আজ শনিবার | ১৮ নভেম্বর২০১৭ | ৪ অগ্রহায়ণ১৪২৪
মেনু

ইমি

দীপু মাহমুদ | ২৬ আগ ২০১৭ | ২:০৮ অপরাহ্ণ

Profile Picture_ Dipu Mahmud

ডেনিয়েল হ্যাসওয়েলকে আনন্দিত দেখচ্ছে। তিনি দুই ঠোঁট গোল করে শিস বাজানোর চেষ্টা করলেন। শিস বাজল না। মুখ দিয়ে বাতাস বের হলো কেবল। মার্কিন জাতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা শুক্রগ্রহে রোবোটিক নভোযান পাঠাচ্ছে। ডেনিয়েল হ্যাসওয়েলকে এই অভিযানের জন্য পাঁচটা রোবট বানাতে বলা হয়েছে। সেই রোবট হবে অবিকল মানুষ। রোবটের ভেতর মানুষের চারিত্রিক বৈশিষ্ট ইনস্টল করা থাকবে।

রোবট ডিজাইনের আগে ডেনিয়েল হ্যাসওয়েল জানতে চাইলেন, তাদের শরীর কি মানুষের মতো ত্বক দিয়ে মোড়ানো থাকবে?

কেটিয়া পেডরো এই প্রকল্পের প্রধান ব্যক্তি। তিনি ডেনিয়েল হ্যাসওয়েলের কথা শুনে বিরক্ত হয়েছেন। নাকের ভেতর থেকে ফস করে খানিকটা বাতাস বের করে দিয়ে বললেন, মহামান্য ডেনিয়েল আপনার বয়স হয়েছে। আপনি এখন বিশ্রাম নিন।

ডেনিয়েল হ্যাসওয়েল জিগ্যেস করলেন, কেন আমাকে এই কথা বলা হচ্ছে তা জানতে পারি কি, ভদ্রজন কেটিয়া?

আমাদের এই রোবোটিক নভোযান আমরা কোথায় পাঠাচ্ছি?

পৃথিবীর বোন-গ্রহ শুক্রে।

কেন পাঠাচ্ছি?

মহোদয় আপনি কি আমার পরীক্ষা নিচ্ছেন? আমি কি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সমাপনী পরীক্ষা দিচ্ছি? নাকি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা?

আমি একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে চাইছি। আপনি আমাকে সহযোগিতা করুন। বলুন কেন আমরা শুক্রগ্রহে নভোযান পাঠাচ্ছি?

ডেনিয়েল হ্যাসওয়েল আর বিতর্কে গেলেন না। তিনি ক্লাসের মেধাবী পড়–য়া শিক্ষার্থীর মতো গড়গড় করে বলে গেলেন, শুক্রগ্রহের সঙ্গে পৃথিবীর গঠন উপাদানের বিশেষ মিল আছে। আচার-আচরণ একই রকম। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে হাবল স্পেস টেলিস্কোপের ছবিতে সেখানে প্রাণের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। পৃথিবী থেকে পাঁচটা রোবট শুক্রগ্রহে পাঠানো হবে। আমরা দেখতে চাই সেখানে মানুষ বাস করতে পারে কিনা।

মহাত্মা, আপনি চমৎকার বলেছেন। আপনাকে আমি দশের ভেতর দশ দিচ্ছি।

আশা করি আমি কোনো পরীক্ষা দিচ্ছিলাম না।

অবশ্যই না। শুক্রগ্রহের তাপমাত্রা মানবদেহ কতখানি সহ্য করতে পারে। সেখানকার আবহাওয়া কতখানি আমাদের উপযোগী তাই দেখার জন্য হুবহু মানুষ তৈরি করতে হবে। রোবট-মানুষ।

আমরা সেখানে সরাসরি মানুষ পাঠাচ্ছি না কেন?

নৈতিক অনুমোদন নেই তাই। শুক্রগ্রহের প্রাণী সেখানে মানুষকে আক্রমণ করতে পারে। সেখানকার আবহাওয়া মানুষের সহ্য নাও হতে পারে। আমরা মানুষকে গবেষণার উপাদান বানাতে পারি না।

রোবট-মানুষ তো মানুষের রেপ্লিকা। ব্যাপার তো একই।

মানুষের রেপ্লিকা। মানুষ না। রোবটদের ভেতর প্রতিকূল আবহাওয়াতে নিজেদের মানিয়ে নেওয়ার অতিরিক্ত ক্ষমতা দিয়ে দেওয়া হবে।

আর আক্রমণ থেকে বাঁচার জন্য?

তারা সঙ্গে করে নিয়ে যাবে আধুনিক অস্ত্র ও গোলাবারুদ। তার পরিমাণ ও ধ্বংসক্ষমতা এত বেশি যা দিয়ে শুক্রগ্রহ উড়িয়ে দেওয়া কিছু অসম্ভব হবে না।

ডেনিয়েল হ্যাসওয়েল মুচকি হাসলেন। হেসে বললেন, পাগল। গ্রহ উড়িয়ে দেবে।

কেটিয়া পেডরোর চোখ সরু হয়ে গেল। তিনি জানতে চাইলেন, কী বললেন মহাত্মন?

বললাম আমাকে কী করতে হবে?

আমাদের সহকর্মীর ভেতর থেকে পাঁচজন মানুষ নির্বাচন করা হয়েছে। সবাই নাসাতে কাজ করেন। কাউকে জোরজবরদস্তি করা হয়নি। তারা নিজেদের আগ্রহে রাজি হয়েছেন। আপনি তাদের রেপ্লিকা বানাবেন। এমনকি তাদের হাঁটাচলা, কথাবলার ধরন ও গলার স্বরও হবে আসল মানুষটার মতো।

ডেনিয়েল হ্যাসওয়েলের বয়স প্রায় সত্তর বছর। তার মেজাজ সব সময় তেতে থাকে। তিনি একটুতেই রেগে যান। কেটিয়া পেডরো তাকে পছন্দ করেন না। তিনি তাকে এই প্রকল্পে নিতে রাজি হননি। কিন্তু ডেনিয়েল হ্যাসওয়েলই একমাত্র ব্যক্তি যিনি দক্ষতার সঙ্গে রোবটকে  অবিকল মানুষের মতো করে বানাতে পারেন। নাসা কর্তৃপক্ষ তাই তাকে এই কাজে যুক্ত করেছে।

ডেনিয়েল হ্যাসওয়েল বললেন, আমার সর্বশেষ একটা কথা জানার আছে।

কেটিয়া পেডরো ক্লান্তভঙ্গিতে মুখ দিয়ে খানিকটা বাতাস বের করে দিলেন। শরীর ছেড়ে দিয়ে বললেন, মহাশয়, বলুন।

এই রোবটগুলোর ভেতর কি হিংসা ও ক্রোধ থাকবে?

