আজ বৃহস্পতিবার | ১৮ জানুয়ারি২০১৮ | ৫ মাঘ১৪২৪
মেনু

পুতুল

দীপু মাহমুদ | ০২ জানু ২০১৮ | ২:১১ অপরাহ্ণ

মুনশি আসগর আলি বাড়ির সামনে বাঁশের মাচার ওপর বসে আছেন। তার মাথার ওপর আমগাছ। তিনি বিশাল চিন্তার ভেতর পড়ে গেলে এই আমগাছের নিচে এসে বসেন। দাদাজানের লাগানো এই গাছের আমের নাম কোহিতুর। নবাব সিরাজউদ্দৌলার পছন্দের আম ছিল কোহিতুর। কোহিতুর আম তাঁর এতই পছন্দ ছিল যে তিনি প্রচ- গরমকালের এই ফল কনকনে শীতকালেও খেতেন। অভিনব কায়দায় কোহিতুর আম সংরক্ষণের ব্যবস্থা ছিল। পাকা আমের বোটায় মোম লাগানো হতো। মোম লাগানো সেই আম ডুবিয়ে রাখা হতো মধু কিংবা ঘিয়ের মধ্যে। শীতের সময় সেই আম ঘি কিংবা মধুর পাত্র থেকে তুলে ধুয়ে বাঁশের ছিলা দিয়ে কাটা হতো। নবাব সিরাজউদ্দৌলা রাজকীয় মেহমানদের কোহিতুর আম দিয়ে আপ্যায়ন করতেন।

কোহিতুর আমের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক আছে কিনা মুনশি আসগর আলি জানেন না। তবে মন অস্থির হলে তিনি এই আমগাছের নিচে এসে বসেন। মন শান্ত হয়। আজ মন শান্ত হচ্ছে না। পাখি কিচিরমিচির করছে। পাখির ডাক আমগাছ থেকে আসছে না। ওপাশের লিচুগাছে পাখিরা ঝটপট করছে।

মুনশি আসগর আলির মন বিষণ্ন হয়ে আছে। নিজের ভেতর প্রবল উত্তেজনা বোধ করছেন। সেই উত্তেজনা তিনি বাইরে প্রকাশ করতে চান না। গ্রামের মানুষ তাঁর ওপর ভরসা রাখে। তিনি সাহস হারালে গ্রামের মানুষের মনোবল ভেঙে পড়বে। দুঃসময়ে মনোবল শক্ত রাখা প্রয়োজন।

ভাসান মিয়া বলল, ‘চাচা, আপনার কি মনে হয় মিলিটারি আবার আসবে?’

ভাসান মিয়া এই বাড়ির কৃষাণ। মাঠে কাজ করে, গরুর দেখভাল করে। গৃহস্থ বাড়ি। ছোটবেলা থেকে ভাসান মিয়া এই বাড়িতে আছে। এখন সে এই বাড়ির একজন হয়ে গেছে।

মুনশি আসগর আলি কিছু বললেন না। তিনি আকাশের দিকে তাকিয়ে আছেন। আকাশে ঘন মেঘ। যেকোনো সময় বৃষ্টি শুরু হবে। কয়েকদিন আগে পাকিস্তানি মিলিটারি এসেছিল এই সোহাগি গ্রামে। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে তিনি বড় দুশ্চিন্তার ভেতর দিন কাটাচ্ছেন। তাঁর দুই ছেলে এবং ছোট ভাই যুদ্ধের ট্রেনিং নিতে গেছে। তারা এখনো ফিরে আসেনি। নাকি ফিরে আসার পথে পাকিস্তানি মিলিটারিদের হাতে ধরা পড়ে মারা গেছে তিনি জানেন না। প্রতিদিন বিভিন্ন জায়গা থেকে খবর আসছে পাকিস্তানি মিলিটারিরা মুক্তিযোদ্ধাদের ধরে মেরে ফেলছে।

