আজ রবিবার | ২৪ সেপ্টেম্বর২০১৭ | ৯ আশ্বিন১৪২৪
মেনু

মানুষ হত্যা করতে চেয়েছিল ওরা!

দীপু মাহমুদ | ০৭ আগ ২০১৭ | ১:২৭ অপরাহ্ণ

Profile Picture_ Dipu Mahmud

হেমন্তের এক সকালে বাড়ির পশ্চিমপাশের প্রাচীরের উপর বসে একটা কাক তীক্ষœ শব্দে কা কা করে ডেকে যায়। চন্দনা বলে, হুস-হুস, যা ভাগ। চন্দনার দুই চোখে জল। তা গড়িয়ে পড়েছে জামার ওপর। বাবার দেওয়া চিকিৎসার টাকা বাঁচিয়ে কাপড় কিনে নিজে এই জামা সেলাই করে দিয়েছে ছোটভাই। পুজোর সময় কাজের অনেক চাপ ছিল বলে ঢাকা থেকে বাড়ি আসতে পারেনি। এসেছিল পুজোর পরে। খবরের কাগজে মোড়ানো একটা প্যাকেট চন্দনার সামনে ধরে ছোটভাই বলেছিল, ‘চন্দনারে চন্দনা, তোর চিন্তায় বাঁচিনা। চারিদিকে কাটা কোটা, মধ্যে একটা সিঁদুরের ফোটা।’

কথায় কথায় শ্লোক বলে ছোটভাই। কারও মন খারাপ হলে শ্লোক বলে হাসায়। তখন আর মন খারাপ করে থাকা যায় না। হাসতে হাসতে লুটোপুটি খাওয়ার দশা হয়। বাবা বলেন, ‘এই ছেলে একদিন বিশ্ব জয় করবে, তাই ওর নাম রেখেছি বিশ্বজিৎ।’

এক একদিন বাবা বাতাসে লম্বা শ্বাস ছড়িয়ে মাকে বলেন, ‘ছেলের আমার পড়াশুনার মাথা ছিল বেশ ভালো। টাকা-পয়সার জোগাড় হলে ওকে আমি ঠিকই এসএসসি পাশ করাতাম।’

মা জানে মিষ্টির দোকানি বাবার সেই সামর্থ নেই। নিজের অক্ষমতা ঢাকতেই মাঝে মধ্যে ওই প্রসঙ্গ তোলেন। ৬ বছর আগে ক্লাস নাইন পাশ করার পর ছেলেকে তিনি ঢাকা পাঠিয়ে দিলেন বড় ভাইয়ের কাছে, দর্জির কাজ শিখতে। বিশ্বজিতের বয়স তখন ১৬/১৭ বছর। বাবা ভেবেছিলেন ছেলে বুঝি খুব কাঁদবে। বিশ্বজিৎ বাবা-মায়ের সামনে চোখের এক ফোটা জলও ফেলেনি। শুধু মশুরা গ্রাম পেরিয়ে আসার সময় চোখ ঝেপে জল এসেছিল।

নড়িয়া থেকে বাসে উঠে শরিয়তপুর পর্যন্ত আসতে খুব কষ্ট হয়েছিল। বারবার চোখ উপচে আসছিল জল। বুক চেপে আসছিল কান্নায়। তবুও কাঁদেনি বিশ্বজিৎ। শরিয়তপুর থেকে ঢাকা আসার পথে বাসে ঘুমিয়ে পড়েছিল। কিছু টের পায়নি।

চন্দনা কাগজে মোড়ানো প্যাকেটটা ছোট ভাইয়ের হাত থেকে নিয়ে বলেছিল, ‘তোর আমন্ত্রণ টেলার্সের প্যাকেট কই? কাগজে মুড়িয়ে কী দিচ্ছিস?’

