আজ বুধবার | ২২ নভেম্বর২০১৭ | ৮ অগ্রহায়ণ১৪২৪
মেনু

আমাদের ইশকুলে রোবট আছে

দীপু মাহমুদ | ১৪ সেপ্টে ২০১৭ | ২:৩৯ অপরাহ্ণ

Profile Picture_ Dipu Mahmud

আমাদের ইশকুলে রোবট আনা হয়েছে। ছয়টা রোবট। তারা দেখতে অবিকল মানুষের মতো। আমি প্রিন্সিপাল মিসকে জিগ্যেস করলাম, ‘মিস, এরা সত্যি রোবট?’

প্রিন্সিপাল মিস সুন্দর করে হাসলেন। আমার মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, ‘হ্যাঁ মা, এগুলো সত্যি রোবট। তারা তোমাদের বন্ধু। তোমাদের সঙ্গে খেলা করবে।’

রোবটদের সঙ্গে আমরা কী খেলা করব জানি না। তবে রোবটগুলো খুব মজার। প্রিন্সিপাল মিস রোবটদের সঙ্গে আমাদের পরিচয় করিয়ে দিলেন। ছয় ঋতুর নামে ছয় রোবটের নাম। গ্রীষ্ম, বর্ষা, শরৎ, হেমন্ত, শীত আর বসন্ত।

আমি বললাম, ‘চলো আমরা খেলি আর গান গাই।

রাবটদের নিয়ে আমি ক্লাসরুমে ঢুকে পড়লাম। প্রিন্সিপাল মিস সঙ্গে এলেন। ক্লাসে ছেলেমেয়েরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। কেউ বসে আছে। কেউ দাঁড়িয়ে আছে। আমি ওদের ডাকলাম। কেউ তাকাল, কেউ তাকাল না। কেউ আবার দূরে সরে গেল। কাউকে তখন বিরক্ত দেখাচ্ছিল। মনে হচ্ছে সে রেগে গেছে।

এটা অটিস্টিক শিশুদের ইশকুল। প্রিন্সিপাল মিস চেয়েছিলেন অটিস্টিক শিশুরা স্বাভাবিক শিশুদের সঙ্গে মিলেমিশে পড়াশুনা করবে। তিনি সকলের জন্য ইশকুল বানালেন। সেখানে অটিস্টিক শিশুদের সঙ্গে অন্য ছেলেমেয়েদের ভর্তি করতে চাইলেন। তখন দেখা গেল অটিস্টিক শিশু ছাড়া অন্য সবাই কোনো-না-কোনো ইশকুলে ভর্তি হয়ে গেছে।

আমার মা এই ইশকুলের পড়ান। আমি পড়ি ক্লাস থ্রিতে। মা একদিন আমাকে সঙ্গে নিয়ে এই ইশকুলে এলেন। অটিস্টিক শিশুদের দেখিয়ে বললেন, ‘তুমি এদের সঙ্গে পড়বে?’

আমি ওদের দিকে তাকালাম। ক্লাসে অনেক ছেলেমেয়ে। তাদের কেউ হাত দোলাচ্ছে। কেউ চুপ করে এক জায়গায় বসে আছে। একজন খেলনার বাক্স সামনে নিয়ে বসে আছে। সে বাক্স উপুড় করে সবগুলো খেলনা মেঝেতে ঢেলে ফেলছে। আবার খেলনাগুলো তুলে বাকসে ভরছে। সে বারবার একই কাজ করছে। দুটো ছেলেমেয়ে চিৎকার করে কাঁদছে।

মাকে বললাম, ‘আমি এদের সঙ্গে পড়ব।’

মা আমার মাথায় চুমু খেলেন। প্রিন্সিপাল মিস এসে আমাকে বুকের ভেতর জড়িয়ে ধরলেন।

প্রিন্সিপাল মিস ভাবলেন আমি একা এতজন ছেলেমেয়ের সঙ্গে খেলতে গিয়ে হাঁপিয়ে উঠব। ওদের আরও কয়েকজন বন্ধু দরকার। যারা স্বাভাবিক আচরণ করবে। তাহলে এই ইশকুলের অটিস্টিক শিশুরাও স্বাভাবিক আচরণ শিখবে। তিনি সায়েন্স একাডেমিকে জানালেন। সায়েন্স একাডেমি এই ইশকুলের জন্য ছয়টা শিশু রোবট বানিয়ে দিল।

কয়েকদিনেই রোবটগুলো সকলের ভালো বন্ধু হয়ে গেল। ইশকুলের ছেলেমেয়েরা বোরটদের সঙ্গে সারাদিন খেলাধুলা করে, নাচে, গান গায়, ছবি আঁকে। মজার ব্যাপার জেনেছি।  রোবটদের শরীরে রক্ত নেই। কেটে গেলে লাগে না। কাটা তখুনি ঠিক হয়ে যায়।