গত বুধবার হাটের দিন সোহাগি গ্রামে পাকিস্তানি মিলিটারি এসেছিল। তারা আগুন দিয়ে গ্রামের বাড়িঘর জ¦ালিয়ে দিয়েছে। গুলি করে রাস্তার ওপর একটা গোরু আর দুটো কুকুর মেরেছে। গুলি করে গোরু আর কুকুর হত্যা করার কারণ বোঝা যায়নি। মনে হয় গ্রামে ঢুকে মানুষজনের দেখা না পেয়ে পাকিস্তানি মিলিটারিরা উত্তেজনায় এই ঘটনা ঘটিয়েছে। তাদের কাছে গোরু, মানুষ সব সমান হয়ে গেছে। গ্রামের মানুষজন তখন বাড়িঘর ছেড়ে দূরে জঙ্গলে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছিল। কুদ্দুস নামে বয়স্ক একজন মানুষ মাঠে কাজ করছিল। তাকে পাকিস্তানি মিলিটারিরা ধরে নিয়ে গেছে। কেন তাকে ধরে নিয়ে গেছে তা মুনশি আসগর আলি কিছুটা অনুমান করতে পারেন।

পাকিস্তানিদের এই গ্রামে নিয়ে এসেছিল খলিলুর রহমান। সে রাজাকার বাহিনীর কমান্ডার হয়েছে। কালো পোশাক পরে রাইফেল কাঁধে নিয়ে ঘুরে বেড়ায়। মুক্তিযোদ্ধাদের খবর পাকিস্তানি মিলিটারিদের কাছে পৌঁছে দেয়। সোহাগি গ্রামের ছেলেরা যে মুক্তিযুদ্ধে গেছে সেই খবর পাকিস্তানি মিলিটারিদের কাছে পৌঁছে দিয়েছে ওই খলিলুর রহমান। তার সঙ্গে কুদ্দুসের জমিজমা নিয়ে গন্ডগোল। কুদ্দুস বলেছে সে জমি বিক্রি করবে না। খলিলুর রহমান সেই জমি নেবেই। সে নাকি পুকুর বানাবে। সেদিন খলিলুর রহমান গ্রামে পাকিস্তানি মিলিটারিদের নিয়ে এসে মাঠ থেকে কুদ্দুসকে ধরে নিয়ে গেল। এখন জোর করে তার কাছ থেকে জমি লিখিয়ে নেবে। পাকিস্তানি মিলিটারিরা আবার সামনে হাটের দিন শনিবার সোহাগি গ্রামে আসবে বলে গেছে।

মুনশি আসগর আলি বললেন, ‘২০ জনের থাকার ব্যবস্থা করতে হবে। তারা আসবে শুক্রবার রাতে।’

ভাসান মিয়া বলল, ‘বৈঠকখানায় থাকার ব্যবস্থা করব নাকি ভেতর বাড়িতে?’

‘কথা যেন পাঁচ কান না হয়। খলিলুর রহমান লোক ভালো না। বড়ো ধরনের খারাপ লোক। তার কাছ থেকে সাবধান থাকা দরকার।’

‘কথা কেউ জানবে না।’

‘তারা সবাই এক জায়গায় থাকবে না। তিন/চারজন করে দলে ভাগ হয়ে থাকবে। গ্রামের ভেতর বিশ্বস্ত পাঁচ/ছয় জনের বাড়ি দেখে রাখতে হবে।’

‘খুনকার বাড়ি, তালেব আলি, মনীষ, মনোজ পাল, লিয়াকত…।’

‘এখন কাউকে কিছু বলার দরকার নেই। শুক্রবারে বলা যাবে।’

‘তাঁরা কি মুক্তিযোদ্ধা?’

‘হ্যাঁ। শনিবারে এখানে পাকিস্তানি মিলিটারি এলে তাঁরা অ্যাটাক দেবে।’

ভাসান মিয়াকে অস্থির দেখাচ্ছে। তার মনে হচ্ছে মুক্তিযোদ্ধারা যেন এখুনি আসবে। তাঁদের থাকাখাওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। এই কাজ তাকে দেওয়া হয়েছে বলে তার ভালো লাগছে।

মুনশি আসগর আলি উদাস চোখে রাস্তার দিকে তাকিয়ে আছেন। তিনি কীভাবে এতবড়ো ঘটনা সামাল দেবেন ভাবছেন। অনেক ঝুঁকি আছে এই কাজে তিনি জানেন। চারপাশে পাকিস্তানি মিলিটারির চর। এইদেশের কিছু বেঈমান তাদের দালালী করছে। মুনশি আসগর আলি মনে মনে বললেন, ‘দেশের জন্য আমাকে ঝুঁকি নিতেই হবে।’

