আজ বৃহস্পতিবার | ১৮ জানুয়ারি২০১৮ | ৫ মাঘ১৪২৪
মেনু

অদিতি আনজুমের গল্প— খোলা চিঠি ১

অদিতি আনজুম | ০৮ জানু ২০১৮ | ১১:৫১ পূর্বাহ্ণ

ছবি- অদিতি আনজুম

এক

হারিয়ে যাচ্ছিলাম অনন্ত অসীমে। হারানোই ছিল নিয়তি। তুমি দেবদূত হয়ে নিমজ্জিত তরী থেকে তুলে আনলে।

আমি শিহরিত-পুলকিত হলাম। স্বপ্ন দেখলাম। সুখ স্বপ্ন।  স্রোতস্বীনি এক নদীর স্বপ্ন। নদী-বৃষ্টির টাপুর টুপুর খেলার স্বপ্ন। হলুদ শর্ষে ক্ষেতে ছুট লাগানোর স্বপ্ন। আকাশের বিশালতায় তোমাকে ছুঁয়ে দেখার স্বপ্ন।

তোমার ঔদ্ধত্য আদর। প্রেমিকের চাতুর্যে হাত ছুঁয়ে যাওয়ার প্রবণতা। আমার স্বপ্নে তোমার একাত্মতা। ধ্বংসস্তুপের নিচ থেকে মলিন, রক্তাক্ত, মৃতপ্রায় এক ফুলকে তুলে এনে জীবনের স্বপ্ন দেখালে। ধ্বংসাবশেষ থেকে মাথা তুলে দেখলাম একটা আলো আমার দিকে হাত বাড়িয়ে আছে। ভাবিনি কিছুই। ভাববার সুযোগ ছিল না। ধরে ফেললাম বাড়িয়ে দেওয়া হাত।

আমি আলো, কিন্তু অনন্ত এক অন্ধকারের নাম। একবারও ভাবিনি, জীবনের সমস্ত আলো জড়ো করে যে তুমি আমার দিকে হাত বাড়ালে, আমার আঁধার তাকে নষ্ট করতে পারে। স্বার্থ ছেড়ে দিতে দিতে কখন স্বার্থপর হয়ে উঠলাম টের পেলাম না। হাতটা ধরতেই হ্যাঁচকা টান। তুলে আনল আঁধারের রাজ্য থেকে। আমার ধ্বংসস্তুপ থেকে। উড়ে যেতে যেতে পিছনে ফিরে দেখি, আমার রাজ্য জুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে আমার টুকরো টুকরো স্বপ্ন।

এতদিন এগুলোকে আগলে বসে ছিলাম। ভাঙা স্বপ্নের চৌকিদার হিসেবে একা থাকার অভ্যেস আমার। তুমি এলে শ্রাবণের ঢল হয়ে। ভাসিয়ে দিলে আমার যত্নে আগলে রাখা ভাঙা স্বপ্নের টুকরো। আমি যতই আগলে রাখি প্রবলতর হয় তোমার স্রোত। আমি তোমাকে বোঝাতে পারি না, এগুলোই আমার শেষ সম্বল। বেঁচে থাকার রসদ।

তুমি নতুন করে স্বপ্ন দেখালে। নতুন করে বাঁচতে শিখলাম আরও একবার। নতুন করে স্বার্থপর হতে শিখলাম। আর একবার ভালবাসার সংজ্ঞা আমাকে আবেগতাড়িত হরিণ শাবকের মতো ছটফট করতে শেখালো। আমি ভালবাসলাম।

তীব্র শঙ্কায়, প্রচ- আতঙ্কে আমি তোমাকে ভালবাসলাম। আমি যখন জীবন নিয়ে বাজি ধরেছিলাম, তখনও ঠিক এভাবে ভালবাসিনি। সম্ভবত ভালবাসার সংজ্ঞাটা আমার কাছে এতটা পরিষ্কার ছিল না কখনোই। ভালবাসার সংজ্ঞা যখন পুরোপুরি জানলাম, পরিষ্কার হলো, ভালবাসা মিলনে মলিনও হয় না, বিরহে উজ্জ্বলও না। ভালবাসা সূর্যের আলোর মতো। শ্বাশত। দূর থেকে ভাল। কাছে আসার তীব্রতায় পুড়ে ছাই।

