আজ রবিবার | ১৯ নভেম্বর২০১৭ | ৫ অগ্রহায়ণ১৪২৪
মেনু

গল্প শেষ হয়নি

দীপু মাহমুদ | ৩০ জুলা ২০১৭ | ৬:০৭ পূর্বাহ্ণ

Dipu Mahmud

ফরিদ আহমেদ মাথার নিচে দুই হাত মুড়ে রকিং চেয়ারে আধশোয়া হয়ে আছেন। তার মন বিষণ্ন। শুধু বিষণ্ন না তিনি খানিকটা বিরক্তও। গতকাল ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েছেন, ‘গল্প চাই। কোনো পত্রিকার জন্য না, নিজের জন্য। কারও কাছে ভালো গল্প থাকলে কমেন্টে অথবা ইনবক্সে জানান। গল্প বলতে এখানে কাহিনি বা ঘটনা বোঝানো হয়েছে।’ ৭২২ জন রিঅ্যাকশন জানিয়েছে। তারভেতর লাইক, লাভ, ওয়াও আর স্যাড ইমোটিকন আছে। স্যাড ইমোটিকন কেন দিয়েছে বোঝা গেল না। স্ট্যাটাসের নিচে মন্তব্যগুলোও অদ্ভুত।

‘অভিনন্দন।’

‘চালিয়ে যান।’

‘শুভকামনা।’

‘কেমন আছেন ভাই? আপনার সাথে থানার মোড়ে দেখা হয়েছিল। আমাকে চিনতে পেরেছেন? আমি বাবুলের বন্ধু। কাইষ্ট্যা বাবুল।’

ফরিদ আহমেদ কাইষ্ট্যা বাবুল বা এই মন্তব্য যিনি লিখেছেন তাকে চিনতে পারলেন না। একজন লিখেছেন, ‘আমাদের জীবনের সব ঘটনাই গল্প।’

আরেকজন লিখেছেন, ‘পুঁজির বিকাশের সঙ্গে আমাদের জীবন থেকে গল্প হারিয়ে যায়। জীবন হয়ে ওঠে এক কঠিন বাস্তবতা। এখন আর গল্প খুঁজে পাওয়া যাবে না।’

ফরিদ আহমেদ এই মন্তব্যের কিছুই বুঝলেন না। তিনি ভুল বানানে লেখা আরেকটা মন্তব্য পড়লেন, ‘বাই কি বালোভাশা নিয়ে গল্প লিখতে চান? আমার কাছে রুমান্টিক একখান গল্প আছে। একজন লিখেছেন, নারির ঝড়ে পরা প্রেম তাইপের গল্প হলে চইলবে? লাগলে বইলেন।

মানুষজন ফেসবুকের স্ট্যাটাসকে গুরুত্ব দেয় না। এই কথা মনে হয়ে ফরিদ আহমেদ বিরক্ত হয়েছেন। মানুষজন মনে করে ফেসবুক হচ্ছে সস্তা রসিকতা করার জায়গা। এখানে সিরিয়াসনেস বলে কিছু নেই। ‘কিছুক্ষণ আগে বাবা আমাদের ছেড়ে না ফেরার দেশে চলে গেছেন্’ এই স্ট্যাটাসের নিচে ৪৭টা লাইক। স্ট্যাটাসে কী লেখা আছে সেটাও পুরোটা পড়ে না। পড়লেও বোঝার চেষ্টা করে না। হুট করে মন্তব্য করে বসে। তিনি ভাবলেন ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেওয়া ঠিক হয়নি। গল্পের কথা জানিয়ে কাগজে বিজ্ঞাপন দেওয়া দরকার ছিল।

ফরিদ আহমেদ রাজনীতি করেন। রাজনৈতিক নেতা হিসেবে তার নামডাক আছে। তিনি দলের গুরুত্বপূর্ণ পদে আছেন। দল এখন ক্ষমতায়। তার লেখক হওয়ার কথা ছিল না। তিনি হয়েছেন। দল ক্ষমতায় থাকলে সাঁতার না জানা মানুষও সাঁতরিয়ে প্রমত্তা নদী পাড়ি দিতে পারে। তিনি নামের আগে সাহিত্যিক লাগাতে চেয়েছেন। সাহিত্যিক ফরিদ আহমেদ। তাও নিজের ইচ্ছেতে না। প্রথম ইচ্ছে প্রকাশ করেছে মজনু। সে ফরিদ আহমেদের সঙ্গে লেপটে থাকে। রাজনৈতিক নেতার বডিগার্ড। তার কোমরে সব সময় গুলিভরা রিভলবার গোঁজা থাকে। সেই রিভলবার লাইসেন্স করা না। মজনু হেসে বলে, ‘সবচেয়ে বড় লাইসেন্স ফরিদ ভাই।’

