আজ রবিবার | ১৯ নভেম্বর২০১৭ | ৫ অগ্রহায়ণ১৪২৪
মেনু

এক রাতের সংসার

অদিতি আনজুম | ১৮ আগ ২০১৭ | ২:০২ অপরাহ্ণ

Nahid

ক্ষৌণী: কোনো কোনো সময় এমন হয়, মিস করি ভীষণ। তোমার পঞ্চ-ইন্দ্রিয়র সকাতর স্পর্শ, আলিঙ্গন, উন্মোচিত হবার ইচ্ছা, সব….

আদিত্য: আচ্ছা!!! তো, তোমাকে কবে যেন জড়িয়ে ধরেছিলাম? বয়স হয়েছে তো, মনে করতে পারছি না।

ক্ষৌণী: জড়িয়ে না ধরলে উপলব্ধি করা যায় না বুঝি?

আদিত্য: যায় বোধ হয়। তবে মনে মনে মন কলায় টেস্ট নাই। তোমার এই সকাতর পঞ্চ-ইন্দ্রিয় বিষয়টা যদি আরেটু ইলেবোরেট করতে….

ক্ষৌণী: ধ্যাত!! জানো, কোনো কোনো জোস্নায় তোমাকে পাশে পেতে খুব ইচ্ছা করে।

আদিত্য: হাত বাড়িয়ে চেয়ে দেখেছো কখনও?

ক্ষৌণী: সবসময় হাত বাড়িয়েই চাইতে হয়! মন পেতে দিয়ে বসে আছি একযুগ হলো, তাকিয়েও দেখলে না।

আদিত্য: এক যুগ! অথচ খেয়ালই করলাম না! চাইবার মতো করে চাওনি সম্ভবত ক্ষণ। চাইলে তা উপেক্ষা করার সাধ্য আমার ছিল না।

ক্ষৌণী: হবে হয়তো। হয়তো আমিই তোমাকে চাইবার সে দুঃসাহসটা দেখাতে পারিনি।

আদিত্য: কে বারণ করলো?

ক্ষৌণী: নিয়তি। অথবা ঈশ্বরও বলতে পারো। হয়তো প্রকৃতিই চায়নি ইহলোকে পূর্ণতাপ্রাপ্ত হই। পরলোকের উচ্চাকাক্সক্ষা যে বিসর্জন যাবে তবে!

বলেই হেসে উঠলো ক্ষৌণী।

বিছানায় বসে ক্ষৌণীকে নিঃশ্বাসের দুরত্বে টেনে আনলো আদিত্য। ক্ষৌণীর পেটে নাক ঘষে বলল: ‘এবার দেখো তো একটু সাহস দেখাতে পারো কি না।’

মৃদু হেসে মাথাটা আলতো করে নিজের সাথে মিশিয়ে দিয়ে কোমল হাতে আঙুল চালালো আদিত্যের চুলে। সেই আদরটুকু উপভোগ্য। আদিত্য সাধক পুরুষ ছিল না কখনও।

ইন্দ্রিয় কখনও ইহলোক-পরলোক বিবেচনায় জেগে উঠে না। শাড়ির ফাঁক গলে আদিত্যের ঠোঁট খুঁজে পেল মসৃণ এক উপত্যাকা। দুইদিনের কিশোর-দাঁড়ির আঁচড়ে কেঁপে কেঁপে উঠছে সে উপত্যাকা। চোখ বন্ধ করে সে কম্পনের সুখ নিচ্ছে সে। আগে কখনও এতটা কাছে আসেনি ক্ষৌণী। অদ্ভূত এক ভাললাগা ছড়িয়ে পড়ছে উপত্যাকা ছাড়িয়ে সূর্য পর্যন্ত। পাছে নেশা ধরে যায়, চোখ খুলল আদিত্য। উপত্যাকার ডান কোণে একটা বড় কাটা দাগ জ্বলজ্বলে চোখে তাকিয়ে আছে ওর দিকে। আলতো করে আঙুল ছোঁয়ালো কাটা দাগটার উপর।

আদিত্য: এটা হলো কীভাবে?

ক্ষৌণী: (মুচকি হেসে) গত জন্মের পাপ (বলেই একটা চোখ টিপ দিলো)

আদিত্য: মানে কি? হেঁয়ালি করছো কেন? কী হয়েছিল?

ক্ষৌণী: আরে গাধা, এটা অপারেশনের দাগ। আমার অ্যাপেনডিস্ক অপারেশন হয়েছিল।

আদিত্য: তাই বলে এমন পুরু হয়ে ফুলে থাকবে কাটা জায়গাটা? কত বছর আগে?

ক্ষৌণী: বিশ বছর। তবে কি জানো আদি, শরীরে যে কাটা দাগ একবার বসে যায়, মলিন হয়তো হয় ঠিকই সে দাগ, বিলীন হয় না কখনও।

কাটা দাগে ঠোঁট ছোঁয়ালো আদিত্য। আরও একবার শিহরিত হলো উপত্যাকার মালিক। নিজেকে ছাড়িয়ে নিলো আদিত্যর বাহুবেষ্টন থেকে।

ক্ষৌণী: যথেষ্ট হয়েছে। চলো, বারান্দায় গিয়ে বসি।

আদিত্য: উঁহু। বারান্দায় মশা আছে।

ক্ষৌণী: এই ঘোর বিকেলে মশারা আপনার জন্য বারান্দায় বসে নেই জনাব।

উঠে এলো বিছানা থেকে। ক্ষৌণীর ঠোঁটে ঠোঁট ছোঁয়ালো; ’চলো’।

হেসে ফেলল ক্ষৌণী। এমন তীব্র আর গভীর দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকিয়ে আছে আদিত্য, উপেক্ষা করা কঠিন।

ক্ষৌণী: চলো বলে গাধার মতো দাঁড়িয়ে আছো কেন?

আদিত্য: না, ভাবছি।

ক্ষৌণী: কী ভাবছো?

আদিত্য: তোমার কী অসাধারণ অবজারভেশন ক্ষমতা! গাধা জীবনে দেখোনি, অথচ গাধারা কীভাবে দাঁড়ায় সেটা ঠিকই অবজার্ভ করে ফেলেছো।

ক্ষৌণী: গাধা দেখিনি তোমাকে কে বলল?