বলছিলাম আমার ভালবাসার গল্প। তোমার স্রোতে আমার ভাঙা টুকরোগুলোর ভেসে যাওয়ার গল্প। বলছিলাম আমার নিঃস্ব হওয়ার গল্প। আমার শেষ অবলম্বনটুকু হারানোর গল্প। তুমি আলো হয়ে হাত বাড়ালে। আমি ধরলাম। যতই তোমার দিকে আগাই, দেখি আরও আলো। চোখ ধাঁধানো আলো। আমি তো অবাক। এতো আলো! এই আলো আমার হয় কী করে? এ তো নতুন আর এক স্বপ্ন। এ স্বপ্ন আমার হয় কী করে?

আমি স্বপ্ন বুনলাম। আবার। বুনেই চললাম। আমি আলোর সাগরে ভাসলাম। আলোর অলংকার পরে রূপসী হলাম। ভাসছি মেঘের হাত ধরে। হাসছি প্রাণ খুলে। উড়ছি প্রজাপতি হয়ে। আমি তখন সুখের স্পন্দন। আমি তখন আলোকিত আকাশ। সেখানে পাখিরা প্রবল দুঃসাহসে ডানা মেলে। মেঘেরা মুচকি হেসে চলে যায়। চাঁদ এসে চুমু খায় পৃথিবীর চোখে।

অনেক দূরে। কালো একটা ছায়া। পাত্তাই দিলাম না। আমি তখন বুনো হাঁস। ঝাঁকে উড়ে চলি দেশান্তরে। মনে হলো, ভালবাসা সব পারে। সত্যি সত্যিই ভালবাসা দুরন্ত ষাঁড়ের চোখে বাঁধতে পারে লাল কাপড়। বিশ্ব খুঁজে নিয়ে আনতে পারে ১০৮টি নীলপদ্ম। আমি ভুলে গেলাম আমার অতীত। আমি ভুলে গেলাম আমার ভবিষ্যৎ। আমি তখন শুধুই বর্তমান।

সামনে তখন ধেয়ে আসছে কালো মেঘ। সে কী ভীষণ কালো। আমি তখনও স্বপ্ন চোখে তাকিয়ে আছি। আমার মন বলছে, এবার আর আমার স্বপ্ন ভাঙবে না। তুমি তো আমার আছোই। আমি হাসছি, ভাসছি। কালো মেঘ আমাকে ঢেকে দিলো, পাত্তাই দিলাম না। আমার ভাবনাগুলো তখনও স্বপ্ন বুনতে ব্যস্ত। আমি জানি, কালো মেঘের আঁধার আমাকে গ্রাস করতে পারবে না। আমার তুমি আছো। তুমিই আমার আলো।

আমি তখনও স্বপ্ন বুনে চলেছি। চারপাশ একটু একটু করে অন্ধকার হয়ে আসছে। দেখি ঘুটঘুটে অন্ধকার। ঠিক আগের মতো। যখন আমি ছিলাম আমার ধ্বংসস্তুপের মাঝে। আরো আকস্মিক আমি অনুভব করলাম, আমার হাতটা আর তোমার হাতের মাঝে নেই। চারপাশে তখন শুধুই শূন্যতা। চারপাশে তখন কোথায় আলো নেই। আমি তোমাকে খুঁজে চলেছি। হাতড়ে বেড়াচ্ছি। অসহায় আকুতিতে তোমাকে ডাকছি। কোনো সাড়া নেই। নিঃস্তব্ধতার শব্দও এখন আর পাওয়া যাচ্ছে না। অনেকক্ষণ হয়ে গেলো। চোখে আলো সয়ে আসছে না এখনও। কিছুই দেখতে পাচ্ছি না আমি। কোথায়ও নেই তুমি। এটা আলোর মতো সত্য। এটা ভালবাসার মতো শ্বাশত। তুমি নেই।