ফরিদ আহমেদ তার কথা শুনে বিগলিত হন।

স্নেহের হাসি হাসেন। মজনু বলে, ‘ফরিদ ভাই, আপনি এত সুন্দর বক্তৃতা দেন। আমি মুগ্ধ হয়ে শুনি। আপনি হচ্ছেন কথার জাদুকর। রাজনীতিবিদ না হয়ে আপনার সাহিত্যিক হওয়া উচিত ছিল।’

ফরিদ আহমেদ আবার হাসেন। তার যে সাহিত্যিক হওয়ার ইচ্ছে ছিল না তা নয়। কলেজে পড়ার সময় তিনি প্রচুর কবিতা লিখেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে ওঠার পর আর লেখা হয়নি। তখন শুধু মিছিল, শ্লোগান আর বক্তৃতা। তিনি বললেন, ‘রাজনীতিবিদরা কি সাহিত্যিক হতে পারে না?

মজনু বলল, ‘পারবে না কেন? অবশ্যই পারবে। আপনি লেখা শুরু করেন।’

‘কী লিখব?’

‘কবিতা লিখবেন। এই ধরেন-

ভালোবাসার অপর নাম মলি

তাকে দেখে গেলাম আমি গলি

বলি বলি বলেও হয়নি বলা

তাতেই আমার একলা জীবন ঠ্যালা।’

‘মলি কে?’

‘আমাদের পাড়ায় থাকত। উকিল সাহেবের মেয়ে। খুব সুন্দর। জোছনা আর দুধ দিয়ে তৈরি। তাতে একটুখানি আলতা মেশানো। মলির উকিল বাপটা হচ্ছে খাটাস।’

‘কাহিনি কী?’

‘বলতেছি। কাহিনি জটিল। আমি তখন কলেজে পড়ি। মলি ইশকুলে। মলির বাপ মলির বিয়ে দিয়ে দিল।’

‘তোদের প্রেম ছিল?’

‘প্রেম করতে আর পারলাম কোথায়? মলিকে প্রেমের কথা বলার আগেই তার বিয়ে হয়ে গেল।’

‘মলির কোনো ছোট বোন ছিল না?’

‘ছিল। তার নাম জলি। ঘটনা দেখে পাড়ার ছেলেরা দাঁত কপাটি খেয়ে গেলাম।’

‘থামবি না। কাহিনি বলে যা।’

‘বলতেছি, ভাই। জলি হচ্ছে সাক্ষাত দেবী।’

‘দেবী!’

‘হ্যাঁ, দেবী। দেবী মা কালি। শুনেছিলাম জলি নাকি উকিল সাহেবের নিজের মেয়ে না। তিনি জলিকে দত্তক নিয়েছিলেন।’

মজনুর প্রবল আগ্রহে ফরিদ আহমেদ গল্প লিখতে শুরু করলেন। তিনি গল্প সাজিয়ে ফেললেন। নাম দিলেন ‘মজনু-মলির প্রেম।’ অবশ্য শেষ পর্যন্ত তিনি গল্পের এই নাম রাখেননি। মজনু আর মলির অদ্যাক্ষর দিয়ে গল্পের নাম বানালেন মম। মজনু ভালোবাসে মলিকে। এই কথা মলিকে বলতে পারেনি মজনু। একসময় তার অনেক টাকা হলো। মজনু প্রাসাদের মতো বাড়ি বানাল। বাড়ির নাম রাখল মম। মজনু বলে, ‘আমি আর মলি মিলেমিশে এক হয়ে, হয়ে গেছি মলি। বউ ছেলেমেয়ে ঘটনা ধরতে পারেনি।’

একটা অন লাইন পত্রিকার সাহিত্য বিভাগে সেই গল্প প্রকাশিত হলো। মজনু গল্প পড়ে ফরিদ আহমেদকে বলল, ‘আপনি ভাই, গল্পটারে একটু কারেকশন করেন।’

‘কী কারেকশন?’

