কর্মকান্ডে জাতি বিস্মিত, আশাহত-বেদনাহত । ’

৫২ এর ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ’৯০ এর স্বৈরশাসকের পতন পর্যন্ত প্রতিটি আন্দোলনের যে সংগঠনের সদস্যরা বুক চিতিয়ে সত্য ও ন্যায় অর্জনের পথে সংগ্রাম করেছে, যাদের অতীত সাফল্য ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে গাঁথা তাদের উত্তরসুরীদের থেকে কালো অধ্যায়ের সূচনা হচ্ছে বা হোক-এটা বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশের শুভাকাঙ্ক্ষীরা কোনভাবেই প্রত্যাশা করে না ।

অথচ হর-হামেশা ছাত্রলীগ দ্বারা সংঘটিত এমন কতিপয় কর্মকান্ডের নজির প্রকাশ পায়, যারা বিরুদ্ধে অতীতের ছাত্রলীগ বিদ্রোহী ছিল । ছাত্রলীগেরে নাগালহীন কর্মকান্ডে বিরক্ত হয়ে জননেত্রী ও মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যেদিন আওয়ামীলীগের এ অঙ্গসংগঠনের প্রধানের পদ থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করেছেন, সেদিনেই উপলব্ধি করা গিয়েছিল, ছাত্রলীগ তার স্বমহিয়ায় আর অধিষ্ঠিত নেই ।

প্রতিহিংসা পরায়ন রাজনৈতিক কর্মকান্ডের চর্চায় দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলগুলো যথেচ্ছা তাদের ছাত্র সংগঠনকে ব্যবহার করছে বলে ছাত্রদের মধ্য থেকে বিভিন্ন সংগঠনে বিভক্ত শ্রেণীরাও এসব হীন স্বার্থ চরিতার্থ করতে উদগ্রীবের ভূমিকা পালন করছে । অথচ ছাত্রদের বিবেকের চর্চায় সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা থাকা আবশ্যক ছিল । ছাত্রসংগঠনের ব্যানারধারী হয়ে যারা সাধারন ছাত্রছাত্রীদের ওপর আক্রমন চালায় কিংবা ইন্ধন জোগায় তারা আর যাই হোক, কোনভাবেই ছাত্রদের স্বার্থে কাজ করছে না বলেই প্রমাণিত হয়েছে । ছাত্ররাজনীতি যখন কতিপয় রাজনীতিকদের কুস্বার্থে ব্যবহৃত হচ্ছে তখন এর খেসারত যে জাতিকে কতখানি মারাত্মকভাবে দিতে হবে তার প্রাথমিক ট্রায়ালগুলো কেবল প্রকাশ পাচ্ছে ।
….
হাঠাৎ রাজনীতিতে কী এমন যাদুর কাঠি লাগলো যাতে ছাত্রলীগের কেউ কেউ কিংবা রাজনীতিতে এলেই অনেকের সম্পত্তি রাতারাতি হাজার-লাখ গুন বেড়ে যাচ্ছে ? এই বাংলাদেশের রাজনীতির প্রাথমিক পর্যায়ের ইতিহাসেই বাঘা বাঘা রাজনীতিকদের দেশের বিভিন্ন স্থানে সফর করার যাতায়াত ভাড়া জোগাতে চাঁদা তুলতে হত অথচ আজকাল গ্রাম-ইউনিয় পর্যায়ের ছাত্ররাজনীতিকদের কেউ কেউ লক্ষ-লক্ষ টাকার মালিক হয়ে যাচ্ছে ।

ছাত্রলীগের নাম যখন টেন্ডারবাজি-চাঁদাবাজির সাথে একাকার হয়ে প্রকাশ পায় তখন আগামীর নেতাদের নেতৃত্বের গুনাবলির অনেকখানি বলে দেযা যায় । এ বছর অর্থ্যাৎ ২০১৮ সাল আওয়ামীলীগের জন্য অন্তত গুরুত্বপূর্ণ বছর । নির্বাচনের এ বছরে ছাত্রলীগের কর্মকান্ড আওয়ামীলীগের ভোট প্রাপ্তিতে নিশ্চিতভাবেই সহায়ক কিংবা প্রতিবন্ধকতার ভূমিকা নেবে । নৃ-তাত্ত্বিক পরিচয়ে বাঙালি হিসেবে আমাদের বড় বৈশিষ্ট্য হচ্ছে আমরা অতীতকে খুব বেশি স্মরণে রাখতে পারি না ।