আদিত্য: তুমি। বাই দ্য ওয়ে, তোমার বাবা-মা তোমার জন্য এমন একটা কঠিন নাম বাছাই করলো কেন বলো তো? না হয় তারা জানেন অনেক, তাই বলে এত কঠিন একখানা নাম, উচ্চারণ করতে দুইবার থামতে হয়।

ক্ষৌণী: ফাজিল কোথাকার! তাদের নামটা পছন্দ হইছে, তারা তাদের মেয়ের নাম রাখছে, সমস্যা কোথায়?

আদিত্য: সমস্যা বললাম! ভাল বললাম। নামটা সুন্দর সন্দেহ নাই। তোমার নামের অর্থ জানো তো..

ক্ষৌণী: না, জানি না, কোনো সমস্যা?

আদিত্য: হ্যা, সমস্যা। এই জন্যই এত দুর্দশা তোমার…

আদিত্যের কথা শেষ হলো না, এর মাঝে উত্তর দিলো ক্ষৌণী

ক্ষৌণী: পৃথিবী, পৃথিবী আমার নাম। একটা দীর্ঘশ্বাস গোপন করে ভাবল, হবে হয়তো এই জন্যই এত দুর্দশা। তারপর আবার বলল, ‘তো কী মহাভারত উল্টালো নামের অর্থ জানায়?’

আদিত্য: মহাভারতে খুব বেশি ক্ষতি বৃদ্ধি হয়নি। তবে বিশ্বব্রাক্ষ্মা-ে আরও একবার প্রমাণ হলো, তুমি যে একটা খসখসে গোঁয়ার।

‘বলছে তোমাকে….’ আদিত্যের পেটে একটা ঘুষি চালিয়ে বারান্দায় পা বাড়ালো ক্ষৌণী। পেটে হাত দিয়ে কপট ”আউ” বলে পিছু নিলো আদিত্য।

———————————

পাহাড়ে সন্ধ্যা নামে ঝুপ করে। যেন সূর্যটা অনেকক্ষণ ধরে একনাগাড়ে কারো জন্য অপেক্ষা করে মুখ ঘুরিয়ে আকস্মিক চলে যায় ভীষণ অভিমানে। বারান্দায় ছোট্ট একটা বাঁশের চৌকি। তাতে হাঁটুর উপর থুতনির ভর দিয়ে বসেছে ক্ষৌণী। সামনে সবুজ বনরাজি। পাখিদের শেষবেলার আলোচনা। মেঘেদের আনাগোনা। ভেজা মাটির গন্ধ। গতকালও বৃষ্টি হয়েছে এখানে। পাশেই আদিত্য, এক হাতে ক্ষৌণীকে বেষ্টন করে আছে যতটা পারা যায়। আরও কিছুটা কাছে টেনে আনলো ক্ষৌণীকে। হালকা একটা শীত শীত একটা বাতাস ওদের ঘিরে খেলা করছে। যেন ফিসফিস করে বলছে, কীসের এত অপেক্ষা ক্ষণ? টেনে নাও। শুষে নাও পুরোটা। যেন বাতাসের ফিসফিসানিকে প্রশ্রয় দিতেই মুখ তুলল ক্ষৌণী। আদিত্যের পুরু ঠোঁট টেনে নিলো নিজের দুই ঠোঁটের ফাঁকে। দুষ্টু বাতাস সে বার্তা পৌঁছে দিলো মেঘকে। মেঘের সে কী রাগ! আছড়ে পড়লো পৃথিবীর বুকে। রুক্ষ্ম পৃথিবী মেঘের এই বরিষণেরই অপেক্ষায় ছিল। বুক পেতে শুষে নিলো বেদনার জল। এই যে জলের আধার পৃথিবী, তবু যেন ওর আরও চাই। কিন্তু ভীষণ হিংসুটে এই বাঁশের চৌকি। তীব্র ভাষায় প্রতিবাদ জানালো। বাতাসের কুমন্ত্রণায় যেমন হঠাৎই ক্ষেপে উঠেছিল ওরা, তেমনি আকস্মিক থেমে গেল বরিষণ।

হেসে চৌকি থেকে নেমে রেলিং-এর ধারে এসে দাঁড়ালো ক্ষৌণী। রক্ত চলাচল স্বাভাবিক হতে আরও কিছুটা সময় নিলো আদিত্য। তারপর উঠে এসে পাশে দাঁড়ালো ক্ষৌণীর। বাতাসে হালকা ছাঁট আসছে বৃষ্টির।

‘মাঝে মধ্যে মাথাটা খারাপ করে দাও তুমি ক্ষণ।’

ক্ষৌণী হেসে বলল, ‘আমার কী দোষ! বাতাস এসে কানে কানে বলে গেল যে তোমায় চুমু খেতে…’

‘আচ্ছা! তাই না? তেমনটাই বলেছে তো তোমাকে বাতাস? ঠিক ঠিক শুনেছো?’ তারপর দাঁত কিড়মিড় করে বলল, যেদিন ধরবো ওঝা-কবিরাজ কিছুতেই কাজ হবে না, বলে রাখলাম। আমি কিন্তু জ্বীনও না, ফেরেস্তাও না। মানুষ।’

আজ যেন ভূতে পেয়েছে ক্ষৌণীকে। আরও কিছুটা কাছে সরে আসলো আদিত্যের। মুচকি হেসে বলল, ‘মানুষ নাকি? পরীক্ষা করে দেখবো একটু…

টান মেরে ওকে বুকের সীমানায় নিয়ে এলো আদিত্য। শুধু ঠোঁটের পরিসরে নয়, আদিত্যের বিচরণ এখন ক্ষৌণীর সর্বত্র।

বাইরে তুমুল বৃষ্টি পৃথিবীকে সিক্ত করছে ভালবাসায়। অবগাহনের উচ্ছলতায় উদগ্রীব অন্দর।

অবগাহনের কোনো সময়কাল থাকতে নেই। অবগাহনের কোনো সময় থাকে না। সে যেন অনন্তের বাণী নিয়ে আসে বুকে করে। কতক্ষণ সে বুকের ঘ্রাণ নিয়েছে ক্ষৌণী, জানা নেই। তবে ইহলোকে পূর্ণতাপ্রাপ্ত হতে তখনও কিছুটা বাকি। ক্ষৌণী চুলে আঙুলের আরামদায়ক মৃদু চলাচল। মুখ তুলে তাকাল। ওর দিকে তাকিয়ে হাসলো আদিত্য।

– কী? বলেছিলাম না ক্ষেপিয়ো না, পরে হুজুর, ওঝা, কবিরাজ কেউ ঠেকাতে পারবে না। হলো এবার?