‘বাড়ির নাম যে মম এই ঘটনা মলিকে জানানোর ব্যবস্থা করেন।’

‘গল্পে নাকি বাস্তবে?’

‘আপনি গল্পে লেখেন, বাস্তবে ব্যবস্থা আমি করব।’

পরে ওই গল্প ছাপা হয়েছিল এক দৈনিক পত্রিকার সাহিত্য পাতায়। তখন সেই গল্পের নাম দেওয়া হয়েছিল ‘ঝরা কুঁড়ি’। ফরিদ আহমেদ গল্পে মজনুর বাড়ির নাম যে মম তা মলিকে জানানোর ব্যবস্থা করে দিলেন।

ফরিদ আহমেদ গল্প লেখেন। মজনু পত্রিকা অফিসে ফোন করে, আপনার পত্রিকায় একটা গল্প গেছে। এইমাত্র ইমেইলে পাঠানো হয়েছে, দেখেন। লেখক ফরিদ আহমেদ। সামনে সংখ্যায় গল্পটা ছেপে দেবেন।’

‘সেই গল্প পড়তে হবে। দেখতে হবে ছাপার মতো কিনা। তা ছাড়া সামনে সপ্তাহে দেওয়া যাবে না। পেইজ মেক-আপ হয়ে গেছে।’

‘বাপের গল্প দেখতে হয় না। যখন তখন ছাপা যায়।’

‘বাজে কথা বলবেন না।’

‘গল্পের লেখকের নাম ফরিদ আহমেদ। আশা করি তার পরিচয় দিতে হবে না। এমনিতেই তোর কাপড় থাকে কোমরের নিচে। ফরিদ আহমেদের নাম শুনলে মানুষজনের কাপড় হাঁটুর নিচে নেমে আসে। তোর কাপড় ঝুপ করে পড়ে যাবে গোড়ালির কাছে। আন্ডারওয়ার পরিস তো?’

‘আপনি তুই তুকারি করছেন কেন?’

‘সম্পাদকের ফোন নম্বর দে। তোর চাকরি খৎনা করার ব্যবস্থা করি।’

মজনু পত্রিকার সম্পাদকের সঙ্গে কথা বলে। ফরিদ আহমেদের গল্প বিভিন্ন খবরের কাগজের সাহিত্যপাতায় ছাপা হয়। একটা, দুটো করে লিখতে-লিখতে তিনি বেশ কয়েকটা গল্প লিখে ফেলেন। বইমেলার আগে একজন প্রকাশক এসে বললেন, ‘ফরিদ ভাই, আপনি তো গুরু মানুষ। আপনার লেখা সবগুলো গল্প আমার কাছে আছে।’

প্রকাশক ব্যাগ থেকে পেপার কার্টিং বের করে দেখালেন। তরুণ প্রকাশক। চোখমুখে বুদ্ধি ঝিলিক দিচ্ছে। ফরিদ আহমেদ মুগ্ধ হলেন। একজন মানুষ তার লেখা গল্পগুলো সংগ্রহ করে রেখেছেন! বিশাল বিস্ময়কর ঘটনা।

প্রকাশক বললেন, ‘আপনার বই প্রকাশ করতে চাই সামনে মেলায়। অনুমতি দেন।’

ফরিদ আহমেদ অনুমতি দিলেন। বইমেলায় তার লেখা বই প্রকাশিত হলো। বইয়ের নাম ‘পথে পথে হেঁটে হেঁটে’। বইয়ের নাম শুনে প্রকাশক বললেন, ‘দারুণ হয়েছে। গল্পের বইয়ের নাম কবিতার বইয়ের মতো।’

ফরিদ আহমেদ বললেন, ‘বইয়ের নাম বদলে দেব?’

