আজ সোমবার | ২০ নভেম্বর২০১৭ | ৬ অগ্রহায়ণ১৪২৪
মেনু

কাটা হাত

দীপু মাহমুদ | ০৮ অক্টো ২০১৭ | ৫:১৩ পূর্বাহ্ণ

Dipu Mahmud

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি। থাকি মাদার বখশ হলের ১০২ নম্বর রুমে। সারাদিন ক্লাস আর থিয়েটার নিয়ে মেতে থাকি। হলের ডাইনিংয়ে কোনোদিন খাওয়া হয় না। যখন হলে ফিরি তখন ডাইনিংয়ে খাবার থাকে না। তাতে খারাপ লাগে না বরং ভালো লাগে। ডালহীন পাতলা ডাল আর মাইক্রোসকোপের সাহায্যে খুঁজে পাওয়া মাংসের টুকরা দিয়ে কাঁকর মেশানো ভাত খেতে হয় না। আমরা পাশের রেলওয়ে স্টেশনের হোটেলগুলোতে গিয়ে খেয়ে আসি। মাঝেমধ্যে শহরে গিয়ে বিসমিল্লাহ হোটেলে খাই। দম ফেলার ফুসরত মেলে না।

আমার অনার্স ফাইনাল পরীক্ষা শুরু হলো। ঘরে শেকল দিয়ে আটকে দেওয়ার মতো করে বন্দী করা হলো আমাকে। পরীক্ষায় খারাপ করলে রুম ছেড়ে দিতে হবে, বন্ধুদের কড়া নির্দেশ। জো হুকুম। ক্লাস বন্ধ। নাটকের রিহার্সাল থেকেও ছুটি। স্টেশনে যাই খেতে আর রুমে বসে পড়াশুনা করি।

পরের দিন প্রথম পরীক্ষা। সারাদিন ঘর থেকে বের হয়নি। একবার টুক করে ডাইনিংয়ে গিয়ে দুপুরের খাবার খেয়ে এসেছি। সকাল থেকে অস্থির লাগছে। পড়াগুলো কিছুতেই মাথার ভেতর ঠিকঠাকমতো বসছে না। দুপুরে পড়তে পড়তে কখন জানি ঘুমিয়ে গেছি। শেষ বিকেলের দিকেই হবে মনে হয়।

জানালার দিকে মুখ করে কাত হয়ে শুয়েছিলাম। আমার জানালার ঠিক সামনে একটা ঝাঁকড়া আমগাছ আছে। ওই আমগাছটা হচ্ছে আমার বন্ধু। ওর সঙ্গে খুব ভাব আমার। আমি বিছানায় শুয়ে জানালা দিয়ে তাকিয়ে ওর সঙ্গে গল্প করি। অনেক কথা বলি, ‘কী আ¤্রবৃক্ষবাবু আজ যে খুব খুশি খুশি মনে হচ্ছে।’ আমগাছ হাসে। ডালসহ পাতা নাড়িয়ে বলে, ‘মুকুল এসেছে গাছে খেয়াল করেছ। খুশি তো আমি হবই।’

বিকেল বেলা সবাই রুম থেকে বেরিয়েছে। ঘরে আমি একা। পড়তে পড়তে কখন ঘুমিয়ে পড়েছি, কখন সন্ধ্যে হয়ে গেছে টের পাইনি। আমার মনে হলো কেউ আমাকে ডাকছে। আমাকে স্পর্শ করে আলতো করে ধাক্কা দিয়ে ঘুম থেকে জাগানোর চেষ্টা করছে। আমি চোখ মেলে তাকালাম। সন্ধ্যার আলো মিলিয়েছে। ঘর অন্ধকার। আমি ছাড়া ঘরে অন্য কেউ নেই বলে সন্ধ্যায় ঘরে আলো জ্বলেনি।

আমি আমার পিঠে কারও হাতের স্পর্শ অনুভব করলাম। হিম ঠান্ডা। ঝট করে ঘুরলাম। আমার শরীরের সঙ্গে একটা হাত। শুধু হাত। রোমশ কালো হাত। ওখানে কোনো মানুষ নেই। আমি চোখ বন্ধ করে ফেললাম।

