আজ শনিবার | ১৮ নভেম্বর২০১৭ | ৪ অগ্রহায়ণ১৪২৪
মেনু

বানভাসি

দীপু মাহমুদ | ১৯ আগ ২০১৭ | ২:৪৫ অপরাহ্ণ

Dipu Mahmud

: আজকের এই আসরে উপস্থিত সুধিজন, ফিরা চান একবার, ফিরা চান চারিধার। কী দেখা যায়? জবান বন্ধ ক্যান সব্বার? যায় কি দেখা কিছু চক্ষু বরাবর?

: যায়-যায়।

: কী? কী দেখা যায় কন।

: অথৈ জলরাশি। পানির পরে পানি চারিধার। শতজোড়া চক্ষুর জ্যোতির নাগাল পানির মাতম কেবল।

: সন্ধ্যা সমাগত প্রায়। পশ্চিমাকাশে সূর্য অস্ত যায়। বানের জলে হাওয়া কাঁপন লাগায়। মেঘ কেটে তখন রোদ্দুর আভা দেখা দেয়। নরম কমলায় দীপ্তি ছড়ায়। বৃষ্টির পরে হঠাৎ আলোর আভাস। পশ্চিম আকাশে তখন খুনের প্লাবন। এমন তো হবার কথা নয়। এ কিসের আলামত। দূর হতে আজান শোনা যায়। অস্পষ্ট সে ধ্বনি, মাঝেমধ্যে স্পষ্ট হয়। শঙ্খ বাজে। মনে হয় ইসরাফিল শিঙ্গা ফুঁকায়।

কাশেমালি ধীরে ধীরে দুই পায়ে ভর দিয়ে উঠে দাঁড়ায়। সোজা না হয়। নাকি আবার ভেঙে পড়ে যায়। এক পা দুই পা করে সামনে আগায়। থমকে দাঁড়ায় কাশেমালি, স্থির নিশ্চয়। কী দেখা যায়? সম্মুখে তার কী ভেসে যায়? চতুর্দিকে বানভাসি মানুষের কোলাহল অকস্মাৎ স্তব্ধ প্রায়। কলার ভেলায় কে বা তার পুতেরে ভাসায়। দেবতার সন্তান বুঝি এরকমই হয়। নিষ্পাপ চেহারা তার মানুষ নয় য্যান তারে ফেরেশতাই কয়। বানের টানে পুত্রধন দুলতে দুলতে যায়। কার বুক খালি করে পুত্র ভেসে যায়, কাহারে শুধায়? কাশেমালি স্থির তখন। বুকটা টান করে লাশের পানে চায়। ঘূর্ণিটানে ভাসতে থাকে ভেলা। নিশ^াস বন্ধ কাশেমালির অঙ্গ মাটিতে লুটায়। দূরে যে বৃক্ষ খানিক মাথা জাগায়, ভেলা গিয়ে সেইখানে আটকায়। মাটি আঁকড়ে কাশেমালি আল্লারে শুধায়- কোন পাপে, কোন পাপে এত বড়ো শাস্তির ভার আমায় বইতে হয়?

: কী হয় কাশেমালির? জবান বন্ধ ক্যান এখন তোমার? কথা কও গায়েন, কেচ্ছা শোনাও।

: যে কথা মানুষটা বারবার ভুলতে চায়। বানের জলের নাহাল সেই স্মৃতিই কেবল তারে আটকায়, দুমড়ায়, মচকায়। কাশেমালি পাগলের মতো বানের জলে থাপড়ায়। কিল ঘুসি দেয়, লাঠিতে পেটায়। শরীর জুড়ায় না কাশেমালির কলজে পুড়ে যায়। শিউলি ফুলের মতোন বৌ তার চক্ষুষ্মান হয়।

সেদিন ছিল ভরা পূণিমা। উথালপাতাল জোছনায় ডুবে যায় সব। চাঁদের আলো ফিনকি দিয়ে ওঠে। পূর্ণিমার টানেই বুঝি সাগর উতলায়। দূর থেকে বাঁধ ভাঙা পানির শব্দ শোনা যায়। ঘরে বাঁধা ছাগল, গোয়ালের গাভীন গাই আচানক হাম্বায়। বাঁশের খাঁচায় আটকে রাখা হাঁস-মুরগি, গাছের ডালে পাখ-পাখালি, বাঁশের ঝাঁড়ে পশুশাবক নিদ্রা ভেঙে কেবলই ছটফটায়। কাকে জিগায় কাশেমালি, কোন দিকে যায়!