প্রকাশক বললেন, ‘বলেন কী! এটাই তো আপনার বিশেষত্ব। এখানেই অন্যের থেকে আপনি আলাদা। আপনার বইয়ে নাম অবশ্যই নদীর ঢেউয়ের মতো হবে।’

বিশেষ করিৎকর্মা প্রকাশক। খবরের কাগজে বিজ্ঞাপন দিলেন। ফেসবুকে লিখলেন, ‘ফরিদ আহমেদ শুধু একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বই নন, তিনি একজন অসাধারণ কথাসাহিত্যিক। আমরা প্রকাশ করেছি তার প্রথম গল্পগ্রন্থ।’ তিনি বিশ্ববিদ্যালয় হলে দলের ছাত্রনেতাদের ফরিদ আহমেদের বই কিনতে আর কেনাতে উদ্বুদ্ধ করে ফেললেন।

ফরিদ আহমেদ বইমলোয় যখন ঢোকেন তখন তার চারপাশে মৌমাছির চাকের মতো ভিনভিন করে দলের ছেলেমেয়ে। তিনি বিশাল মিছিল নিয়ে বইমেলায় আসেন। বইমেলায় গিয়ে ফরিদ আহমেদ হকচকিয়ে গেলেন। স্টলের সামনে দীর্ঘ লাইন। ছেলেদের একটা লাইন। মেয়েদের জন্য আলাদা লাইন। সবার হাতে তার লেখা বই ‘পথে পথে হেঁটে হেঁেট’।  সকলেই বইয়ে অটোগ্রাফ চাইছে। তার সঙ্গে ছবি তুলছে। অনেকে সেলফি তুলতে আগ্রহী। লম্বা লাইনে বই হাতে যারা দাঁড়িয়ে আছে তারা সবাই দলের ছেলেমেয়ে। ফরিদ আহমেদ কিছুটা অবাক হলেন। নিজ দলের ছেলেমেয়ে ছাড়া অন্য কেউ তার বই কিনতে আসেনি।

আরও দুইজন প্রকাশক আগামী বইমেলায় তাদের জন্য বই লিখে দিতে বলেছেন। একজন অগ্রিম টাকা দিতে চেয়েছেন। আগামী মেলায় তাদের স্টলে গিয়ে বসার জন্য অনুরোধ করেছেন। ফরিদ আহমেদ হতভম্ব হয়ে গেলেন। একটা বই লিখেই তিনি বিখ্যাত হয়ে গেছেন। তাকে নিয়ে কাড়াকাড়ি পড়ে গেছে। তবে তার মন খারাপ হয়েছে। ভেবেছিলেন এই বইয়ের জন্য তিনি ‘সিটি আনন্দ আলো সাহিত্য পুরস্কার’ পাবেন। পুরস্কার তিনি পাননি। তবে পুরস্কার পাওয়ার ব্যবস্থা করে ফেলছেন। ‘নগরজীবন সাহিত্য স্বর্ণপদক’। দলের ছেলেমেয়েরা চাঁদা তুলে ঘটনা ঘটিয়ে ফেলেছে। আয়োজন করেছে মজনু।

অনেকেই মাসিক সাহিত্য পত্রিকা প্রকাশ করেন। পত্রিকার সম্পাদক ফরিদ আহমেদের কাছে লেখা চাইছেন। তার মাথায় গল্পের কোনো প্লট আসছে না। তিনি আছেন বিরাট চিন্তার ভেতর। ভাবছেন খবরের কাগজে বিজ্ঞাপন দিলে মানুষ গুরুত্ব দিয়ে নিত। তার নাম আরও ছড়িয়ে পড়ত। এটাও লেখালেখি নিয়ে এক ধরনের বিজ্ঞাপন। কোথায় যেন পড়েছিলেন, বিজ্ঞাপন না দিয়ে ব্যবসা করা আর অন্ধকারে সুন্দরী নারী দেখে হাসা একই ব্যাপার। অবশ্য সাহিত্যচর্চা ব্যবসার ভেতর পড়ে কিনা তিনি বুঝতে পারছেন না। চট করে ভাবলেন, প্রচারেই পসার। তিনি নিজের সাহিত্যকর্মের প্রচার চান। পসারের মানে কী মনে করতে পারছেন না। বাংলা একাডেমির অভিধান খুললেন। সেখানে লেখা পসার মানে ব্যবসায়ে উন্নতি। ফরিদ আহমেদ খানিকটা দমে গেলেন।

ফেসবুকে গল্প চাই বিষয়ক স্ট্যাটাসে অন্যদের লেখা মন্তব্য পড়ে তার মেজাজ খারাপ লাগছে। তিনি ভাবছেন ফেসবুকের এই স্ট্যাটাস ডিলিট করে দিয়ে পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেবেন। আবার স্ট্যাটাসে এতগুলো লাইক দেখে ডিলিট করতে পারছেন না। তবে কোন কোন পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেওয়া যায় সেই কথা ভাবছেন।

