আজ বুধবার | ২২ নভেম্বর২০১৭ | ৮ অগ্রহায়ণ১৪২৪
মেনু

জুনিয়র জোনস

দীপু মাহমুদ | ১৬ সেপ্টে ২০১৭ | ২:২৮ অপরাহ্ণ

Dipu Mahmud

বিজ্ঞানী আফজাল হোসেন কম্পিউটারের সামনে মাথা নিচু করে বসে আছেন। তার মেজাজ ভীষণ খারাপ। ইচ্ছে করছে কম্পিউটারের মনিটর তুলে আছাড় দিতে। তিনি আছাড় দিতে পারছেন না।

ঢাকার আগারগাঁয়ে বিশাল বিজ্ঞান গবেষণাগার। আফজাল হোসেন সেখানে কাজ করেন। তিনি মঙ্গলগ্রহে উদ্ভিদ জন্মানোর সম্ভাবনা প্রায় আবিষ্কার করে ফেলেছেন। গবেষণার তথ্য কম্পিউটার থেকে উধাও হয়ে গেছে। তিনি ডেস্কটপ কম্পিউটারে কাজ করতে পছন্দ করেন। ল্যাপটপ বা অন্য কোনো হার্ডডিস্কে তথ্যগুলো রাখা নেই। অফিসে তার ঘর তালা দেওয়া থাকে। ঘটনা কী ঘটেছে তিনি বুঝতে পারছেন না।

বিজ্ঞান গবেষণাগারের ডিরেক্টর দুপুর আড়াইটার সময় মিটিং ডেকেছেন। সবাইকে সেখানে উপস্থিত থাকতে বলা হয়েছে। ঘটনা তিনি বের করে ছাড়বেন বলে জানিয়েছেন। আফজাল হোসেন ঘড়ির দিকে তাকালেন। বারোটা বাজে। দুপুর আড়াইটা বাজতে আড়াই ঘন্টা বাকি।

ক্রিস্টোফার জোনস ঘরে ঢুকেছে। এই ছেলের বয়স কম। তবে জ্ঞানবুদ্ধি ভালো। সে মঙ্গলগ্রহে পানির অস্তিত্ব প্রমাণ করেছে। সারা দুনিয়ার মানুষ তাকে চেনে। আফজাল হোসেনের ধারণা ঘটনার ভেতর ঝামেলা আছে। তিনি ঝামেলা ধরতে পারেননি। মঙ্গলগ্রহে উদ্ভিদ জন্মানোর সম্ভাবনা খুঁজতে গিয়ে তিনি সেখানে পানির সন্ধান করেছিলেন। এই ছেলে সেটা কিভাবে যেন জেনে গেছে।

ক্রিস্টোফার জোনসকে দেখে আফজাল হোসেন বিভ্রান্ত হয়েছেন। এত বড় চুরির ঘটনা ঘটেছে। তাতে ক্রিস্টোফারকে মোটেও চিন্তিত মনে হচ্ছে না। সে ঘরে ঢুকে বলল, ‘হাই ওল্ডম্যান। ভুলে যাও সবকিছু। নতুন করে শুরু করো।’

আফজাল হোসেনের মনে হচ্ছে ক্রিস্টোফারকে কষে চড় লাগাতে। তিনি চড় লাগালেন না। নিজেকে শান্ত করে বললেন, ‘এত দিনের গবেষণা!’

‘আমি তো বিরাট ঘটনা ঘটিয়ে ফেলেছি।’

‘কী ঘটনা?’

‘পশু-পাখির ভাষা বোঝার যন্ত্র আবিষ্কারের চেষ্টায় আছি, তুমি জানো।’

‘হ্যাঁ জানি। তুমি কাকের ভাষা আবিষ্কার করেছ। এক কাক আরেক কাককে খেতে ডাকছে। সে জোরে জোরে  চিৎকার করছে, খা খা।’

ক্রিস্টোফার জোনস এই কথায় কিছু বলল না। সে তার আগের কথার রেশ ধরে বলল, ‘একটা ব্যাপার খেয়াল করেছি। এক বছর বয়সের শিশুরা অনেক কথা বলে। শব্দগুলো অর্থহীন। গত ছয়মাস ধরে আমার ছেলের উপর গবেষণা করেছি। তুমি অবাক হবে জেনে। তার বলা শব্দগুলো যন্ত্রের মাধ্যমে বোঝা যাচ্ছে।’

আফজাল হোসেনের বিরক্ত লাগছে। তিনি মনোযোগ দিতে পারছেন না। অফিসের ফোন বাজছে। ঝনঝন শব্দ হচ্ছে। ফোন ধরতে ইচ্ছে করছে না। ক্রিস্টোফার বলল, ‘এ্যই ওল্ডম্যান। ফোনটা ধরো।’

আফজাল হোসেন ফোন ধরলেন। ফোন ধরেই তিনি চমকে উঠেছেন। দৈনিক পত্রিকা থেকে ফোন করেছে। তারা জানতে চাইছে তথ্য চুরির ঘটনা ঠিক কিনা। তিনি সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না কী বলবেন। এত দ্রুত খবর কিভাবে পত্রিকাতে চলে গেল তাও বুঝতে পারছেন না। অসহায় গলায় বললেন, ‘আমরা আপনাদের জানাব।’

