আজ মঙ্গলবার | ১৪ আগস্ট২০১৮ | ৩০ শ্রাবণ১৪২৫
মেনু

দুই দুগুনে আট

অদিতি আনজুম | ১৫ জানু ২০১৮ | ১২:৩১ অপরাহ্ণ

এক.

চার বছরের একটা গুল্লু বাচ্চা। মাথা ভর্তি চুল। ঘাড় নিচু করে নামতা পড়ছে। একটু পর পর চোখের উপর এসে পড়ছে ওর বেয়ারা চুলগুলো। গাল দুটো ভেজা। চুলগুলো মুখে লেপ্টে যাচ্ছে ইচ্ছা মতো। কচি হাতে সরাতে গিয়ে হাতে জড়িয়ে যাচ্ছে সেগুলো। একবার পড়ছে। একবার মায়ের দিকে তাকাচ্ছে। যখনই মায়ের দিকে তাকাচ্ছে, সংখ্যাগুলো হাওয়ায় ভেসে যাচ্ছে। আর মনে করতে পারছে না একটু আগে কী পড়েছিলো।

মা: জোরে পড়ো কনক

কনক: (ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে পড়ছে) দ্ইু এক্কে দুই,/ দুই দুগুনে পাঁচ,/ তিন পাঁচা বিশ,/ বিশ দুগুনে এক। এতটুকুন পড়েই কনকের মনে হলো কোথাও একটা গণ্ডগোল হয়েছে। ভয়ে ভয়ে মাথা তুলল কনক। মা তাকিয়ে আছে তার দিকে। ঠিকই ধরেছে ও। কোথাও একটা গণ্ডগোল করে ফেলেছে। কিন্তু মা ওকে আশ্চর্য করে দিয়ে হো হো করে হেসে উঠলো।

মা: তিন পাঁচে বিশ বানালি কেমনে রে কনক?

এটা তো কনকেরও প্রশ্ন। তিনটা পাঁচ মিলে বিশই হবার দরকার কি ছিল, এক-ও তো হতে পারতো। দুই হলেই বা ক্ষতি কি ছিল! কনক এসব হিসাব খুব ভাল বোঝে না। অংকগুলো খুব গোলমেলে লাগে ওর। কিছুতেই মেলে না। কেন তিনটা পাঁচ মিলে বিশ হলো না, সে হিসাব কখনও মিলাতে পারেনি ও।

চশমা খুলে পাশে রাখলেন কনকের মা। চোখ মুছলেন। ডক্টর আল আমীন ভেতরে ঢুকলেন। ওটির দরজা বন্ধ হলো। অতটুকুন মেয়ে! এত ভোগান্তিই ছিল….

দুই.

– শরীরটা আজ বেশ খারাপ।

– কেন? কি হয়েছে?

– বুঝতে পারছি না। ভীষণ ব্যথা পেটে।

– নারীঘটিত সমস্যা নাকি?

– সে তো জানি না। নারী যেহেতু, নারীঘটিত হতেই পারে।

– ডাক্তার কী বলে?

– গেলে তো?

– যাচ্ছ না কেন?

– তুমি নিয়ে যাচ্ছ না, তাই?

– ধুর, ডাক্তার জিজ্ঞেস করলে কী বলবো?

– রোগ আমার, তুমি বলতে যাবে কেন?

– আমি কে হই তোমার, যদি জিজ্ঞেস করে?

– কেন, ডাক্তারের খাতায় কি লেখা আছে, তুমি আমার দুর্বলতার সুযোগ নিচ্ছো, কিন্তু বিয়ে করোনি।

– না, তা নেই

– তুমি তো সত্যবাদী যুধিষ্ঠিরও না। তাহলে মিথ্যা বলবে, তুমি আমার সোয়ামী লাগো।

– ঠিক আছে। কাল নিয়ে যাবো।

– না, লাগবে না।

– কেন?

– তোমার সাথে যেতে ইচ্ছা করছে না। তোমার সাথে যাবো না।

– তুমি আমার সাথে যাবে না। আমি তোমার সাথে যাব। হলো?

– ফোন রাখবো রণ। কথা বলতে ইচ্ছা করছে না।

– কাল বিকালে অফিসে আসবো। ডাক্তারের অ্যাপয়েনমেন্ট দিয়ে রাখবো আমি। পারলে একটু আগে বের হবার চেষ্টা কোরো।

‘ছাড়ছি’ ফোন কেটে দিলো কনক।

মনটা বেশ খারাপ ওর। আসলেই ডাক্তার দেখানো দরকার। রণ’র জন্য বসে আছে, বিষয়টা তা নয়। ডাক্তারের কাছে আবার যেতে ভয় হচ্ছে ওর। ভাবতে ভাবতেই পাশে রাখা ফোনটা আবার বেজে উঠলো। রণ।

– আবার কি?