ডোর বেল বাজছে। কেউ এসেছে। বাসায় দরজা খোলার মানুষ আছে। কেউ দরজা খুলছে না। ফরিদ আহমেদ উঠে দাঁড়ালেন। তখন বাসার কাজের মেয়ে এগিয়ে গিয়ে দরজা খুলে দিল। ফরিদ আহমেদ এসে দাঁড়িয়েছেন বাইরের দরজার সামনে। দরজার ওপাশে একজন তরুণী দাঁড়িয়ে আছেন। তার বয়স আনুমানিক ২২ বছর হবে। মাথায় লম্বা চুল। গায়ের রঙ কালো। শুধু কালো না, বেশ কালো। বড় বড় দুই চোখের দৃষ্টি প্রখর। একবার তাকালে চোখ নামিয়ে নিতে হয়। চোখের দিকে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকা যায় না। পরনে সাদাকালো প্রিন্টের সুতি শাড়ি। কপালে বড় কালো টিপ। চোখে গাঢ় করে কাজল দিয়েছে। এক হাতে কাঠের কালো বালা। আরেক হাতে চিকন কালো বেল্টের ঘড়ি। কানে সাদা পাথরের দুল। অপূর্ব লাগছে তাকে দেখতে। ফরিদ আহমেদ হকচকিয়ে গেছেন। তার ধারণা ছিল কেবল ফরসা মেয়েরাই দেখতে সুন্দর হয়। কালো গায়ের রঙ যে মেয়ের সে দেখতে এমন অসম্ভব সুন্দর হতে পারে তিনি ভাবতেই পারেননি। মেয়েটি ফরিদ আহমেদকে সালাম দিয়েছে। সে বলল, আমি অদিতি। আপনার কাছে এসেছি।’

এই মেয়ে কেন তার কাছে এসেছে ফরিদ আহমেদ বুঝতে পারলেন না। তিনি অদিতিকে ঘরের ভেতর এসে বসার জন্য বললেন।

অদিতি ঘরের ভেতর এসে বসল। সাজানো গোছানো ঘর। দেখলে বোঝা যায় ফরিদ আহমেদ বেশ অর্থবিত্তের মালিক। অদিতি বলল, ‘আপনি ঘটনা খুঁজছেন। গল্প লিখবেন।’

চমকে উঠেছেন ফরিদ আহমেদ। তিনি বললেন, ‘আপনি আমার ফেসবুক ফ্রেন্ডলিস্টে আছেন?’

‘আমি নেই। আমার বন্ধু আছে।’

‘তার নাম কী?’

‘সেখানে তার আসল নাম নেই। প্রভাতের ফিকে আলো নামে ফেসবুক আইডি চালায়।’

‘অবশ্য নাম থাকলেও হয়তো চিনতাম না। ফেসবুকে ৫,০০০ ফেন্ডস আমার। ২২,০০০ ফলোয়ার।’

‘আপনাকে একটা ঘটনা বলতে এসেছি।’

‘আপনি আমার দলের কেউ? কোথায় আছেন?’

‘আমি রাজনীতি করি না।

এই বয়সের ছেলেমেয়েদের ফরিদ আহমেদ ‘তুমি’ বলে সম্বোধন করেন। দুই-এক কথার পর তারা নিজে থেকে বলে, ‘ভাইয়া (যদিও আংকেল বলা উচিত) আমি আপনার থেকে বয়সে অনেক ছোট। আমাকে ‘তুমি’ করে বলবেন।’ তিনি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। অদিতি এখনো কিছু বলেনি। তাকে ‘তুমি’ করে বলা যাচ্ছে না। ফরিদ আহমেদ বললেন, ‘বেশ। চায়ের কথা বলি। চা খেতে-খেতে ঘটনা শুনব।’

অদিতি বলল, ‘আমি গ্রিন টি খাই। আমার কাছে গ্রিন টির প্যাকেট আছে। শুধু গরম পানি হলেই চলবে।’

ফরিদ আহমেদ খানিকটা চমকালেন। তিনি একইসঙ্গে কৌতুক বোধ করছেন। এই মেয়ে টি-ব্যাগ সঙ্গে নিয়ে ঘোরে। তিনি বললেন, ‘গ্রিন টি বাসায় থাকার কথা। আমি চায়ের কথা বলে আসি।’