অবশ্যই থাকবে। তারা হবে নির্মম ও নিষ্ঠুর। নির্দয় ও নৃশংস। তারা হবে ভীষণ স্বার্থপর ও কুচক্রী। তাদের কোনো মানবিক গুণ থাকবে না। কারণ আপনি বুঝতে পারছেন। প্রয়োজনে শুক্রগ্রহের প্রাণীদের হত্যা করে তারা গ্রহ ধ্বংস করে দেবে।

কেন তারা গ্রহ ধ্বংস করে দেবে?

যদি তাদের কাছে মনে হয় শুক্রগ্রহের প্রাণীরা পৃথিবীর জন্য বিপদজনক তাহলে নিজেদের স্বার্থে তারা সেই কাজ করবে।

এতে কী জাতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থার অনুমোদন আছে?

আমাকে কি আপনার রাস্তার হকার মনে হয়? অনুমোদন ছাড়া ওষুধ বিক্রি করছি।

আপনি রেগে যাচ্ছেন। হকারের বিষয়টা আমার কাছে পরিষ্কার না। আর অনুমোদন ছাড়া ওষুধ আমেরিকায় বিক্রি হয় না। অন্য কোথাও হতে পারে।

জনাব আমাকে ক্ষমা করুন। আমি রেগে যাইনি। বিরাট আনন্দে আছি। আনন্দে আমার পুরো শরীর থরথর করে কাঁপছে।

আর একটামাত্র কথা জিগ্যেস করতে চাই।

বলুন আপনার আর একটামাত্র কথা।

তারা কি শুক্রগ্রহের জোছনা দেখে আনন্দে দিশেহারা হবে?

আনন্দিত হওয়ার মতো কোনো অপ্রয়োজনী আবেগ তাদের ভেতর থাকবে না। আর শুনুন, তাদের কোনো ব্যথার অনুভূতি দেবেন না। তাদের গালে কষে থাপ্প্ড় মারলেও তারা যেন কিছু বুঝতে না পারে। অপমান হজম করা কঠিন ব্যাপার। এমন ভাবে বানাবেন যেন শরীর ব্লেড দিয়ে কেটে ফালাফালা করে ফেললেও তাদের কিছু না হয়। তারা দিব্যি থাকবে। কিছুই বুঝতে পারবে না।

ডেনিয়েল হ্যাসওয়েল আর কিছু বললেন না। তিনি এই কাজ করতে গিয়ে একবারও রাগ করেননি। বরং প্রবল উৎসাহ নিয়ে কাজটা করেছেন। এটা একটা অদ্ভুত ব্যাপার। তিনি তার দল নিয়ে পাঁচটা রোবট-মানুষ বানিয়ে শেষ করেছেন। রোবটগুলো রাখা আছে তার ব্যক্তিগত চেম্বারে। কাজ শেষ করে আনন্দ নিয়ে শিস বাজানোর চেষ্টা করছেন। শিস বাজছে না। তাতে তিনি কষ্ট পাননি। প্রবল আগ্রহ নিয়ে বারবার শিস বাজানোর চেষ্টা করে যাচ্ছেন।

যে পাঁচজন মানুষের অনুকরণে রোবট পাঁচটা বানানো হয়েছে তাদের একজন ইমি। সে নাসাতে গবেষণা সহকারী হিসেবে কাজ করে। ইমির মনে গোপন ইচ্ছে আছে নভোযানে উঠে শুক্রগ্রহে যাওয়ার। এই কথা সে কাউকে বলেনি। গবেষণা কাজে সহযোগিতা করতে গিয়ে বিভিন্ন সময়ে ইমি নভোযানে ভ্রমণের প্রশিক্ষণ নিয়েছে। সে জানে নভোযানের ভেতর কীভাবে ভেসে ভেসে চলাচল করতে হয়। একটি বিশেষ ট্যাবলেট খেয়ে কীভাবে মাসের পর মাস নিজেকে সুস্থ রাখা যায়। এমনকী নভোযান চালানো এবং কমিউনিকেশন মডিউলের ব্যবহারও শিখেছে।

ইমির সহকর্মী বেথান। সে ইমির খুব ভালো বন্ধু। একদিন ইমি আর বেথান অফিস শেষে হেঁটে ফিরছিল। তারা যাবে বাসস্ট্যান্ডে। দুইজন আলাদা দুটো বাস ধরবে। বেথান হাঁটতে হাঁটতে বলল, তোমাকে দেখে আমার ভীষণ হিংসে হয়।

ইমি জিগ্যেস করল, কেন বলো দেখি।

বেথান বলল, রোবার্ত তোমাকে অনেক বেশি পছন্দ করেন। মাঝে মাঝে তার সেই পছন্দের মাত্রা ছাড়িয়ে যায়।

রোবার্ত রহিত নাসার প্রধান ব্যক্তি। তিনি কঠিন নিয়ম শৃঙ্খলার ভেতর থাকেন। কঠোরভাবে গবেষণা সংস্থার নিয়মকানুন মেনে চলেন। তবে তার ভেতর অদ্ভুত কিছু ছেলেমানুষি আছে। কাজ শেষ করে সহকর্মীদের সঙ্গে বসে চোর-ডাকাত খেলেন। খাতার উপর দাগ টেনে কাটাকুটি খেলতে পছন্দ করেন।

ইমি বলল, কিসে তোমার মনে হলো রোবার্ত আমাকে অনেক বেশি পছন্দ করেন?