– কথা শেষ হয়নি তো। ফোন কেটে দিলে কেন?

– কথা বলতে ইচ্ছে করছিলো না, তাই।

– মা কথা বলবে।

একটু বিস্মিত হয়ে বলল, এখন?

– হু, নাও কথা বলো।

ও পাশ থেকে রণ’র মা ফোন ধরলেন।

– হ্যালো

– স্লামালাইকুম খালাম্মা?

– অ্যাই খালাম্মা কি রে! মা বল।

– কেমন আছো?

– ভাল আর থাকতে দিলি কই?

– কেন আবার কি করলাম?

– বার বার বিয়ে পিছাচ্ছিস কেন? তোদের বিয়েটা কি আমাকে খেয়ে মরতে দিবি না?

মনে মনে উত্তর দিলো, ’না।’ কনক ভবিষ্যৎ দ্রষ্টা নয়, ক্রীড়নক মাত্র।

– কে কার আগে মরে তা কি কেউ জানে?

– একটা চড় খাবি। সারাক্ষণ বাজে কথা।

– আমি তো রজি। তোমার ছেলেই তো ইনিয়ে বিনিয়ে বিয়ে পিছাতে বলছে। আমি কি করবো?

– মিথ্যে বলছিস কেন?

– তোমার ছেলেকে আজকাল বোরিং লাগছে তাই বিয়ে পিছাচ্ছি।

– কনক…….

– বাদ দাও না। করবো তো। থাকি না আরও কিছুদিন স্বাধীন।

– কিছু লুকোচ্ছিস মা?

– ধুর। কি লুকাবো। ঠিক আছে, ৭ নভেম্বর ডেট ঠিক করো। খুব জ্বালাও তোমরা।

– সে তো এক বছর পর। এখন তো মোটে জানুয়ারি।

– ওটাই ফাইনাল। মাকে বলে দাও।

– কেন, তুই বলতে পারিস না?

– না, লজ্জা লাগে।

– তোর লজ্জা লাগে!

– ফোন রাখি। তুমি সিআইডির মতো প্রশ্ন করছো।

– কাল আসবো তোদের বাসায়।

– আচ্ছা। এবার বাথরুমে যাব। তুমি না ছাড়লে তো যেতে পারছি না।

হেসে ফেললেন মিসেস রওশন, যা। সেই ছোট্টই আছিস। ছোটবেলাতেও এভাবেই পালাতি।’

চোখে স্নেহ নিয়ে ফোন কাটলেন মিসেস রওশন। ছোটবেলা থেকে চেনেন কনককে। বলা যায়, এক সাথে বড় হতে দেখেছেন কনক আর রণকে। কম্পাউন্ডে কনক ছিলো দস্যু মেয়ে। রণ ঠিক উল্টো। ভীষণ জ্বালাতো রণকে। রণ মাঝে মাঝেই কাঁদো কাঁদো মুখে নালিশ করতো। এত মিষ্টি আদুরে মেয়ে ছিল কনক যে কেউ ওর উপর রাগ করবে তেমনটা কখনও হয়নি। মনে হলো, এই তো সেদিনের ঘটনা। কী তাড়াতাড়ি সময় চলে যায়! দেখতে দেখতে মেয়েটা যেন ক্ষীণধারা ঝর্ণা থেকে স্রোতস্বীনী নদী হয়ে গেলো। কল কল করে বয়ে চলছে উৎকর্ষে। কনকরা যখন কম্পাউন্ড ছাড়লো, তখন সবে স্কুলের গণ্ডি পেরিয়েছে কনক। রণ কলেজে। এরপর বেশ কিছুদিন কোনো যোগাযোগ ছিল না। আবার যখন এই দুই পরিবারে যোগাযোগ হলো, কনক তখন মাস্টার্সে। রণ সবে পাস করে বেরিয়েছে।