পুতুল সামনের রাস্তা দিয়ে হেঁটে আসছে। সে আসছে মাথা নিচু করে। মাটির রাস্তার দিকে তার চোখ। পায়ের কাছে ধুলা উড়ছে। পুতুলকে দেখে মনে হচ্ছে তার মন খারাপ। খুব বেশি খারাপ। মুনশি আসগর আলির ছোট মেয়ে পুতুল। বয়স ১৩ বছর। সে সোহাগি দ্বিমুখী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে অষ্টম শ্রেণিতে পড়ে। বৃত্তি পরীক্ষা দেওয়ার কথা আছে। দেশে যুদ্ধ শুরু হয়েছে। বৃত্তি পরীক্ষা হবে কিনা বোঝা যাচ্ছে না। ক্লাস ফাইভে পুতুল টেলেন্ট পুলে বৃত্তি পেয়েছিল। সেই বছর তাদের ইউনিয়ন থেকে আর কেউ টেলেন্ট পুলে বৃত্তি পায় নাই। পুতুল কাছে আসতেই মুনশি আসগর আলি বললেন, ‘কোথায় গিয়েছিলে?’

পুতুল শুনতে পেয়েছে বলে মনে হলো না। সে শাড়ির আঁচল টেনে ধরে বাড়ির দিকে রওনা হলো। মুনশি আসগর আলি আবার বললেন, ‘পুতুল তুমি কোথায় গিয়েছিলে?’

পুতুল দাঁড়াল। আলতো করে মাথা তুলে বলল, ‘নীলিমাদের বাড়ি। ওরা চলে গেল।’

মুনশি আসগর আলি বললেন, ‘হ্যাঁ। সকালে নীলিমার বাবা এসেছিল। ওরা ইন্ডিয়ায় চলে যাচ্ছে।’

পুতুল কিছু বলল না। তার চোখ ভরা পানি। মনে হচ্ছে কেঁদে ফেলবে। নীলিমা তার ছোটবেলার বন্ধু। একসঙ্গে খেলতে-খেলতে বড় হয়েছে। পুতুল চোখে শাড়ির আঁচল দিয়ে বাড়ির ভেতর ঢুকে পড়ল।

বৃহস্পতিবার দুপুরবেলা। ভাসান মিয়াকে ডেকে মুনশি আসগর আলি বললেন, ‘তাদের একজন এসেছিল। তারা সকলে এক গ্রামে থাকতে চাইছে না। আশপাশ কয়েক গ্রামে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকবে।’

সন্ধ্যা লাগার আগেই চারপাশ অন্ধকার হয়ে গেল। সকাল থেকে বৃষ্টি হচ্ছে। আষাঢ় মাসের ঝুম বৃষ্টি। অন্ধকার রাত। গা ছমছম করছে। অন্ধকারে নিজের হাতটাও দেখা যাচ্ছে না। মুক্তিযোদ্ধা দল এসে পৌঁছেছে সোহাগি গ্রামে। দলে আছেন ২০ জন মুক্তিযোদ্ধা।

ভাসান মিয়া দুপুরে বৃষ্টির মধ্যে ভিজে তাদের থাকার ব্যবস্থা করেছে। মুক্তিযোদ্ধারা তিনজন, তিনজন করে আশপাশের গ্রামে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকবেন। যাতে ধরা পড়লে সবাই একসঙ্গে ধরা না পড়েন।

মুনশী আসগর আলির বাড়িতে আছেন দুইজন মুক্তিযোদ্ধা। তাদের একজনের নাম সিরাজ আরেকজনের নাম মতিউর। মতিউর এই মুক্তিযোদ্ধা দলের লিডার। ভাসান মিয়া অন্য মুক্তিযোদ্ধাদের বাড়ি-বাড়ি পেঁছে দিতে গেছে। তার কাজ হচ্ছে মুক্তিযোদ্ধাদের খোঁজখবর নেওয়া। তাঁদের খবর আদানপ্রদান করা। মুনশি আসগর আলির বাড়িতে মুক্তিযোদ্ধাদের দেখাশুনার ভার পড়েছে পুতুলের ওপর। সে আনন্দ নিয়ে এই দায়িত্ব পালন করছে।

শুক্রবার সকালবেলা। মুনশি আসগর আলির বাড়ি। সিরাজ আর মতিউর কিছুক্ষণ আগে নাস্তা করেছেন। এখন তারা ঘরের ভেতর বসে অস্ত্র পরিষ্কার করছেন। পুতুল সামনে দাঁড়িয়ে আছে। তার চোখ ভরা বিস্ময়। সে কৌতুহল নিয়ে অস্ত্রগুলো দেখছে। পুতুল দুই হাঁটু মুড়ে ঘরের মেঝেতে বসে পড়ল। একটা গ্রেনেড হাতে তুলে নিয়ে বলল, ‘এটা কী?’