বিশ্বজিৎ মুখে বিশ্বজয়ের হাসি মেখে বলেছিল, ‘চন্দ্র-সূর্য অস্ত গেল, জোনাকি জ্বালায় বাতি/মোগল পাঠান হদ্দ হলো, ফরাসি পাড়ার তাঁতি। আমি হলাম শাঁখারীবাজারের দর্জি। আমার একটা দোকান, তার আবার প্যাকেট।’

চন্দনা কাগজের মোড়ক খুলে দেখেছিল তার ভেতর গোলাপী প্রিন্টের কামিজ, গলার কাছে সিঁদুরের ফোটার মতো লাল বুটি, গোলাপী সালোয়ার আর ওড়না।

আনন্দে চন্দনার কণ্ঠ বুজে এসেছিল। দুইহাতে জামা চেপে ধরে অভিমানভরা গলায় বলেছিল, ‘দুইদিন হলো পুজো গেছে। এখন উনি এসেছেন আমার জন্য নতুন জামা নিয়ে।’

‘পাঠাতে চেয়েছিলাম, বিশ্বাস কর। নিজে হাতে তোকে দেব বলে পাঠায়নি’, বোনের অভিমান ভাঙাতে বিশ্বজিৎ বলেছিল, ‘তুই মন খারাপ করেছিস? পুজোর সময় দোকানে কত কাজ ছিল বল। কাজ ফেলে আসি কেমন করে।’

চন্দনা জানে ছোটভাই পুজোর কাজ ফেলে কখনো আসবে না। এখন ওদের অনেক টাকা দরকার। বাবা বেশ কদিন হলো অসুখে ভুগছেন। ছোটভাই বলেছে বাবাকে ঢাকায় নিয়ে গিয়ে চিকিৎসা করাবে।

চন্দনা বলেছিল, ‘পুজোর রোজগার থেকে আমার জন্য খরচ করলি? রেখে দিলে তো কাজে লাগত।’

বোনের কানের কাছে মুখ এনে বিশ্বজিৎ ফিসফিস করে বলেছিল, ‘গতবার বাড়ি থেকে জ্বর গায়ে ঢাকা গেলাম, তখন বাবা টাকা দিয়েছিল ডাক্তার দেখানোর জন্য। সব টাকা খরচ হয়নি। সেই টাকায় তোর জন্য কাপড় কিনেছিলাম। সেলাই তো নিজেই করেছি। ডিজাইন পছন্দ হয়েছে তোর?’

চন্দনা কোনো কথা বলেনি। ছোট ভাইয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে ছিল। ২২/২৩ বছরের টগবগে, উচ্ছল, তুখোড় তরুণ। মায়াময়-স্বপ্নভরা চোখ। মনে হয় কত বড় হয়ে গেছে! অন্যের দায়িত্ব নিতে শিখেছে।

অগ্রহায়ণের শেষ। মাঠের ফসল কেটে ঘরে তোলার কাজও প্রায় শেষ। মাঠে এখনো কতক ধান রয়ে গেছে। সপ্তাহখানেকের মধ্যে সেগুলোও কেটে মাড়াইয়ের কাজ করতে হবে। বছরের এই সময়টা মহিবুল্লার ভালো লাগে। একই রকম ভালো লাগে মহিবুল্লার স্ত্রী রোমেনার। নিজের মতো করে একটু পিঠা-পায়েস করা যায়। জিনিসপত্রের দাম এত বেড়ে গেছে যে আগের মতো আর পারে না। তবুও যতটুকু পারে তাতেই শান্তি।

রোমেনা চুলার আঁচ থেকে আরেকটা পিঠা তুলে থালার ওপর রাখে। মহিবুল্লা টুক করে গরম পিঠাটা দুই হাতের তালুতে নিয়ে এ-হাত ও-হাত করতে থাকে আর দুই ঠোঁট সরু করে তাতে ফুঁ দেয়।