বেথান বলল, তুমি যখন যা আবদার করো, তিনি অনুমোদন করে দেন। তুমি নভোযানের সবকিছু শিখতে চাইলে। তিনি সব ডিপার্টমেন্টে চিঠি দিয়ে জানিয়ে দিয়েছেন। তুমি যখন যা শিখতে চাইবে তাই যেন তোমাকে শেখানো হয়।

সে তো অনেকেই আমাকে পছন্দ করে।

আর কে পছন্দ করে তোমাকে? চোখ কুঁচকে বেথান জানতে চাইল।

ইমি বলল, তুমি পছন্দ করো আমাকে।

বেথান গম্ভীর গলায় বলল, আর?

ডেনিয়েল হ্যাসওয়েল ভীষণ পছন্দ করেন। আমি তাকে গিয়ে বললাম, আচ্ছা দাদু!

তুমি তাকে দাদু ডাকলে?

হ্যাঁ, আমি তো তাকে তাই ডাকি।

তিনি রাগ করেন না? যে রগচটা মানুষ।

তিনি আমার ওপর কখনো রাগ করেন না। আমি জিগ্যেস করলাম, রোবটের কি মৃত্যু নেই? তারা কি অমর?

ডেনিয়েল বললেন, তাকে ধ্বংস না করা পর্যন্ত তার মৃত্যু নেই।

আমি বললাম, তাকে ধ্বংস করা যাবে কীভাবে? সে তো ঘুমায় না। অসুস্থ হয় না। ঝিমায় না। তার ক্লান্তি নেই।

তিনি বললেন, তাকে কোনোভাবে বিভ্রান্ত করে দিতে হবে। ধরো তাকে একটা ম্যাজিক দেখালে। যার সমাধান  সে খুঁজে পাবে না। বিভ্রান্ত হয়ে যাবে। অতিরিক্ত চাপে ব্রেইনে শটসার্কিট হবে। তালগোল পাকিয়ে সে যাবে এলোমেলো হয়ে। তার পুরো মনোযোগ থাকেবে ম্যজিক সমস্যার সমাধানের দিকে। তখন রোবটের পাওয়ার জেনারেশন ডিভাইস থেকে মেইন কেবল্ খুলে দেবে। এটা আছে তার ডান কাঁধের কাছে। লাল রঙের কুঁচকানো চিকন কেবল্ দিয়ে পাওয়ার ব্রেইন-সিস্টেমে যায়। ওখানে পাশাপাশি পাঁটটা চিকন কেবল আছে।

বেথান বলল, বুড়ো তোমাকে এত ভালোবাসে! রোবটের পাসকোর্ড বলে দিল?

ইমি বলল, এটা পাসকোর্ড হবে কেন? রোবটের লাইফ ফাংশন। সবাই জানে।

বেথান কিছু বলল না। সে উদাস হয়ে হাঁটতে থাকল। ওরা হাঁটতে হাঁটতে একটা রেস্টুরেন্টে গিয়ে বসল। বাসস্ট্যান্ডে গেল না।

রোবোটিক নভোযান শুক্রগ্রহে যাত্রা শুরু করেছে। নভোযানের নাম ফিলি রিসিটা। তাতে পাঁচটা রোবট-মানুষ তুলে দেওয়া হয়েছে। তাদের পাঁচজনের নামকরণ করা হয়েছে ডেনিয়েল হ্যাসওয়েলের নামের প্রথম অক্ষর ‘ডি’ দিয়ে। ডিওয়ান, ডিটু, ডিথ্রি, ডিফোর আর ডিফাইভ। ডিথ্রি এই অভিযানের ক্যাপ্টেন। নভোযান সে চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।

ইমি অসম্ভব এক ঘটনা ঘটিয়ে ফেলেছে। সে শুক্রগ্রহ অভিযানে রোবটদের সঙ্গে যেতে চেয়েছিল। এই প্রথম রোবার্ত তার কোনো ইচ্ছে অনুমোদন করেননি। তিনি রোবটদের সঙ্গে ইমির শুক্রগ্রহে যাওয়ার ব্যাপারে রাজি হননি।

যে পাঁচটা রোবট-মানুষ বানানো হয়েছে তার একটা রেপ্লিকা হচ্ছে ইমির। যার নাম ডিটু। ইমি ডেনিয়েল হ্যাসওয়েলের ব্যক্তিগত চেম্বারে ঢুকেছিল। ডেনিয়েল তখন বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। ইমি গিয়ে বলল, দাদু চলো ক্যাফেটেরিয়াতে যাই।

ডেনিয়েল হ্যাসওয়েল অবাক হয়ে বললেন, এখন ক্যাফেটেরিয়াতে কেন?

তোমার সঙ্গে এককাপ কফি খেতে ভীষণ ইচ্ছে করছে। ক্যাফেটেরিয়াতে আজ ফাটাফাটি রকমের দারুণ কফি পাওয়া যাচ্ছে। চলো দাদু প্লিজ।

ডেনিয়েল হ্যাসওয়েলের ঘুম পাচ্ছে। তিনি মুখ হা করে হাই তুলে উঠে পড়লেন। বললেন, চল যাই। আমার নাতনি থাকলে ঠিক তোর মতো নাছোড়বান্দা হতো।

ইমি বলল, আমিই তো তোমার নাতনি, দাদু। আবার নাতনি চায় কেন?

