আজ বৃহস্পতিবার | ১৮ জানুয়ারি২০১৮ | ৫ মাঘ১৪২৪
মেনু

ফেইক মুখ

শোভা দেববর্মা | ২৫ ডিসে ২০১৭ | ১১:৫৪ অপরাহ্ণ

‘ফেইসবুক ?ফেইসবুক না আর কিছু- আমার মাথা,যত্ত সব বদমাশ চালবাজের দল’, রাগে গনগন করে জ্বলছে আর টগবগ করে ফুটছে অনিন্দিতা।একটু দূরে সোফায় বসে বাবাই-তার হাতেও মোবাইল।অনিন্দিতা আঁড়চোখে একবার তাকায় ছেলের দিকে, বিদেশে থাকে, অল্প কিছুদিনের জন্য বাড়ীতে এসেছে সে।অনিন্দিতা চেঁচিয়ে ছেলেকে বলে ‘এ্যাই- ফেইসবুক করছিস?বন্ধ কর – বন্ধ কর-সারাদিন শুধু মোবাইল নিয়ে বসে বসে ফেইসবুক ঘাটাঘাটি- তাই না? বন্ধ কর বলছি’। বাবাই ও সমানতালে চেঁচিয়ে বলে ‘আরে না না , আমি ফেইসবুক করছি না, অন্য একটা কাজ করছি’-আসলে সেও বসে বসে রিমির সঙ্গে ম্যাসেন্জারে চেটিংই করছিল, মাকে মিথ্যে কথা বলে সে, আর অনিন্দিতা সেটা ভালই বুঝতে পারে।।

এবারে মুখ তোলে বাবাই একবার মার দিকে তাকায়, মাকে ফেইসবুকে একাউন্ট টা সেই খুলে দিয়েছিল। মা সারাদিন বাড়িতে একা থাকেন আর সে নিজেও তো থাকে বিদেশে, তাই ভেবেছে মা যদি ফেইসবুক নিয়ে সময় কাটায় তাহলে মন্দ কি ? প্রথম প্রথম মা পাসওয়ার্ড ঘনঘন ভুলে যেতেন এখন আর তা হয় না।বাবাই মুখ তোলে জিজ্ঞেশ করে ‘কি হলো কি? কোন সমস্যা?’ অনিন্দিতা বলে ‘ দেখ না , হাঁটুর বয়সি ছেলে বলে কিনা আই লাভ ইউ !’হেসে ফেলে বাবাই – হা হা করে হাসে, তাকায় মার দিকে- সত্যি – ওর মা আজও ভীষন সুন্দরি, মনেই হয় না এতো বয়স হয়েছে, একটু গর্ব বোধ করে বাবাই।‘মা-সাবধানে চেটিং করবে,অনেক ফ্রড লোক ও আছে কিন্ত্তু, নানা ভাবে কথার জালে আটকে পরে টাকার জন্য ব্লেকমেইল ও করতে পারে, সব পুরুষ কিনত্তু পুরুষ বন্ধু নাও হতে পারে আবার মেয়ে বন্ধুরাও মেয়ে নাও হতে পারে, সুতরাং খুব সাবধান মা’।অনিন্দিতা সাবধান হোক বা না হোক কিনত্তু নিশ্চিন্ত হয়, অন্তত এই ছেলেকে কেউ চীট করতে পারবে না, এবারে হেসে ফেলে সে।

অনেক কষ্টে নিজের সমস্ত কিছু উজাড় করে দিয়ে এই ছেলেকে বড় করেছে অনিন্দিতা।প্রবাল যখন ওদের ছেড়ে চলে যায় তখন আর কতইবা বয়স বাবাইয়ের-ক্লাশ থ্রীতে পড়ে তখন, আর আজ ? গর্ব হয় অনিন্দিতার নিজের ছেলের জন্য, মনে হয় এতো বছরের যু্দ্ধ আজ শেষ, আজ সে বিজয়ী, তবু একটা চিনচিনে কষ্ট ওর বুকে থেকেই যায় প্রবালের জন্য। কেন যে ওদের দুজনের মধ্যে বনিবনা হলো না মাঝে মাঝে তা সত্যিই ভেবে পায়না অনিন্দিতা।ওরা দুজনেই ডাক্তার, একই কলেজ থেকে পাশ করেছিল, নিজেরা ভালবেসে বিয়েও করেছিল অথচ বিয়ের পর দুজনে একসঙ্গে দশ বছরও সংসার করতে পারলনা ! কিসের সংঘাত ?ব্যাক্তিত্বের ?ভেবে পায় না অনিন্দিতা।আজ এই বয়সে এসে সে ভাবে তার হয়তো আরো একটু বেশি সহিষ্ণু হওয়া উচিত ছিল। আজও সে প্রবাল কে আইনত ডিভোর্স দেয়নি , আঠার বছর আগে সেই যে লোকটা বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে গেল তারপর থেকে আর কোন যোগাযোগ নেই।অনিন্দিতা ভাবে আবার যোগাযোগ হলে প্রবালকে সে ডিভোর্স টা দিয়েই দেবে। পিটিং করে আওয়াজ হয় মোবাইলে – ম্যাসেঞ্জারে মেসেজ এসেছে, অনিন্দিতা একটু দ্রুত এগিয়ে গিয়ে ডাইনিং টেবিলের উপর থেকে মোবাইল টা তুলে নেয়, ঠিক , যা ভেবেছে ঠিক তাই- অনিমেষে্র মেসেজ- গুডমর্নিং মেসেজ, অনিন্দিতা সঙ্গে সঙ্গে রিপ্লাই দেয়। এতক্ষন আড়চোখে মাকে দেখছিল বাবাই, এবারে একটু মুচকি হেসে নিজের ঘরে ঢুকে পরে সে।

