আজ বৃহস্পতিবার | ১৮ জানুয়ারি২০১৮ | ৫ মাঘ১৪২৪
মেনু

অগোছালো কথোপকথন

শারমিন সুপ্তি | ০৯ জানু ২০১৮ | ৭:৫০ পূর্বাহ্ণ

এক.

মেঘ প্রতিদিনের মতো আজও হাতের কাজ গুছিয়ে অফিসের উদ্দেশে বের হয়ে গেলো। মেঘের আজ মন ভাল নেই! গাড়িতে উঠে মোবাইলটা হাতে নিলো মেঘ। অন্যমনস্ক হয়ে এসএমএস অপশনে ঢুকলো।

মেঘ: গুড মর্নিং

কোন উত্তর নেই।

অফিসে ঢুকলো মেঘ। কাজে মন দেয়ার চেষ্টা করছে,। কিন্তু মন বসছে না।

মেইল ওপেন করলো মেঘ। এই সময় টুং টুং করে বেজে উঠলো মোবাইল-

পাহাড়: গুড মর্নিং! হঠাৎ এতো সকালে?

মেঘ: আজ অফিসে এসেছি ৮:০৮ এ!

পাহাড়: তাই!! আমি তো তখনো ঘুমাই…

মেঘ: হুম। জানি!

পাহাড়: এত সকালে কী মনে করে?

মেঘ: জানো, আমার খুব ইচ্ছে করছে লেকের ধারে হাঁটি। কৃষ্ণচূড়ারা সারি সারি দাঁড়িয়ে। খুব সকালে ঐ কৃষ্ণচূড়ার নিচে হাঁটবো। ঠান্ডা বাতাস জড়িয়ে থাকবে আমায়। আর আমার হাতে থাকবে কারো হাতে………

পাহাড়: বাহ রোমান্টিক হয়ে যাচ্ছো দেখি

মেঘ: (কিছুটা উদাস হয়ে) আমার প্রিয় মানুষটি আমার হাত ধরে হাঁটবে। আমার ছোট ছোট ইচ্ছেগুলোকে অনুভব করবে। এমন কাউকে পেলাম না। তাই আর হাঁটাও হল না!

পাহাড়: বুঝতে পারছি, আজ তোমাকে বিষণ্নতা ধরেছে…………

মেঘ পাহাড়ের কথা শুনেছে বলে মনে হলো না। অন্যমনষ্কভাবে বলেই চলল, ’কিন্তু সকাল সকাল উঠে রেডি হয়ে অফিস চলে আসা অভ্যাস হয়ে গেছে।

পাহাড়: বর্ষা আসুক, একসাথে হাঁটবো দুজনে।

মেঘ: তোমাকে কে বলল, আমি তোমার সাথে হাঁটবো? আমি একলা পথ চলতে শিখে গেছি।

পাহাড়: আচ্ছা, তুমি একলা হেঁটো, আমি তোমার পিছু পিছু হাঁটবো।

মেঘ: তার আর প্রয়োজন নাই।

ওপাশ শুধুই নিঃশ্বাসের আওয়াজ।

মেঘ: হয়তো একদিন একাই নিজের স্বপ্ন পূরণের সাহস সঞ্চয় করে ফেলব। উপভোগ করবো নিজের একাকীত্ব। কোনো বাধা, পিছুটান, সংকোচ বাঁধতে পারবে না আমায়।

পাহাড়: তোমার সাহস, ইচ্ছে দুটোই আছে। পারছো না কেন কে জানে..

মেঘ: হুম, আমি পারবো। একদিন সত্যি উড়বো।

পাহাড়: তোমার স্বপ্নগুলো পূরণ হোক।

মেঘ: হাহাহাহাহা…… উপহাস করলে?

পাহাড়: (অবাক ভঙ্গিতে) কেন? উপহাস করবো কেন? (একটু হতাশার সুরে আবার বলল) জানি কিছু ভুল আমার ছিল, ভুল আছেও….

মেঘ: বাদ দাও, আমার একটা মিটিং আছে। যাই।

পাহাড়: তাই বলে, তুমি সবসময় আমার সব কথা নেগেটিভলি নাও কেন? আমি কষ্ট পাই। এটা তুমিও জানো..

মেঘ: কষ্ট ………কি জানি, জানি না তো ………

পাহাড়: আবার কখন কথা হবে?

মেঘ: যদি ইচ্ছে হয় কোনোদিন………

দুই.

শীত জাঁকিয়ে বসেছে। ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে হাঁড় কাঁপানো শীতকেই আলিঙ্গন করে নিলো মেঘ। শরীর জমে বরফ। কিন্তু ঘরে ঢুকবার তাড়া নেই যেন ওর। হঠাৎ পাশে রাখা মোবাইলের স্ক্রীনে আলো জ্বলে উঠলো। মোবাইলের দিকে তাকালো ঠিকই কিন্তু হারিয়ে গেলো অন্য কোথাওৃৃৃ………….