– ওঝা-কবিরাজকে ঘরে তালা মেরে এসেছি। আসবে না ওরা আমাকে বিরক্ত করতে।

– রুমে যাই ক্ষণ। এখানে থাকলে বিপদ বাড়বে।

– না। তারপর একটু আদুরে গলায় বলল, বাইরে বৃষ্টি তো। কী দরকার? থাকো, আরও কিছুক্ষণ আমার কাছে।

– তুমি আছো সেটাই তো বিপদ। তোমাকে বুকে নিলে ভগ্নাংশের একও ছাড়তে ইচ্ছে হয় না। পুরোটা কড়ায় গ-ায় বুঝে নিতে ইচ্ছা হয়।

– কে  ছাড়তে বলেছে তোমাকে? থাকো এখানেই। কোনো সমস্যা হবে না।

– সমস্যা হবে। আমার সমস্যা হয় ক্ষণ, তুমি জানো না।

এক ইঞ্চিও নড়লো না ক্ষৌণী। ঠিক যেভাবে বুকের সাথে লেপ্টে ছিল, সেভাবেই রইল। ”আমি এখন ঘুমাবো” বলে আরও কিছুটা শক্ত করে আঁকড়ে ধরলো আদিত্যকে।

– এমন বিধ্বংসী জেদ করে না ক্ষণ। ল-ভ- হয়ে যাবে।

জেদী কণ্ঠে বলল, বললাম তো, ঘুমাব। তাও যাই যাই করছো…

মনে মনে বলল, হয়েছে কি মেয়েটার আজ। ভাবতে ভাবতেই ওর চুলে নাক ডুবালো আদিত্য। মিষ্টি একটা ঘ্রাণ আদিত্যকে পথভ্রষ্ট করলো। ক্ষৌণীপ্রাচীরে ডুবে মরলো অহংকারী দিবাকর।

———————————

যখন তাকালো ক্ষৌণী, আকাশ তখনও দেখা পায়নি সূর্যের। ওর আসার বার্তা পেয়েছে মাত্র। তবে পাখিরা সব মিটিং-এ বসে গেছে। বিভিন্ন বিষয়ে চলছে তুমুল বাকবিত-া। পাখিরাও যে এমন বেশুমার গোলোযোগ বাধাতে পারে শকটনির্ভর ঢাকায় তা টের পাওয়া দায়। মুখ তুলে তাকালো আদিত্যের দিকে। ওর দিকেই তাকিয়ে আছে আদিত্য।

‘ঘুম হলো?’

বুকে মুখ ডুবিয়ে মৃদু উত্তর- হুঁ

‘বেশ বেশ। তা, এবার যে ছাড়তে হয় ম্যাডাম। অনেকক্ষণ ধরে ডাক পাচ্ছি। আপনি এমন আদুরে ভঙ্গিতে ঘুমাচ্ছিলেন, ডাকতে মন সায় দিচ্ছিল না। কিন্তু এবার যদি না ছাড়েন, এখানেই কুলকুল করে ছেড়ে দিতে হবে। ব্যাপারটা খুব শোভন হবে না নিশ্চয়ই।’

বলার ধরন দেখে হেসে ফেলল ক্ষৌণী। সরে এলো। আদিত্য আলতো করে ঠোঁট ছোঁয়ালো কপালে। উঠে গেল বাথরুমে।

এক নাগাড়ে পানির আওয়াজ। শাওয়ার নিচ্ছে আদিত্য। উঠলো ও। হ্যাঙ্গার থেকে গাউনটা বের করে গায়ে চড়ালো ভাল করে। দরজা খুলতেই বাইরে অপেক্ষারত শীত শীত বাতাসেরা হুড়মুড় করে ঢুকে পড়লো ঘরে। যেন দেখতে চায় কতটা দুর্যোগ ঘটে গেছে গতরাতে! বাইরের প্রকৃতি যেন সদ্য ¯œান সেরে উঠেছে। রাতের বৃষ্টিতে পাতাগুলো আরও সতেজ-সবুজ হয়েছে। বৃষ্টির পরে প্রকৃতির আনাচে কানাচে ছড়িয়ে থাকে এক ¯িœগ্ধ লাবণ্য। আর বন হয়ে ওঠে তীক্ষèযৌবনা সবুজ পরী। বারান্দায় এসে দাঁড়াল ক্ষৌণী।

এটা টুরিস্ট সিজন না। ওরা দুটো কটেজ নিয়ে আছে। অন্য কটেজগুলো ফাঁকা। সিঁড়ি বেয়ে নেমে এলো রাস্তায়। একটু সামনেই মেঘবালিকারা হেলেদুলে পার হলো ওর কটেজ। ভেজা সিঁড়িতে এসে বসলো ক্ষৌণী। অদ্ভূত সুন্দর একটা ভোর। এই ভোর আর কখনও ফিরে আসবে না ক্ষৌণীর জীবনে। আর কখনও এভাবে আদিত্যের বুকে ডুব মারা হবে না ওর। আদিত্য আর কখনও ওকে কাছে টেনে এনে বলবে না, ‘তোমার নামটা এত কঠিন কেন ক্ষণ? আমার মতো মূর্খেরা কী নামে ডাকবে তোমায়?’ ক্ষৌণীর মন বলছে, আজই শেষ। আজকের পরে আদিত্য হয়ে উঠবে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক মানুষ। কিন্তু আশ্চর্য সত্যি হলো, আদিত্যকে ও ভালবেসে ফেলেছ। ”হায়রে ভালবাসা”… নিজে নিজেই হেসে উঠলো ক্ষৌণী।

টের পেল, পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে আদিত্য। ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো ওর দিকে। আগের রাতের ট্রাইজারটাই পরেছে। খালি গা। গা থেকে টপটপ করে পানি পড়ছে।

‘একলা হাসছো কেন?’