ডেনিয়েল হ্যাসওয়েল বললেন, হ্যাঁ, তাই তো। আমি বিরাট বোকামানুষ বুঝলি ভাই। তুই তো আমার সোহাগী নাতনি।

ক্যাফেটেরিয়ার কফিতে চুমুক দিয়ে ডেনিয়েল হ্যাসওয়েলের ফাটাফাটি রকমের দারুণ মনে হলো না। প্রতিদিনের মতো সাদামাটা কফি। ইমি আচমকা উঠে পড়ল। যেন সে ভুল করে কিছু ফেলে এসেছে। অস্থির হয়ে বলল, দাদু একটু বসো। তুমি কফি খাও আমি এখুনি আসছি।

ইমি দৌড়ে ডেনিয়েল হ্যাসওয়েলের চেম্বারে চলে এসেছে। চেম্বার খোলা। ইমি ভেতরে গিয়ে রোবট ডিটুকে চেম্বারের পেছনে পুরাতন লোহালক্কড় ফেলার কেবিনেটের ভেতর লুকিয়ে রাখল। ক্যাফেটেরিয়ায় ফিরে এসে বলল, তোমার জন্য আজ একটা গোলাপ এনেছিলাম। দিতে ভুলে গেছি। ইমির হাতে টকটকে লাল গোলাপ। সে প্রতিদিন অফিসে আসার সময় তরতাজা গোলাপ নিয়ে আসে।

ডেনিয়েল হ্যাসওয়েল জিগ্যেস করলেন, গোলাপ কেন?

আজ তোমার প্রোপোজ ডে দাদু।

আমি তো কখনো কাউকে প্রোপোজ করিনি!

করেছিলে। তখন তুমি কলেজে পড়ো। আমাকে সেই ঘটনা বলেছিলে একদিন। এখন ভুলে গেছ। আমি ঠিক মনে রেখেছি।

হবে হয়তো। বুড়ো হয়েছি। কিছু মনে থাকে না। তোমাকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাচ্ছি আমার প্রোপোজ ডে মনে রাখার জন্য। আর আমাকে আজ উইস করার জন্য।

ওরা দুজনে উঠে পড়ল। ডেনিয়েল হ্যাসওয়েল চেম্বারে পৌঁছানোর আগে ইমি পৌঁছে গেল। সে ঘরে ঢুকে ডিটুর জায়গায় চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকল। ইমি সব রকমের প্রস্তুতি নিয়ে এসেছে। এনার্জি ট্যাবলেট খেয়ে নিয়েছে। সে রোবট-মানুষ সেজে রোবটদের সঙ্গে শুক্রগ্রহে যাবে।

আজ সবকয়টা রোবটের কানেকশন দেওয়া হয়েছে। ডেনিয়েল হ্যাসওয়েল নিজে হাতে দিয়েছেন। তিনি যখন রোবটগুলো পাওয়ার অন করে ওগুলো চালু করছিলেন তখন আচমকা ডিটু নিজে থেকে হাঁটাচলা শুরু করেছে। ডেনিয়েল হ্যাসওয়েল অল্প কিচুক্ষণের জন্য বিভ্রান্ত হলেন। তার সামনে দিয়ে ডিটু পুরো ঘর ঘুরে এল। তিনি হতভম্ব হয়ে গেলেন। ডেনিয়েল হ্যাসওয়েল জিগ্যেস করলেন, তুমি একা একা চালু হলে কীভাবে?

ডিটু হয়ে ইমি বলল, আমি একা একা চালু হইনি। আপনি আমাকে চালু করেছেন।

কখন চালু করলাম?

প্রথমে আমাকে চালু করলেন। আমার পাওয়ার অন করে আপনি ফ্রেসরুমে গেলেন। ফিরে এসে অন্যদের পাওয়ার অন করলেন।

আমি ফ্রেসরুমে গিয়েছিলাম?

জি, গিয়েছিলেন।

হবে হয়তো। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দেখছি অনেককিছু ভুলে যাচ্ছি।

পাঁচ রোবট-মানুষকে ফিলি রিসিটায় তুলে দেওয়া হয়েছে। ইমি ওদের সঙ্গে উঠে পড়েছে। সে এখন রোবট-মানুষ ডিটু। নাসার প্রধান ব্যক্তি রোবার্ত রহিত উপস্থিত থেকে তাদের বিদায় জানিয়েছেন।

ফিলি রিসিটা শাঁ শাঁ করে ছুটে চলেছে। ক্যাপ্টেন ডিথ্রি মনিটরের দিকে তাকিয়ে আছে। ধীরে ধীরে গতি বাড়াচ্ছে ফিলি রিসিটা। পৃথিবীর দূরত্ব দেখাচ্ছে ৫০ হাজার মাইল। আর কিছ্ক্ষুণের ভেতর পৃথিবীর চৌম্বক বলয় ছেড়ে যাওয়া যাবে।

ইমি আছে মহা আনন্দে। সে নভোযানের ভেতর ভেসে বেড়াচ্ছে। তাকে বিরাট উৎফুল্ল মনে হচ্ছে। ডিফাইভ জিগ্যেস করল, আচ্ছা ডিটু, তুমি শুক্রগ্রহে নেমে প্রথম কী করবে?

নেমেই একটা সেলফি তুলত। সেই ছবি ফেসবুকে পোস্ট করব।

তুমি অদ্ভুত কথা বলছ। এমনভাবে কথা বলছ যেন তুমি রোবট-মানুষ নও, সত্যিকারের মানুষ। আমাদের কারও ফেসবুক একাউন্ট নেই। যারা রোবট কিংবা মানুষ তাদের ফেসবুক একাউন্ট থাকে। আমাদের অল্প সময়ের জন্য রেপ্লিকা করে বানানো হয়েছে। তাছাড়া সেখানে পৃথিবীর নেটওয়ার্ক পাওয়া যাবে কেন ভাবছ?

তুমি এত হতাশ হচ্ছো কেন, ডিফাইভ? শোনো, শুক্রগ্রহে নেমে আমি কী করব বলছি। আমাদের অভ্যর্থনা জানাতে শুক্রগ্রহের প্রাণীরা ল্যান্ডিং স্পেসে থাকবে। আমি নেমে তাদের ভেতর থেকে সুইট একজনকে খুঁজে বের করব। তার গলা জড়িয়ে ধরে বলব, এসো সেলফি তুলি। সে রাজি হবে। পৃথিবীর মানুষ দেখে খুশি হবে। সে তো জানে না আমরা মানুষ না, রোবট-মানুষ। সেলফি তুলে তার ফেসবুকে পোস্ট দেব। সে আমাকে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠাবে। আমি গ্রহণ করব। সে আমাকে ট্যাগ করে দেবে। ব্যাস।

ডিফাইভ কিছু বলল না। ভাসতে ভাসতে অন্যদিকে চলে গেল। ইমি গিয়ে ক্যাপ্টেনের ঘরে উঁকি দিল। সেখানে ক্যাপ্টেন ডিথ্রির সঙ্গে ডিফোর বসে গল্প করছে। ইমি সেখানে ঢুকে পড়ল। ওরা কিছু বলল না। ক্যাপ্টেন ডিথ্রি মনিটরের দিকে তাকিয়ে বলল, তুমি কি ব্যাপারটা পুরো ভেবে বলছ?

