আজ শুক্রবার | ১৫ ডিসেম্বর২০১৭ | ১ পৌষ১৪২৪
মেনু

হিয়ার মাঝে

শোভা দেববর্মা | ২৯ নভে ২০১৭ | ১০:৪৯ অপরাহ্ণ

অবশেষে অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে , ব্যাংক থেকে লোন টোন নিয়ে কোলকাতায় একটা ফ্ল্যাট কিনে ফেলতে পেরেছে সুহাসিনী, ঝামেলাও যে একেবারেই হয়নি তাও না- তবু আজ সুহাসিনী ভীষন খুশী, রেজিস্ট্রেশানটাও যে হয়ে গেছে। মুশকিল হলো এই ফ্ল্যাটটাতে জলেরও একটু অসুবিধা আছে, এমনিতে গার্ডেনরীচের জল কিন্তু সাপ্লাই বড্ড  কম তার উপর আবার লিফ্ট ও নেই।অনেক কষ্টে ভারী ব্যাগ দুটোকে সিঁড়ি দিয়ে টানতে টানতে দোতলায় উঠে আসে সুহাসিনী- তার ফ্ল্যাট দোতলাতেই।দরজায় আটকানো নেমপ্লেটে লেখা তার নাম তারপর ছেলে মেয়ের নাম – আঃ-একটা শান্তির , সুখের শ্বাস টানে সে- চাবি খুলে ঘরে ঢুকে। এবারে প্রায় ছয় সাত মাস বাদে এসেছে সে, ভুঁরু কুঁচকে তাকায় সুহাসিনী, প্রচুর ধুলো জমেছে, ঝুল ও হয়েছে অনেক।ঝাড়ু নিয়ে, ন্যাতা নিয়ে ব্যাস্ত হয়ে পড়ে সুহাসিনী।ঘর দোর পরিষ্কার করে স্নান টান সেরে ফ্রি হতে হতে প্রায় বিকেল চারটা। একটু চা খেতে হবে। একরাশ ক্লান্তি ছেঁকে ধরে তাকে, বুঝতে পারে বার্ধক্য আসছে, আর প্রায় একবছর বাদেই তার রিটায়ারমেন্ট।চা বানাতে বানাতে ওর হঠাৎই কুন্তলের কথা মনে পড়ে, একটা ভারী শ্বাস বুক ঠেলে বেরিয়ে আসে তার , কেন যে চলে গেল হঠাৎ এমনি করে সবকিছুকে পিছনে ফেলে, চোখের পাতা ভিজে আসে সুহাসিনীর। ক্লান্ত চোখ আটকে যায় পাশের এপার্টমেন্টের দোতলার জানালায়, জয়ার শ্বশুরমশাই- ঠিক একই ভাবে জানালার ধারে বসে কিছু পড়ছেন আর পাশে রাখা এফ এম রেডিও-হয়তো গান ও শুনছেন, কি গান? কান পেতে শোনার চেষ্টা  করে সুহাসিনী কিন্তু বুঝতে পারে না, কেমন বয়স হবে ভদ্রলোকের ? কি রকম দেখতে? সবটা মাথা জুড়েই তো শুধু টাক, চুল যাও একটু আছে তাও সাদা। “ বাবা তোমার চা এখানে দেব না টেবিলে যাবে?” ভাবনাটা ছিঁড়ে যায় সুহাসিনীর- চায়ের কাপ হাতে নিয়ে টেবিলে এসে বসে। সুহাসিনী বরাবরই ভীষন মিশুকে, এরই মধ্যে মোটামুটি আশেপাশের প্রায় সবার সঙ্গেই আলাপ পরিচয় করে নিয়েছে সে এই অল্প কদিনেই।কি ভাল এই জয়া মেয়েটা ভাবে সুহাসিনী, যেমন সুন্দর দেখতে তেমনি ব্যাবহার, ওকে পিসী বলে ডাকে জয়া। হঠাৎই মনে হয় সুহাসিনীর কেমন হবে ওর নিজের ছেলের বউ? জয়ার মতো হবে কি? নিজের মনে মনেই হেসে ফেলে সে । নাঃ- বেরুতে হবে, টুকটাক কিছু জিনিষপত্র  কিনতেও হবে, আলস্য ঝেড়ে উঠে পরে সুহাসিনী।