বানের পানি ঢুকে পড়ে ঘরের ভেতর এক ঝটকায়। ভেসে যায় কন্যার খেলার পুতুল, পুত্রের লাটিম, হাড়িপালিত সব। বানের তোড়ে ভেসে যায় কাশেমালির ঘর সংসার স্বপ্নসাধের বেছন সকল। বানভাসি মানুষের চিৎকারে বুঝি কেয়ামতের আলামত পাওয়া যায়। দিগবিদিক জ্ঞানশূন্য মানুষ তখন দিশা হারায়। ছুটতে থাকে মানুষ, পথ যে যেদিকে পায়।

কলসের নিচে একমুঠো খুদ, শিকেয় তোলা আটার সঞ্চয়, ডেগি মুরগি, খুচরো পয়সা, ময়লা টাকার নোট- দুই হাত বন্ধ কাশেমালির বৌ পাগলপ্রায়। ঘাড়ে তুলে নেয় পুত্র কন্যা কাশেমালি বাঁচার আশায়। গলা ছেড়ে হাঁক দেয়- বৌ ও বৌ এদিকে আয়।

সুনসান চারিধার। মানুষের চিৎকার। বানের টানে ভেসে যাওয়া সংসার সকল। পানি বাড়ে। কাশেমালির গলার স্বর বেড়ে যায় ততোধিক। বুজে আসা ভাঙা গলায় ডেকে যায়- বৌ ও বৌ এদিকে আয়।

বৌ না আসে ফিরে। বানের পানি তেড়ে আসে। পাক খায়। হাজারো সর্পের ফণা তুলে ছোবল মারে ঢেউ। বা’ কাঁধে কন্যা কাশেমালির পুত্র দক্ষিণ কাঁধে রয়। আতঙ্কে নীলপ্রায় সহোদর দুইজন বাপেরে আঁকড়ায়। মাথার উপর বুঝি কোনো এক শকুন ঝাপটায়। পানি পিপাসায় ছাতি ফেটে যায় কন্যার। কণ্ঠে আওয়াজ না হয়। বাপের ভয়। দুধের কন্যা তখন পানির কথা গোপনে ভায়ের কাছে কয়। অসহায় ভাই করুণ চোখে চায়। চারিধারে পানি, পাক খেয়ে যায়। বোন তার মরে বুঝি ভীষণ তেষ্টায়।

পথ খুঁজে ফেরে কাশেমালি। উজানের দিকে ধায়। ডাঙা চায়। শুকনো জমিন চায়। তিনজন মানবসন্তান বুঝি এইবার নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। কাশেমালি ঘাড় ঘোরায়। অসহায় কাতর চোখে চায়। নিরাশায় হতাশায় তখনো জেগে থাকে চোখ প্রবল আশায়। কাশেমালি চারিধারে চক্ষু ফেরায়। একবার, শুধু একবার যদি বৌয়ের দেখা পাওয়া যায়। পানি বাড়ে, হায়! নিষ্ঠুর পানির তোড়। নিষ্ঠুর সময়। বৌয়ের সন্ধান পাওয়া না যায়।

পানির ভীষণ গর্জন শোনা যায়। চক্ষুজোড়া কাশেমালির ডাঙার সন্ধানে রয়। স্কন্ধে পুত্রকন্যা বাপেরে শুধায়- বাপজান, মা কি তবে ভেসে গেছে নিশ্চয়?

তখন বৃষ্টি শুরু হয়। দুর্যোগের রাত বুঝি দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয়। কাশেমালির বাষ্পহীন বক্ষপিঞ্জরে হাতুড়ি পেটায়। সন্তান দুয়ের চোখের পানি বৃষ্টিতে ধুয়ে যায়।

স্রোতের টান তখন আরও বেড়ে যায়। পায়ের নিচের মাটি সরে সরে যায়। ডুবে যায় কাশেমালি। একটা বৃক্ষশাখা কি মাটির পাতিল হাতড়ায়। আচমকা পায়ে ঠেকে শক্ত মাটি। কাশেমালি আঁকড়ে দাঁড়ায়। পিছল মাটি, স্রোতের টানে পিছু হটে যায়। দম নিতে কষ্ট হয় কাশেমালির, বুক তার পানিতে আটকায়। কাঁধের উপর সন্তানদ্বয়ের ভার বেড়ে যায়। বুকের সাথে ঘন হয়ে আসে দুই জোড়া পা। পায়ের চাপে ছাতি ফেটে যায়।

নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে কাশেমালির। তখন সে উন্মাদ প্রায়। চোখের সামনে ধেয়ে আসে মরণ। মরণ তার শিথানে থমকায়। বাম কাঁধের বাঁধন ছেড়ে দেয় কাশেমালি, কন্যা সেথায়। বাপেরে আঁকড়ে ধরে কন্যা বাঁচার আশায়। আলগা করে কন্যার বন্ধন পিতা এক ঝটকায়। ভেসে যায় ময়না তার অকুল দরিয়ায়।