ক্ষৌণী ওর প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে উঠে দাঁড়ালো। তারপর বলল, ‘শরীরটাও ভাল করে মুছতে পারো না।’

‘পারি তো। অন্যেরটা পারি। নিজেরটা মুছতে কষ্ট হয়।’

‘সারাক্ষণ বাজে কথা।’

‘বাজে কথা কোথায় বললাম … বলতে বলতেই ক্ষৌণীর কোমর জড়িয়ে কাছে টেনে আনলো আদিত্য।’

‘ছাড়ো’

‘তুমি কি ভাবছো তোমাকে জড়িয়ে ধরতে…. জ্বী না, গা মুছতাছি।’

হেসে ফেলল ক্ষৌণী। জানতো এমনই কিছু একটা উত্তর দিবে আদিত্য। জোর করে ছাড়িয়ে নিল নিজেকে। ভেতরে চলে গেল ও। শাওয়ার নিবে।

———————————

গত দুইটা দিন আদিত্য ডুবে ছিল ক্ষৌণীতে। এবং এতক্ষণে নিজের মুখোমুখি হবার সুযোগ পেল আদিত্য। সেই সাথে দিনের প্রথম সিগারেটটারও। দুইদিনের মধ্যে এই প্রথম সে সজ্ঞানে পুরো বিষয়টা বিশ্লেষণের সুযোগ পেল। রেলিং-এ হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে প্রথম টান দিলো সিগারেটে এবং সাথে সাথে প্রথম যে কথাটা মাথায় এলো, তা হলো, এ কী ভয়ঙ্কর আগুনে হাত পুড়িয়েছি! এটা ঠিক হয়নি। এক ভীষণ অপরাধবোধ গ্রাস করলো আদিত্যকে। ভেতর থেকে কে যেন চীৎকার করে বলছে, ‘ঠিক হয়নি আদিত্য। কিছুতেই ঠিক করোনি কাজটা।’ ‘তুমি ওর সরলতার সুযোগ নিয়েছো, আদিত্য।’

নিজের পক্ষে কোনো যুক্তিই দাঁড় করাতে পারলো না। কিন্তু  টের পেল পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে ক্ষৌণী। গুনগুন করে গাইছে, ‘জানি বাহিরে আমার তুমি অন্তরে নও,/ ভাঙিয়ো না এ মধুর ভুল,/ তবু ভাঙিয়ো না এ মধুর ভুল/ আজি আমার কণ্ঠে দিলে যে কুসুম হার,/ জানি না কাহার তরে তুলেছো সে ফুল/ ভাঙিয়ো না, ভাঙিয়ো না, ভাঙিয়ো না এ মধুর ভুল”। হঠাৎ ওর মনে হলো, ক্ষৌণী বোধ হয় বুঝতে পারছে, ও কি ভাবছে। না হলে এই গানটাই গাইতে হবে এখন!

ওর দিকে ফিরলো আদিত্য। গোলাপী আর বাঙ্গি রঙের কম্বিনেশনের একটা শাড়ি পরেছে ক্ষৌণী। একদম নতুন বৌয়ের মতো লাগছে দেখতে। খচ্ করে উঠলো বুকের ভেতরটা। ভেতর থেকে আবার কেউ একজন বলে উঠলো, ‘তুমি ওর সরলতার সুযোগ নিয়েছো, আদিত্য।’

‘কী এত ভাবছো আদি?’

‘না, কিছু না তো।’

‘তাই? একটু থেমে আবার জানতে চাইলো, তুমি কি অপরাধবোধে ভুগছো কোনো কারণে?’

‘না ভোগার কোনো লজিক্যাল কারণ আছে?’

‘সোজা উত্তর দিতে পারো না?’

‘হু, ভুগছি’

‘কেন?’

‘সম্পর্কে ঠিক যতটা গভীরতা থাকলে এমন একটা সম্পর্ক হতে পারে, তোমার ব্যাপারে আমার ভাবনার গভীরতা ততটা নয়।’

‘জানি’

‘তুমি ভুগছো না?’

‘নাহ। আদি, তুমি আগে সম্পর্ক স্থাপন করেছো, তারপর গভীরতা মাপছো। আমি গভীরে গিয়ে সম্পর্ক স্থাপন করেছি। চলো, নাস্তা করে আসি।’

কোনো প্রতিবাদ করলো না আদিত্য। ঘরে ঢুকলো ও। ওর পিছে ক্ষৌণী। গায়ে শার্ট চাপালো আদিত্য। ক্ষৌণী আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে কাজল দিতে দিতে নতুন একটা সুর ধরলো, ‘….. যে রূপকথায় কাঁদে চোখ,/ সে রাজা-রাণীর ভাল হোক।’

’কেমন দেখাচ্ছে?’ হঠাৎ ঘুরে তাকিয়ে জানতে চাইলো ক্ষৌণী।

তাকালো ওর দিকে আদিত্য। কোনো উত্তর দিলো না। ভোরের শিশিরের মতো পবিত্র দেখাচ্ছে ওকে। বুকের মধ্যে আবার সেই চাপটা টের পেল আদিত্য। কিন্তু ক্ষৌণীর দিকে তাকিয়ে মনে হচ্ছে, ক্ষৌণীর মধ্যে কোনো অপরাধবোধ নেই। কিছুই হয়নি বরং এটাই স্বাভাবিক। এটাই হওয়া উচিত ছিল। ওর ভাবনায় ছেদ ফেলে ক্ষৌণী আবার বলল, ’বললে না কেমন দেখাচ্ছে’।

‘জানোই তো ভাল দেখাচ্ছে। আমার বলায় কী আসে যায়?’

‘তোমার বলায় আসে যায় বলেই আজ আমি এখানে তোমার সাথে। যাক গে, বাদ দাও। চলো নাস্তা করতে যাই।’

ক্ষৌণীর কণ্ঠের উষ্মাটা টের পেল আদিত্য। এই অল্প সময়েই নিজের ভেতরের টানাপোড়েনে ও এতটা ক্লান্ত হয়ে গেছে যে সে উষ্মা ওকে আঁচড় কাটলো ঠিকই কিন্তু অনুভূতিতে নাড়া দিতে পারলো না। আদিত্য গত রাতটাকে না ও অস্বীকার করতে পারছে আর না ও নিজের বাস্তব অবস্থাকে মেনে নিতে পারছে।

‘চলো’ বলে বারান্দায় পা বাড়ালো আদিত্য। পার্টস হাতে ক্ষৌণীও বেরিয়ে এলো। তালা দিচ্ছে দরজায়। পেছন থেকে আদিত্য বলল, ‘ক্ষণ, তোমাকে আজকের ভোরের মতো ¯িœগ্ধ দেখাচ্ছে।’

‘ত্যাল মজে গেছে। এখন আর প্রশংসা শুনতে ইচ্ছা করছে না।’ বলেই ধুপধাপ করে সিঁড়ি বেয়ে নেমে গেল ক্ষৌণী। পেছনে পেছনে আদিত্যও নামলো। নিজেকে খুব অসহায় লাগছে ওর।

———————————

নাস্তা করতে করতে একটু আগের রাগ ভুলে গেলো ক্ষৌণী। কল কল করে কথা বলছে ও। ওর দিকে তাকিয়ে শুনছে আদিত্য। মাঝে মাঝে মৃদু হাসছে।

‘চলো, নীলাচল আর নীলগিরি যাই।’

‘চলো।’

‘না, বরং চলো সাঙ্গু নদীতে নৌকায় ভ্রমণ করি আমরা।’

‘আচ্ছা, ঠিক আছে চলো সাঙ্গুতে যাই।’

‘ধ্যাত, যা বলি তাতেই শিশুদের জন্য হ্যা করছো কেন আদি?’