সব সেরে বিছানায় উঠতে উঠতে প্রায় রাত দশটা আর বিছানায় পড়তে না পড়তেই ঘুম এবং এক ঘুমেই রাত কাবার।জানালার কাঁচ দিয়ে আলো এসে চোখে পড়তেই ঘুম ভাঙ্গে তার।কেন কে জানে ঘুম ভাঙ্গতেই ওর মনে পড়ে যায় পাশের ফ্ল্যাটের ভদ্রলোকের কথা । তাড়াতাড়ি এসে রান্নাঘরের জানালা টা খুলে দেয়- ঐ জানালা দিয়েই ভদ্রলোক কে দেখা যায়- জয়ার শ্বশুরমশাই। হুঁ- সেই এক ই ভঙ্গিতে বসে আছেন ভদ্রলোক, হাতে পত্রিকা আর পাশে এফ এম রেডিও। ফিক্ করে হেসে ফেলে সুহাসিনী। চায়ের কাপ হাতে নিয়ে চেয়ারে এসে বসে, ধীরে ধীরে চায়ের কাপে চুমুক দেয় সে। ভাবনাগুলো সব উড়তে উড়তে ফ্ল্যাট বাড়ী ছেড়ে কলেজের দিনগুলোতে  ডানা মেলে। “ কাগজ নেবে গো বৌদিমনি ?” এক ঝাটকায় বর্তমানে ফেরে সে। “ দিয়ে যাও” – “ এবারে কদিন থাকবে গো বৌদিমনি ?””দশদিন” মিথ্যেই বলে সুহাসিনী, এখানে কাওকেই বিশ্বাস নেই – বাব্বা ।পয়সা দিয়ে কাগজ হাতে নেয় আর খবরে ডুব দেয়, আগের ভাবনাগুলো বেমালুম হারিয়ে যায়।

নিজের মনে মনেই গুম গুম করতে করতে  ব্যাগ গুছায় সুহাসিনী, আগরতলায় ফিরেই আবার অফিসের কাজের ঝামেলায় পড়তে হবে। প্রতিবারই ফ্ল্যাট টা ছেড়ে যেতে ওর খুব কষ্ট  হয়। বারোটা পঁয়তাল্লিশের ফ্লাইট, দেরী হয়ে যাচ্ছে , রান্নাঘরের জানালা বন্ধ করতে গিয়ে একবার তাকায় বাইরে- জয়ার শ্বশুরমশাই- , মুচকি হেসে বেরিয়ে পড়ে সুহাসিনী।

যা ভেবেছে ঠিক তাই, আগরতলায় এসেই ভীষন ভীষন ব্যাস্ত হয়ে পড়ে সুহাসিনী- তার উপর যেন শরীরটাও ঠিক সঙ্গ  দিচ্ছে না। কতবার ভেবেছে ছুটিছাটা নিয়ে একবার কোলকাতা আসবে, চিকিৎসাটাও করাবে কিন্তু ছুটি পাবার ঝামেলা- ধুত্তোর- ।অবশেষে রিটায়ারমেন্টের পরই অফিসের সব কাগজ পত্র জমা টমা দিয়ে  প্রায় এক বছর বাদে আবার  ্কোলকাতায় নিজের ফ্ল্যাটে এসে উঠে সুহাসিনী।পাশের এপার্টমেন্টের ছাদে ম্যারাপ বাঁধা – হয়তো কোন অনুষ্ঠান আছে – ভাবে সে- । ব্যাগ রেখে ঘর পরিষ্কার করার জন্য কোমড় বাঁধে। ঠিক তখন ই কলিং বেল বাজে টুং করে, অবাক হয় সুহাসিনী ! এই তো সবে ঘরে এসে  ঢুকল, এখন আবার কে এল? বিরক্ত মুখে দরজা খুলেই দেখে বাইরে দাঁড়িয়ে জয়া- সঙ্গের ছেলে টা কে? ওর স্বামী ? খুশী হয় সুহাসিনী-“ এসো এসো- ভিতরে এসো” , “ নাগো পিসী, দেখলাম এইমাত্র এলেন, আপনি স্নান টান সেরে আমাদের এপার্টমেন্টের ছাদে চলে আসুন, বাবা তো আর নেই- আমরা তাঁর স্মরনসভার আয়োজন করেছি আজকে “ ।ধ্বক করে  উঠে সুহাসিনীর বুক, – “ তাই নাকি ! নেই !” আস্তে মাথা নেড়ে বলে –“ আচ্ছা ‘, দরজা বন্ধ করে দৌড়ে গিয়ে রান্নাঘরের জানালা খুলে দেয় সে, দোতালার শূন্য জানালা সত্যটা জানান দেয় । কি জানি কেন বুক ঠেলে একটা কান্না বেরিয়ে আসে, কখনও না দেখা , পরিচয় না হওয়া প্রতিবেশীর জন্য, হুঁ হুঁ করে কাঁদে সুহাসিনী- আবার – অনেকদিন পর।