কতক্ষণ পরে খেয়াল নেই। কেউ একজন ঘরে ঢুকে আলো জ্বালাল। তখন আমি চোখ মেললাম। তার আগ পর্যন্ত আমি নিঃসাড় বিছানায় পড়েছিলাম চুপচাপ। ঘরে আলো জ্বালানোর পর তাকিয়ে দেখি সবকিছু স্বাভাবিক।

বন্ধুদের ঘটনা বললাম। ওরা বলল পরীক্ষার অতিরিক্ত টেনশনে নার্ভের ওপর চাপ পড়েছে তাই উলটাপালটা দেখেছি। তাছাড়া সবাই জানে, এই হল তৈরির সময় এখানে দুটো কবর পাওয়া গিয়েছিল। হিসেব করে অনুমান করা যায়, আমাদের রুম ঠিক সেই কবরের ওপর। সেই জানাটা মনের ভেতর কাজ করেছে। আমারও তাই মনে হলো। অতি উৎসাহি বন্ধুদের কেউ কেউ ঘরে মশারি স্ট্যান্ডের সঙ্গে রসুন ঝুলিয়ে দিল। কেউ ওজু করে এসে দোয়া-দরুদ পড়ে ঘরে মিলাদ পড়তে শুরু করল।

দিন গড়িয়ে যায়। আবার ক্লাস আর থিয়েটার নিয়ে মেতে উঠি। ঘটনাটা আমি এবং আমরা ভুলে গেলাম।

২.

আমাদের রুমে যুবরাজ নামে এক ছেলে থাকত। ইংরেজিতে অনার্স পড়ত যুবরাজ। আমার জুনিয়র। মনে ভয়-ডর কিছু আছে বলে মনে হয়নি কোনোদিন। ওর ছেলেবেলার অদ্ভুত সব কাহিনি শুনেছি ওর কাছে। আমি যুবরাজদের বাড়িতে গিয়েছিলাম একবার। ওর মা বললেন, ‘ছেলেবেলা থেকেই বড় ডানপিটে। ঘুমাতে বললে ঘুমাত না। জুজু কিংবা ভূতের ভয় দেখালে চোখ ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে থাকত ভূত দেখার জন্যে। বিরক্ত করে মারত, মা ভূত কখন আসবে। কই মা ভূত আসে না তো!’

সেই ছেলে, মানে যুবরাজ একদিন ভয় পেল। আমরা সবাই নাটকের রিহার্সালে চলে গেছি বিকেল বেলা। যুবরাজ একা ছিল রুমে। ওর পরীক্ষা চলছিল। আমার বিছানা জানালার পাশে বলে যুবরাজ আমার বিছানায় বসে পড়ছিল। পড়তে পড়তে সন্ধ্যের আগে কখন ঘুমিয়ে গেছে টের পায়নি।

যুবরাজের ঘুম ভাঙল ঠান্ডা হতের স্পর্শে। কেউ একজন ওকে ঘুম থেকে ডাকছিল। ঘুম ভেঙ্গে তাকিয়ে দেখে একটা কালো রোমশ হাত। শুধু হাত। মানুষ নেই।

যুবরাজের কাছে সব শুনেটুনে আমরা বুঝতে পারলাম আমার দেখা সেই রোমশ ঠান্ডা হতের ঘটনা ওর মস্তিষ্ক বেশ ভালোভাবে সংরক্ষণ করে রেখেছে। আজ সন্ধ্যের আগে ঘুমিয়ে পড়ে যুবরাজ সেই অবস্থাটা অনুভব করেছে। এটা ওর ব্রেইনের তৈরি একটা ঘটনা। যুবরাজ সেই ব্যাখ্যা মেনে নিল। রুমে আমরা তবুও অনেক মজা করে শুকনা মরিচ পোড়ালাম। রসুন ঝুলিয়ে দিলাম সবগুলো খাটে। লোহালক্কড় এনে রুমে রাখলাম।

৩.

