আজ রবিবার | ১৯ নভেম্বর২০১৭ | ৫ অগ্রহায়ণ১৪২৪
মেনু

ইতিহাস গড়ল বাংলাদেশ

মানচিত্র ক্রীড়া ডেস্ক | ৩১ আগ ২০১৭ | ১২:১১ পূর্বাহ্ণ

বাংলাদেশ ছবি- সংগৃহীত

বাংলাদেশে মশা বেশি। এ দেশে দুর্গন্ধ।ভালো হোটেল নেই। এখানে খেলার চেয়ে দেশে ফিরে যাওয়া ভালো।ওদেরকে একদিনেই হারিয়ে দেয়া যায়।ও অস্ট্রেলিয়া তোমরা হয়তো ভুলে গেছ, বাংলাদেশ এখন যেকোনো প্রতিপক্ষের মনেই ভয় ধরিয়ে দেয়ার মতো দল। ওহে শেন ওয়ার্ন তুমি কোথায়? এসে দেখে যাও মিরপুরে চারদিনেই বলে কয়ে ২০ রানে তোমাদের হারিয়ে দিয়েছে এই দেশের ছেলেরা। সাকিব-তামিমের নৈপুণ্যে ঈদের আগেই আরেক ঈদের আমেজ পেয়েছে বাংলাদেশ। মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামে অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে প্রথম টেস্টে ২০ রানের ‘ঐতিহাসিক জয়’ ছিনিয়ে এনেছে টিম টাইগার। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথমবারের মতো টেস্ট জয়ের ইতিহাস গড়ল টাইগররা।

ম্যাচের আগে যে স্মিথ বলেছিলেন সাকিবের বক্তব্য ‘অতি-আত্মবিশ্বাসী’ মন্তব্য, সেই তিনি তৃতীয়দিন ওয়ার্নারের সঙ্গে দেয়াল হয়ে দাঁড়ান। নতুন অভ্যাসের বাংলাদেশ ওই রাতে চতুর্থ সকালের চিঠি পেয়ে যায়। মঙ্গলবার তামিম বলে যান, পরদিন দুজনকে দ্রুত ফেরাতে পারলে বড় সুযোগ থাকবে। মঞ্চে আসেন সাকিব। সেঞ্চুরি তুলে নেয়া ওয়ার্নার (১১২) তখন বলের ওপর মাছরাঙার মতো চোখ রেখে চলেছেন। মুশফিক বারবার ফিল্ডিং এদিক-সেদিক করছেন। হঠাৎ এলবিডব্লিউর আবেদন। ওয়ার্নার শেষ! এরপর ওই স্মিথ।

বারবার ফ্রন্টফুট ব্যবহার করছিলেন। স্মিথ এমনিতে সামনের পায়ে সবসময় সতর্ক থাকেন। এদিন শুরুতে স্পিনারদের একটু এগিয়ে খেলছিলেন। পরিণত সাকিবের আগুনে কুইকারে স্কয়ারকাট করতে যেয়ে মুশফিকের হাতে ধরা পড়েন। স্মিথ নিশ্চয়ই এবার বিশ্বাসী হবেন। নিশ্চয়ই এবার স্বীকার করবেন বিশ্বসেরা সাকিব আল হাসান শুধু বলার জন্য বলেননি ২-০তে সিরিজ জেতা সম্ভব।

যে সৌম্য সরকারের মানসিকভাবে নড়বড়ে থাকার কথা, সেই তিনি স্লিপে এদিন ঝলক দেখালেন। স্পিনের সামনে অস্ট্রেলিয়ার এই দলটির যদি কেউ সহজাতভাবে স্বাভাবিক থাকতে পারেন, তিনি হ্যান্ডসকম্ব। দুর্দান্ত ব্যাকলিফট। পায়ের কাজ অসাধারণ। বলের ওপর নজর রাখতে পারেন ভালো। সেই তিনি চাপের মুখে তাইজুলের কোনাকুনি কুইকারে স্লিপে ক্যাচ দেন। সৌম্য প্রথম দফায় হাতে লাগিয়ে বল উপরে তুলে দেন। পরে হাঁটুগেড়ে তালুবন্দী করেন। এই টেস্টে এমন আরও কটি ক্যাচ নিয়েছেন তিনি। দাম দিয়ে ওই দুটি ক্যাচের মূল্য দেয়া যাবে না।

দুই দলের প্রথম ইনিংসের পর কখনো মনে হয়নি বাংলাদেশ এই ম্যাচ হারতে পারে। দুই দিনের বেশি হাতে রেখে ২৬৫ রানের টার্গেটে ব্যাট করতে নেমে ওয়ার্নার, স্মিথ সেই ‘ভাবনা’ জাগিয়ে দেন। তবে তাদের কর্তারা সতর্কও ছিলেন। মাঠে নামার আগে সাতসকালে একাডেমি মাঠে দলটির কোচ ব্যাটসম্যানদের নিয়ে কাজ শুরু করে দেন। স্মিথ, ওয়ার্নার ফিরে গেলে কীভাবে স্পিন সামলাতে হবে সেই অনুশীলন করাচ্ছিলেন। হাথুরুসিংহেও বসে থাকেননি। আগের দিন ক্যাচ মিসের কারণে পরিস্থিতি নিজেদের হয়নি। এদিন তাই ফিল্ডারদের ক্লোজে রেখে ক্যাচিং প্রাকটিস করান। যুদ্ধের আগের এই দৃশ্যে ফুটে উঠছিল দুই দলের মরিয়া মনোভাব। যার সবটা ওই স্কোরবোর্ডে লেখা নেই।