‘তো শিশুদের মতো প্ল্যান করলে আর কিইবা করতে পারি?’

‘শিশুদের মতো প্ল্যনা মানে? আচ্ছা, ঠিক আছে। সকালটা নীলাচল। বিকালে সাঙ্গু।’

‘আচ্ছা’

নাস্তা সেরে চান্দের গাড়ির খোঁজে নেমে পড়লো দুইজন। যাওয়ার আগে একটা ছোট্ট ডেপ্যাকে দুইজনের দুই সেট কাপড় নিলো ক্ষৌণী। এর আগেও পাহাড়ে এসেছে ওরা। পাহাড়ের প্রয়োজনটা জানা আছে দু’জনেরই। গাড়ি রিজার্ভ করবে না। কিন্তু লোকজন নেই বললেই চলে। আরও দুইটা পরিবার পাওয়া গেল, যাবে নীলাচল। উঠে পড়লো ১২ জনের টিম। সাধারণত ক্ষৌণী চান্দের গাড়ির ছাদে বসে যেতে পছন্দ করে। আজ শাড়ি সে পছন্দে বাধা হয়ে দাঁড়ালো। ভেজা-পিচ্ছিল পাহাড়ি পথ। চালক সাবধানেই গাড়ি চালাচ্ছে। পাশাপাশি চুপচাপ বসে দেখছে ¯িœগ্ধ সবুজ। সবুজের সান্নিধ্যে বেঁচে থাকা জীবন। ছোট একটা বাচ্চা হঠাৎ কোথা থেকে উড়ে এসে একেবারে গাড়ির সামনে পড়লো। পিচ্ছিল পথে স্পিড কম ছিল বলে বাঁচোয়া। না হলে দুর্ঘটনা ঘটতো একটা। সামান্য চমক। আবার প্রকৃতির সুধাপান। আদিত্যের কাঁধে মাথা রাখলো ক্ষৌণী। তবে বেশিক্ষণ সম্ভব হলো না এভাবে থাকা। প্রচ- ঝাঁকুনিতে আবার সোজা হয়ে বসলো। ঘণ্টা দেড়েক লাগলো ওদের নীলাচল পৌঁছাতে।

দু’জনেই এক সাথে হাঁটছে, দেখছে, ঘুরছে। হঠাৎই আদিত্য খেয়াল করলো, এক ছোকরা টাইপ ছেলে ক্ষৌণীর আশেপাশেই ঘুর ঘুর করছে। নানাভাবে সেলফি তুলছিল। ক্ষৌণী এতক্ষণ বিষয়টা পাত্তা দেয়নি। কিন্তু হঠাৎই তার মনে হলো, ছেলেটা সেলফি তুলছে না। তার ছবি তুলছে। বিষয়টা আদিত্যও খেয়াল করলো। তৃতীয়বার যখনই মোবাইলে ক্যামেরাটা তুলল, ছেলেটা আর ক্ষৌণীর মধ্যে পাহাড় হয়ে দাঁড়ালো আদিত্য। আদিত্য যে আশেপাশেই ছিল, সেটা ঐ ছেলেটা খেয়াল করেনি।

‘কোনো সমস্যা?’ আদিত্য রুক্ষ্ম গলায় জানতে চাইলো।

মাথা নাড়িয়ে একটু দূরে গিয়ে দাঁড়ালো ছেলেটা। এরপর আদিত্য অনেকটা গার্ড দিয়েই রাখল ক্ষৌণীকে। আদিত্যের এ আচরণ ক্ষৌণী মজা পেলো। ছেলেদের সাথে মেয়েরা থাকলেই তাদের সেফ করার একটা সহজাত প্রবৃত্তি কাজ করে ছেলেদের মধ্যে। হোক সে স্ত্রী, প্রেমিকা কিংবা রক্ষিতা।

ফেরার পথে মেঘলা সেতু আর সোনা মন্দির ঘুরলো ওরা। এই সবগুলো জায়গায়ই ওরা আগেও এসেছে। তবে একসাথে এবারই প্রথম।

ফিরে এসে দুপুরের লাঞ্চ। তারপর আবার যাত্রা শুরু। এবারের মিশন সাঙ্গু ভ্রমণ।

একটা নৌকা রিজার্ভ করলো। শুধু দুইজন। ঘণ্টা তিনেক ঘুরাবে ওদের এই নৌকাটা। উঠে নৌকার গুলুইয়ে বসলো ক্ষৌণী। পেছনে দাঁড়ালো আদিত্য। একটু পর মাঝি জানালো, গুলুইয়ের এত সামনে বসা যাবে না। তার দিক ঠিক করতে সমস্যা হয়। গত দুই দিনের বৃষ্টির পর রোদের দেখা পেয়েছে পাহাড়কন্যা বান্দরবান। রোদের তেজও সামান্য বেশি।

‘চলো, ভেতরে গিয়ে বসি। মাঝির সমস্যা হচ্ছে।’

‘চলো’ বলে ছইয়ের ভেতর বসলো ক্ষৌণী। পাশে এসে বসলো আদিত্য।

‘হঠাৎ কেমন যেন চুপ মেরে গেছো তুমি ক্ষণ। সকালের বিষয়টা এখনও মনে রেখেছো?’

