আজ মঙ্গলবার | ২৪ অক্টোবর২০১৭ | ৯ কার্তিক১৪২৪
মেনু

গাল্লু মিয়া

দীপু মাহমুদ | ২৩ সেপ্টে ২০১৭ | ২:৫৩ অপরাহ্ণ

Dipu Mahmud

বিকেলবেলার সূর্যের আলো এসে পড়েছে নদীর পানিতে। নদীতে ভীষণ স্রোত। বর্ষাকালে নদীতে স্রোত হয়। গাল্লু মিয়া নদীর স্রোতের দিকে তাকিয়ে বসে আছে। তার ইচ্ছে করছে সাঁতরে নদীর ওপারে চলে যেতে। তারপর চলে যাবে অনেক দূরে। গাল্লু মিয়া যেতে পারছে না। কারণ সে সাঁতার জানে না। তার বয়স ১০ বছর। সে মহিষখোঁচা ইশকুলে চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ে। ইশকুলের খাতায় তার একটা ভালো নাম আছে। সেই নামে কেউ ডাকে না। সবাই তাকে গাল্লু মিয়া বলে ডাকে। কেন সবাই তাকে গাল্লু মিয়া বলে ডাকে সেই কথা সে জানে না।

গাল্লু মিয়ার মন খারাপ। তার কান্না পাচ্ছে। কিন্তু সে ঠিক করেছে কাঁদবে না। মা তাকে বকেছেন। ওদের পাশের বাড়িতে জয়ীরা থাকে। জয়ীর বাবা বাজার থেকে মুরগি কিনে এনে উঠোনে বেঁধে রেখেছিলেন। গাল্লু মিয়া গিয়ে তার বাঁধন খুলে দিয়েছে। সেই মুরগি খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।

পাড়ার সবাই বলে গাল্লু মিয়া ভীষণ চঞ্চল। সে এক মুহূর্ত স্থির থাকে না। সব সময় লাফিয়ে চলে। আর লাফিয়ে চলতে গিয়ে নানান অঘটন ঘটে। তখন সকলে তাকে বকা দেয়। গাল্লু মিয়ার একদম ছোট থাকতে ইচ্ছে করে না। এক লাফে বড় হয়ে যেতে মন চায়। বড় হয়ে গেলে কেউ আর তাকে বকবে না। তখন যা ইচ্ছে তাই করতে পারবে।

নদীর স্রোতের দিকে তাকিয়ে গাল্লু মিয়ার রাগ হলো। মনে মনে ভাবল নদীতে পানি না থাকলে ভালো হতো। তাহলে হেঁটে নদী পার হয়ে যাওয়া যেত। তখন নদীর পানিতে ভুঁস করে এক ডলফিন ভেসে উঠল। গাল্লু মিয়া বইতে ডলফিনের ছবি দেখেছে। তারা হয় ছাই রঙের। এর গায়ের রঙ শ্যাওলা সবুজ।

চোখের সামনে ডলফিন দেখে গাল্লু মিয়া অবাক হয়েছে। এই নদীতে ডলফিন থাকার কথা না। থাকলে সে আরও আগেই দেখতে পেত।

স্রোত কেটে ডলফিন সামনে চলে এলো। গাল্লু মিয়াকে চমকে দিয়ে বলল, ‘কী হয়েছে তোমার?’

অবাক হয়ে গাল্লু মিয়া বলল, ‘কে তুমি?’

‘আমার নাম জলনৃ।’

‘কোথায় থাকো?’

‘পানির নিচে। সমুদ্রে আর নদীতে।’

‘তুমি আমাদের ভাষায় কথা বলছ কেমন করে?’

‘আমরা অনেক কিছু পারি। তুমি মন খারাপ করেছ। পানির নিচ থেকে সেই শব্দ শুনে বুঝতে পেরেছি।’

‘তোমরা কেমন করে বোঝ?’