ফরিদ আহমেদ চায়ের কথা বলতে গেলেন। অদিতি ঘরের চারপাশে চোখ বুলিয়ে নিল। সে ড্রয়িংরুমে বসে আছে। ঘরের দেওয়াল ভর্তি ছবি টাঙানো। বেশিরভাগ ছবিতে ফরিদ আহমেদকে দলের নেতার সঙ্গে একান্তে দেখা যাচ্ছে। একটা ছবিতে ফরিদ আহমেদ স্ত্রীর সঙ্গে (বয়স আর ভঙ্গি দেখে অদিতি অনুমান করে নিল ছবির এই নারী ফরিদ আহমেদের স্ত্রী) সমুদ্রে গোসল করছেন। ফরিদ আহমেদ খালি গায়ে। অদিতি মোবাইল ফোন সাইলেন্ট করে ব্যাগে রেখে দিল।

ফরিদ আহমেদ ফিরে এসে বললেন, ‘আমার স্ত্রী জানতে চাইছিলেন দুপুরে কী খাবেন? চাইনিজ কোনো আইটেম বানাবে কিনা।’

অদিতি বলল, ‘উনাকে ধন্যবাদ দেবেন। বলবেন আমি দুপুরে এখানে খেতে পারছি না বলে দুঃখিত।’

ফরিদ আহমেদ বিস্মিত হয়েছেন। অদিতি একবারও হাসেনি। সে কথা বলছে গম্ভীর মুখে। এই বয়সের ছেলেমেয়েরা হবে উচ্ছ্বল। কথায়-কথায় হেসে উঠবে। তারা বুড়ো পন্ডিতের মতো গম্ভীর হয়ে থাকবে না। এই মেয়ে গম্ভীর হয়ে আছে। তিনি বললেন, ‘আচ্ছা সে দেখা যাবে। গল্প শুনি।’

অদিতি গল্প বলতে শুরু করল, ‘একদেশে ছিল দুই বন্ধু।’

ফরিদ আহমেদ এখন অদিতির সঙ্গে ‘আপনি’ বা ‘তুমি’ এড়িয়ে কথা বলার চেষ্টা করছেন। তিনি বললেন, ‘এটা কী কোনো রূপকথা?

‘গল্পটা শুরু করেছি সেভাবে।’

‘আচ্ছা, গল্প শুনি।’

‘একজনের নাম আদনান আর আরেকজনের নাম বদরুল। তাদের ছিল গলায়-গলায় ভাব।’

‘ছিল কেন, এখন নেই?’

‘এখন থাকলে সেটা গল্প হবে না। একটা সাদামাটা কথা হয়ে যাবে। আপনি গল্প লেখেন। আপনি জানেন গল্পে বাঁক থাকতে হয়। বাঁকে এসে যে যত ভালোভাবে মোচড় দিতে পারে পাঠক তত আগ্রহ পায়। গল্প ভালো হয়ে ওঠে। লোকে বলে গল্প জমে গেছে।

আদিতির কথা শুনতে ফরিদ আহমেদের ভালো লাগছে। তিনি বললেন, ‘আর প্রশ্ন করব না। গল্প শুনি।’

অদিতি বলল, ‘দুই বন্ধুর কেমন ভাব ছিল উদাহরণ দিলে আপনি বুঝবেন। দুজন একই বিশ^বিদ্যালয়ে পড়ে। তাদের পড়ার বিষয় আলাদা হলেও একসঙ্গে থাকে। একই হলে। একই রুমে। তারা ছাত্র রাজনীতি করে। একই দল। তখন দেশে মিলিটারি শাসন। মিছিল, মিটিং, আন্দোলনে উত্তাল দেশ। রাজপথে মিছিল হচ্ছে। মিছিল থেকে বদরুলকে পুলিশ অ্যারেস্ট করেছে। তাকে গাড়িতে তুলে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। আদনান ছুটে গেছে পুলিশের গাড়ির কাছে। সে পুলিশের গাড়িতে ওঠার চেষ্টা করছে। পুলিশ তাকে গাড়িতে উঠতে দিচ্ছে না। গাড়ি চলছে। পেছনে মিছিল। পুলিশ টিয়ার শেল ছুড়েছে। কেউ পুলিশের গাড়ির কাছে এগিয়ে আসার সাহস পাচ্ছে না। আদনান পুলিশের গাড়ি ছাড়েনি। তাকে পুলিশ পেটাতে শুরু করেছে। আদনান লাফ দিয়ে পুলিশের গাড়িতে উঠে পড়ল। সে তার বন্ধু বদরুলকে একা হাজতে কিংবা জেলে যেতে দেবে না। সেও যাবে। তাকে কেন পুলিশ অ্যারেস্ট করছে না সে বুঝতে পারছে না।