ইউনিভার্সিটিতে কবে ওদের আবার পরিচয়, সেটা রণকে জিজ্ঞেস করেননি মিসেস রওশন। কিন্তু রণ যখন জানালো ও কনককে বিয়ে করতে চায়, মিসেস রওশন এক কথায় রাজি হয়ে গেলেন। কনকের পরিবারও রাজি। দু’পরিবারের কথা হলো, মেয়ে পাস করুক। অন্যদিকে ছেলেও দাঁড়াক আর একটু পোক্ত হয়ে। তারপর বিয়ে। এরপর পার হয়ে গেছে আরও দুই বছর। কনক পাস করে বেরিয়েছে। চাকরি করছে। রণও এখন বেশ ভালভাবেই গুছিয়ে নিয়েছে নিজের কাজ। কিন্তু হঠাৎ কী হলো কনকের কে জানে, পর পর দুই বার বিয়ের ডেট পিছালো ও। কনককে জিজ্ঞেস করলে একই উত্তর, তোমার ছেলে দিনকে দিন বোরিং হয়ে যাচ্ছে। আসলেই কি তাই? নাকি কনকের ইচ্ছা অন্যকিছু। একটা দীর্ঘশ্বাস গোপন করে মিসেস রওশন ছেলের দিকে চাইলেন।

– কনকের সাথে ঝগড়া হয়েছে কোনো কিছু নিয়ে?

– না তো।

– তাহলে?

– জানি না মা। ও তো এমনিতেই চাপা। আজকাল আরও ইন্ট্রোভার্ট হয়েছে। ঝিম মেরে থাকে বেশিরভাগ সময়।

– কথা বল ওর সাথে।

– লাভ হচ্ছে না। তার উপর ওর শরীরটাও খারাপ বলছে বেশ কয়েকদিন ধরেই।

– ডাক্তারের কাছে নিয়ে যা।

– দেখি, বললাম তো কাল নিয়ে যাবো। ওর আজকাল যেভাবে মেজাজ সুইং করে, কখন কি মর্জি হয় বোঝা দায়।

– খাবি কিছু?

– না, মা, ইচ্ছা করছে না। যাবার আগে দরজাটা টেনে যেও।

মিসেস রওশন বেরিয়ে গেলেন ঘর থেকে। বারান্দায় এসে দাঁড়ালো রণ। জানুয়ারির শীত। বারান্দায় আসতেই কাঁপন ধরে গেলো। অস্থির লাগছে। আজকাল যেন নতুন এক কনককে ডিল করছে ও। কেন যেন মনে হচ্ছে, ও কোনো কারণে রণকে বিয়ে করতে চাইছে না। আচ্ছা, ও কি অন্য কাউকে পছন্দ করে। সে জন্য কি বিয়ে পিছাচ্ছে বার বার। ধুর, এসব কি চিন্তা করছি। নিজেকেই নিজে ভর্ৎসনা দিলো রণ। তেমন হলে, কনক ঠিকই শেয়ার করতো। কনক ওর বন্ধু বেশি, প্রেমিকা কম।

তিন

বেশ বয়স্ক প্রফেসর। বয়স ৬৫ হবে। এখনও বেশ সুঠাম দেহের অধিকারী। গম্ভীরভাবে রিপোর্টে চোখ বুলাচ্ছেন। তার চেহারা দেখে কনকের ভয় আরও কিছুটা জাঁকিয়ে বসল। নিশ্চয়ই নেগেটিভ কিছু।

– তুমি একা এসেছো?

– জ্বী

– সাথে কাউকে আনা উচিত ছিল।

– আমাকেই বলেন।

– বিয়ে করার প্ল্যান আছে?

– ডিপেন্ডস অন মাই ফিজিক্যাল কন্ডিশন

– রিপোর্ট যা বলছে, একটা মেজর অপারেশন দরকার হবে।

– এমন ক্রিটিক্যাল ক্ষেত্রে মা, বাবা কাউকে নিয়ে আসা উচিত।

– আমি এখনই জানাতে চাইছি না বিষয়টা।

– কেন?

– ব্যক্তিগত।

– তুমি না চাইলেও তো এক সময় না এক সময় বাসায় জানাতেই হবে। অবস্থাটা বেশ ক্রিটিক্যাল মনে হচ্ছে।

– কত দিন সাসটেইন করবো?

ওর প্রশ্নের ধরন শুনে হেসে ফেললেন বৃদ্ধ।

– এটা তো বাবা সিনেমা না। ১০ বছরও বাঁচতে পারো। আবার ১০ মাস বাঁচাটাও কঠিন হয়ে যেতে পারে।

– কত খরচ পড়বে?

– খুব বেশি হয়তো পড়বে না। কিন্তু তুমি তো জানোই, এখানে সিট পাওয়াটা খুব ঝক্কি। এত এত সিন্ডিকেট।

– তাহলে?