‘আমাদের অনেক বুদ্ধি। পৃথিবীতে মানুষ এসেছে মাত্র ৫কোটি বছর আগে। আর পানির নিচে মাছের জন্ম হয়েছে ৫০কোটি বছর আগে। ৪০কোটি বছর আগে ডাঙ্গায় উঠে এসেছি। তখন থেকে আমরা পানিতেও থাকতে পারি আবার ডাঙাতেও থাকতে পারি। আমরা উভচর। তোমরা আমাদের থেকে কোটি-কোটি বছর পিছিয়ে আছ। তোমরা এখন আমাদের কাছে অতীত। এই যে তুমি আমাকে দেখছ, আমি এখানে এসেছি আগামী থেকে।’

জলনৃ কী বলছে গাল্লু মিয়া পুরোপুরি বুঝতে পারল না। তবে মনে হলো ওদের বুদ্ধি অনেক বেশি। সে শুনেছে তিমি মাছ, ডলফিন এরা হচ্ছে প্রচন্ড বুদ্ধিমান প্রাণী। সে এও বুঝতে পারল যে জলনৃ হচ্ছে কয়েকবছর পরের প্রাণী।

গাল্লু মিয়া বলল, ‘আমাকে আগামীতে নিয়ে যাবে? মানে ধরো যদি আমি এখন বড় হয়ে যেতে চাই!’

জলনৃ বলল, ‘নিয়ে যেতে পারি। তবে সেখান থেকে কিন্তু ফিরতে চাইবে না।’

গাল্লু মিয়া বলল, ‘একবার বড় হতে পারলে আমি আর ছোট হব না।’

জলনৃ বলল, ‘বেশ চলো।’

ওদের সামনে পানির উপর নীল রঙের ছোট্ট নৌকা ভেসে উঠল। সেই নৌকা দেখতে ঝিনুকের মতো। তার সামনের কপাট খুলে গেল। জলনৃ আর গাল্লু মিয়া নৌকার ভেতর ঢুকে পড়ল। গাল্লু মিয়ার একবারও মনে হলো না মা তাকে খুঁজবেন। বাবা খুঁজবেন। ন’চাচা খুঁজে বেড়াবে।

নৌকা চলতে শুরু করেছে। কোনো আওয়াজ হচ্ছে না। তবে সেটা জোরে ছুটছে বোঝা যাচ্ছে।

ঝিনুকের মতো দেখতে নৌকার ভেতর ঝকঝকে আয়না। সেখানে সবকিছু দেখা যাচ্ছে। গাল্লু মিয়ার ইশকুল দেখা যাচ্ছে। খেলার মাঠ। বন্ধুরা সেখানে খেলছে।

ধীরে ধীরে আয়না সরে গেল। গাল্লু মিয়া নিজেকে সেখানে দেখতে পেল। তার চারপাশে সবকিছু জীবন্ত আর বাস্তব হয়ে উঠেছে। সে নিজেকে ন’চাচার মতো বড় হয়ে যেতে দেখল। বড় হতে পেরে সে ভীষণ খুশি হয়েছে। দেখতে দেখতে গাল্লু মিয়া ওর বাবার বয়সী হয়ে গেল। তখন সে আর তার ছোটবেলার বন্ধুদের আশপাশে দেখল না।

নৌকা ছুটে চলছে। সবকিছু বদলে যাচ্ছে। বাবা-মায়ের সঙ্গে গাল্লু মিয়ার দেখা হলো। তাঁরা একদম বৃদ্ধ হয়ে গেছেন। চোখে ভালো দেখতে পান না। কানেও শোনেন না। গাল্লু মিয়ার গায়ে হাত বুলিয়ে বাবা-মা কী বললেন সে কিছুই বুঝতে পারল না। খুব কষ্ট হলো ওর। কান্না পেল। দুই চোখ বেয়ে দরদর করে পানি বেরিয়ে এলো। চোখের সেই পানিতে গাল্লু মিয়ার দুই গাল ভিজে গেল।