হ্যালো

অপর প্রান্ত থেকে সদ্য ঘুম থেকে উঠার জড়তা জড়ানো গলায়- ’হ্যালো! কি খবর? ঘুম ভেঙেছে?’

ঘুম! সে তো কোন ভোরে ভেঙেছে
আজ প্রচ- শীত পড়েছে। তুমি কিন্তু একদম ঠা-া লাগাবে না। গরম কাপড় নিয়ে বের হবে।

মেঘ মুচকি হাসলো। হাসিটা কিছুটা উপহাসের, কিছুটা কষ্টের । বলল -–

তুমি এত ভাবো আমাকে নিয়ে! অবাক করলে!
অবাক হবার কী হলো? তুমি জানো, আমি সবসময়ই তোমাকে নিয়ে ভাবি।
ঠিক তাই। (দীর্ঘশ্বাস ফেলে চুপ রইলো মেঘ)

অপর প্রান্ত থেকে অস্থির আকুতি- ’কেন তুমি সবসময় পুরোনো স্মৃতি মনে করো? কেন তুমি আমার একটা অপারগতা ভুলতে পারো না।’

ভুলে তো যেতে চাই। সত্যি। কিন্তু তোমার আমার প্রিয় কৃষ্ণচূড়ার পাপড়িগুলো ভুলতে দেয় না। যতবার দেখি, ডায়েরির পাতার ভাঁজে শুকনো পাপড়িগুলো মলিন বদনে মনে করিয়ে দেয়।
তুমি কি আমায় এই জন্মে ক্ষমা করতে পারবে?
ক্ষমা! সে তো আমি কবেই করে দিয়েছি।
আমি জানি, তোমার দীর্ঘশ্বাসের অনলেই ধ্বংস লেখা আমার!
কিসের দীর্ঘশ্বাস!
আমি মানছি, আমি ভুল করেছি।
মানুষ মাত্রেই সহজ পথে চলতে চায়। তুমি তার ব্যতিক্রম নও।
কিন্তু আমার ফিরে আসার পথগুলো তো তুমি বন্ধ করে রেখেছো আজও। ভীষণ অভিমান তোমার..
অপেক্ষা করতে করতে মন ভুলে গেছে কিসের অপেক্ষা! আমাদের প্রিয় কৃষ্ণচূড়া গাছটা শুকিয়ে গেছে নোনাজলে। আমাদের হেঁটে বেড়ানোর মাঠে আজ বহুতল অট্টালিকারা মুখোমুখি। কতটা সময় বয়ে গেলো। এখন আর কোথায় ফিরবে তুমি? তোমার তো কিছু নেই আর।

পাহাড় নীরবে শুনে গেলো মেঘের স্বগোক্তি। খুব অসহায় কণ্ঠে উত্তর দিলো, ‘আমি সেদিন বুঝিনি তুমি আমার কতটা আপন। কিন্তু তোমায় ফিরিয়ে দিয়ে প্রতিদিন প্রতি মুহূর্তে জেনেছি, তুমি আমার পুরো অস্তিত্ব গ্রাস করে নিয়েছো।

তাই বুঝি! শুনো বালক, মনীষীরা বলেছেন, ‘সময় গেলে সাধন হবে না।’
তুমি বড্ড জেদী। বড় বেশি অভিমানী। আর কতবার ক্ষমা চাইলে গ্রহণ করবে আমায়?
কিসের ক্ষমা! কিসের অভিমান! মরা মনে পচন ধরেছে। দেহের পচন দেখা যায়। মনের পচন দেখা যায় না। ক্ষতে শুধু ক্ষরণ বাড়ে।
একটিবার, শুধু একটিবারের জন্য সুযোগ দাও।
শুনো ছেলে, অবুঝ হয়ো না। পাহাড় আর মেঘের কখনো মিলন হয় না। তুমি কখনোই আমার ছিলে না। কখনো হবেও না। সব স্বপ্ন পূরণ হয় না। সবটাই পেতে নেই।

ঘরের ভেতর থেকে শিশুর ঘুম জড়ানো কণ্ঠ। ‘মা, মা’ তুমি কোথায়?

সচিকত হয়ে উঠলো মেঘ। ঠা-ায় জমে গেছে একেবারে। কতক্ষণ বসে ছিল টের পায়নি। চোখ মুছে চেয়ার ছাড়ল। ঘরে ঢুকলো ও । শুকনো কৃষ্ণচূড়ার ফাঁক গলে মেঘের কুয়াশারা হেঁটে যায়। তীব্র ক্ষিতিধর আর কোমল জলদের স্বপ্ন ততক্ষণে কুয়াশার আড়ালে দূর বহুদূর।

তিন

অনেকদিন পর মেঘ এসেছে দেখা করতে পাহাড়ের সাথে। পাহাড়ের মধ্যে অদ্ভূত এক শিহরণ। মেঘকে দেখামাত্র শক্ত করে জড়িয়ে ধরল! ঔদ্ধত্য আদর একে দিল মেঘের চোখে, ঠোঁটে, চিবুকে। পাহাড়ের আলিঙ্গনে নেশা আছে। তা গ্রাস করলো মেঘকে। যেমন লম্বা খরার পর এক পশলা বৃষ্টি ভিজিয়ে দেয় শক্ত মাটির বুক, তেমনি পাহাড়ের ভালোবাসার স্পর্শে ভিজে গেল ও।

অনেকটা নেশাগ্রস্তের মতো বলে গেলো পাহাড়, ‘আমি তোমাকে চাই মেঘ। খুব আপন করে…..