– আগামী সপ্তাহে একটা ফোন কোরো’ বলে কার্ডটা এগিয়ে দিলেন প্রফেসর।

কার্ডটা হাতে নিয়ে বলল, অপারেশন কতদিনের মধ্যে করতে হবে?

– যত তাড়াতাড়ি সম্ভব।

‘আচ্ছা’ বলে উঠে দাঁড়ালো ও। চেম্বার থেকে বের হলো। মেয়েটা ইচড়ে পাকা। পেছন থেকে ঘোলাটে দৃষ্টিতে নিজের মেয়ের ছায়া দেখলেন প্রফেসর। তিনি ডাক্তার, কিন্তু মেয়ে বাঁচাতে পারেননি। মৃত্যুতে কারো দোষ থাকে না। মৃত্যু অনিবার্য।

পিজি থেকে বেরিয়ে ফোনটা হাতে নিলো কনক। অনেকক্ষণ ধরে ভাইব্রেট করছে ওটা। রণ। রিসিভ করলো।

– কোথায় তুমি?

– কেন?

– একঘণ্টা ধরে ফোন করছি। নামো। আমি তোমার অফিসের নিচে।

– আমি তো অফিস যাইনি আজ।

– মানে? শরীর কি বেশি খারাপ? আমাকে জানাতে পারতে…

– না, শরীর ভাল।। অফিস যেতে ইচ্ছা করছিল না।

– তুমি কোথায় এখন?

– ইউনিভার্সিটিতে। আসবে?

– আসছি।

– চারুকলায় আছি।

ফোন কেটে দিলো রণ। চারুকলার আইল্যান্ডে বসলো কনক। কিভাবে বাসায় বলবে বিষয়টা? তিন ভাইয়ের পর ও একটি বোন। আহ্লাদী, আদুরে। জানলে তো বাসায় হুলুস্থুল পড়ে যাবে। মাকে সামলাবে কীভাবে? হু হু করে উঠলো কনকের ভেতরটা। আর বাঁচবে না ও। আর পাওয়া হবে না রণকে।

পৃথিবী এক অদ্ভূত মায়া। মানুষ তাকে ছাড়তে চায় না। মৃত্যু পতাকা সামনে এলে পৃথিবী যেন আরও সুন্দর হয়ে ওঠে। জংলী হলুদ ফুলের উপর হেঁটে যাওয়া নোংরা পোকাটাও তখন আশ্চর্য সুন্দর লাগে। আর কনকের সামনে তো অপার মায়ার হাতছানি। রণ। বিয়ে। একটি শিশুর ধীরে ধীরে বেড়ে ওঠা দেখার সাধ। কনকের চোখ ভেসে যাচ্ছে মায়ার মায়াহীনতায়। খুব সাধ ছিল রণকে পড়বে পুরোটা। ভাঁজে ভাঁজে। একটু একটু করে। নিঃশ্বাসের উষ্ণতায় ছড়িয়ে দেবে প্রাচুর্য। রণ’র উত্তাল বাহুর ভেতর ডুব দিয়ে তুলে আনবে ঐশ্বর্য।হলো না। বাবা-মায়ের উদ্বিগ্ন মুখটা পলকে চোখের সামনে ভেসে উঠলো। গতকালই মা জিজ্ঞেস করছিলো, তুই এত শুকিয়ে যাচ্ছিস কেন? কী করবি এত ডায়েট করে? শুকানোর কারণটা জানাতে সাহস হয়নি ওর। পরশু ব্যাংকক থেকে ফিরেছে বড়দা। ওর মিষ্টি তেঁতুল পছন্দ। দুই কেজি তেঁতুল এনেছে ওর জন্য। ভাবী তো হেসেই বাঁচে না। এত তেঁতুল আনে কেউ। কেউ হয়তো আনে না। কিন্তু বড়দা বলে কথা। সে তো আনতেই পারে। ঠাণ্ডা বাড়ছে একটু একটু করে। ঝাপসা দৃষ্টিতে বাধ সাধলো কালো হুন্দাই। ওর সামনে এসে ব্রেক করলো রণ’র গাড়ি। পাশে এসে বসলো রণ।

– কাঁদছো কেন?

– মন খারাপ হলো তাই।

– কেন?

– কতদিন আসি না এখানে…

– কেন, গত উইকেই তো এলাম আমরা।

– ও। মনে নেই। ভুলে গেছি।

– উঠো, ডাক্তারের কাছে যাব। আমি অ্যাপয়েনমেন্ট দিয়ে রেখেছি।

– না, আমি তিনশ’ ফিট যাব।

– মানে? তোমার না ডাক্তার দেখানোর কথা আজ।

– আজ যেতে ইচ্ছে করছে না, রণ। চলো, বালু নদীটা আর একবার দেখে আসি।

– আর একবার দেখে আসি মানে?