খুব তাড়াহুড়ো করে ঘন্টা দুয়েক এর মধ্যেই রেডী হয়ে পাশের এপার্টমেন্টের ছাদে গিয়ে পৌঁছয় সুহাসিনী। সুন্দর ম্যারাপ বাঁধা, সাজানো গোছানো সবকিছু, বাঃ। এই প্রথম সামনে থেকে দেখল সুহাসিনী ভদ্রলোকের ছবি, ফুল মালায় ঢাকা, ভালো করে বোঝাও যাচ্ছে না। লোকজনও মোটামুটি কম. হয়নি, ছাদটা প্রায় ভরে গেছে। একটু বাদেই উঠে দাঁড়ায় বিনায়ক, জয়ার স্বামী, ছেলেটাও ভারি সুন্দর দেখতে, সুহাসিনী এখন চিনে গেছে তাকে। দাঁড়িয়ে উঠে পকেট থেকে একটা কাগজ বের করে বিনায়ক, একটু ঢোঁক গিলে কাগজের দিকে তাকায়- বলে “ আমার বাবা নিয়মিত ডাইরি লিখতেন, মারা যাবার আগেরদিন রাত্তিরেও বাবা ডাইরি লিখেছেন, বাবার ডাইরির শেষ পাতার শেষ কয়েকটা লাইন আমি আপনাদের পড়ে শুনাতে চাইছি”- ছাদ নিস্তব্ধ , কেউ একজন বলে “ পড় বাবা, আমরা শুনছি”-, বিনায়ক পড়ে- “ আমি বুঝতে পারছি, প্রতি মুহুর্তে আমি অনুভব করতে পারছি – হাসি- তুমি আমার কাছেই আছো, তুমি যেখানেই থাকো আমি জানি আমার শেষ দিনে তুমি আমার কাছেই থাকবে- আমার জন্য সেই গানখানি গেয়ো হাসি” ।সুহাসিনীর পাশে কেউ ফিস্ ফিস্ করে বলে “ মনিময় খুব ভালবাসত তার স্ত্রীকে “। থরথর করে কাঁপছে সুহাসিনী, হুঁ হুঁ করে কাঁদছে মন, ছুটছে পিছন পানে। “মনিময় ! মনিময় ! তুমি মনিময় ছিলে ! অথচ আমি তোমাকে চিনতে পারিনি মনিময়”। মনিময়ের ছবির দিকে তাকায় সুহাসিনী- এবারে সে চিনতে পারছে- ষাটোর্ধ মনিময়কে, মনে হলো হঠাৎ মনিময় বলছে” তুমি আমাকে আজও চিনতে পারোনি হাসি- কখনও বুঝতেই পারোনি আমাকে” – সেই আভিমান ভরা দুই চোখ, যেন তাকিয়ে আছে সুহাসিনীর দিকে।সত্যিই তাই, কখনো সে বুঝতেও চায়নি মনিময়ের ভালবাসাকে, সেই সময়ের সুহাসিনী।সুন্দরী, মেধাবী, বড়লোক বাপের একমাত্র  কন্যা, আর মনিময় ? গ্রামের ছেলে, গরীব বাবার ছেলে কিন্তু ভীষন মেধাবি। তাতে কি হয়েছে ? সুহাসিনীর পেছনে তখন এমন অনেক মেধাবী, সুপুত্তরের লাইন, তাকে পাত্তা দেবে কেন সুহাসিনী ? ঠিক এইজন্যই  মনিময়ের নীরব ভালবাসাকে কখনও বুঝতেই পারেনি সুহাসিনী। একেবারেই কি বুঝতে পারে নি ? আজ নিজের মনকেই শুধায় সে – তাহলে কি – উপেক্ষা ? তিন বছর কলেজের পড়া শেষ করার পর সেই দিন টা- যে দিন টা ছিল ওদের ফেয়ারওয়েলের দিন- হাসি, হুল্লোর , মজা, তামাশা আবার কলেজ ছেড়ে যাওয়ার ও কষ্ট- সব কিছু মিলিয়ে বেশ চলছিল, এরই মাঝে কেউ চেঁচিয়ে বলে উঠে “ এই মনিময়, একটা গান শোনা “। সত্যিই – ভীষন ভাল গায় ছেলেটা। অদ্ভুত তো ! একবার বলতেই মনিময় উঠে দাঁড়ায়। একটু হাসে ,  বলে “ শোন্ – আমি এখন যে গান টা গাইব সেটা আমার একান্ত আপন তার জন্য “ সমস্বরে চীৎকার – “কে কে – কে সে “? ম্লান হাসে মনিময়- “ সে জানে “। “ আমি জানি আমার জীবনের শেষ দিনে সে আমার কাছেই থাকবে “ – “ওহো – কবে বিয়ে করছিস ?” আবার সমস্বরে চীৎকার -, ক্লান্ত হেসে মনিময় বলে “ সে যেন আমার শেষ দিনে এই গানখানিই গায়- তাহলেই সে আমার হবে চিরদিনের মতো”।একটু ভারী হয়ে ওঠে পরিবেশ- ভারী হয় সুহাসিনীর চোখের পাতা- মনিময়  গায় “ আমার হিয়ার মাঝে লুকিয়ে ছিলে দেখতে আমি পাই নি  তোমায় —“।

গল্প টা এখানেই শেষ- উঠে দাঁড়ায় সুহাসিনী- আর গায় “ ———

লেখক- শোভা দেব বর্মা, আগরতলা, ত্রিপুরা, ভারত।

Comments

comments

x