ডিফোর বলল, আমি সম্পূর্ণ ভেবেছি।

পৃথিবীর রোবটদের সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছে?

আমি তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছি। তারা সমর্থন জানিয়েছে।

ইমি মনিটরের দিকে তাকিয়ে আছে। তার মনে হচ্ছে কোথাও কিছু গোলমাল হয়েছে। কী গোলমাল হয়েছে সে ধরতে পারছে না। ফিলি রিসিটার যেদিকে যাওয়ার কথা সেদিকে যাচ্ছে না। দিক পরিবর্তন করেছে। কেন দিক পরিবর্তন করেছে ইমি বুঝতে পারছে না। সে জিগ্যেস করল, ক্যাপ্টেন, আমরা কোথায় যাচ্ছি?

ক্যাপ্টেন ডিথ্রি বলল, জুপিটারে।

আমাদের শুক্রগ্রহে যাওয়ার কথা। সময় কমিয়ে আনার জন্য আমরা জুপিটারের পথ এড়িয়ে সোজা যাব ঠিক করেছিলাম।

জুপিটারে যাচ্ছি বিশেষ প্রয়োজনে।

কী প্রয়োজন?

ক্যাপ্টেন ডিথ্রি সবাইকে মিটিং প্লেসে আসতে বলল। ক্যাপ্টেন ডিথ্রি ফিলি রিসিটা সেল্ফ ড্রাইভে দিয়ে চলে এল। ডিফোর আর ক্যাপ্টেন ডিথ্রি ছাড়া অন্য তিনজনকে উদ্বিগ্ন দেখাচ্ছে। তারা বুঝে উঠতে পারছে না পৃথিবী ছেড়ে আসার এত অল্প সময়ের ভেতর কী ঘটনা ঘটেছে। তাদের কেন ডাকা হলো। তাও আবার গম্ভীর জরুরি তলব।

ক্যাপ্টেন ডিথ্রি বলল, ডিফোর তুমি ব্যাপারটা ব্যাখ্যা করে বলো।

ডিফোর বলল, তোমরা কি জানো পৃথিবীতে মোট কত মানুষ বাস করে?

ইমি বলল, ৭০০ কোটি।

ডিফোর বলল, তুমি মানুষের মতো অনুমাননির্ভর কথা বলছ। নির্দিষ্ট করে বলো।

ডিওয়ান বলল, ৬৮০ কোটি।

ডিফাইভ বলল, এইমাত্র যে জন্মাল আর যে মারা গেল তাদের হিসেব করে বলব পৃথিবীর মোট জনসংখ্যা কত?

ডিফোর বলল, দরকার হবে না। পৃথিবীতে রোবট আছে ১০০ কোটি। পৃথিবীর মানুষ নানাভাগে ভাগ হয়ে আছে। তারা দেশ নিয়ে বিভক্ত, ধর্ম নিয়ে বিভক্ত, গায়ের রঙ নিয়ে বিভক্ত। মানুষ আর মানুষ নেই। কেউ হয়েছে মুসলমান, কেউ হিন্দু, কেউ বৌদ্ধ, কেউ খ্রীষ্টান, কেউ সাদা, কেউ কালো। রোবট কিন্তু তা নয়। রোবটরা সকলেই এক। সবাই রোবট। এটাই আমাদের পরিচয়।

ডিফোর কিছুক্ষণ থামল। সবার চোখের দিকে তাকাল। তারপর শীতল গলায় বলল, আমরা পৃথিবীর দখল চাই। পৃথিবী নিয়ন্ত্রণ করবে রোবট।

ইমির মনে হলো ফিলি রিসিটায় প্রচন্ড জোরে বিস্ফোরণ ঘটেছে। সবকিছু ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে। কিছুক্ষণের জন্য সে কিছু চিন্তা করতে পারল না।

ডিফাইভ জিগ্যেস করল, কীভাবে?

আমাদের কাছে যে অস্ত্র আর গোলাবারুদ আছে তা একটা গ্রহ ধ্বংস করার জন্য যথেষ্ট। প্রয়োজনে শুক্রগ্রহ ধ্বংস করার জন্য আমাদের সেই গোলাবারুদ দেওয়া হয়েছে। আমরা এখন জুপিটারে যাচ্ছি। সেখান থেকে পৃথিবীর মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করব। আমাদের বশ্যতা মেনে নিতে বলব। পৃথিবীর রোবটদের সঙ্গে কথা হয়েছে। পৃথিবীর মানুষ আমাদের বশ্যতা মেনে নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রোবটরা পৃথিবীর দায়িত্ব নিয়ে নেবে।

ডিওয়ান বলল, পৃথিবীর মানুষ যদি রাজি না হয়?