– মানে কিছু না। চলো তো’ বলে টেনে উঠালো ওকে।

পূর্ণ দৃষ্টিতে চাইলো ছোট্টবেলার খেলার সাথী, বর্তমানের প্রেমিকা এবং ভবিষ্যতের বউয়ের দিকে। কনকের কণ্ঠে কী যেন একটা ছিল। ভাল লাগল না ওর। কনকের চেহারায় গোধূলির ছায়া। অপূর্ব লাগছে ওকে। ওর হাতটা টেনে হাতের মুঠোয় নিলো রণ। আলতো করে একটা কামড় দিলো প্রিয় কনে আঙ্গুলে।

– এভাবে তাকিয়ে আছো কেন?

– আর যেন এমন কথা না শুনি।

মাথার চুল এলো করে দিলো কনক, চলো যাই।’

হাতের বাঁধন আর একটু শক্ত করলো রণ। তুই খুব ভোগাচ্ছিস, মেয়ে।’

– আচ্ছা আর ভোগাবো না।

– আবার?

চোখের ধার বেয়ে উপচে পড়লো ঢেউ। আশ্চর্য হয়ে সেই বহমানতা দেখলো রণ। এত মন খারাপের কী হলো! কারণে অকারণে কেঁদে উঠছে ও আজকাল।

জানুয়ারির মাঝামাঝি। দেখতে দেখতে কুয়াশায় ঢেকে গেলো পুরো পথ। যখন ওরা তিনশ’ ফিটের কাছে, একফুট দুরত্বেও সব ঝাপসা। ঢাকায় টেম্পারেচার ৭.২ ডিগ্রী। হাত ঠাণ্ডায় জমে যাচ্ছে। বালু ব্রিজের কাছাকাছি এসে গাড়ি সাইড করলো রণ। হিটার প্রাণান্ত চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে গাড়ির ভেতরের তাপমাত্রা সহনশীল রাখার। তারচেয়েও তীব্রতর হচ্ছে এই প্রেমিক-যুগলের হৃদস্পন্দন। দু’জনেই শূন্যে তাকিয়ে। জানে, একবার চারচক্ষুর মিলন হলে বাঁধন আলগা হওয়া সময়ের ব্যাপার। স্টিয়ারিং-এ হাত রেখে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো কনকের দিকে। কনক তখনও সামনের অদৃশ্যে দৃশ্য দেখছে।

– তো এবার…

চোখ তুলে তাকালো রণ’র দিকে। প্রেমিক মাত্রেই জানে সে চোখের ভাষা। কাছে এগিয়ে এলো দু’টি মাথা। একাকার হলো দু’জোড়া ঠোঁট। হৃদয়ের গতি তীব্রতর হলো। ঠোঁটের পরিসর ছাপিয়ে চোখ, গাল, চিবুকে ঠোঁট ছোঁয়ালো রণ। অস্থির রণ’র মুখটা নিজের দু’হাতের তালুতে ধরল কনক। আলতো করে ঠোঁট ছোঁয়ালো ওর নাকের ডগায়। ঠোঁটটা নামিয়ে আনলো ঠোঁটে। চোখ বন্ধ করে সে আদরটুকু নিলো রণ।

– পাগল হয়েছো?

– হু। আর পারি না কালি। তুই আর কত জ্বালাবি?

– ধরো যদি বিয়েটা না করি

একটু রেগেই বলল, আবার এক কথা…..,

– এমনও তো হতে পারে আমি অন্য কারো প্রেমে পড়েছি।

– না। পরোনি। তোমার ঠোঁট তা বলেনি।

– কইছে তোমারে। চলো চা খাব।

– সেই ভাল। উল্টা পাল্টা কথার চেয়ে চা ঢের ভাল।

চা খেলো। ঠাণ্ডা আরও বেড়েছে। ফিরতি পথ ধরলো ওরা।

বাসায় ঢুকতেই মা ডাকলেন কনককে।

মা: রণ’র মা এসেছিলেন।

কনক: জানি

মা: ৭ নভেম্বর ডেট দিলেন।

কনক: আচ্ছা।

মা: আর পিছাবি না তো

কনক: দেখি

নিজের ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিলো কনক। অবাক হয়ে সেটা দেখলেন কনকের মা।

চার.