মানুষের সাথে এখানকার মানুষ যে আচরণ করে তা বর্তমান সময়ের সম্পর্ক ও কর্মকান্ডের বিবেচনায় । কাজেই ছাত্রলীগের এমন কর্মকান্ড যদি বেপারোয়া গতিতে চলমান থাকে এবং আওয়ামীগ শৃঙ্খলা টানার উদ্যোগ না নেয় কিংবা তাদের উদ্যত চলার লাঘামটানতে ব্যর্থ হয়ে তবে তা আওয়ামীলীগের জন্য ভয়াবহ দুঃসবাদের কারণ হতে পারে । বিশেষ করে, ‘রূপকল্প-২০২১’ বাস্তবায়নের জন্য আওয়ামীলীগ আরেকবার সরকার গঠনের জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে কিংবা করা উচিত । অথচ তাদের এ প্রয়াসকে মারাত্মকভাবে কঠিন করে দিতে পারে ছাত্রলীগের কতিপয় সার্বজনীন সমালোচিত কর্মকান্ড ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের সাথে ছাত্রলীগের আচরণ নতুন করে মনে করতে চাইনা । চট্টগ্রাম কিংবা দেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের ভূমিকা লজ্জার ছিল । স্বীকার করতে দ্বিধা নাই, যারা ছাত্রলীগের সাথে জড়িত তাদের মধ্যে সর্বোচ্চ মেধাবী পর্যায়ের যারা তারা দেশের বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যয়নরত । অথচ তাদের থেকে এমন আচরণ তো কোনভাবেই কাম্য হতে পারে না । বিভিন্ন সময়ে যারা ক্ষমতায় ছিল তাদের কেউ ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করার পক্ষে ছিল না, এটা এখনও কাম্য নয় ।

কিন্তু কোনকিছু যখন লাঘামহীন হয়ে যায় তখন তার শৃঙ্খলারক্ষা ও পূর্বসুনাম বহাল রাখার তাগিদে কিছুটা সংস্কার বোধহয় যৌক্তিক হয়ে দাঁড়ায় । বাংলাদেশে আজ যারা সুনামের সাথে রাজনীতি করছেন তাদের প্রায় প্রত্যেকেই ছাত্ররাজনীতি থেকে উত্তীর্ণ হওয়া ফসল । আজকে যারাছাত্ররাজনীতিতে জড়িত তাদের মধ্য থেকেই আগামীর নেতৃত্ব উম্মোচিত হবে ।

কাজেই শুধু দেশের আগামীর স্বার্থে ছাত্রলীগের নেতৃত্বের ভার তাদের কাঁধেই দেওয়া উচিত অন্তত যারা শিক্ষার গুরুত্বের কথা কর্মীদের বোঝাতে সক্ষম, নীতি-নৈতিকতা দিয়ে অনুসারীদের পরিচালনা করার মানসিকতা পোষেণ এবং তাদের কাছে ছাত্রদের স্বার্থই সর্বাগ্রে প্রধাণ্য পায় । ছাত্র আর অর্থ কিংবা ক্ষমতা আর শক্তি অথবা সম্মান আর ভয় যে সমার্থক নয় এটা যারা বিশ্বাস করে তাদের কাঁধেই ছাত্রলীগের দায়িত্ব পড়ুক ।

এ সংগঠনের উপদেষ্টা হিসেবে তাদের মনোনীত করা হোক যারা দেশ ও জাতীর মঙ্গল কামনা করে । অতীতের ছাত্রলীগ আর বর্তমান ছাত্রলীগের মধ্যে বিস্তর ব্যবধান । কাজেই যদি এখনই শুদ্ধি অভিযান চালানো না হয় তবে খেসারতটা এককভাবে আওয়ামীলীগকেই দিতে হবে । কেননা ছাত্রলীগের কর্মকান্ড দিনে দিনে সীমাতিক্রম করার যাত্রায় ।

রাজু আহমেদ, কলামিষ্ট ।

Comments

comments

x