সিরাজ বললেন, ‘এটা বোমা। ছুড়ে মারলে প্রচ- শব্দ হয় আর অনেক লোক মারা যায়।’

পুতুল বলল, ‘এটা কীভাবে ছুড়ে মারে?’

মতিউর বেশ মজা পেয়েছেন পুতুলের কথায়। তিনি বললেন, ‘তুমি শিখবে?’

পুতুল বলল, ‘জি।’

মতিউর আবার বললেন, ‘কেন শিখবে গ্রেনেড ছোড়া?’

পুতুল বলল, ‘আমার ছোট চাচা আর দুই ভাই যুদ্ধের ট্রেনিং নিতে ভারতে গেছে। তারা ট্রেনিং নিয়ে দেশে ফিরে আসবে। আমি তাদের সঙ্গে যুদ্ধে যাব। গ্রেনেড ছুড়ে পাকিস্তানি মিলিটারিদের মেরে ফেলব। ওরা খুব খারাপ। ওদের জন্য নীলিমারা চলে গেল।’

‘নীলিমা কে?’

‘আমার বন্ধু। আমরা একসঙ্গে পড়তাম। এখন ইশকুল বন্ধ।’

মতিউর বললেন, ‘আমি তোমাকে গ্রেনেড ছোড়া শিখিয়ে দিচ্ছি। তোমার চাচা আর দুই ভাই যখন ফিরে আসবে তখন তুমি তাদের অবাক করে দেবে। তুমি সাহসী মেয়ে। তুমি পারবে।’

পুতুলের আগ্রহ দেখে মতিউরের ভালো লাগছে। পুতুলের ভেতর কিশোরীসুলভ চপলতা আছে। আবার কোথায় যেন বড়দের মতো গাম্ভীর্য আছে। দেখে মনে হয় তাকে দায়িত্ব দেওয়া যায়।

পুতুল শিখল কীভাবে সেফটি পিন খুলে লিভার চেপে ধরে গ্রেনেড ছুড়তে হয়। সে চার-পাঁচ বার পিন খুলে লিভার চেপে ধরে গ্রেনেড ছুড়ল। কিন্তু সেটা গ্রেনেড ছোড়া শেখানোর জন্য আলাদা করে রাখা বলে গ্রেনেড ফাটল না। তারপর রাইফেল দেখিয়ে পুতুল বলল, ‘আমাকে রাইফেল চালানো শেখাবেন?’

সিরাজ বললেন, ‘তুমি রাইফেল চালানোও শিখতে চাও?’

পুতুল বলল, ‘হ্যাঁ চাই। আমাদের গ্রামে মহি চাচার বন্দুক আছে। ছোট চাচার এয়ারগান আছে। আমি দেখেছি। ট্রিগার ধরে টান দিলেই ঠাস। তাই দিয়ে পাখি মারে। আর রাইফেল দিয়ে মানুষ মারে।’

মতিউর বললেন, ‘তুমি মানুষ মারতে চাও?’

পুতুল বলল, ‘পাকিস্তানি মিলিটারিরা মানুষ না। ওরা জানোয়ারের চাইতেও খারাপ। সেদিন এসে আমাদের গ্রামের বাড়িগুলো আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দিয়েছে। কুদ্দুস চাচাকে ধরে নিয়ে গেছে। ওদের জন্য নীলিমারা দেশ ছেড়ে ইন্ডিয়ায় চলে গেছে।’

মতিউর বললেন, বেশ, ‘তোমাকে আমি রাইফেল চালানো শেখাব। তবে এখানে তো শেখানো যাবে না। গুলি করলে শব্দ হবে।’

পুতুল বলল, ‘ও আচ্ছা। তাহলে থাক।’