স্তম্ভিত ফিরে পেয়ে নিজেকে পাহাড়ের আলিঙ্গন থেকে মুক্ত করলো ও। আপন মনে হাসলো এক ঝলক! সে অপারগতার হাসি। পাহাড়ের দৃষ্টি এড়ায়নি সে হাসি। ’হাসলে কেন? হাসির মতো কি বললাম?’

কাকে পেতে চাও তুমি?
তোমাকে
আমাকে? নাকি তোমার প্রেমপূজারী… তোমার প্রেয়সীকে?
হুম। আমার ‘তুমি’কে…
সে তো কবেই মরে গেছে। পচা শরীর পোকায় খুবলে খেয়েছে।
এভাবে বলো না। আমি নিতে পারি না৷
শুনেই নিতে পারছ না। একবার ভেবে দেখতো যে সয়েছে সে কীভাবে ধারণ করেছে এই যন্ত্রনা! প্রতিরাতে নীরব অপেক্ষায় মনের মন্দিরে দ্বীপ জ্বালিয়েছি। এই বুঝি আমার ভালোবাসার দেবতা এসে মুক্ত করবে মিথ্যে সম্পর্কের শিকল থেকে! আসেনি! ভালবাসার দেবতারা পূজারির অর্ঘ্যরে জন্য মুখিয়ে থাকে। পূজারির শিকল ভাঙায় অপারগ।
জানি। সব আমার ভুল।(অসহিষ্ণু হয়ে) আমার আসলে আসাই উচিৎ না আর!
সত্য সময়ই খুব নিষ্ঠুর৷
হ্যা তাই। তুমি যা জানো তাই শুধু সত্য
এত বিরক্তি কেন? কোনটা ভুল ছিল?
জানি না। কিচ্ছু জানি না। আমি শুধু জানি, তোমাকে পাওয়ার অক্ষমতা আমাকে গ্রাস করে নিচ্ছে। আমি পাগল হয়ে যাচ্ছি!
এত ব্যাকুলতা! এত যন্ত্রনা! সত্যিই? আবার মোহে পড়ো নি তো…
ও তুমি বুঝবে না। তোমার বোঝার বয়স হয়নি।

শব্দ করে হেসে উঠলো মেঘ। ’আমার বয়স হয়নি?’

কেউ যদি সব বুঝেও না বুঝতে চায় তাকে বোঝাবো সে ক্ষমতা আমার নেই।
থাক, যে দিন গেছে তা নিয়ে আর ভেবে কী হবে?
কিন্তু আমি তো আটকে আছি সেখানেই। তোমাকে ফিরিয়ে দিয়েছি ঠিকই, আমি আটকে আছি তোমাতে।

চলো উঠি। অনেকটা পথ যেতে হবে।

চলে তো যাবেই……
সেদিন যখন ভালবাসার মালা হাতে, হৃদয়ের সবটা নিংড়ে তোমাতে শঁপে দিয়েছিলাম এই মন, তাকে যখন ধারণ করতে পারলে না, সে ব্যর্থতার দায় আমার না………
মেঘ (কাতর অস্ফূটস্বরে বলে উঠলো পাহাড়)
পাহাড়, সত্যি বলতে কি জানো, তুমি আসলে আমাকে চাও না। তুমি তোমার যন্ত্রণা থেকে মুক্তি চাও।
এবার কিন্তু অপমান করছো মেঘ……
কথায় কথা বাড়ে। মান অপমানের নামতা বড় হয়। মিছে স্বপ্ন হাতে নিয়ে আশারা সব খেলা করে। তার চেয়ে, বাদ দাও।

চুপ করে গেল দু’জনেই। যে যার যন্ত্রণার ভার বহন করছে। পাহাড় পারেনি মেঘকে ধারণ করতে। মেঘও এখন সমাজ-সংসারের নিয়মে বন্দী।

একটু পর বিষণ্ন কণ্ঠে মেঘ আবার বলল, চলো, আগাই।

অন্ধকার হয়ে এসেছে। মেঘের শ্রাবণ আড়াল নিয়েছে সন্ধ্যোর কালোয়। মৃদু বাতাসে ঢাকা পড়েছে দীর্ঘশ্বাস। এপ্রিলের মাঝামাঝি। সেই কৃষ্ণচূড়া। সেই বেদী। সেই আগুনরঙা ফুল, পাপড়ি। কালো পীচ। স্মৃতি। শোক। তিক্ততা। তীব্রতা। দু’জনে নীরবে পার হলো প্রিয় পথ। পেছনে পড়ে রইল স্মৃতিরা।

Comments

comments

x