সোলায়মান এসে দাঁড়ায় ভর সন্ধ্যায় উঠোন অন্ধকার করে। সোলায়মান গায়ে-গতরে যেমন মোটাসোটা তেমনি কুচকুচে কালো তার গায়ের রং। হাতে-পায়ে বড় বড় লোম। অন্ধকারে হঠাৎ দেখলে যে কেউ চমকে ওঠে। ছোট ছেলেমেয়েরা ওকে এড়িয়ে চলে, ভীষণ ভয় পায় বলে।

সোলায়মান গলা নামিয়ে কথা বলে, তবুও মনে হয় তিনজন একসঙ্গে কথা বলছে। সোলায়মান বলে, ‘মহিবুল্লা ঢাকাত যাওয়া লাগিবে। মোচ্ছব শুরু হইছে ওইঠে।’

‘কোনঠে! কী হইছে বাহে?’

সোলায়মান ইঙ্গিত করে মহিবুল্লাকে, ‘এলাও বাইরে আইসো, কথা আছে।’

মহিবুল্লা হাতের পিঠা থালার ওপর রেখে উঠে দাঁড়ায়। ঘরের ভেতর থেকে সোমা চিকন গলায় ডাকে, ‘বাপ! এত্তি আসেন কাছে। মোর মাথায় হাত বুলায়ে দ্যান। কষ্ট হবার লাগিছে।’

মহিবুল্লার ৮ বছরের মেয়ে সোমা। তিনদিন হলো জ্বরে বেহুশ। উথাল-পাথাল জ্বর। মাথার উপর মাটির হাড়ি ফুটো করে ঝোলানো আছে। তা থেকে টুপ টুপ করে মাথায় পানি পড়ে সারাক্ষণ। তাও মাথা পুড়ে যায় জ্বরের গনগনে আগুনে।

মহিবুল্লা গলা উঁচিয়ে বলে, ‘আইসি মা। তোমার সোলায়মান চাচা আসিছেন, কথা বলি।’

সোলায়মানের সঙ্গে বাড়ি থেকে বের হয়ে এসে রাস্তার উপর দাঁড়ায় মহিবুল্লা।

মানুষ সাপ্লাইয়ের ব্যবসা সোলায়মানের। দেড় যুগ পার করেছে এই ব্যবসায়। ঢিল ছুড়লেই মজুরি। আয় রোজগার ভালো। ওদের হেড অফিস ঢাকায়। সেখানে বড় বড় মানুষজন ব্যবসা চালায়। সোলায়মান চালায় একটা ব্রাঞ্চ অফিস। গ্রাম থেকে লোক জোগাড় করে ঢাকায় পাঠায়। মিছিল-মিটিং থেকে পুলিশের ওপর ইট ছুড়ে মারার জন্য লোক ভাড়া দেয় ওরা।

এই ভাড়াটে লোকগুলো জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মিছিল থেকে ইট ছুড়ে মারে পুলিশের ওপর। ককটেল মারে। কখনো বা গাড়ির টায়ারে আগুন দিয়ে ভীতির সঞ্চার করে। সড়ক অবরোধ করে। আজকাল গাড়িতে আগুন দেওয়ার নতুন চল হয়েছে। এই কাজের জন্য কোনো কোনো রাজনৈতিক দল তাদের ভাড়া করে। কাজের জন্য লোকপ্রতি মজুরি দেয়। কখনো এই মজুরি লাখ টাকা পর্যন্ত হয়। ঝুঁকি আর ভাড়াটে লোকসংখ্যার উপর নির্ভর করে মজুরি।

সোলায়মান বলে, ‘ঢাকা যাওয়া লাগিবে বাহে, ম্যালা ট্যাকার খ্যাপ ধরিলোমহয়।’

মাঠে এখনো অর্ধেক ধান কাটা বাকি। সে ধান নিজের নয়, অন্যের জমিতে ফসল ফলায় মহিবুল্লা। সময়মতো কেটে ঘরে তুলতে না পারলে মাটিতে হেলে পড়বে ধানগুলো। এই অল্পকটা ধানই তার সম্বল। তাতে বছরের যে কয়টা দিন যায়। ধান কাটা বাদ দিয়ে এখন কেন ঢাকায় যেতে হবে সেই কথা মহিবুল্লার মাথায় ঢোকে না। তা ছাড়া সে আগে কোনোদিন ঢাকায় যায়নি, সেটাও তার একটা ভয়।

মহিবুল্লাহ বলে, ‘জ্বরে মেয়ের শরীল পুড়িয়া যায় বাহে। ঢাকাত না গেলু না হয়?’