বেশ কিছুদিন পরের কথা। ইতোমধ্যে আমাদের রুমে ঘটা সেই অস্বাভাবিক ঘটনা থেকে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘটে গেছে। সবাই সেইসব জটিল বিষয় নিয়ে ভীষণ উত্তেজিত।

এরমধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ে অনার্স ভর্তি পরীক্ষা শুরু হয়েছে। পাবনা থেকে একজন ছেলে এসেছে ভর্তি পরীক্ষা দিতে। ছেলেটি এসে উঠেছে আমাদের রুমে। আমাদের বন্ধু লিটনের বাড়ি পাবনা। ভর্তি পরীক্ষার্থী সেই ছেলে লিটনের পরিচিত। রুমে সেই ছেলে এসে উঠল ঠিকই, সমস্যা দেখা দিল ঘুমাবে কোথায়। এমনিতেই আমরা ডাবলিং করি। লিটনের বেডে জুনিয়র দুই ছেলে থাকে। লিটন থাকে আমার সঙ্গে। কামাল ওর বেড অন্য দুইজনকে ছেড়ে দিয়ে রুম ছেড়ে গেস্ট রুমে থাকা শুরু করেছে অনেক দিন হলো। অগত্যা আমার বিছানা ছেলেটিকে ছেড়ে দিলাম। সন্তুষ্ট হলো সে। আনন্দ নিয়ে পড়ায় মন দিল।

রাতের খাবার খেয়ে সাড়ে দশটা নাগাদ রুমে ফিরলাম। ছেলেটি বিছানার ওপর বসে তখনো পড়ছে। রাতের খাবার খেয়েছে বলে জানাল। ওর প্রতি আমাদের বিশেষ আতিথেয়তায় ওকে সুখী মনে হচ্ছিল।

রাত সাড়ে এগারোটার দিকে আমরা দল বেঁধে বের হলাম। ছেলেটি তখন শুয়ে পড়েছে। আমরা ঘরের বাতি নিভিয়ে দিয়ে বেরুলাম। প্রায় প্রতি রাতে আমরা হলের পাশে বিশ্ববিদ্যালয় রেল স্টেশনে গিয়ে বসি। চা খাই। পূর্ণিমার ভরা জোছনায় আমরা গান গাই, হল্লা করি। ক্ষয়ে যাওয়া চাঁদের ওপর দিয়ে সাদা মেঘ ভেসে যাওয়া দেখতে দেখতে আমরা জীবনানন্দ হই।

রাত সাড়ে বারোটামতো বাজে। আমরা রুমে ফিরলাম। হলে প্রায় সব রুমে আলো জ্বলছে। কয়েকটা রুমের বাতি নেভানো। আমাদের রুম যথারীতি অন্ধকার।

ঘরে ঢুকে বাতি জ্বাললাম। আমরা সবাই অবাক হয়ে ছেলেটির দিকে তাকালাম। ছেলেটি বিছানায় উঠে বসে আছে। ঘামে গায়ের শার্ট ভিজে জবজবা। এমন কিছু গরম পড়েনি। ঘরে যথেষ্ট বাতাস। এমনভাবে ঘেমে ওঠার কথা নয়। ছেলেটি স্থিরভাবে দরজার দিকে তাকিয়ে আছে। ওর চোখের দিকে তাকিয়ে আমরা ঘাবড়ে গেলাম। অস্বাভাবিক দৃষ্টি। বিস্ফারিত দুই চোখে আতঙ্ক। কোনো কারণে ছেলেটি ভয় পেয়েছে। অল্পসল্প মামুলি ভয় সে পায়নি বোঝা যাচ্ছে। প্রচন্ড ভয়ে থরথর করে কাঁপছে।

ভীষণ রাগ হলো। নিশ্চয় কেউ রুমে ঢুকে ওকে মিছামিছি ভয় দেখানোর জন্য পিস্তল টিস্তল বা এইরকম কিছু দেখিয়েছে। এ রকম মাঝেমধ্যেই হয়। নতুন ছেলেদের সঙ্গে মজা করার জন্য কেউ কেউ এমন করে।

বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে এসে ফার্ষ্ট ইয়ারেই ছেলেগুলো বাতামভাজার মতো পকেটে গুলি আর ইন্ডিয়ান লেদ মেশিনে বানানো পিস্তল নিয়ে ঘোরে। প্রতিপক্ষের ওপর হামলা চালায়। নিজের শক্তিমত্তা আর ক্ষমতা জাহির করে। আড্ডায় বসে অন্যদের সামনে নিজেকে বেশ গুরুত্বপূর্ণ করে তুলতে কোনো একটা প্রসঙ্গ টেনে এনে প্রথমে গুলি, তারপরে পিস্তল দেখায়।