ফরিদ আহমেদকে কিছুটা উত্তেজিত দেখাচ্ছে। তিনি অস্থির হয়েছেন। অদিতিকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, ‘আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে এরকম ঘটনা ঘটেছে কয়েকবার। আমার খুব কাছের বন্ধুর নাম হাসান। আমরা একসঙ্গে রাজনীতি করতাম। হাসান খুব সাহসী আর একরোখা ছেলে ছিল। আমাকে ভীষণ ভালোবাসতো। আমি বলেছিলাম দুইজন একসঙ্গে জেলে যাওয়া বোকামী। আমি জেলে গেলে তুই বাইরে থেকে আন্দোলন চাঙা করে তুলবি। হাসান রাজি হলো না। সে বলল, হাজতে তুই পুলিশের মার সহ্য করতে পারবি না। আমি কাছে থাকলে কিছু একটা ব্যবস্থা করতে পারব। সেই ব্যবস্থা হাসান করেছিল। সে পুলিশের নির্মম অত্যাচারের হাত থেকে প্রত্যেকবার আমাকে বাঁচিয়েছে।’

চা চলে এসেছে। চা নিয়ে এসেছে বাড়ির কাজের মেয়ে। মজনু মাঝখানে একবার এসে উঁকি দিয়ে গেছে। তাকে বাসার বাইরের দিকে অন্য একটা ঘরে থাকতে বলা হয়েছে। ফরিদ আহমেদ সিগারেট জ¦ালিয়েছেন। তিনি উত্তেজনায় সিগারেট জ¦ালানোর আগে অদিতির অনুমতি নিতে ভুলে গেছেন। অদিতির জন্য গ্রিন টি দেওয়া হয়েছে। রস চায়ে চুমুক দিয়ে চুপচাপ বসে আছে।

ফরিদ আহমেদ বললেন, ‘আদনানের গানের গলা ছিল অসাধারণ। একদিন আমরা দুজনে ক্যান্টিনে সকালের নাস্তা করছি। তখন সেখানে অসম্ভব সুন্দর দেখতে একজন মেয়ে এসেছে। আমি মুগ্ধ হয়ে গেলাম। এই মেয়েকে আগে কখনো ক্যাম্পাসে দেখেছি বলে মনে হচ্ছে না। আদনান নাস্তা শেষ করে হাত ধুয়ে এল। আমার নাস্তা শেষ হয়ে গেছে। সেই মেয়ে এক কাপ চা খেয়ে উঠে পড়ল। আদনান উঠে পড়েছে। আমিও উঠে পড়েছি। ক্যান্টিন থেকে আমরা বের হয়ে এসেছি। আদনান গান গাইছে, ও কেন এত সুন্দরী হলো। অমনি করে ফিরে তাকাল। দেখে তো আমি মুগ্ধ হবই, আমি তো মানুষ। মান্না দের গান। আদনান গান শেষ করতে পারেনি। মোটর সাইকেল নিয়ে একজন এসে দাঁড়াল। ক্যাম্পাসের বড় ভাই। ক্যাডার। সঙ্গে আর্মস রাখে। আমাদের সঙ্গে ওই মেয়ের পরিচয় করিয়ে দিল। বড় ভাই হেসে বলল, আমার বন্ধু। তোদের ভাবী হবে। সেই মেয়ে বড় ভাইয়ের মোটর সাইকেলে উঠে চলে গেল। আমরা দুই বন্ধু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকলাম।’

অদিতি চুপ করে আছে। ফরিদ আহমেদের মাথায় গল্পের প্লট চলে এসেছে। চতুর্ভুজ প্রেমের গল্প। মিজান ঘরে উঁকি দিয়েছে। ফরিদ আহমেদ সিগারেটেরে শেষটুকু অ্যাসট্রেতে ঠেসে ধরে আগুন নিভিয়ে দিলেন। মিজান বলল, ‘বাহার বলছে তার জরুরি দরকার।’