অপারেশন করছি, করবো করে আরও তিন মাস হারিয়ে গেলো কনকের জীবন থেকে। বাড়িতে এখনও জানায়নি ওর অসুস্থতার কথা। এরই মধ্যে অফিসের একটা মিটিং-এ ওর দিল্লী যাওয়া ঠিক হলো। কনক প্ল্যান করলো দিল্লীর কাজ শেষ করে একটু ডাক্তার দেখিয়ে আসবে ভেলর থেকে। সেভাবেই প্রিপারেশন নিলো কনক। অফিস থেকে ছুটি নিলো ১৫ দিনের। নানা ধরনের টেস্ট করে ভেলরের ডাক্তার জানালো, খুব মাইনর একটা সিস্ট। পিরিয়ডের আগে পরে মাঝারি ধরনের ব্যথা হতে পারে। ম্যালিগন্যান্ট না। ফলে ভয়ের কিছু নেই। তবে এর গ্রোথ থাকলে রিস্ক না নেয়াই ভাল। প্রতি মাসে একবার চেক করতে হবে গ্রোথ আছে কিনা। বুকের উপর থেকে নেমে গেলো গত অর্ধ বছরের ভারী পাথর।

ঢাকায় ফিরে সেই বৃদ্ধ প্রফেসরের সাথে দেখা করতে গেলো কনক। চেকআপের জন্য না। গালি দিতে। সমস্ত রিপোর্ট দেখালো প্রফেসরকে। বিস্মিত চোখে রিপোর্টগুলো দেখলেন ডাক্তার।

– তোমার তো কোনো ম্যালিগন্যান্ট নেই।

– সেটাই তো দেখাচ্ছে

– ডাক্তারদের উদাসীনতাই আমাদের দুর্নামের জন্য দায়ী।

– আমার ছয়টা মাস নষ্ট করলেন আপনারা।

– স্বীকার করছি। তবে এখন প্রতি মাসেই একটু চেক করাও। এটাকে অবজার্ভেশনে রাখতে হবে।

– ঠিক আছে।

ভিজিট রাখলেন না বৃদ্ধ প্রফেসর। কনক কোনো এক অজানা কারণে ভদ্রলোককে ঝারি দিতে পারলো না।

——————————————————-

কাজ, বিয়ের জোগাড়-যন্ত্র, চিকিৎসা সব মিলিয়ে বছরটা যেন হাতের ফাঁক গলে ফুড়ৎ করে চলে গেলো। এদিকে সিস্ট-এর গ্রোথ দেখা যাচ্ছে। অপারেশন ছাড়া অন্য পথ নেই। জানাতেই হবে বাসায়। সবচে’ কঠিন কাজ মনে হলো এটা। কিন্তু এটাই সবচে’ সহজ হয়ে ধরা দিলো। বাসায় জানানোর পর মা পুরোটা শুনলেন। কী চিকিৎসা হবে তা নিয়ে আলোচনা করলেন। এতদিন কেন জানায়নি, সে বিষয়ে ভর্ৎসনা করলেন। তারপর কীভাবে কবে অপারেশন করা হবে সে বিষয়ে কথা বললেন। বাসার সবার চেহারা দেখে মনে হলো, খুব সাধারণ বিষয়। কিন্তু ও মাকে আড়ালে চোখ মুছতে দেখেছে। সদাগম্ভীর বাবা রাতে বাড়ি ফিরে ওর সাথে ঘণ্টার পর ঘণ্টা গল্প করে। বড়দা’ মেজদা প্রতিদিন ওর প্রিয় খাবার বাজার করে। বিপত্তি বাঁধলো যখন রণকে জানানোর সময় হলো। মানুষ যা চায় সৃষ্টিকর্তা সেভাবেই তাকে সবটা দেন না।

——————————————————-

ঝুম বৃষ্টি। একটা কফিশপে বসে রণ’র জন্য অপেক্ষা করছে কনক। জানালার কাঁচে অস্থিরভাবে আছড়ে পড়ছে বৃষ্টিরা। আইল্যান্ডে পানি ছুঁই ছুঁই করছে। ঢাকার জলাবদ্ধতা জীবনের জলাবদদ্ধতার মতো অতটা তীব্র নয়। তবে কষ্টকর তো বটেই। রণ’র গাড়ি এসে থামলো বাইরে। কোনোমতে মাথা বাঁচিয়ে শপে ঢুকলো রণ। চেয়ার টেনে বসলো।

– এত জরুরি তলব? আবার বিয়ে পিছাবে নাকি?