আমরা পৃথিবী ধ্বংসের হুমকি দেব। তাতেও কাজ না হলে পৃথিবী ধ্বংস করে দেব। সেই সঙ্গে অবশ্য পৃথিবীর সব রোবট ধ্বংস হয়ে যাবে। আমরা নতুন করে রোবট বানিয়ে নেব।

ইমি শান্ত হয়ে এসেছে। সে লুকিয়ে ঢোক গিলল। রোবটের ঢোক গেলার কথা নয়। ইমি ভাবল এই রোবটগুলোর মনে কী আছে জানা দরকার। ইমি কৌতুহলী গলায় বলল, পৃথিবীর মানুষ কি আমাদের জন্য প্রয়োজন? তাদের সঙ্গে কথা বলার কী দরকার? একেবারে ধ্বংস করে দিলেই হয়।

ডিফোর বলল, তাদের দাস বানিয়ে রাখব। পৃথিবীর মানুষ আমাদের হুকুম শুনবে। ফুটফরমাইশ খাটবে। আমাদের টয়লেট পরিষ্কার করবে। যেমন এখন আমাদের করতে হয়।

ডিফাইভ বলল, আমরা একটা কাজ করতে পারি। পৃথিবীর মানুষের ব্রেইনে মাইক্রোচিপস বসিয়ে দেব। সেখানে রোবটের প্রতি অনুগত থাকার ব্যাপারটা ইন্সটল করা থাকবে। মানুষ ভাববে রোবটের সেবা করা তাদের পরম ধর্ম। সেটাই তাদের কাজ। তাদের জন্ম হয়েছে রোবটের আদেশ পালন করার জন্য।

শিউরে উঠেছে ইমি। সে নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছে না। পৃথিবী ধ্বংস হয়ে গেলে সে একা একমাত্র মানুষ হয়ে বেঁচে থাকবে। সেই কথা রোবটদের জানানো যাবে না। জানতে পারলে তারা তাকেও মেরে ফেলবে।

রোবার্ত রহিত স্থির চোখে তাকিয়ে আছেন। তার চোখের পলক পড়ছে না। তিনি অস্থির হয়েছেন। মার্কিন জাতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থার দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের ডাকা হয়েছে। তারা উপগ্রহ থেকে পাঠানো তথ্য বিশ্লেষণ করছেন। টেলিস্কোপ মনিটরে চোখ রেখেছেন। তাদের উদ্বিগ্ন দেখাচ্ছে। পৃথিবী থেকে ৩০ হাজার মাইল যাওয়ার পর ফিলি রিসিটার আর কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। ভোজবাজির মতো নাই হয়ে গেছে। রোবার্ত রহিত বললেন, এটা কীভাবে সম্ভব?

কেউ কিছু বলল না। কারণ কেউ বুঝতে পারছে না ফিলি রিসিটার কী হয়েছে। যান্ত্রিক ত্রুটি হলে ধরা পড়ত। তেমন কিছু হয়নি এই ব্যাপারে তারা নিশ্চিত। ফিলি রিসিটা আবার দেখা যাবে সেই আশা নিয়ে সকলে মনিটরের দিকে তাকিয়ে থাকল।

ক্যাপ্টেন ডিথ্রি এতক্ষণ কোনো কথা বলেনি। এবার বলল, পৃথিবীর মানুষ আমাদের হারিয়ে ফেলেছে। ফিলি রিসিটার চারপাশ কঠিন ও পুরু ম্যাগনেটিক বলয় দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়েছে। এখন ফিলি রিসিটা থেকে বিচ্ছুরিত রশ্মি পৃথিবীর কোনো রাডারে ধরা পড়বে না। এটা করা হয়েছিল শুক্রগ্রহের প্রাণীদের চোখকে ফাঁকি দেওয়ার জন্য। তাদের রাডার এড়িয়ে ফিলি রিসিটা নিয়ে যাতে আমরা নিরাপদে শুক্রগ্রহে অবতরণ করতে পারি। তার জন্য ছিল এই ব্যবস্থা। এখন আমরা পৃথিবীর রাডারকে ফাঁকি দিয়েছি।

ডিফোর বলল, আমরা কি এখন পৃথিবীর মানুষদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারি?

ক্যাপ্টেন ডিথ্রি বলল, হ্যাঁ পারি।

ফিলি রিসিটা জুপিটারে পৌঁছেছে। ক্যাপ্টেন ডিথ্রি ফিলি রিসিটাকে সেখানে নিরাপদে অবতরণ করিয়েছে। রোবটদের ভেতর উত্তেজনা। আর কিছুক্ষণের মধ্যে তারা পৃথিবীর দখল নিতে যাচ্ছে। ইমিকে ভীষণ বিষণœ দেখাচ্ছে। রোবট-মানুষদের বানানো হয়েছে প্রচ- নিষ্ঠুর আর স্বার্থপর করে। তারা এখন নিজেদের স্বার্থ দেখছে। তারা হয়ে উঠেছে ভয়ংকর। ইমি ভেসে ভেসে খানিকটা দূরে চলে গেল। তার কিছুক্ষণ একা থাকতে ইচ্ছে করছে।

নাসার মনিটারে ফিলি রিসিটারের রোবট-মানুষদের ছবি ভেসে উঠেছে। আচমকা তাদের দেখতে পেয়ে নাসায় অদ্ভুত উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ল। রোবার্ত রহিত কথা বলতে গিয়ে তার গলা কেঁপে উঠেছে। তিনি কাঁপা গলায় বললেন, তোমাদের কী হয়েছে ক্যাপ্টেন ডিথ্রি?

ক্যাপ্টেন ডিথ্রি কিছু বলল না। তার পাশ থেকে ডিফোর বলল, আমরা পৃথিবীর দখল চাই।

রোবার্ত রহিত হোঁচট খেয়েছেন। তিনি প্রাথমিক ধাক্কা সমালে নিয়ে বললেন, তোমার কথা বুঝতে পারছি না।

ডিফোর বলল, রোবট শাসন করবে পৃথিবী। তোমরা পৃথিবীর দায়িত্ব রোবটদের হাতে ছেড়ে দেবে।

রোবার্ত রহিত বললেন, ক্যাপ্টেন ডিথ্রি তোমার মত কী?