অনিমেষের সঙ্গে ওর ফেইসবুকে বন্ধুত্ব –তাও প্রায় বছর তিনেক হয়ে গেল। অত্যন্ত সৎ ব্যাক্তি বলেই মনে হয় তাকে, বিদেশে থাকেন, স্ত্রী আছেন, ছেলেও আছে, কই – মিথ্যে কথা তো বলেননি , যা সত্য তাই তো বলেছেন- ভাবে অনিন্দিতা।শুধু মনের মধ্যে একটা নিঃসঙ্গতা সবসময় তাকে কুড়ে কুড়ে খায়-এই বয়সে এসে জীবনের সব ভুল ভ্রান্তিগুলো মিটিয়ে ফেলে এবারে সুস্থ ভাবে বাঁচতে চায়-জানায় অনিমেষ।অনিন্দিতাও প্রকৃ্ত বন্ধুর মত তাকে সবসময় নানারকম উপদেশ, মতামত দিয়ে জীবনের সমস্যাগুলো থেকে বেরিয়ে আসার রাস্তা দেখায়।অনিন্দিতার জীবনেও তো ঘাত প্রতিঘাত কম আসেনি-সেও তার জীবনের সমস্ত দুঃখ, দ্বন্দ অনিমেষের সঙ্গে শেয়ার করে নেয়। এইভাবেই আস্তে আস্তে এই তিন বছরের মধ্যে তাদের দুজনের একটা অদ্ভুত সুন্দর বন্ধুত্ব তৈরী হয়েছে। কিনত্তু অনিন্দিতার হয়েছে ভারী মুস্কিল, কত যে ছেলে বন্ধু কত ভাবে কত প্রস্তাব দেয় তার ইয়ত্তা নেই, সবই যে ফালতু বদমাশি তা এখন সে ভালই বুঝতে পারে।নাঃ-ও ভাবে অনিমেষকে জানাবে, বাবাই বলেছে সাবধানে চেটিং করতে , কথার জালে আটকে ফেলে পরে নাকি আবার ব্লেকমেইলও করতে পারে !কি কান্ড ! ছেলেগুলো নাকি আবার মেয়েও হতে পারে !মোবাইলে মেসেজ টা টাইপ করে অনিমেষকে পাঠায় সে, উঠে একবার রান্নাঘরেও যায় , হাতের কাজগুলো দ্রুত সেরে নেয়।আওয়াজ হয় পিটিং- অনিন্দিতা মেসেজ বক্স খোলে, অনিমেষ লিখেছে ‘হা হা হা –আরো শোন, বিদেশী নাম নিয়ে যে সব ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট আসে সেগুলো কিনত্তু বিদেশী নাও হতে পারে- বেশির ভাগই ফেইক মুখ হয়-