– না। তোমার সাথে কথা ছিল।

– নতুন করে প্রেমে পড়েছো?

– আমার ওভারিতে একটা সিস্ট আছে।

– এটা কোনো ব্যাপার হলো নাকি? সব মেয়েরই দু’একটা সিস্ট থাকে ওভারিতে।

– হ্যাঁ থাকে। তবে তাদের গ্রোথ থাকে না। আমারটা বাড়ছে।

এতক্ষণে সিরিয়াস হলো রণ। বাড়ছে মানে?

– অপারেশনে যেতে হবে।

ভ্রু কুচকে তাকালো কনকের দিকে, সিরিয়াস কিছু?

– সিরিয়াস না। তবে অপারেশন করাটাই সেফ মনে করছে ডাক্তার ।

– আচ্ছা তাহলে করে ফেলাই ভাল। কবে করবে?

– যত তাড়াতাড়ি সম্ভব।

এরপর ওদের মধ্যে আর বিশেষ কিছু কথা হলো না।

রণ’র মধ্যে একটা দ্বিধা তৈরী হয়েছে। অপারেশন মানে তো সিরিয়াস কিছু। তাহলে কনক মিথ্যা বলল কেন? ও কি কিছু গোপন করলো? খাবার টেবিলে মাকে জানালো বিষয়টা। রণ’র মা-ও একটু থিতিয়ে গেলেন যেন। কী সর্বনাশ, এই বয়সে সিস্ট। তার ছেলের কী হবে! তিনি মেয়েটাকে ভয়ানক স্নেহ করেন। কিন্তু আগে তো তার ছেলে। কনকের সাথে বিয়ের বিষয়ে আর মন সায় দিলো না মিসেস রওশনের।

পাঁচ.

সবচেয়েও বড় পরিবর্তন এলো রণ’র আচরণে। সে ঘটনার পর রণ প্রায় যোগাযোগ বন্ধই করে দিলো কনকের সাথে। কনক ফোন করলে অধিকাংশ সময় ধরে না। যদিওবা ধরে হু হা বলে রেখে দেয়। এক মাসের মাথায় আনুষ্ঠানিকভাবে বিয়ে ভেঙে দিলেন রণ’র মা। কনক সেদিনও ফোন দিয়েছিলো রণকে। রণ ফোন ধরেনি। সেটাই ওকে শেষ ফোন দেয়া।

গোটা গোটা অক্ষরে এখনও তারিখটা লেখা আছে। ২ অক্টোবর। চোখের কোল বেয়ে বর্ষা যেন ভিজিয়ে দিচ্ছে ডায়েরীর পাতা। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বন্ধ করলো প্রিয় ডায়েরীটা, যে ওকে কখনও ছেড়ে যায়নি। যে ওর সুখ-দুঃখের স্মৃতিগুলো সংরক্ষণ করে অতিযত্নে। হঠাৎ করে শূন্যতা গ্রাস করলো কনককে। মুখে হাত চাপা দিয়ে কেঁদে উঠলো ও।

কী সামান্য কারণে মানুষ কত কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে পারে। কত ছোট ছোট ঘটনা মানুষকে কী ভীষণ দৃঢ় করে দেয়। একটা সময় কনকই চাইছিল না বিয়েটা হোক। ও ধরেই নিয়েছিল ওর ক্যান্সার। যখন চাইতে শুরু করলো, রণ’র অনিচ্ছা তীব্রতর হলো। রণ’র কোনো দোষ দেয়নি কনক। রণ সম্ভবত চাইছিল না জেনে, বুঝে একজন হতে-পারে-ক্যান্সার রোগীর দায়িত্ব নিতে। হয়তো রণ ধরেই নিয়েছিল বিয়ের পর ওদের কনজ্যুগাল লাইফে এই অপারেশনের এফেক্ট পড়বে। হয়তো রণ’র মনে হয়েছিল, জেনে-শুনে, ২০ লাখ টাকা গুনে একজন রোগীকে কেন কাঁধে নিবে ও? হেসে ফেললো কনক। ওদের দেনমোহরও ঠিক হয়ে গেছিল। চোখের পানি যেন আজ আর কোনো বাধাই মানতে চাইছে না।

কনকের অপারেশন কাল। সেই প্রফেসরই করবেন ওর অপারেশন। ভদ্রলোক ওর বিষয়টা কোনো এক অজানা কারণে ব্যক্তিগতভাবে নিয়েছেন। তিনি শুধু ওটি চার্জ রাখবেন।