সিরাজ বললেন, ‘রাইফেল কিন্তু অনেক ভারী।’

মতিউর বললেন, ‘তোমার চাচার এয়ারগান নিয়ে এসো। কেমন করে টার্গেট করতে হয় দেখিয়ে দিই। আর গুলি করার জন্য রাইফেল কীভাবে রেডি করতে হয় দেখাই।’

পুতুল চলে গেল। কিছুক্ষণ পর ফিরে এসে বলল, ‘আব্বা এয়ারগান কোথায় যেন রেখে গেছেন। পেলাম না। আব্বা বাড়িতে নেই। বাজারের দিকে গেছেন। থাক রাইফেল চালানো পরে শিখব।’

সারাদিন কেউ বাড়ি থেকে বের হয়নি। ভাসান মিয়া দরকারি খবরাখবর এনে দিয়েছে। সন্ধ্যাবেলা মেঘ করেছিল। তবে বৃষ্টি হয়নি। ঠান্ডা বাতাসের সঙ্গে রাত নেমে এল।

খানিকটা আরাম পেয়ে রাত নামার পরপরই মুক্তিযোদ্ধারা ঘুমিয়ে পড়লেন। ঘুমের ভেতর মতিউর অদ্ভুত স্বপ্ন দেখলেন। বিশাল বড়ো এক নদী। মতিউর সেই নদী সাঁতরে পার হচ্ছেন। তিনি প্রায় নদীর পাড়ের কাছাকাছি চলে এসেছেন। সামনে নদীর পাড়। তিনি পাড়ে উঠবেন। সাঁতরে সামনে যাচ্ছেন। ঠিক সেই সময় বড়ো ঢেউ এসে তাকে প্রবল স্রোতে ভাসিয়ে নিয়ে গেল। তিনি পাড়ে উঠতে পারলেন না। মাঝ নদী দিয়ে ভেসে গেলেন। মতিউরের ঘুম ভেঙে গেল। ঘুম ভেঙে তিনি অস্থির হয়ে পড়লেন। মনে হলো কোথাও কোনো গ-গোল হয়েছে। কী গ-গোল হয়েছে তিনি চট করে বুঝে উঠতে পারলেন না।

অন্যান্য মুক্তিযোদ্ধাদেরও ঘুম ভেঙেছে ভোরবেলা। তাঁদের ঘুম ভেঙেছে গুলির শব্দে। মতিউর বুঝতে পেরেছেন কাছে কোথাও গুলি হচ্ছে। তারা এখানে আছে সেই খবর পাকিস্তানি মিলিটারিদের কাছে চলে গেছে। পাকিস্তানি মিলিটারিরা গ্রাম ঘিরে ফেলে গুলি করতে করতে এগিয়ে আসছে। এটা মতিউরের জানা গুলির আওয়াজ। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর থ্রি-জি রাইফেলের ফায়ার। তিনি গুলির এই আওয়াজের সঙ্গে পরিচিত।

মতিউর আর সিরাজ ঘুম ভেঙে ধড়ফড় করে উঠে বসলেন। তাঁরা বুঝতে পারছেন না কী করবেন।

পুতুল ছুটে এসেছে। তাকে ভীষণ উত্তেজিত দেখাচ্ছে। তবে ঠান্ডা গলায় পুতুল বলল, ‘আপনারা বাড়ির পেছনের জঙ্গলের ভেতর দিয়ে চলে যান।’

ভাসান মিয়া দৌড়ে অন্যান্য মুক্তিযোদ্ধাদের খবর দিতে গেল। মুনশি আসগর আলি টুপি মাথায় দিয়ে মসজিদের দিকে গেলেন। পাকিস্তানি মিলিটারিদের খবর নেওয়া দরকার।

পুতুলের কথামতো সিরাজ আর মতিউর জঙ্গলের ভেতর দিয়ে এগিয়ে যেতে থাকলেন। তাঁরা জানেন না কোথায় যাচ্ছেন। গ্রামের মানুষজন প্রাণভয়ে পালাচ্ছে। পাকিস্তানি মিলিটারিরা গুলি করতে-করতে এগিয়ে আসছে। সিরাজ আর মতিউর অস্ত্র হাতে ছুটছেন। তাদের হাতে ব্যাগ। ব্যাগের ভেতর অনেকগুলো গ্রেনেড। মতিউর আর সিরাজের সঙ্গে আছে পুতুল। সেও ছুটছে।

