আজ মঙ্গলবার | ২৪ অক্টোবর২০১৭ | ৯ কার্তিক১৪২৪
মেনু

নাম ধরে নয়, সুরে সুরে ডাকা হয় এই গ্রামে

মানচিত্র ডেস্ক | ২১ সেপ্টে ২০১৭ | ২:৩৩ অপরাহ্ণ

House ছবি- সংগৃহীত

ঘর থেকে মা সুর তোলেন, কুকু উ কুকুর রু…। পাহাড়ি পথের বাঁকে বন্ধুদের সঙ্গে তখন গল্পে মত্ত কুকু উ কুকুর রু। মায়ের ডাক কানে যেতেই বন্ধু ইউউ উ উই… আর আআই উউ কুকু..কে বিদায় জানিয়ে ঘরের পথ ধরে কুকু উ কুকুর রু। কথায় বলে নামে কী আসে-যায়। সেটাকেই কাজে করে দেখান বাংলাদেশের তামাবিল থেকে একেবারেই কাছে ভারতের মেঘালয় রাজ্যের চেরাপুঞ্জি থেকে ৫৬ কিলোমিটার দূরে থাকা পূর্ব খাসি পাহাড়ে কং থং গ্রামের বাসিন্দারা।

এ গ্রামের লোকজন একে অপরকে ডাকেন নাম ধরে নয়, সুরে-সুরে। সবার জন্য রয়েছে পৃথক নামের সুর! একজনের ডাকে মোটেই অন্য জন ভুল করে সাড়া দেন না। কংথং ট্যুরিজম কো-অপারেটিভ সোসাইটির চেয়ারম্যান রোথেল খংসিট জানান, বহু যুগ ধরে, এই গ্রামের গর্ভবতী মায়েরা পাহাড়-জঙ্গলে কান পেতে পাখির ডাক, ঝরনার শব্দ থেকে সুর বোনেন। সন্তান জন্মের পরে, সেই সুর তার কানের কাছে গুনগুন করা হয়। সুর থেকে জন্ম নেয় গান। যার নাম জিংগারওয়াই লেওবেই।

আর ওই গানের প্রথম অক্ষর আর তার সুরটাই হয়ে যায় সন্তানের নাম। শিশুও জন্মের পরে তার নামের জিংগারওয়াই লেওবেই টাই আগে আওড়াতে শেখে। ছবির মতো কংথং গ্রামে এখন বাসিন্দার সংখ্যা প্রায় ৭০০। পাহাড়ি নদীর উপরে রাবার গাছের শেকড়ে তৈরি জীবন্ত সেতু পার করে চলে যাতায়াত। দূর থেকে নামের সুর শুনেই সবাই বুঝে যান কে কাকে ডাকছে!

গ্রামের প্রবীণরা জানান, আগেকার দিনে শিকারের সময় এইভাবে নাম ডাকার শুরু। সেই প্রথাই চলছে। শুধু নাম-গান নয় তার সঙ্গে এক লোকগাথা ও স্বয়ম্বর ধাঁচের প্রথাও জড়িয়ে। প্রতি বছর গ্রীষ্মকালের নির্দিষ্ট পূর্ণিমায় গ্রামের অবিবাহিত নারী-পুরুষ আগুন জ্বেলে গানের আসর বসায়। যে ছেলে সবচেয়ে ভালো গান গায়, সে গ্রামের সবচেয়ে সুন্দরী কুমারীকে বিয়ে করার অধিকার পায়।

অবশ্য সভ্যতার দাবি মেনে, আজকাল গ্রামবাসীদের খাতা-কলমে খাসি নামও রাখা হচ্ছে। কিন্তু সেই নাম শুধুই স্কুল বা অফিসের কাজে লাগে। কোনো ব্যক্তি মারা গেলে, তার নামের সুর আর গানও তার সঙ্গেই শেষ হয়ে যায়। ওই সুর অন্য কেউ চালিয়ে যেতে পারবেন না। জিংগারওয়াই লেওবেই-এর কোনো লিখিত স্বরলিপি হয় না। কিন্তু বর্তমান প্রজন্ম নিজেদের নাম সুর করে গেয়ে মোবাইলে রেকর্ড করে রাখছে। দরকারমতো হোয়াটস অ্যাপে সেই সুরের নামও পাঠানো যাচ্ছে।

প্রবীণদের আক্ষেপ, এভাবে নবীনরা শুধু নিজের নামই মনে রাখছে, অন্যের নাম তো রেকর্ড করা হয় না। তাই আগের মতো সবাই সবার নাম মনে রাখার প্রথাও এই প্রজন্ম চালিয়ে যেতে পারবে কী-না সন্দেহ। এমন আজব নাম-গানের গ্রামের বাসিন্দা দুই বিবাহিতা বোন সিডিয়াপ খংসিট ও সিথোহ খংসিটের জীবন নিয়ে স্বল্পদৈর্ঘ্যের ছবি মাই নেম ইজ ইউউউউ বানিয়েছেন মণিপুরী পরিচালক ওইনাম দোরেন।

ছবিতে দেখানো হয়েছে, তাদের ছেলেমেয়েরা পড়াশোনার জন্য শিলং শহরে গিয়ে নগর সভ্যতা, পশ্চিমী রক গানের সংস্পর্শে আসার পরেও কীভাবে বেঁচে থাকে জিংগারওয়াই লেওবেই। দেশ-বিদেশে পুরস্কার জেতা ওই ছবি দেখার জন্য রাজ্যপাল বনোয়ারিলাল পুরোহিত রাজভবনে দুবার স্ক্রিনিংয়ের ব্যবস্থা করেন। ওইনামকে সংবর্ধনা দেয়ার পাশাপাশি তিনি গ্রামের অন্তত ১৫০ মানুষকে রাজভবনে আমন্ত্রণ করে খাওয়ান।- সূত্র: আনন্দবাজার

 

Comments

comments

x