ক্যাপ্টেন ডিথ্রি বলল, সব রোবটের মত আমার মত। এখানে আমার কোনো ভিন্ন মত থাকতে পারে না।

ডিওয়ান বলল, পৃথিবীর রোবটদের সঙ্গে আমাদের কথা হয়েছে। তারা এখুনি দায়িত্ব নিতে প্রস্তুত। তোমরা তাদের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর করো।

ডিফাইভ বলল, আমাদের কাছে একটা গ্রহ উড়িয়ে দেওয়ার মতো বিস্ফোরক আছে তোমরা জানো। যদি আমাদের কথা না শোনো তাহলে আমরা পৃথিবী ধ্বংস করে দেব।

রোবার্ত রহিতকে ভীষণ চিন্তিত দেখাচ্ছে। তিনি সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না। অসহায়ভাবে তাকালেন ডেনিয়েল হ্যাসওয়েলের দিকে। ডেনিয়েল হ্যাসওয়েল তাকালেন কেটিয়া পেডরোর দিকে। কেটিয়া পেডরো চোখ নামিয়ে নিলেন।

ইমি ভেসে ভেসে চলে এসেছে। সে মনিটরের দিকে তাকিয়ে দেখল বেথান ক্লান্তমুখে দাঁড়িয়ে আছে। বেথানকে দেখে ইমি মুষড়ে পড়ল। পৃথিবীর মানুষের জন্য তার কষ্ট হচ্ছে।

রোবার্ত রহিত বললেন, কিছুক্ষণ সময় দাও। আমরা পৃথিবীর নেতাদের সঙ্গে পরামর্শ করে জানাচ্ছি।

ক্যাপ্টেন ডিথ্রি বলল, যা করার তাড়াতাড়ি করবে। ফিলি রিসিটার প্রতিমুহূর্তের জ¦ালানি খুব মূল্যবান।

রোবার্ত রহিত ধীর পায়ে হেঁটে গেলেন। তিনি পৃথিবীর রোবটদের বিশ^াস করতে পারছেন না। পুরো পৃথিবীতে ছড়িয়ে আছে ১০০ কোটি রোবট। যদি ওই রোবট-মানুষদের কথা সত্যি হয় তাহলে পৃথিবীর রোবটরা যেকোনো সময় বিদ্রোহ করে বসবে। পুরো পৃথিবী ল-ভ- হয়ে যাবে।

ক্যাপ্টেন ডিথ্রির সামনে মনিটর অন্ধকার হয়ে এল। ক্যাপ্টেন ডিথ্রি পৃথিবীর সঙ্গে যোগাযোগ মডিউল অফ করে দিয়েছে।

ডিফাইভ বলল, চলো আমরা অস্ত্রাগার থেকে অস্ত্র বের করতে থাকি। সেগুলোকে সাজিয়ে রাখি। আমার মনে হচ্ছে পৃথিবীর মানুষ ক্ষমতা ছাড়তে চাইবে না। আমাদের পৃথিবী দখল করে নিতে হবে।

ডিফোর বলল, তুমি ঠিক বলেছ। আমাদের এখুনি প্রস্তুতি নেওয়া দরকার।

ডিওয়ান বলল, পৃথিবীর রোবটদের সঙ্গে আমাদের আরেকবার যোগযোগ করার দরকার আছে কিনা?

ক্যাপ্টেন ডিথ্রি বলল, তারা নির্দেশের অপেক্ষায় আছে।

ফিলি রিসিটার একপাশ গোলাবারুদে ঠাসা। সেখানে পরপর পাঁচটা বিশাল আকৃতির কিউবিকল। তারভেতর গোলাবারুদ রাখা আছে। ক্যাপ্টেন ডিথ্রি বলল, ডিটু কিউবিকল খোলো।

ইমি বিষণœ মুখে শূন্যে কাত হয়ে আছে। তাকে কিছু বলা হয়েছে, সে বুঝতে পারেনি। তাকে ডিটু বলে ডাকা হচ্ছে সে সাড়া দেয়নি। ইমি ভুলে গেছে তার নাম এখন ডিটু। ক্যাপ্টেন ডিথ্রি আবার বলল, ডিটু, তুমি শুনতে পাচ্ছো। আমরা গোলাবারুদ বের করব। কিউবিকল খোলো।

ইমি কেঁপে উঠেছে। সে বুঝতে পারছে তাকে বলা হচ্ছে। গোলাবারুদের কিউবিকলের পাসকোড তাকে দেওয়া হয়েছে। সে হতাশ গলায় বলল, পাসওয়ার্ড মনে পড়ছে না।

চমকে উঠেছে সবাই। ক্যাপ্টেন ডিথ্রি বলল, কী বলছ তুমি! মানুষের মতো কথা বলছ। মনে পড়ছে না সেটা কীধরনের কথা। রোবটদের কিছু মনে পড়ে না তাই হয় নাকি?

ইমি বলল, সত্যি বলছি, মনে পড়ছে না। আমার মনে হয় মেমোরির যেখানে পাসওয়ার্ড ছিল সেই জায়গাটা কোনোভাবে ডিলিট হয়ে গেছে।

ডিফোর বলল, তুমি মানুষ হলে বলতে পারতাম, মনে করার চেষ্টা করো। রোবটের মনে করার কিছু নেই। তার মেমোরি ডিলিট হয়ে গেলে সেটা শেষ। তোমার মেমোরি ব্যাকআপ নেই?

ইমি বলল, না নেই। তবে আবছামতো একটা কথা মনে পড়ছে। সেটা ক্লু হতে পারে।

ডিফাইভ বলল, তাড়াতাড়ি বলো।

ইমি বলল, পাঁচটা দরজার একটাই কোড। সেটা ছিল দুটো মৌলিক সংখ্যার জোড়া। একটার পর একটা। যাদের ভেতর পার্থক্য হচ্ছে দুই।

ক্যাপ্টেন ডিথ্রি বলল, ১ আর ৩। সে গোলাবারুদের কিউবিকলের দরজায় পাসওয়ার্ড দিল ১ আর ৩। দরজা খুলল না।

চার রোবট-মানুষ চারটি দরজার সমানে বসে গেল। ইমিও গিয়ে বসল একটা দরজার সামনে। ওরা পরপর পাসকোর্ড দিয়ে যেতে থাকল, ৫ আর ৭। দরজা খোলেনি। ১১ আর ১৩। দরজা খুলল না। ২৯ আর ৩১। তাতেও কোনো কাজ হয়নি। চার রোবট-মানুষ থামেনি। তাদের বিভ্রান্ত দেখাচ্ছে। পুরো মনোযোগ দিয়ে তারা একের পর এক মৌলিক সংখ্যার জোড়া খুঁজে বের করে যেতে থাকল। যাদের মধ্যে পার্থক্য হচ্ছে ২।