‘না তো। বান্দরবান আমার খুব প্রিয় একটা জায়গা। এখানে এসে আমার মন খারাপ হবার ফুসরত থাকে না।’

‘ও। তাহলে বোধ হয় আমার বোঝার ভুল।’ বলে মোবাইলে মনোনিবেশ করলো আদিত্য। বান্দরবানে নেটওয়ার্ক খুব ভাল না। অগত্যা আবার ক্ষৌণীর দিকে তাকালো। নৌকার ছইয়ে হেলান দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে ও। দেখে মনে হচ্ছে এ জগতে নেই। ওর কোলে মাথা দিয়ে লম্বা হয়ে শুয়ে পড়লো আদিত্য। তাকালো আদিত্যের দিকে। হাসলো। এটা হয়তো মানুষের সহজাত- কেউ কোলে মাথা রাখলে নিজের অগোচরেই আঙুলগুলো সক্রিয় হয়ে ওঠে। চুলে বিষণœ পাঁচ আঙুলের অন্যমনষ্ক চলাচল টের পেল আদিত্য। খুব মনোযোগ দিয়ে সে বিষণœতা খাচ্ছে ও। সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ছে তার আবেশ। এক সময় ঘুমিয়ে পড়লো।

হঠাৎ কোথা থেকে যেন পানি পড়লো মুখে। ঘুমের মধ্যেই ভাবছে, বৃষ্টি হবে হয়তো। পরমুহূর্তেই সচেতন হয়ে উঠলো ব্রেন। নৌকার ভেতরে বৃষ্টি আসবে কোথা থেকে! ঘুম ভেঙে গেল। একইভাবে বসে আছে ওর মাথাটা কোলে নিয়ে। অন্যমনষ্ক আঙুলগুলো সচল। কিন্তু চোখে পানি, এটা নতুন সংযোজন। পানির উৎসের সন্ধান মিলল। মোবাইল দেখল। প্রায় ঘণ্টাখানেক ঘুমিয়েছে। তারমানে ওরা এখন ফিরতি পথ ধরেছে।

ক্ষৌণীর দিকে তাকিয়ে বলল, ‘এতক্ষণ এভাবে ঠাঁয় বসে আছো! আমাকে ডাকলেই তো হতো।’

‘আমি ঘুমের মানুষ ডাকতে পারি না। তবে পায়ে ঝিঁ ঝিঁ ধরে গেছে। উঠো এবার।’

উঠে বসলো আদিত্য। পা লম্বা করে ছড়িয়ে বসলো ক্ষৌণী।

‘বসো তুমি, আমি একটা বিড়ি খেয়ে আসি।’ বলেই বাইরে বের হলো আদিত্য।

আদিত্য: আমরা কি ফিরতি পথ ধরছি ভাই?

মাঝি: হ

আদিত্য: সিগারেট খাবেন?

মাঝি: জ্বী না স্যার।

সিগারেট শেষ করে আবার ভেতরে আসলো আদিত্য।‘মেজাজ খারাপ তোমার?’

‘না’

‘ও। এমন কাটা কাটা উত্তর দিচ্ছো’

‘হয়তো তোমার মনে হচ্ছে, আমার মেজাজ খারাপ হওয়া উচিত। তাই ভাবছো মেজাজ খারাপ।’

‘তোমার উত্তরেই তো বোঝা যাচ্ছে মেজাজ মোবারক ভাল না।’

‘কাল তো বাচ্চাদের সাথে কথা বলোনি। আজ বলো।’

‘নাহ। কাল সকালে পৌঁছালে তো দেখা হবেই।’

‘কেন কথা বলতে সমস্যা কি?’

‘আমার বাচ্চাদের বিষয়টা আমাকেই বুঝতে দাও।’

‘ওহ, শিওর। আই অ্যাম সরি’ বলতে বলতে আদিত্যের মোবাইলটা বেজে উঠলো।

ফোন ধরলো আদিত্য – হ্যালো

একটা হাসি খেলে গেলো ক্ষৌণীর ঠোঁটে। আদিত্যর ‘হ্যালো’ বলার টোন, চেহারার এক্সপ্রেশন দেখে ক্ষৌণী টের পায় ওপাশে কে আছে। তীর্যক হাসিটা লক্ষ্য করলো আদিত্য। বুকের কোথায় যেন একটা মোচড় দিলো আদিত্যের। ক্ষৌণী বাইরে বেরিয়ে এলো।

———————————

সাঙ্গু নদী। এর আগেও বহুবার এসেছে এখানে। শেষ যখন এখানে এলো, সময়টা খুব খারাপ যাচ্ছিল ওর। এর মাস দুয়েক আগেই ছাড়াছাড়ি হয় মামুনের সাথে। কী ভীষণ এক অন্ধকার যুগ কাটিয়েছে সেই সময়টা! মাত্র তিন মাসেই মামুন ওকে নরক দর্শন করিয়ে ছাড়লো। সবার সাথে যোগাযোগ বন্ধ করে দিলো। ডিভোর্স হয়ে যাবার পরও সেই ট্রমা কাটিয়ে উঠতে পারছিলো না ক্ষৌণী। রাগের মাথায় ছেড়ে দিলো চাকরি। সেটাও ছিল ওর জন্য আরও ভয়ঙ্কর। চাকরি থাকলে তবু কিছুটা সময় ব্যস্ত থাকতে হতো। চাকরি না থাকায় পুরোটা সময় বিষণœতা। একা ঘরে বসে থাকা। উচ্ছল প্রাণের ক্ষৌণী ডুব মারলো অন্ধকারে। বাবা-মা তো বটেই বন্ধুরাও ভয় পেয়ে গেলো, পাছে না আত্মহত্যা করে বসে ও।

একরকম জোর করেই ওর কিছু বন্ধু মিলে বান্দরবানে প্ল্যান করলো। একেবারে রিমোটে যাবে। রোনিন পাড়া দিয়ে শুরু করে মুন্নাম পাড়া হয়ে রুমা বাজার। সেখান থেকে নৌকায় রিজুক ঝর্ণা হয়ে বান্দরবান। দুই দিন লেগেছিলো ওদের রোনিন পাড়া হয়ে মুন্নাম পাড়ায় যেতে। পাহাড়ের এক আশ্চর্য ক্ষমতা আছে। তোমার মনে যত কষ্টই জমে থাক, সে তোমাকে এত ভয়ঙ্কর শারীরিক কষ্ট এবং মানসিক তৃপ্তি দিবে যে তুমি পুরোনো শোক ভুলে পায়ের গিঁটে আর মাস্লে মালিশ করতে থাকবে। ক্ষৌণীর তাই হয়েছিল। ভুলে গিয়েছিল কী ভয়াবহ তিনটি মাস কাটিয়েছে ও মামুনের সাথে। এই পাহাড়ে এসেই ফিরে পেয়েছিল ও নিজেকে।

কাঁধে হাত রাখলো আদিত্য। চমকে উঠলো ক্ষৌণী। কখন যে আদিত্য পিছনে এসে দাঁড়িয়েছে টের পায়নি ও।

‘চমকে দিলাম না তো? কাঁদছেন কেন?’

‘একটু চমকে তো দিয়েছেনই। কাঁদছি না।’

চোখের পানি আঙুলে নিয়ে দেখালো, ‘এটা কি তাহলে?’