সোলায়মান দ্বিগুণ মজুরির কথা বলে। জানায় এ মাত্র একদিনের ব্যাপার। কাল রাতেই ফিরবে আবার। মজুরির সঙ্গে প্যান্ট পাওয়া যাবে, শার্টও দেবে।

মেয়ের কথা মনে হয় মহিবুল্লার। দ্বিগুণ মজুরির কথা ভাবে। ভাবনার টানাটানির ভেতর সোলায়মান তার হাতে একদিনের মজুরি আগাম গুজে দেয়। মহিবুল্লার আর না করার জোর থাকে না।

রাতে সোমা ডেকে বলে, ‘মোক ছাড়ি কোনঠে না যান বাপ! মোক আপনি ধরি বইসেন। এলায় মোর বুক ছিড়ি যায়।’

মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে মহিবুল্লা। অত্যন্ত রূপবতী এই মেয়ে তার মায়ের চেহারা পেয়েছে। মেয়ের তপ্ত মাথায় হাত রেখে মহিবুল্লা বলে, ‘এলাও জাগিয়া আছো? নিঁন যাও নাই?’

রোমেনা বিড়বিড় করে বলে, ‘মেয়ে কবার লাগিছে, আইজে না গেলি কি নোয়ায়?’

‘ভাত খাবার দে, মোর ভুক লাগিচে,’ বলে মেয়ের কাছ থেকে উঠে আসে মহিবুল্লা।

খেতে বসে খেতে ইচ্ছা করে না। অল্প একটু খেয়ে উঠে পড়ে।

মেয়ের ঘরের দিকে আর যায় না। বাড়ি থেকে বেরুনোর মুখে রোমেনা এসে দাঁড়ায় পাশে। ‘তুমি যে উঠিয়া আসিলে? যাও ঘরে যাও, তোমার সোমা জাগিয়া একা,’ বলে মহিবুল্লা সোজা এসে ওঠে ট্রাকে।

ট্রাক ভর্তি করে লোক যাচ্ছে ঢাকায়। শীতের কনকনে বাতাসে ওরা জড়োসড়ো হয়ে বসে আছে। শীতার্তদের জন্য যে শীতবস্ত্র সংগ্রহ করা হয়েছিল সেখান থেকে সোলায়মান ওদের প্রত্যেককে একটা করে প্যান্ট আর শার্ট দিয়েছে। ঢাকাতে নাকি এই প্যান্ট-শার্ট পরে যেতে হবে। কেউ কেউ লুঙ্গি মালকোছা দিয়ে তার উপর প্যান্ট পরেছে। কেউ প্যান্ট পরে লুঙ্গি মাথায় জড়িয়ে নিয়েছে। কেউ নিজের মাফলার দিয়ে শক্ত করে কান বেঁধে শীত আটকানোর চেষ্টা করছে। মহিবুল্লা একটু সরে আজিজের পাশে গিয়ে বসে।

বিরক্ত হয়ে পশেরজন বলে, ‘আহ! নড়িবার লাগিছ ক্যানো কহেন দেকি। জাড় আসিয়া মারি ফ্যালায়।’

মহিবুল্লা আজিজের মুখের কাছে নিজের মুখ নিয়ে বলে, ‘হামার ডর লাগে বাহে। কোনঠে যাই মোরা। কামখানা কী?’