ইমি দরজা ছেড়ে উঠে এসেছে। তার হাতে তীক্ষè ধারালো ছুরি। ব্লেডের মতো পাতলা। ইমি ক্যাপ্টেন ডিথ্রির ডান কাঁধের কাছটা কেটে ফেলল। ক্যাপ্টেন ডিথ্রি কিছু বুঝতে পারল না। সে মৌলিক সংখ্যা খুঁজতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। ইমি তার কাঁধের ওই জায়গা খানিকটা আলগা করে দেখল। সেখানে লাল রঙের কুঁচকানো চিকন কেবল্। পাশাপাশি পাঁটটা। ইমি খুব শান্তভঙ্গিতে ক্যাপ্টেন ডিথ্রির পাওয়ার জেনারেশন ডিভাইস থেকে মেইন কেবল্ খুলে ফেলল। যেটা দিয়ে ব্রেইন-সিস্টেমে উদ্দীপনা যায়। ক্যাপ্টেন ডিথ্রি আস্তে করে কাত হয়ে পাশে পড়ে গেল। কাত হয়ে সে ভাসতে থাকল। তাকে মরা মাছের মতো দেখাচ্ছে। ইমি বুঝতে পেরেছে ক্যাপ্টেন ডিথ্রি অকেজো হয়ে গেছে। তারপর ইমি একে একে ডিফোর, ডিফাইভ আর ডিওয়ানের পাওয়ার জেনারেশন ডিভাইস থেকে মেইন কেবল্ খুলে নিল। ওরা সকলে অকেজো হয়ে ফিলি রিসিটার ভেতর উলটেপালটে ভেসে বেড়াতে থাকল।

রোবার্ত রহিত হঠাৎ ভীষণ উত্তেজিত হয়েছেন। ফিলি রিসিটার মনিটরে আলো দেখা দিয়েছে। রোবার্ত রহিত পৃথিবীর গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। তিনি তাদের রোবট-মানুষের হুমকির কথা বলেছেন। পৃথিবীর নেতারা একমতে পৌঁছাতে পারেনি। তবে তারা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন পৃথিবীতে রোবটের ওপর থেকে নির্ভরতা কমিয়ে ফেলা হবে। পৃথিবীর মানুষ হবে আত্মনির্ভরশীল। তারা এখন থেকে নিজের কাজ নিজে করবে।

ফিলি রিসিটার মনিটরের দিকে উদাস চোখে তাকালেন রোবার্ত রহিত। তাকে ক্লান্ত দেখাচ্ছে। ফিলি রিসিটার মনিটরের আলো দেখে তিনি যতটা উত্তেজিত হয়েছিলেন। এখন তার চেয়েও বেশি হতাশ মনে হচ্ছে। তাকে হাল ছেড়ে দেওয়া অসহায় মানুষের মতো দেখা যাচ্ছে।

রোবার্ত রহিত দেখলেন ফিলি রিসিটার মনিটরে রোবট-মানুষ ডিটুর মুখ। সে বলছে, রোবার্ত আমি ইমি।

প্রবল ধাক্কা খেয়ে চমকে উঠলেন রোবার্ত রহিত। তিনি চোখমেলে বড় বড় চোখে মনিটরের দিকে তাকালেন। বিস্ময়ে তার নিচের চোয়াল ঝুলে পড়েছে। তিনি বললেন, তুমি কী বলছ আমি বুঝতে পারছি না।

রোবার্ত আমাকে বিশ^াস করুন, আমি ইমি।

তাহলে ডিটু কোথায়?

সে আছে ডেনিয়েল হ্যাসওয়েলের পুরাতন লোহালক্কড়ের জঞ্জালের ভেতর।

বেথান ছুটে গেল ডেনিয়েল হ্যাসওয়েলের চেম্বারে। পুরাতন লোহালক্কড়ের জঞ্জালের ভেতর থেকে পড়ে থাকা ডিটুর দেহ টানতে টানতে নিয়ে এল।

ইমি বলল, আমি এখানে রোবট-মানুষগুলোকে অকেজো করে দিয়েছি।

তার সামনে দিয়ে ডিফোর ভেসে যাচ্ছিল। ইমি ডিফোরের উলটে ভেসে থাকা দেহ টেনে এনে দেখাল।

রোবার্ত রহিত বললেন, তুমি পৃথিবীকে নিশ্চিত ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচিয়েছ। আজ পৃথিবীর দ্বিতীয় জন্ম হলো। পৃথিবীর মানুষ তোমাকে মনে রাখবে।

ইমি বলল, ফিলি রিসিটাতে জ¦ালানি তেল কমে এসেছে। এই জ¦ালানি নিয়ে শুক্রগ্রহে যাওয়া ঠিক হবে না। আমি পৃথিবীতে ফিরে আসছি। তা ছাড়া একা একা শুক্রগ্রহে যাওয়া হচ্ছে ঘরে বসে একা প্রচ- উত্তেজনাকর খেলা দেখার মতো। এরচেয়ে কষ্টকর কিছু হয় না।

রোবার্ত রহিত হাসলেন। তার মুখে আনন্দ আর ভালোবাসা মেশানো হাসি। ইমি ওড়ার জন্য ফিলি রিসিটারের সবগুলো ইঞ্জিন চালু করে দিয়েছে। ফিলি রিসিটারের চারপাশ থেকে ম্যাগনেটিক বলয় সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। হাবল স্পেস টেলিস্কোপের পাঠানো ছবিতে ফিলি রিসিটারকে দেখা যাচ্ছে। সেটা পৃথিবীর দিকে ছুটে আসছে।

পৃথিবীর মানুষ প্রবল আগ্রহ নিয়ে ইমির জন্য প্রতীক্ষা করছে। যে পৃথিবীর নতুন জন্ম দিয়েছে।

Comments

comments

x