বিজ্ঞান গবেষণাগার থেকে জানানোর আগেই সবগুলো অনলাইন পত্রিকাতে খবর চলে এলো। টেলিভিশনের খবরে আর দৈনিক পত্রিকাগুলো ফলাও করে তথ্য চুরির ঘটনা প্রকাশ করে দিল। তাতে সারা পৃথিবী জুড়ে ব্যাপক হৈচৈ শুরু হয়ে গেল।

বাংলাদেশ সরকার চোর ধরার ব্যবস্থা করে ফেলেছে। চোর সন্দেহে কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গোয়েন্দা বিভাগ থেকে সাংবাদিকদের ডেকে প্রতিদিন পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করা হচ্ছে। তবু আসল চোর ধরা পড়ছে না।

গবেষণাগারের বিজ্ঞানীরা বিরাট লজ্জার ভেতর পড়ে গেছেন। তাদের মাথা খারাপ অবস্থা। এত বড় আবিষ্কারের তথ্য তাদের গবেষণাগার থেকে চুরি হয়ে গেছে। সেই আবিষ্কার করছিলেন বাংলাদেশের একজন বিজ্ঞানী। মঙ্গলগ্রহে উদ্ভিদ জন্মানো সম্ভব এটা প্রমাণ করতে পারলে সারাবিশ্বে বাংলাদেশের নাম আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠত।

লজ্জা ঢাকা দরকার। মানুষজন ছিঃ ছিঃ করছে। বিজ্ঞান গবেষণাগারের পক্ষে নতুন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তারা ক্রিস্টোফার জোনসের উদ্ভাবিত যন্ত্র প্রদর্শনের আয়োজন করেছে। অনুষ্ঠান হচ্ছে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে নামকরা বড় বিজ্ঞানীরা এসেছেন। তাদের আমন্ত্রণ করে আনা হয়েছে। সাংবাদিকরা উপস্থিত আছেন।

অনুষ্ঠান শুরু হয়েছে। ক্রিস্টোফার জোনস তার ছেলে জুনিয়র জোনসের সঙ্গে সকলের পরিচয় করিয়ে দিল। সে দেখতে অসম্ভব সুন্দর। মাথাভর্তি সোনালী চুল। সবুজ দুটো চোখ। গোলগাল ফুটফুটে চেহারা। দেখলেই আদর করতে ইচ্ছে করে।

ক্রিস্টোফার জোনস বলল, ‘শিশুর মুখের ভাষা স্পষ্ট হতে বছর দুই সময় লাগে। কেউ তার আগে দুই-একটা শব্দ পরিষ্কারভাবে বলতে পারে। জুনিয়র জোনসের বয়স মাত্র একবছর চারমাস। আমি গত ছয়মাস ধরে আমার উদ্ভাবিত যন্ত্রে তার কথা বোঝার চেষ্টা করছি। ছোট শিশুদের যে কথাগুলোকে আমাদের কাছে অর্থহীন বোধ হয়। মনে হয় সেগুলো শুধুই কিছু শব্দ। এই যন্ত্রের মাধ্যমে সেই কথা পুরোপুরি বোঝা সম্ভব।’

সবাই প্রচ- আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছেন। জুনিয়র জোনসকে প্রশ্ন করা হবে। সে তার উত্তর দেবে। যন্ত্রের মাধ্যমে তার বলা অর্থহীন শব্দগুলোর অর্থ বোঝা যাবে। কিছুক্ষণ আগে যন্ত্র ছাড়া অনেকে তার সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করেছেন। সে হাত নেড়ে ইয়াম্মি, মাম, ইতানা-আউ ধরনের কিছু অর্থহীন শব্দ উচ্চারণ করেছে।

আফজাল হোসেন সামনের সারিতে বসে আছেন। তাকে বিষণœ দেখাচ্ছে। জুনিয়র জোনস তার দিকে তাকিয়ে হাত নেড়ে কিছু বলছে। তিনি খেয়াল করেননি। জুনিয়র জোনসকে উত্তেজিত মনে হচ্ছে। সে দুই হাত নেড়ে আতামি, আয়, ইয়ানা ইতা জাতীয় শব্দ করছে। কেউ কিছু বুঝতে পারছে না। সে তার বাবা ক্রিস্টোফার জোনসের দিকে তাকিয়েয়ে। হাত নেড়ে তাকে কিছু বলছে।

ক্রিস্টোফার জোনস তার উদ্ভাবিত যন্ত্র চালু করে দিয়েছে। তাতে জুনিয়র জোনসের কথা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। সে বলছে, ‘বাবা আমি খুব কষ্টে আছি। লজ্জা পেয়েছি অনেক। তুমি আফজাল আংকেলের থিসিস সরিয়ে ফেলেছ। এই কথা তুমি স্কাইপে দেশের বাইরে কাউকে বলছিলে। আমি তখন শুনেছি। কাজটা তুমি ঠিক করোনি। সরি বলো। ভুল করলে সরি বলতে হয়।’

মনে হলো এইমাত্র হলঘরে কিছু একটা বিস্ফোরিত হয়েছে। তবু পুরো হলঘর নিস্তব্ধ। পিনপতন নীরবতা।

 

Comments

comments

x