আজিজ বলে, ‘ঢাকা শহর মোর হাতোর ত্যালোর মতোন চেনা। কিসের ডর বাহে? হামার লগে থাকিবা সকল সোমায়। মোক ছাড়ি কোনঠে একলা না যাও।’

আজিজের কথা শুনে ভরসা পায় মহিবুল্লা। আজিজ আরও বলে, ‘তোমার মুখের দিকে চায়া আছে তোমার কন্যা। ধানের ন্যায্য দাম দিবার চায় না লোকে, সেই ন্যায্য দাম ঠিক করিবার লাগি ঢাকাত যাই। ঢাকা হতে ফিরিয়া ধান বেচিবা বেশি দামে।’ সোলায়মান এমনই শিখিয়ে দিয়েছে তাকে সবাইকে বলার জন্য।

হাই তোলে মহিবুল্লা, ‘নিদ ভাঙি আসে মোর চক্ষে,’ বলে ট্রাকের দুলুনিতে ঘুমিয়ে পড়ে। ঘুমের ভেতর স্বপ্ন দেখে উজান বেয়ে ধেয়ে আসছে তীব্র পানির স্রোত। সেই স্রোতে নদীর পাড় ভাঙছে, ভেসে যাচ্ছে ওদের গ্রাম, ঘরবাড়ি। অথচ কী আশ্চর্য! পানির সেই তীব্র স্রোতের ভেতর অবিচল দাঁড়িয়ে আছে তার ছোট্ট মেয়ে সোমা। ঘুম ভেঙে যায় মহিবুল্লার।

ঘন কুয়াশায় মোড়া ঢাকা শহরের আকাশ একটু একটু করে ফর্সা হচ্ছে। কিছুক্ষণ আগে ফজরের আজান হচ্ছিল। চারপাশ থেকে উথলে ওঠা আজানের শব্দে ঢাকা শহর আড়মোড়া ভেঙে জেগে উঠছে। সদ্য ঘুমভাঙা কাক কা কা করে শহর মাতিয়ে তুলেছে। পুরান ঢাকার লক্ষ্মীবাজারের ঋষিকেশ দাস রোডে ঢোকার মুখে একটা কৃষ্ণচূড়া গাছ। সেই গাছে একঝাঁক শালিক যেন কলহ-বিবাদে লিপ্ত হয়েছে। শালিকের ক্যাচক্যাচানিতে কান পাতা দায়।

ভোরের দিকে শীত-শীত লাগে। বিশ্বজিৎ আড়মোড়া ভেঙে গায়ে কাঁথা টেনে নেয়। গুটিশুটি হয়ে শুয়ে থাকে বিছানায়। যেন ছোট্ট বালক এক, ঘুমাচ্ছে মায়ের কোল ঘেঁষে।

চাচাতো ভাই রকি ওঠে খুব ভোরে। মর্নিং-ওয়াক করে প্রতিদিন ফিরে দেখে বিশ্বজিৎ উঠে কলপাড়ে গেছে। রকি আজ গলির মোড়ে ঢুকতেই শালিকগুলো অমনি থেমে যায়। চুপ করে তাকিয়ে থাকে রকির দিকে। ঘরে ফিরে দেখে বিশ্বজিৎ তখনো বিছানায়। রকি ঘরের ভেতর উঁকি দিয়ে বলে, ‘কী রে, কী হয়েছে তোর? দোকানে যাবি না।’

কাঁথার ভেতর থেকে মুখ বের করে বিশ্বজিৎ বলে, ‘অবরোধের ডাক দিছে তো আজ। হরতালের মতো মনে হয়। আজ আর দোকান না খুলি।’

বিশ্বজিৎ আবার কাঁথার ভেতর মুখ ঢুকিয়ে ফেলে। তখন ওর মোবাইল বেজে ওঠে। এক কাস্টমার তার কাপড় নেওয়ার জন্য ফোন করেছে। খুবই নাকি দরকার। কাস্টমার জোর দিয়ে বলে, ‘আজ তো হরতাল না। রাজপথ অবরোধ। গাড়িঘোড়া বন্ধ থাকবে। দোকান বন্ধ রাখবা কেন?’