তার আরও বয়স বেড়ে গেল। সে বুড়ো হয়ে গেছে। জানতে পারল তার বাবা-মা মারা গেছেন। আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব অনেকেই বেঁচে নেই। সবাইকে হারিয়ে গাল্লু মিয়া একেবারে একা হয়ে পড়ল। মনের দুঃখ সে মনে চেপে রাখল। জলনৃকে কিছু বলল না। একসময় গাল্লু মিয়া একশ বছরের থুরথুরে বুড়ো হয়ে গেল। মাথার সব চুল পেকে সাদা হয়ে গেল। দাঁত পড়ে গেল। মুখের চামড়া কুঁচকে গেল।

গাল্লু মিয়ার মনে হলো, কত তাড়াতাড়ি বুড়ো হয়ে গেলাম। ছোটবেলার বন্ধুদের সঙ্গে ছুটে বেড়ানো হলো না। নদীতে সাঁতার কাটা হলো না। ন’চাচার সঙ্গে গাছে উঠে আম পাড়া হলো না।

মনের দুঃখে ঝরঝর করে কাঁদতে লাগল একশ বছরের বুড়ো গাল্লু মিয়া। ভাবল, মা আমাকে কত আদর করতেন। বাবা আদর করতেন। মাত্র কয়েকদিন আদর নিয়েই বুড়ো হয়ে গেলাম।

জলনৃ জিজ্ঞেস করল, ‘কেমন লাগছে তোমার?’

গাল্লু মিয়া বলল, ‘একদম ভালো না।’

জলনৃ বলল, ‘কেন ? তুমি তো বড় হতে চেয়েছিলে। কত তাড়াতাড়ি বড় হয়ে গেলে। তাও ভালো লাগছে না?’

গাল্লু মিয়া বলল, ‘বন্ধুদের সঙ্গে মাছ ধরতে যাওয়া হলো না আমার। মা আমাকে কত গল্পের বই পড়ে শোনাতেন, সেগুলো শোনা হলো না। বাবা আর মায়ের সঙ্গে কোথাও বেড়াতে গেলাম না। আমি একটাও গাছ লাগালাম না। বাগান করলাম না। হুট করে বুড়ো হয়ে গেলাম। কিছুই করা হলো না আমার।’

জলনৃ জানতে চাইল, ‘তাহলে কী চাও তুমি এখন?’

এক মুহূর্ত দেরি করল না গাল্লু মিয়া। বলল, ‘ইশকুলে ফিরে যেতে চাই। বন্ধুদের কাছে।’

জলনৃ বলল, ‘তুমি বলেছিলে আর ফিরতে চাইবে না।’

গাল্লু মিয়া বলল, ‘আমি আগের মতো ছোট হতে চাই। তারপর ধীরে ধীরে বড় হব। সবাই যেমন হয়।’

জলনৃ হেসে বলল, ‘ঠিক আছে। চলো ফেরা যাক।’

নীল রঙের নৌকা পানিতে ভেসে উঠল। গাল্লু মিয়া লাফিয়ে উঠল ডাঙায়। পানিতে নিজের ছায়া দেখল। সে তেমনই আছে আগে যেমন ছিল। যেন কোথাও যায়নি। এখানেই বসেছিল। তবে সন্ধ্যা হয়ে গেছে। সূর্য ডুবি ডুবি করছে।

জলনৃকে নিয়ে নীল নৌকা টুপ করে পানিতে ডুবে গেল। গাল্লু মিয়া দেখে নদীর পাড়ে ন’চাচা দাঁড়িয়ে আছে। তাকে দেখে বলল, ‘কোথায় গিয়েছিলি? সবাই তোকে খুঁজে হয়রান।’

ন’চাচাকে দেখে আনন্দে চোখে পানি চলে এলো গাল্লু মিয়ার। সে চাচাকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে ফেলল।

ন’চাচা অবাক হয়ে বলল, ‘কীরে কী হয়েছে। অমন করছিস কেন?’

গাল্লু মিয়া ন’চাচার গায়ে মুখ ঘষতে ঘষতে বলল, ‘আমি আর কোনোদিন দুষ্টুমি করব না।’

গাল্লু মিয়া এখন আর কাউকে যন্ত্রণা করে না। মন দিয়ে পড়াশুনা করে। পাড়ার সবাই তাকে খুব ভালোবাসে।

Comments

comments

x