টেস্ট ক্রিকেটের প্রতি অস্ট্রেলিয়ানদের গভীর এক মমত্ববোধ আছে। ঘরোয়া ক্রিকেটে লংঙ্গার ভার্সনকে তারা সবসময় প্রাধান্য দেয়। স্বীকার করতেই হবে তাদের ইতিহাস আর ঐতিহ্যের কাছে বাংলাদেশ কিছু নয়। কিন্তু এই বুধবারের পর থেকে এই কথাটি বলতে দুইবার ভাবতে হবে। বাংলাদেশ ক্রিকেটের যে অগ্রযাত্রা শুরু হয়েছে এই জয় তার সার্টিফিকেট নয়, সাধারণ উদাহরণ মাত্র। এই সফর নিয়ে অস্ট্রেলিয়া কম জলঘোলা করেনি। ‘বাংলাদেশ জঙ্গিবাদের দেশ’ কথিত এই প্রলাপ তারাই প্রায় প্রতিষ্ঠিত করে দিয়েছিল।

অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের টেস্ট জয় লেখা হয়ে যেতে পারত সেই ২০০৬ সালের ফতুল্লায়। প্রথম ইনিংসে ১৫৮ রানের লিড পাওয়া বাংলাদেশ ৩০৭ রানের বিশাল লক্ষ্য দিয়েছিল অজিদের। উপমহাদেশে চতুর্থ ইনিংসে যাদের ২০০ কিংবা তার বেশি রান তাড়া করে জয়ের ইতিহাস ছিল না, তারাই কিনা ওই কঠিন চ্যালেঞ্জ জয় করে ফেলে রিকি পন্টিংয়ের ১১৮ রানের অপরাজিত ইনিংসে। সেদিন হাবিবুল বাশারের কাছে ‘এই সাকিব’ ছিলেন না। যে সাকিব যেকোনো পরিস্থিতিতে দুহাত আকাশে মেলে পাখির মতো উড়তে পারেন। যে সাকিব উইকেটে দাঁড়িয়ে প্রতিপক্ষ ব্যাটসম্যানকে ‘স্যালুট’ দেখাতে পারেন। যে সাকিব ৯টি টেস্ট খেলুড়ে দেশের বিপক্ষে পাঁচ উইকেট নিতে পারেন। যে সাকিব ক্যারিয়ারে দ্বিতীয়বার পঞ্চাশ কিংবা তার বেশি রানের সঙ্গে ১০ উইকেট নিয়ে প্রতিপক্ষকে ধসিয়ে দিতে পারেন।

এমন সুখের দিনে উড়ে গেছে কণ্ঠযোদ্ধা আব্দুল জব্বারের প্রাণপাখি। সুখ আর দুঃখের এমন দিনের পরেও হয়তো পত্রিকায় পাতায় ভাসবে বানভাসি কোনো মায়ের মুখ। এদিন নিশ্চয়ই তার ক্রিকেটপাগল স্কুলপড়ুয়া ছেলে ত্রাণ নিয়ে ফিরতে ফিরতে শুনে যাবে সাকিবের নাম। ওই নামে তার পেট ভরবে না ঠিকই; কিন্তু আব্দুল জব্বারের গানের মতো প্রাণ ভরবে। বেঁচে থাকার আনন্দ খুঁজে পাবে। সে যদি শেন ওয়ার্নকে চিনে থাকে নিশ্চয়ই গুনগুন করে গাইবে, ‘তুমি কি দেখেছো কভু বাংলাদেশের কাছে অস্ট্রেলিয়ার পরাজয়?

সংক্ষিপ্ত স্কোর:
বাংলাদেশ প্রথম ইনিংস: ২৬০ (তামিম ৭১, সাকিব ৮৪, মুশফিক ১৮, নাসির ২৩, মিরাজ ১৮, শফিউল ১৩; কামিন্স ৩/৬৩, লায়ন ৩/৭৯, অ্যাগার ৩/৪৬।)

অস্ট্রেলিয়া প্রথম ইনিংস: ২১৭ (রেনশ ৪৫, হ্যান্ডসকম্ব ৩৩, অ্যাগার ৪১*; মিরাজ ৩/৬২, সাকিব ৫/৬৮, তাইজুল ১/৩২।)
বাংলাদেশ দ্বিতীয় ইনিংস: ২২১ (তামিম ৭৮, সৌম্য ১৫, মুশফিক ৪১, সাব্বির ২২, মিরাজ ২৬; লায়ন ৬/৮২, অ্যাগার ২/৫৫, কামিন্স ১/৩৮।)
অস্ট্রেলিয়া দ্বিতীয় ইনিংস ২৪৪ (ওয়ার্নার ১১২, স্মিথ ৩৭, হ্যান্ডসকম্ব ১৫; মিরাজ , সাকিব , তাইজুল, মোস্তাফিজ। )
ফল: চতুর্থদিনে বাংলাদেশ ২০ রানে জয়ী।

ম্যাচসেরা: সাকিব আল হাসান।

Comments

comments

x