ছুটতে ছুটতে পুতুল আচমকা দাঁড়িয়ে পড়ল। সে জোরে জোরে শ্বাস নিচ্ছে। পুতুল পায়ের গোড়ালি থেকে অনেকখানি উঁচু করে শাড়ি পরেছে। তবু তার দৌড়াতে অসুবিধা হচ্ছে। পুতুল হাঁপাচ্ছে। হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, ‘আমাকে দুটো গ্রেনেড দেন।’

সিরাজ বললেন, ‘তুমি গ্রেনেড নিয়ে কী করবে?’

পুতুল বলল, ‘আপনারা সোজা হিন্দু পাড়ায় চলে যান। যাওয়ার সময় বাঁশের সাঁকো পাবেন। সাঁকো পার হয়ে যাবেন। ওপাশে হিন্দু পাড়া। আমি গ্রেনেড নিয়ে সাঁকোর ওপারে ঝোঁপের ভেতর বসে থাকব। পাকিস্তানি সৈন্যরা এলেই গ্রেনেড ছুড়ে মারব।’

মতিউর বললেন, ‘ওরা যদি তোমাকে ধরে ফেলে?’

পুতুল মনে জোর নিয়ে বলল, ‘আমি গ্রেনেড ছুড়েই দৌড়ে চলে যাব।’

পুতুলের আত্মবিশ্বাস দেখে মতিউর বা সিরাজ আর কিছু বলতে পারলেন না। পুতুল আচমকা ব্যাগের ভেতর হাত ঢুকিয়ে দিল। ব্যাগের ভেতর থেকে সে দুটো গ্রেনেড বের করে এনেছে। এখন তার দুই হাতে দুটো গ্রেনেড। পুতুল মাথা ঝাঁকিয়ে বলল, ‘আপনারা তাড়াতাড়ি চলে যান।’

সিরাজ আর মতিউর ঘটনা দেখে থতমত খেয়ে গেছেন। তারা আর কিছু বললেন না। হিন্দু পাড়ার দিকে দৌড়ে গেলেন। সামনে পানি থৈথৈ খাল। তার ওপরে বাঁশের সাঁকো। সিরাজ আর মতিউর সাঁকো পার হলেন। তাঁরা হিন্দু পাড়ায় ঢুকে রাইফেল কক করলেন। পুরো পাড়ায় কোনো মানুষ নেই। তাদের অনেকই ঘরবাড়ি ছেড়ে ভারতে শরনার্থী ক্যাম্পে চলে গেছে। যারা ছিল তারা পাকিস্তানি মিলিটারি আসছে শুনে ভয়ে জঙ্গলে গিয়ে লুকিয়েছে।

সিরাজ আর মতিউর ফাঁকা একটা বাড়ির আড়ালে পজিশন নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকলেন। পুতুল সাঁকো পার হয়ে খালপাড়ের জঙ্গলের ভেতর লুকিয়ে থাকল।

গুলির শব্দ কাছে এগিয়ে আসছে। মতিউর আর সিরাজের মাথার ওপর দিয়ে এক ঝাঁক গুলি ছুটে গেল। তারমানে পাকিস্তানি সৈনারা তাদের দেখে ফেলেছে। কেউ একজন চিৎকার করছে, ‘উধার মুক্তি হ্যায়। হিন্দু পাড়ামে মুক্তি হ্যায়।’

পাকিস্তানি সৈন্যরা ফায়ারের গতি বাড়িয়ে দিয়েছে। পাকিস্তানি সৈন্যরা এগিয়ে আসছে। তাদের সঙ্গে রাজাকার। পুতুল এই রাজাকার দলের কমান্ডারকে চেনে। খলিলুর রহমান। সে পাকিস্তানি সৈন্যদের সঙ্গে আছে। তবে সে আছে সবার পেছনে। সামনে অন্য আরেকজন রাজাকার। তাদের নিয়ে সাঁকো পার হয়ে হিন্দু পাড়ায় ঢুকবে।