বুক ভরে নিশ্বাস নেয় কাশেমালি। সম্মুখে তাকায়। তখুনি বাজ পড়ে। বিজলির চমকে ফেড়ে ফ্যালে আসমান জমিন সমান। পৃথিবী তখন দুই ভাগে ভাগ হয়ে যায়। হতবাক পুত্র দুই হাতে শক্ত করে বাপেরে জাপটায়। উজান বেয়ে সম্মুখ পানে ধায় কাশেমালি। দূর দিগন্তের পানে চায়। একফোটা শুকনো জমিন, গাছের গুড়ি, মাটির ঢিবি কোথাও কিছু নাই। পানিতে জোছনা পড়ে পানিতে হারায়। সাপের ফণা তুলে বানের ঢেউ আছড়ায়। নাই, বুঝি বাঁচার আশা নাই। দুই পা এগোয় তো তিন পা পেছন ফিরে যায়। শরীর বড়ো ভার হয়ে আসে। ক্লান্ত অবসন্ন কাশেমালি বিষাদে ভরে যায়।

পুত্র তারে জাপটে ধরে। অস্পষ্ট স্বরে কী য্যানো কয়। নাকি কঁকায়? কিছুই বোধ হয় না কাশেমালির। কেবল মৃত্যুর আগে কোনো এক পশুর গোঙানির শব্দ শুনতে পায়। বানের সাথে যুদ্ধে বুঝি এবার সে পরাস্ত হয়।

বুক ছেড়ে পানি এবার কাঁধের উপর দিয়ে বয়। স্রোতের টানে দিশেহারা কাশেমালি তখনো যুদ্ধে লিপ্ত রয়। পুত্র তার অকস্মাৎ অচেনা সুরে বাপের সুধায়- আমারেও কি ছেড়ে দিবা তুমি ময়নার মতোই? কাতর স্বরে সন্তান তারে কয়- কোমর থিকে গামছা খুলি বান্ধি মোরে লও।

বৃষ্টি বাড়ে। তখন জোছনা উধাও। বাড়তে থাকে বানের পানি। বানের পানি উঠে আসে কানের পাশে। কাশেমালি ডুবতে থাকে। দূরে-বহুদূরে মানুষের কণ্ঠস্বর শোনা যায়। বানের পানির ঝাপটায় মানুষের কথা বোঝা না যায়। উজান বেয়ে কাশেমালি বড়ো আশা নিয়ে সেদিক পানে চায়। মানুষ দেখা যায়। কাশেমালি জমাট বাঁধা মানুষের পানে যায়। পুত্র তারে জাপটে ধরে শতগুনে বাঁচার আশায়। ডুবে যায়। ডুবে যায় কাশেমালি গহিন দরিয়ায়।

পানির ওপর মাতম ওঠে। পানির নিচে মানুষ নাকি পশুর লড়াই। কে বা জানে সেথা কোন কিচ্ছার জন্ম হয়। পানির উপ্রে যখন সে শরীর ভাসায়, বড়ো হালকা লাগে তার, কাঁধেতে পুত্র নাই।

পানির নিচের কথা আমার জানা নাই। হয়তো বাঁচার আশায় পুত্র তারে আকুতি জানায়। বাঁচার আশায় পুত্র তখন পিতার সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হয়। হায় বিধি! সেই লড়াইয়ে পুত্রকেই বুঝি পরাস্ত হতে হয়। পানির নিচে মল্লযুদ্ধে পিতা পুত্রকে হারায়। বানের টানে পুত্র ছুটে যায়। ওই যায়। দরিয়ার মাঝে বুক ছিঁড়ে তার মানিক ভেসে যায়।

এই আসরে উপস্থিত জননী সকল, ভাই-ভগ্নি-বন্ধু-স্বজন। উপস্থিত আমার মুরুব্বিগণ- করজোড়ে মিনতি জানাই, ভুলভ্রান্তি নেবেন না দশজন। যেমন যা জেনেছি, বয়ান করেছি। অধিক কিছু করি নাই বর্ণন।

পানির পরে পানি চারিধার। দূরে যে বৃক্ষ খানিক মাথা জাগায়, ভেলা গিয়ে সেইখানে আটকায়। বানের ধাক্কায় ভেলা আবার ভেসে যায় অতল কোন দরিয়ায়? কে বা জানে নিজ হাতে কে তার পুতেরে ভাসায়।

Comments

comments

x