খুব বেশি মেজাজ খারাপ হয়ে গেল। ঠিক করলাম, আজ ওই ব্যাটাকে ধরব, যে ওকে ভয় দেখিয়েছে। তারপর তার কাছ থেকে পিস্তল নিয়ে তারই গলার ভেতর সেটা ঢুকিয়ে দেব। ভয় কাকে বলে টের পাইয়ে ছাড়ব। পয়েন্ট থ্রি-নট-থ্রির গুলির চোখা মাথা দিয়ে তার আলজিহ্বা আজ আমি নেড়ে দেব।

ছেলেটি বিছানায় বসে তখনো ভয়ানকভাবে কাঁপছে। চেহারায় কেমন উদ্ভ্রান্ত বিবর্ণ ভাব। টেবিলের ওপরে পানির জগ। আমি গ্লাসে পানি ঢাললাম। গ্লাসভর্তি পানি এগিয়ে দিলাম ছেলেটির দিকে। আমার দিকে অনিশ্চিতের মতো তাকাল। হাত বাড়িয়ে পানির গ্লাস নিয়ে ঢকঢক করে খেয়ে ফেলল।

আমরা ওকে জিজ্ঞেস করলাম কী হয়েছে। ও কোনো উত্তর দিল না। আমরা ওর গায়ে হাত দিয়ে ওকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করলাম যে আমরা এখন সবাই আছি ওর ভয়ের কিছু নেই।

ছেলেটি জানাল সে এই ঘরে থাকবে না। চলে যাবে। আজ রাতেই যাবে।

আমরা ওকে অভয় দিলাম ওর কোনো ক্ষতি হবে না। শুধু কে ওকে কী বলেছে আমাদের বলুক। যা ঘটেছে হুবহু জানাক। আমরা নিশ্চিত ছিলাম ঘরে ঢোকার ভঙ্গি, শব্দের ব্যবহার, কথা বলার ধরন, আর্মস বা ছোরার বর্ণনা পেলে আমরা অবশ্যই ধরে ফেলতে পারব কে ওকে ভয় দেখিয়েছে।

ছেলেটি বলল, ‘ভয় করছে।’

আমরা বললাম, ‘ভয়ের কিছু নেই, বলো। এখানে সবাই আমাদের পরিচিত। রুমে কে এসেছিল বলো। তার চেহারা তো মনে আছে তোমার। কেমন দেখতে বলো। কী দিয়ে তোমাকে ভয় দেখিয়েছে?’

ছেলেটি বলল, ‘আমি ঘুমাচ্ছিলাম। মনে হলো কেউ একজন আমাকে ডাকছে। আমি ভাবলাম আপনারা ফিরেছেন। ঘরের বাতি নেভানো ছিল। বাইরের ল্যাম্পপোস্টের আলোতে ঘরের ভেতর সবকিছু আবছা দেখা যাচ্ছিল। আমি জানালার দিকে মুখ করে শুয়েছিলাম।’ এইটুকু বলে ছেলেটি আবার থরথর করে কেঁপে উঠল। ওর চোখেমুখে কেমন একটা অস্বাভাবিকতা ভর করল।

কাঁপুনি থামলে ছেলেটি বলল, ‘মনে হলো কেউ আমাকে ডাকছে। আমার গায়ে হাত দিয়ে ধাক্কাচ্ছিল। আমি ঘুরে তাকালাম।’

ছেলেটি বিছানার চাদর খামচে ধরল, ‘দেখলাম, একটা হাত কবজি পর্যন্ত। হাত ভর্তি কালো বড় বড় লোম।। বরফের মতো ঠান্ডা। শুধু হাত। মানুষ নেই।’

এই ঘটনার কোনো ব্যাখ্যা আমরা দাঁড় করাতে পারিনি। আমাদের রুমের ঘটনা সেই ছেলের জানার কথা নয়। তবুও সেই কালো রোমশ কাটা হাতের সঙ্গে আমরা থেকেছি কত বছর। তারপর অবশ্য সেই হাত আর কোনোদিন আমাদের কাউকে ঘুম থেকে ডেকে তোলেনি। পরীক্ষার আগের সন্ধ্যায় বেহুশ হয়ে ঘুমালেও সে আসেনি। কেন আসেনি তাও জানি না।

Comments

comments

x