বুঝেছ?বিভিন্ন কল সেন্টার থেকে ওরা বিদেশী নাম্বার যোগাড় করে, ওই নাম্বার থেকে ফোন ও করতে পারে – তারপর নানা অজুহাতে টাকা আদায় করে’। সত্যিই তো !অবাক হয় অনিন্দিতা। বছর খানেক আগে কেভিন এলেক্স নামে একজন বিদেশী ভদ্রলোক ওকে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠিয়েছিল আর সেও তা একসেপ্ট করেছিল। অল্প কিছুদিনের মধ্যে ওরা ফোন নাম্বার ও দেয়া নেয়া করে। এরপরেই একদিন এলেক্স ওকে বলে সে নাকি অনিন্দিতার বাড়ির ঠিকানায় প্রচুর উপহার পাঠিয়েছে, অনিন্দিতা কে তা ছাড়িয়ে নিতে হবে , প্রায় পঁচিশ হাজার টাকা দিয়ে !বিরক্ত হয় অনিন্দিতা, রাগও হয়েছিল তার, পরে সে এলেক্সের নাম্বারটা ব্লক করে দেয়। এরপরে তো আরো অবাক কান্ড, অনিন্দিতা খুঁজে পায় বিভিন্ন নামে এলেক্সের আরো অনেক ফেইক একাউন্ট- তার মানে এলেক্স একটা ফেইক মুখ !এখন অনিমেষের কথা শুনে সে সব আরো ভালোভাবে বুঝতে পারে, বুঝতে পারে কিভাবে বিদেশী নাম্বার থেকে এলেক্স ওকে ফোন করত।মনে মনে বলে অনিন্দিতা- ‘তোমাকে অনেক ধন্যবাদ অনিমেষ’।

অনিন্দিতার ফেইসবুকফ্রেন্ডের সংখ্যা এখন এক হাজার ছাড়িয়ে গেছে, আরো অনেক বেশি সড়গড়ও হয়ে গেছে সে এখন কিন্ত্তু অনিমেষ আজও আছে, মনের আরো কাছাকাছি, বন্ধুত্ব আরো গভীর। প্রতিদিনের সমস্ত ঘটনা রাত্তিরে একবার অনিমেষকে বলতে না পারলে অনিন্দিতার ঘুমই আসে না, আর অনিমেষ? দিনে কতবার যে সে ফোন করে ,মেসেজ করে অনিন্দিতাকে তার ইয়ত্তা নেই। বন্ধুত্ব যত গভীর থেকে গভীরতর হয় ততোধিক পরস্পর বিশ্বাসও দৃঢ় থেকে দৃঢ়তর হয়। অনিন্দিতা আজ নির্দিধায় বলতে পারে অনিমেষকে যে প্রবালের সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট হওয়ার জন্য সে নিজেও অনেকাংশে দায়ী, এই বয়সে এসে সে নিজের ভুল বুঝতে পেরেছে, অনেকদিন থেকে সে মনে মনে প্রবালকে খুঁজছেও- শুধু একবার ক্ষমা চাইবে বলে। তেমনি অনিমেষও নিজের অনুভূতির কথা জানায় অনিন্দিতাকে, তার সন্দেহ, ঈর্ষা প্রতিমূহুর্তে তার স্ত্রী, পরিবারকে তার নিজের থেকে অনেক দূরে সরিয়ে দিয়েছে, আজ সেই ভুলগুলো সে নিজেও শোধরাতে চায়। সুন্দর নির্মল বন্ধুত্ব ষাটোর্ধ দুই ব্যাক্তিকে মনের খুব কাছাকাছি নিয়ে আসে।

অনিমেষই একদিন হাসতে হাসতে প্রস্তাব দেয় ‘এসো- আমরা একদিন মীট করি-তুমিতো জানই না আমি দেখতে কেমন, আমার টাইমলাইনে তো শুধুই ফুলের ছবি দেয়া’। অবাক হয় অনিন্দিতা , সত্যিই তো !কখনো তো সে ব্যাপারটাা তেমন ভাবে ভেবেই দেখেনি !এত বছর হয়ে গেল একবারও তো সে অনিমেষকে বলে নি নিজের ছবি আপলোড করতে ! সুতরাং অনিমেষের প্রস্তাবে সানন্দে রাজি হয়ে যায় অনিন্দিতা।অনিমেষ জানায় অফিসের কাজে সে ইন্ডিয়া আসবে কয়েকদিনের মধ্যেই- তখন সে দেখা করবে আনিন্দিতার সঙ্গে।

নির্দিষ্ট দিনে সুন্দর করে সেজে অনিন্দিতা এয়ারপোর্টে যায় অনিমেষকে রিসিভ করতে।অনিমেষ আগেই জানিয়ে দিয়েছিল যে সে নীল রঙের শার্ট পরে আসবে আর হাতে থাকবে একগোছা গোলাপ ফুল। অধির আগ্রহে অনিন্দিতা দাঁড়িয়ে থাকে এরাইভেল গেইটের সামনে- খোঁজে নীল রঙের শার্ট, গোলাপগুচ্ছ- হঠাৎই অনিন্দিতা দেখতে পায় হাতে একগোছা গোলাপ নিয়ে হাসিমুখে এগিয়ে আসছে নীল রঙের শার্ট –একটা ফেইকমুখ-প্রবাল।

Comments

comments

x