বিশ্বজিৎ ‘আচ্ছা ৯টার দিকে আসেন দোকানে,’ বলে আবার কাঁথা মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়ে। ঘুম ভেঙে আসে দুই চোখ জুড়ে।

মহিবুল্লা আর সবার সঙ্গে ট্রাক থেকে নেমে পড়ে। আজিজকে জিজ্ঞাসা করে, ‘এই তাইলে ঢাকা বাহে?’

আজিজ বলে, ‘না। ঢাকা আছে দূর। এলায় মোরা সাভার আছি।’

দলে দলে আরও লোক আসে চারপাশ থেকে। রাজপথ ভরে যায় লোকে। মহিবুল্লা হাঁটতে থাকে আজিজের গা ঘেঁষে। হাঁটে না, যেন দৌড়ায়।

মহিবুল্লাহ বলে, ‘কোনঠে যাই মোরা? এই স্থানে ক্যানে হয়?’

আজিজ একটা ছোট ব্যাগ মহিবুল্লার হাতে দিয়ে বলে, ‘উয়ারা চায় না ধানের ন্যায্য দাম মোরা পাই, তাই ঠেকাবার আইসে। যদি আইসে সামনে কেউ তাইলে ইট মারি মাথা খাম করি দিবারহয়।’

মহিবুল্লা ব্যাগ খুলে দেখে ভেতরে অনেকগুলো ইটের টুকরা।

রোমেনা এসে দাঁড়ায় বাড়ির বাইরে রাস্তার উপর। ওপাশে বিষন্ন ধানক্ষেত। ধানগুলো মাঠের উপর নুয়ে পড়েছে। তার উপর কুয়াশা ঢাকা। আজ কাটার কথা ছিল। রোমেনার মন বড় অস্থির লাগে। বেলা না ওঠা পর্যন্ত ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে রাস্তার ওপর।

কুয়াশার ওপর সূর্যের আলো পড়ে। কুয়াশা বিন্দু বিন্দু শিশির হয়ে ধানের শিষে ঝুঁলে থাকে। রোমেনা দেখে আকাশে একটা চিল। চিলটা আকাশে পাক খেতে থাকে। পাক খেতে খেতে নেমে আসে নিচে।

সকাল নয়টায় বাসা থেকে রিকশা নিয়ে শাঁখারীবাজারের দিকে রওনা হয় বিশ্বজিৎ। ভিক্টোরিয়া পার্কের কাছাকাছি আসতেই ঢাকা জজকোর্ট এলাকা থেকে আসা অবরোধ কর্মসূচির সমর্থক আইনজীবিদের মিছিলের মুখোমুখি হয়। ওই মিছিলের পেছন-পেছন  শান্ত ও ধীর ভঙ্গিতে আসে শাকিল, নাহিদ, লিমন, ইমদাদুল হক আর ওবাইদুল কাদের। সঙ্গে আরও অনেকে। ওরা সবাই জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় আর কবি নজরুল কলেজের ছাত্র। তবে ছাত্রের চেয়ে ওদের বড় পরিচয় ওরা সবাই সরকারি দলের ক্যাডার। শাকিলের হাতে নতুন কেনা চাপাতি আর সবার হাতে রড নাহয় লাঠি।

ভিক্টোরিয়া পার্কের কাছাকাছি আসতেই পেছন থেকে শাকিল তার দলবল নিয়ে ‘ধর ধর’ বলে ঝাঁপিয়ে পড়ে মিছিলের ওপর। মিছিল ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। যে যেদিকে পারে ছুটে পালায়। তখুনি আচমকা পার্কের কাছাকাছি তেলের পাম্পের পাশে ককটেল ফাটে।