সামনের সেই রাজাকার সাঁকোর ওপর উঠে এসেছে। তার পেছন-পেছন আরও কয়েকজন পাকিস্তানি সৈন্য সাঁকোতে উঠেছে। সাঁকো দুলছে। তারা খুব সাবধানে পাশের বাঁশ আঁকড়ে ধরে সাঁকো পার হচ্ছে। হেঁটে হেঁটে প্রায় সাঁকোর মাঝামাঝি চলে এসেছে।

তখন প্রচ- শব্দে পরপর দুটো গ্রেনেড বিস্ফোরিত হলো। পুতুল গ্রেনেড ছুড়ে মেরেছে। আকস্মিক ঘটনায় পাকিস্তানি সৈন্যরা থমকে গেছে। তারা এমনিতেই পানি ভয় পায়। পাকিস্তান মরুভূমির দেশ। তারা সাঁকো পার হতে ভয় পাচ্ছিল। তার ভেতর হঠাৎ গ্রেনেডের আওয়াজ। সাঁকোর ওপর যারা ছিল গ্রেনেডে তাদের দেহ ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল। রাজাকার দল বা পাকিস্তানি সৈন্যরা এই ঘটনার জন্য প্রস্তুত ছিল না। তারা দিশেহারা হয়ে পড়ল। তাদের ভেতর ছোটাছুটি শুরু হয়ে গেল।

পুতুল দৌড়াচ্ছে। সে দৌড়ে আসছে হিন্দু পাড়ার দিকে। পাকিস্তানি সৈন্যরা তখন মরণ চিৎকার করে ছুটে পালাচ্ছে। তাদের আগে আগে পালাচ্ছে রাজাকার কমান্ডার খলিলুর রহমান।

পুতুল এসে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, ‘গ্রেনেড দুটো ফাটিয়ে দিয়েছি। সাঁকো ভেঙে গেছে।’

মতিউর বললেন, ‘রাজাকাররা কোথায়?’

পুতুল বলল, ‘পালিয়েছে।’

বাঁশের সাঁকো ভেঙে পড়ে আছে। খালের পানি রক্তে লাল হয়ে গেছে। শত্রু ঘায়েল হয়েছে গ্রেনেডে। বাকিরা হকচকিয়ে গিয়ে পালিয়েছে।

চারপাশ থেকে এস.এল.আর এবং নাইন এম.এম কারবাইনের গুলির আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে। তারমানে অন্য মুক্তিযোদ্ধারা ফায়ার শুরু করেছে। ভাসান মিয়া তাদের গিয়ে খবর দিয়েছে। মুক্তিযোদ্ধা দল পাকিস্তানি সৈন্য আর রাজাকারদের ঘিরে ফেলেছে। মতিউর আর সিরাজও ফায়ার করতে করতে এগিয়ে গেলেন। পাকিস্তানি সৈন্য আর রাজাকাররা ঘেরাওয়ের মধ্যে পড়ে গেছে।

তখন প্রচন্ড গোলাগুলি শুরু হলো। গ্রামের যারা ভয়ে জঙ্গলে পালিয়েছিল তারা ফিরে এসেছে। তির ধনুক নিয়ে তারাও মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে যুদ্ধে যোগ দিল। তারা পাকিস্তানি সৈন্যদের দিকে তির আর বর্শা ছুড়ে মারতে থাকল। ঝাঁকে ঝাঁকে তির গিয়ে পাকিস্তানি সৈন্যদের অস্থির করে দিল। অনেক পাকিস্তানি সৈন্য মারা পড়ল। দুপুর পর্যন্ত যুদ্ধ চলল। দুপুরে পাকিস্তানি সৈন্যদের গুলি ফুরিয়ে গেল। তারা আর যুদ্ধ করতে পারল না। মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে আত্মসমর্পন করল।

পুতুল আনন্দে ফাঁকা মাঠে একটা গ্রেনেড নিয়ে ছুড়ে মারল । প্রচ- শব্দে বিস্ফোরিত হলো সেই গ্রেনেড। সকলে একসঙ্গে মহা আনন্দে চিৎকার করে উঠল। মতিউরের কাছ থেকে পুতুল রাইফেল চালানো শিখে নিল। ছোট চাচা আর তার তার দুই ভাই ফিরে এলে সে তাদের সঙ্গে যুদ্ধে যাবে। সোহাগি গ্রামের যুদ্ধে তারা জিতে গেছে।

Comments

comments

x