জীবন মানুষকে কিছু দেয়ার বিনিময়ে কিছু কিছু মূল্যবান প্রাপ্তি ছিনিয়ে নেয়। কারো কারো মুখোশ খুলে দেয়। কারো কারো কদর্য দ্বিধা কিংবা বেকসুর অসহায়ত্ব চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। সময় সেইসব কদর্য ক্ষতে চুনকাম চালায়। রং লাগায়। সময়ের পরিক্রমায় সেই ক্ষত থেকে আবার সেই চুন-সুড়কি খসে পড়ে। বেরিয়ে পড়ে সময়ের পোকায় খাওয়া কদর্য দাঁত। মানুষ পথ চলে সেই সময়ের হাত ধরেই। প্রতিদিন তার ঝোলায় জমা হয় আরও কোনো নতুন ক্ষত।

কেউ আছে, যত্নে তুলে রাখে সে ক্ষত। ক্ষতের উপর নতুন ক্ষতের সংক্রমণ হয়। নিদ্রাদেবীর দৈন্যতায় নিদ্রাহীনতা ধৃষ্টতা দেখায়। নোনো দাগ চিহ্ন রেখে যায় বালিশের কভারে। দীর্ঘশ্বাসের ঢেউয়ে ফিকে হয়ে আসে স্বপ্ন। চোখের জলে জ্বলে উঠে শাঁপ। সাধনার শাঁখায় নিদারুণ পচন রোগ বাসা বাঁধে। বিষের নীলে ধুয়ে যায় স্খলিত পাপ। কনকেরা পোড়ে। স্বর্ণাকারের সূক্ষ্ম আঘাতে অলংকার হয়। কখনও শোভা পায় সজ্জায়। কখনও শয্যায়। চোখের প্লাবণে ঢাকা পড়ে স্বর্ণাকারের দৈন্যতা। কনকেরা জানে জীবনের নামতায় ছন্দ থাকে। স্বপ্ন থাকে। শুধু ভুল নামতায় ভুলের সমীকরণ কখনও মেলে না।

৭ নভেম্বর। অপারেশন থিয়েটার। ডক্টর আমীনের কপালে জমে উঠছে বিন্দু বিন্দু ঘাম। নার্স একটু পর পর মুছিয়ে দিচ্ছে তা। সামান্য একটা সিস্ট। নার্ভাস হওয়ার মতো কিছুই নেই। কিন্তু তার নার্ভাস লাগছে। মনে হচ্ছে মেয়েটার পুরো শরীরটাই একটা জ্বলজ্বলে সিস্ট। ফরসেপ দিয়ে বের করে আনলেন সিস্টটা। মাস্কের ভেতরে ডাক্তারের বিজয়ীর হাসিটা দেখলো না তার সহকর্মীরা। মনে মনে বললেন, খুব জ্বালিয়েছিস মেয়েটাকে। এবার বিদেয় হ। এবার আর ওর বিয়েতে আর কোনো বাধা নেই।

ঠোঁটে হাসি নিয়ে ওটি থেকে বের হলেন ডক্টর আল আমীন। মৃদু হেসে বললেন, মেয়ে নিরাপদ। এবার বাড়ি যান। মেয়েকে পোস্ট অপারেটিভে রাখা হবে ৪৮ ঘণ্টা। চোখে আনন্দাশ্রু সবার। পোস্ট অপারেটিভের সামনে দাঁড়িয়ে আছে ওর রক্তরা।

গোলাপী কাতান পরে বসে আছে বউ। পাশে রণ। ফটোগ্রাফারের নানান নির্দেশনায় বেশ কাতর দেখাচ্ছে মেয়েটাকে। কিছুটা আড়ষ্টও বটে। কন্যা সম্প্রদানের পালা এবার। মেয়ের বাবা মেয়ের হাত তুলে দিলেন রণের হাতে। রণ কন্যার ভরণপোষণের দায়িত্ব গ্রহণ করলো। দিনটা ছিল ৭ই নভেম্বর।

পোস্ট-অপারেটিভ শুয়ে আছে কনক। মৃদু হৃদস্পন্দন ওর অস্তিত্বের জানান দিচ্ছে। ভ্রু’টা সামান্য একটু কুঁচকে উঠলো ওর। কোথায় যেন একটা বাচ্চা সুর করে নামতা পড়ছে…

দুই এক্কে দুই ……..

দুই দুগুনে আট ……..

আট দুগুনে তেরো……..

তেরো দুগুনে বাইশ……..

বাইশ দুগুনে এক ……..

Comments

comments

x