সরকারি দলের ক্যাডাররা চাপাতি, রড আর লাঠি উচিয়ে ধাওয়া করে সেদিক পানে।

রিকশাওয়ালা বিশ্বজিৎকে বলে, ‘দৌড় লাগান। দেখেন না গোলাগুলি শুরু হইছে। দৌড়ান।’

বিশ্বজিৎ রিকশা থেকে লাফিয়ে নেমে পড়ে। রিকশাওয়ালা রিকশা ঘুরিয়ে উলটো দিকে ছোটে। বিশ্বজিৎ পথের উপর দিয়ে দৌড় শুরু করে সামনে। পেছন থেকে ধেয়ে আসে সম্মিলিত চিৎকার, ‘ধর ধর।’

তাল হারায় মহিবুল্লা। বড় অস্থিরতার মধ্যে পড়ে যায়। ট্রাক থেকে নেমে ঘুম ঘুম চোখে তাকিয়ে দেখে এক আতঙ্কিত সকাল। দৌড়াচ্ছে মানুষ। গাড়ি ভাঙছে, গাড়িতে আগুন লাগাচ্ছে। পুলিশ গুলি ছুটছে। ধোয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে আসেছে চারপাশ। মানুষজন পুলিশের দিকে ইটপাটকেল ছুড়ছে।

শীতের ভোরের স্নিগ্ধতা খান খান হয়ে ভেঙে পড়ে মহিবুল্লার সামনে গুলি, কাঁদানে গ্যাসের শেল আর ককটেল বিস্ফোরণের শব্দে।

আগুন-ভাঙচুরের তা-বে প্রকম্পিত আর ধোয়ায় আচ্ছন্ন চারপাশে আজিজ পাগলের মতো খুঁজে বেড়ায় মহিবুল্লাকে, ‘কাঁই বাহে? মহিবুল্লা, কোনঠে গেইছ?’

আজিজের ডাক শীতের সকালে রাজপথে পাক খেয়ে ফেরে। পুলিশ পিক-আপ ভ্যানে রাজপথ থেকে গুলিবিদ্ধ একজনের লাশ তুলে রওনা হয় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল মর্গের দিকে।

বিশ্বজিৎ দৌড়ে ঢুকে পড়ে সামনের একটা ডেন্টাল ক্লিনিকে। সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে যায়।

সরকারি দলের ক্যাডারদের কেউ একজন চিৎকার করতে থাকে, ‘ওপরে ওপরে।’

শাকিলের হাতের চাপাতি শীতের সকালের রোদ্দুরে ঝলকে ওঠে। ওরা ছুটে যায় ডেন্টাল ক্লিনিকের দোতলায়।

চন্দনা আবার বলে, ‘হুস। যা- যা ভাগ।’

কাকটা বাড়ির প্রাচীরের ওপাশের নারকেল গাছ থেকে উড়ে এসে বসেছে উঠোনে শুকাতে দেওয়া ওর জামার ওপর। বিচ্ছিরিভাবে কা কা করে ডেকে যাচ্ছে একটানা।

চন্দনা কাকটাকে তাড়িয়ে দুই হাতে জামা চেপে ধরে। সহসা বিশ্বজিতের সরল, হাসিমাখা মুখটা ভেসে ওঠে মনে।

জাপটে ধরে ওরা বিশ্বজিৎকে। এলোপাতাড়ি রড দিয়ে আঘাত করতে থাকে। শাকিল চাপাতি দিয়ে কোপ বসায় বিশ্বজিতের ডান হাতের গোড়ায়। ‘মাগো’ বলে কোঁকিয়ে ওঠে বিশ্বজিৎ।