একদিন ইশকুলে কিছু দুষ্টু লোক এল। তারা ছিল পাঁচজন। তাদের গায়ে কালো কাপড়। হাতে অস্ত্র। লোকগুলো ইশকুলে ঢুকে সবাইকে ঘিরে ফেলল। মিসদের একঘরে নিয়ে আটকে রাখল। আর ছেলেমেয়েদের অন্যঘরে আটকালো।

আমি শুনলাম বাইরে অনেক মানুষ হৈচৈ করছে। সাইরেন বাজিয়ে পুলিশের গাড়ি আসছে। আমি রোবটদের বললাম, ‘কিছু দুষ্টু মানুষ আমাদের আটকে ফেলেছে। নিজেদের বুদ্ধি করে বাঁচতে হবে।’

কিছু দুষ্টু মানুষ কেন আমাদের আটকে ফেলেছে তা রোবটগুলো বুঝতে পারল না। আমি বললাম, ‘ওরা সংখ্যায় পাঁচজন। তোমরা ছয়জন। একজন এখানে আমার সঙ্গে থাকবে। ছেলেমেয়েদের ছবি এঁকে ছড়া শোনাবে। বাকিরা গিয়ে কালো কাপড় পরা পাঁচজন দুষ্টু লোককে কামড়ে-খামচে অস্থির করে দেবে। তোমরা রোবট। ওরা তোমাদের কিছু করতে পারবে না।’

এক রোবট বলল, ‘কামড়ে-খামচে অস্থির করতে হয় কেমন করে আমরা জানি না।’

আমি বললাম, ‘শিখিয়ে দিচ্ছি।’

আরেক রোবট বলল, ‘কামড়ানো-খামচানো ব্যাপারটা আমাদের মেমরিতে ইন্সটল করে দাও।’

আমি বললাম, ‘কিভাবে ইন্সটল করতে হয় আমি জানি না।’

রোবট বলল, আমি ব্যবস্থা করছি। কেমন করে কামড়াতে-খামচাতে হয় তুমি আমাদের দেখাও।’

আমি তাই করলাম। রোবটরা নিজেদের ভেতর কামড়ানো আর খামচানো ব্যাপারটা ঢুকিয়ে নিল।

তখন একজন দুষ্টু লোক দরজা খুলে ভেতরে ঢুকল। আমি চিৎকার করে বললাম, ‘যাও তোমরা। ওদের কামড়ে-খামচে অস্থির করে দাও। বর্ষা আমাদের কাছে থাকল। বাকি পাঁচজন ছুটে গেল। ওরা কালো কাপড় পরা পাঁচজন দুষ্টু লোককে কামড়ে-খামচে অস্থির করে দিল। লোকগুলোর হাতে ছুরি ছিল। আর গুলিভর্তি অস্ত্র ছিল। তারা ছুরি দিয়ে রোবটদের খোঁচা দিল। রোবটের কিছু হলো না। পাঁচজন দুষ্টু লোক অবাক হয়ে দেখল এদের শরীর কাটলে রক্ত বের হচ্ছে না। কাটা জায়গা সঙ্গে সঙ্গে জোড়া লেগে যাচ্ছে।

তারা ভয় পেয়ে গেল।  রোবটরা পাঁচজন দুষ্টু লোককে খুব করে কামড়াতে থাকল। তারা রোবটের কামড় খেয়ে মেঝেতে গড়াগড়ি দিতে লাগল।

তখন একদল পুলিশ ইশকুলের ভেতর ঢুকে পড়ল। তাদের হাতে অস্ত্র ছিল। তারা দুষ্টু লোকগুলোকে দুই হাত উঁচু করে দাঁড়াতে বলল। দুষ্টু লোকগুলো মেঝে থেকে উঠে পড়ল। তারা দুই হাত উঁচু করে দাঁড়াল। পুলিশ দুষ্টু লোকগুলোকে ধরে নিয়ে গেল।

পত্রিকা আর টেলিভিশন চ্যানেল থেকে অনেক সাংবাদিক এসেছিলেন। তারা বোরটের কথা জানেন না। সাংবাদিকরা রোবট বন্ধুদের সঙ্গে মিসদের, আমার আর ইশকুলের ছেলেমেয়েদের ছবি তুলে নিয়ে গেলেন। দেশের সবগুলো টেলিভিশন চ্যানেলে আর সংবাদপত্রে খবর প্রকাশ হলো, আমাদের দেশের একদল সাহসী শিশু। কেউ লিখল, একদল অটিস্টিক সাহসী শিশু। পত্রিকা আর টেলিভিশনে আমাদের ছবি দেখে আমরা ভীষণ আনন্দ পেলাম।

Comments

comments

x