ওর আঙুলটা মুছিয়ে হাসলো ক্ষৌণী- ‘সব সত্য যেমন চোখে পড়ে না। সব মিথ্যাও তেমনি চোখে আঙুল দিয়ে দেখাতে হয় না। ঢাকায় কথা হলো? সব ঠিক?’

‘আল ইজ ওয়েল। নো টেনশন। বড় জন খালি একটু জেদ করছে মায়ের সাথে।’

‘হু, এটা ভাল। আমিও করি মাঝে মধ্যে।’

‘আপনি মাঝে মধ্যে করেন না, সবসময় করেন। এটা মোটেই ভাল না।’

‘ঠিক। এটা মোটেও ভাল না।’

ওদের মধ্যে এই যে ‘আপনি’ সম্বোধন, এটা ওদের স্বাভাবিক আচরণ। ‘তুমি’ করে বলেছিল আবেগী হয়। সেটা এক রাতের স্বপ্ন। দুঃস্বপ্নও বলা যেতে পারে। শেষ বিকেলে প্রকৃতির মধ্যে এক মায়াময় আলো ছড়িয়ে থাকে। এই দুই অতৃপ্ত প্রাণ সে আলোয় আলেয়ার সন্ধান করে। দু’জনেই ওরা বয়ে বেড়াচ্ছে এক ‘নেই’কে। দু’জনেই ওরা সেই ‘নেই’-এর চোরাফাঁদে আটকা পড়েছে। পার্থক্য শুধু, একজন প্রাণপণ বেরিয়ে আসতে চাইছে। আর অন্যজন শুধুই নিমজ্জিত হতে চাইছে সেই চোরাফাঁদে।

দূরে তটরেখা দেখা যাচ্ছে। ভেতরে এলো ক্ষৌণী। সাথে আদিত্যও। ব্যাগ থেকে শুধু পানির বোতলটাই বের করেছিল। তাতে আর সামান্যই পানি আছে। এক সিপ নিজে নিয়ে বাকিটা এগিয়ে দিলো আদিত্যের দিকে। পানির বোতলটা হাতে নিলো, কিন্তু পান করলো ক্ষৌণীর অধরসুধা। সম্ভবত শেষবারের জন্য। দু’জনেই জানে এটাই শেষ। অথবা সুদূর কোনো ভবিষ্যতে। কে জানে ভাগ্য বিধাতা মানুষকে কখন কোন পরীক্ষায় ফেলে!

সাড়ে ছ’টা বাজে। অন্ধকার হয়ে এসেছে চারপাশ। নৌকাও পৌঁছে গেছে গন্তব্যে। এবার যার যার বাড়ি ফেরার পালা। কটেজে ফিরে এলো ওরা। আদিত্য সকালেই রুম ছেড়ে দিয়েছিল। ওর ব্যাগ ক্ষৌণীর রুমে। ক্ষৌণী শেষবার চেক করলো, সব ঠিকঠাক নিয়েছে তো!

বারান্দায় এসে দাঁড়ালো দু’জন। পাশাপাশি। কাছে টেনে আনলো ওকে আদিত্য। দু’জন এভাবেই দাঁড়িয়ে রইলো কিছুক্ষণ। হঠাৎ আদিত্য বলল, ‘আর একদিন থেকে যাব নাকি?’

‘লোভ বাড়িয়ে লাভ কি বলো? তারপর হয়তো আমার আর যেতেই ইচ্ছা করবে না। তখন কি থাকবে আমার সাথে? তা তো থাকবে না।’

‘তুমি জানো ক্ষণ, আমি অনেক কিছুই পারি না। আমার হাত বাঁধা।’

‘সে জন্যই তো বলছি। ধরো, তুমি যদি থেকে যেতে চাও, আমি তো তোমাকে জোর করে ঢাকা পাঠাবো না। তখন তোমার ছা’গুলোর কি হবে?’

আবার নীরবতা। আগের মতোই ঠাঁয় দাঁড়িয়ে আছে দু’জন। এক রাতের এক মিথ্যা সংসারের সুখ-স্মৃতি ওদের জন্য ভীষণ ভারী এক বোঝা। অথবা হয়তো এটাই সম্বল। সমাজের চাপিয়ে দেয়া দায়িত্ব, কচি কচি মুখ, আঙুল সব কিছু গিলে খাচ্ছে ওদের একরাতের এই সংসারটাকে। মানব সংসার বিচিত্র এক জায়গা। কোথাও ভালবাসা থাকে, মমতাও থাকে। কিন্তু কোনো বন্ধন থাকে না। কোথাও কোথাও মানুষ বাঁধা পড়ে থাকে অনন্তকাল। ভালবাসা থাকে না। আবার কোথাও ভালবাসা, বন্ধন কিছুই থাকে না। শুধুই বিরাজ করে ‘কাম’। ক্ষৌণী আর আদিত্যের মধ্যে কে কামোন্মুখ ছিল, আর কে ভালবাসায় পথভ্রষ্ট হলো, সেটা উন্মোচিত হয়নি কখনও। সম্ভবত কেউই তারা সে সত্য উন্মোচনে ব্যাকুল ছিল না।

মামুনের সাথে সময়টা ওর জন্য একটা অন্ধকার যুগ ছিল। প্রেম-ভালবাসা তো ছিলই না, সম্মান-শ্রদ্ধাও পায়নিও মামুনের কাছে। অপমান, নিগ্রহ, অবহেলা, গালাগালি এমনকি এক আধবার গায়ে হাত তোলা। মধ্যরাতে বাড়ি থেকে বের করতেও দ্বিধা করেনি মামুন। বেরিয়ে এসেছিল। ভয়ঙ্কর বিপদ মাথায় নিয়ে বাবা-মায়ের কাছে ফিরে এসেছিল ও। সে ক্ষতে থেকে থেকে এখনও পুঁজ বেরোয়। মাত্র এক রাতে আদিত্য ওকে সবটুকু দিয়েছে। সম্মান-শ্রদ্ধা-ভালবাসা-যতœ। হোক তা একরাতে। কিন্তু আরও বেশ কিছুদিন ভাল থাকার খোরাক এটা।

ঠিক সময়েই বাস ছাড়লো। ঠিক সময়ে কাউন্টারেও পৌঁছালো ওরা। আদিত্যের কাঁধে মাথা রাখল ক্ষৌণী। কাঁধটা আরও একটু এগিয়ে দিলো আদিত্য। হাতটা লম্বা করে দিলো ক্ষৌণীর কাঁধে। অন্য হাতে ধরে আছে ক্ষৌণীর বাঁ হাত। কিছুক্ষণ ও ক্ষৌণীর আঙুল নিয়ে খেললো অন্যমনষ্ক হয়ে। তারপর বাঁ হাতের কনে আঙুলে চুমু খেলো একটা। মুখ তুলে তাকালো ক্ষৌণী। একটু লজ্জিত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলো আদিত্য,‘কোনো সমস্যা?’ হেসে উত্তর দিলো, ‘না।’ কিছুক্ষণ পর আদিত্য আবার জিজ্ঞেস করলো, ‘ক্ষণ, তোমার কি এখনও মনে হয়, কাল যা হয়েছে ঠিক হয়েছে?’