দৌড় দেয়। দৌড়াতে থাকে। নিচে নামার সিঁড়ি খুঁজে পায় না। তেড়ে আসছে পেছনে সরকারি দলের ক্যাডাররা। হাতে চাপাতি, রড, লাঠি। হঠাৎ বিশ্বজিৎ সামনে দেখে সিঁড়ি। তরতরিয়ে নেমে আসে নিচে। রাস্তায় অনেক মানুষ দাঁড়ানো। এবার আর কেউ তাকে মারতে পারবে না, ভাবে বিশ্বজিৎ। এত মানুষ চারপাশে, নিশ্চয় তাকে বাঁচাবে।

পেছন পেছন ছুটে আসে শাকিলরা। গলগল করে রক্ত পড়ছে বিশ্বজিতের ডান হাতের কাটা থেকে। একজন মানুষ আঁকড়ে ধরে তাকে। পাশের ন্যাশনাল হাসপাতালে নেওয়ার চেষ্টা করে। ছুটে আসে সরকারি দলের সশস্ত্র ক্যাডাররা। ছিনিয়ে নেয় বিশ্বজিৎকে।

আবার এলোপাতাড়ি মার শুরু হয়। চাপাতি দিয়ে কোপাতে থাকে। যাদের হাতে চাপাতি ছিল না তারা রড দিয়ে পেটায়, লাঠির বাড়িতে রক্তাক্ত করে, কিল-ঘুষি মারতে থাকে নৃশংসভাবে।

বিশ্বজিতের ধূসর জামা রক্তে লাল হয়ে ওঠে। রক্তে ভেসে যায় পুরো শরীর। বিশ্বজিৎ দুই হাত জোড় করে বাঁচার তীব্র আকুতি নিয়ে জানায়, ‘আমি রাজনীতি করি না। আমি দরজিখানায় কাজ করি।’

উন্মত্তদের নিষ্ঠুর উন্মাদনা থামে না। বিশ্বজিতের দেহ ধারালো চাপাতির আঘাতে ফানা ফানা করে। রড-লাঠি দিয়ে ক্ষতবিক্ষত করে। বিশ্বজিৎ অনুনয়-বিনয় করে বাঁচার জন্য। বিশ্বজিৎ জানে এই আন্দোলনে রাজনৈতিক দল হিসাবে হিন্দুদের কোনো সম্পৃক্ততা নেই, আছে ধর্মভিত্তিক ইসলামিক দলের। বাঁচতে বিশ্বজিৎ করুণ কণ্ঠে বলে, ‘আমাকে মারবেন না। আমি মুসলমান না, আমি হিন্দু। মায়ের দিব্বি।’ বিশ্বজিৎ বাঁচার শেষ চেষ্টা করে। জানে যারা তাকে মারছে তারা মুসলমান। বিশ্বজিৎ তাই তাদের সত্যটা বিশ্বাস করাতে আল্লাহর কসম কাটে। কাতর গলায় বলে, ‘আল্লার কসম, আমি হিন্দু। আল্লাহর দোহায় লাগে আমাকে বাঁচান।’

বিশ্বজিতের বাঁচার আর্তি, জীবনের জন্য কাকুতিমিনতি ওদের স্পর্শ করে না। চাপাতি, রড আর লাঠি ওর ওপরে পড়ে আর ওঠে আর পড়ে। ধারালো অস্ত্রের আঘাতে বিশ্বজিতের বিক্ষত রক্তাক্ত দেহ লুটিয়ে পড়ে রাজপথে। রক্তে রাজপথ ভিজে যায় মুহূর্তের মধ্যে।

সোমা পিঠ সোজা করে উঠে বসে বিছানায়। বলে, ‘মা মোক তুলি ধরো। বাপ ডাকবার লাগিছেন।’

রোমেনা মেয়ের পিঠের নিচে হাত দেয়। উঠে দাঁড়ায় সোমা। মনের ভেতর নিশ্চিত টের পায়, ‘শরীলে শক্তির ঢেউ খেলি যায়।’

বিশ্বজিৎ হা করে নাক-মুখ দিয়ে বাতাস টেনে নেয় বুকের ভেতর বাঁচার আশায়।

Comments

comments

x