আমি কাঁদছি। অঝোর কান্না। আমার ভুল ভেঙে গেছে। তুমি আমাকে নতুন স্বপ্ন দিতে আসোনি। তুমি এসেছিলে আমার কাছ থেকে আলো চুরি করতে। তোমার ভ্রম হয়েছিল। তুমি আমার ভাঙা স্বপ্নগুলোকে আলো ভেবেছিলে। আলোগুলো নিয়ে যাও। ভাঙা স্বপ্নগুলোও নিতে পারো। কোনো অভিযোগ নেই। আমার শেষ অবলম্বনটুকু নিয়ে যদি তুমি ভাল থাকবে মনে করো, নিয়ে যাও। কোনো অনুযোগ নেই। খুব দুঃখ হয় মাঝে মাঝে, তুমিও দেখলে না শুধু তোমার সাথেই আমি কত সুখী ছিলাম। তুমি একবার ফিরেও তাকালে না যাবার আগে! আশ্চর্য! এতটা?

আমি জানতাম, তুমি চলে যাবে। আমাকে ধারণের ক্ষমতা তোমার নেই। আমি জানতাম আমার আলো চুরি যাবে। তারপরও স্বপ্ন দেখেছি। তারপরও তোমাকে ভালবেসেছি। তারপরও আবার ছোট ছোট স্বপ্ন জোড়া লাগিয়েছি। তারপরও বেঁচে থাকতে চেয়েছি। তবে সত্যি বলতে কি, তুমি যাবার আগে নিয়ে গেছো আমার বিশ্বাস। কষ্টটা এখানেই। যখন আমি স্বপ্ন-শবের চৌকিদার তখনও আমার ভেতরে বিশ্বাস ছিল। মানুষকে ভালবাসার বিশ্বাস। তুমি এসে সেই বিশ্বাসটুকুও নিয়ে গেলে। আমি তোমার অক্ষমতা জানতাম। আমার ভালবাসায় সে অক্ষমতাকে আড়ালও করেছিলাম।

সাগরের জল থেকে এক নদী জল চুরি গেলে সাগর শুকিয়ে যায় না, নদী পূর্ণতা পায়। কিন্তু সাগরের মমতা পেলো না যে নদী, সে বড় দুর্ভাগা।

সূর্যকে পায় ক’জন? সূর্যকে ভালবাসা যায়, পাওয়া যায় না। দিবাকরেরও প্রেম আছে। সে ভালবাসে দূর থেকে। সে আগুন। তার কাছে আসলে ছাইও অবশিষ্ট থাকে না। সূর্যের জন্মই হয়েছে একা থাকার জন্য। সূর্য একাই থাকে। অতৃপ্ত বাসনা তার নিজের আগুনে পুড়েই ভষ্ম হয়। স্বপ্নের ছাইগুলোও খুঁজে পাওয়া যায় না। সূর্যের আলো চুরি করতে নেই। ওর আলো কখনো শেষ হয় না। তুমি চাইলেই পারতে। তার যে আলো বিলিয়েই সুখ।

আমার কাছে তোমার কোনো দায় নেই। আলো চুরির অভিযোগ থেকেও তোমাকে মুক্তি দেওয়া হলো। শুধু একটা দাবি। ভয় পেয়ো না। স্বপ্নগুলো ফিরে চাইতে আসিনি। ভালো থেকো। এটাই তোমার শাস্তি।

ইতি

‘দূর্গা’

[যার ঘরে আগুন লেগেছে, যে এখন শুধুই এক গলিত মাংসপি-, সে জানে আগুনের দহন কতটা নিদারুণ! আরও একবার যদি সে ঘরে আগুন লেগেই থাকে, তবে জেনে রেখো, তার আর হারাবার কিছু নেই। আগের আগুনেই সে নিঃস্ব। শুধু ক্ষতের দহন পৌনঃপুনিক হয়।]

Comments

comments

x