‘আমার কাছে ভুল তো কিছু মনে হয়নি আদি। ভালবাসি তোমাকে। আর যখন তোমাকে ধারণ করেছি, তখন তোমার ক্ষত, রোগ সব নিয়েই ধারণ করেছি।’

‘তুমি তো জানোই আমার পক্ষে অনেক কিছুই সম্ভব না।’

“‘সম্ভব না’র চেয়েও বড় হলো, তুমি আমাকে ভালবাসো না আদি। ফলে তোমার অপরাধরোধ কাজ করাটা স্বাভাবিক। দেখো, আমার ডিভোর্স হয়েছে ১০ বছর। এর মধ্যে চাইলে আমি বিয়ে করতে পারতাম। এই ১০ বছরে আর কোনো পুরুষ আমাকে স্পর্শ করেনি। আমি না চাইলে তুমি তা কখনোই পারতে না। তোমার বউ-বাচ্চা আছে, সেটা আমার জন্য অনুতাপের, সন্দেহ নাই। কিন্তু কালকের জন্য আমার মধ্যে কোনো অপরাধবোধ নাই।”

আলতো করে ক্ষৌণীর মাথায় ঠোঁট ছোঁয়ালো আদিত্য।

‘এখন ঘুমাও। অন্তত আজ রাতে আমি তোমার জন্য। এটাই সত্য।’

কিছু বলল না ক্ষৌণী। আদিত্যের বুকের কাছে ভেজা একটা শিহরণ। এই মেয়েটা তার জন্য কাঁদছে। তার জন্য কষ্ট পাচ্ছে। আদিত্য সাধারণ পুরুষ। কোনো নারী, যাকে সে সামান্য পছন্দ করে, তার জন্য কাঁদলে তার ভাল লাগে। এটাই স্বাভাবিক। ওর ভাল লাগছে। ও ভোগী। ভোগ্য ওর জন্য কষ্ট পেলে তাতে এক ধরনের নৃশংস সুখ আছে। মানুষ জন্মগত নৃশংস। রাতের নীরবতা ভেঙে বাস এগিয়ে যাচ্ছে গন্তব্যে। আর ক্ষৌণী তার গন্তব্যের বিপরীতে ছুটছে। নীরব কান্না রাতের গর্ভে বিলীন হচ্ছে নীরবে। হয়তো কোনো সাধারণের বুক পকেটে নোনা চিহ্ন এঁকে যাচ্ছে সন্তর্পণে, অনাগত কোনোদিনে প্রযুক্তি ডিটারজেন্টে বিলীন হবে তা-ও।

———————————

পরের গল্পটা আর অতটা দীর্ঘ নয়। ঢাকা ফিরে আদিত্য নিজের চারপাশে তৈরি করেছে একটা ব্যুহ। ক্ষৌণী আদিত্যের এই দূরে সরে যাওয়াকে সমর্থন হয়তো করেনি, সম্মান করেছে।

সম্ভবত আদিত্য চায়নি ক্ষৌণী আবার কষ্ট পাক। অথবা হয়তো মন আর সমাজের চাপে পড়ে অপরাধবোধে ক্ষয় হচ্ছে প্রতিদিন। কিংবা হয়তো, কে জানে, ক্ষৌণীর কাছে যা চেয়েছিল, পাওয়া হয়ে গেছে তার পুরোটাই। এখন ক্ষৌণী হয়তো তার কাছে শুধুই এক ব্যবহৃত বাসি ফুল।

ক্ষৌণী এখন প্রতিরাতে ঘুমোতে যায় সে রাতের স্মৃতি নিয়ে। ওর দিনটি শুরু হয় সেই দিনটির আবেশ-মাখা ভাল লাগায়। ওর দিনগুলো কাটে সেই এক রাতের সংসারের কোলে মাথা রেখে ঘুমোতে যাবে, সেই প্রত্যাশায়।

‘অভিমান- মনসাদেবীর দীর্ঘশ্বাস। যে ঘরে একবার পড়ে, জ্বলে পুড়ে খাক হয়ে যায়, আরোগ্যলাভ হয় না। এই দীর্ঘশ্বাস কোনো এক চোরা ফোকর দিয়ে মাথা গলিয়েছিল আদিত্যের বেডরুমে। এখন সে ঘরের যেদিকে তাকানো যায়, শুধুই ছাই। মনসাদেবীর দীর্ঘশ্বাসে আলোকিত সংসারটা কালোয় ডুবে গেছে বহুকাল হলো। তাতে কোনো আশা নেই। স্বস্তি নেই। এমনকি ভরসাও নেই।

অভিমান এখন বাসা বেঁধেছে ক্ষৌণীর মনের চৌকাঠে। একটু একটু করে গ্রাস করছে ওর উদারতা, সহনশীলতা, সাধ এবং সাধনা। ক্ষৌণীর পুরোটা জুড়ে ফোস্কা পড়ে আছে। দগদগে ক্ষতে পুঁজ হয়। পচে যায় প্রেম, ভালবাসা, আকাক্সক্ষা, স্বপ্ন, সব। গ্যাংরিন এই পোড়াকে পুঁজি করে সা¤্রাজ্য বাগাচ্ছে। কোনো বদ্যি-কবিরাজে কাজ হচ্ছে না আর। কোনো মন্ত্রই যন্ত্রণা কমাতে পারছে না ওর। ক্ষৌণী জানে, ওর আর আরোগ্য নেই। পচনেই মুক্তি। পচনের শুরুটা সম্ভবত এভাবেই হয়। শেষটা হয় নৃশংস।

মানুষ জন্মগত নৃশংস। কখনও সে অন্যকে দাহ্য বানিয়ে নৃশংস। কখনও নিজেকে পুড়িয়ে।

Comments

comments

x