ফরিদ আহমেদের সমস্যা মিটে গেছে। তিনি গল্প পেয়ে গেছেন। মাথার ভেতর সেই গল্প ছোটাছুটি করতে। তিনি নতুন করে গল্প শুনতে আগ্রহ বোধ করছেন না। বাহারকে আসতে বলেছিলেন। সিটি কর্পোরেশনের টেন্ডার নিয়ে কথা আছে।

অদিতি ঘটনা বুঝে ফেলেছে। সে বলল, ‘আজ উঠি। আগামীকাল আসব।’

অদিতির আসার আর কোনো প্রয়োজন নেই। তবু তাকে না বলতে পারলেন না ফরিদ আহমেদ। অদিতির ভেতর প্রবল আকর্ষণ আছে। কীসের আকর্ষণ ফরিদ আহমেদ বুঝতে পারছেন না। তিনি বললেন, ‘আগামীকাল সকালে আমার মিটিং আছে। আমরা পাঁচটা নাগাদ বসতে পারি। সন্ধ্যার পর আমি আবার একটু বেরুব।’

অদিতি বলল, ‘পাঁচটার সময় আসব।’

পরদিন ঠিক পাঁচটায় অদিতি এল। তার পরনে জিনসের প্যান্ট। গায়ে অফ-হোয়াইট ফতুয়া। কপালে বড়ো কালো টিপ। গলায় ঝোলানো ওড়না। আজ হাতে কিছু নেই। কাঁধে ঝুলছে কালো রঙের ব্যাগ।

ফরিদ আহমেদ বললেন, ‘গল্প কিন্তু আমি একটা পেয়ে গেছি। দুই বন্ধু একজন মেয়েকে ভালোবাসে। সেই মেয়ে ভালোবাসে অন্য এক ছেলেকে। তাই নিয়ে তাদের ভেতর টানাপোড়েন।’

অদিতি বলল, ‘সেই ছয়ের দশক থেকে এরকম কাহিনি নিয়ে প্রচুর সিনেমা-নাটক হচ্ছে। আর আপনি নতুন কিছু লিখুন। আমি গল্পটা বলি। দরকার হলে আপনি পরে লিখবেন।’

ফরিদ আহমেদ সোফায় গা এলিয়ে দিলেন। তিনি অদিতির যুক্তি মেনে নিয়েছেন। বললেন, ‘বেশ।’

অদিতি গল্প বলতে শুরু করল, ‘দুই বন্ধু বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করে বের হয়েছে। বদরুল ব্যবসা করে। আদনান নির্দিষ্ট কিছু করে না। পার্টি থেকে তার মাসখরচ চালানো হয়। পার্টিতে তখন তার ভীষণ নামডাক। পার্টির সেন্ট্রাল কমিটিতে গুরুত্বপূর্ণ পদে আদনানের নাম প্রস্তাব করা হয়েছে। বদরুল নিজের ব্যবসা গোছাতে গিয়ে পার্টির নাম ভাঙিয়ে এমন কিছু করেছে যাতে পার্টি বিব্রতকর অবস্থায় পড়েছে। পার্টিতে বদরুলের অবস্থান বিশেষ সুবিধার না।

ফরিদ আহমেদ সিগারেট জ্বালালেন। তিনি চা দিতে বলেছিলেন। তাদের চা দেওয়া হয়েছে। অদিতির জন্য গ্রিন টি। অদিতি বলল, ‘আদনানকে দূরে কোথাও সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। বর্ডারের কাছে ছোট কোনো জেলা শহরে। চেষ্টা করে বদরুল। সে পার্টিকে গিয়ে বোঝায়, আদনান পার্টির জন্য অতি প্রয়োজনীয় একজন মানুষ। সে ভালো সংগঠক। মানুষের কাছে তার গ্রহণযোগ্যতা অনেক বেশি। যেখানে আমাদের পার্টি মাথা তুলে দাঁড়াতে পারছে না সেখানে আদনানকে পাঠানো দরকার। পার্টি তাতে শক্তিশালী হবে। আগামী সংসদ নির্বাচনে ওই আসন আমাদের নিশ্চিত হয়ে যাবে। পার্টির সেন্ট্রাল কমিটি রাজি হয় না। তারা আদনানকে সেন্ট্রালে রেখে দেন।

ফরিদ আহমেদের অস্বস্তি লাগতে শুরু করেছে। অস্বস্তি কেন লাগছে তিনি বুঝতে পারছেন না। তবে কোনো কারণে তার অস্থির বোধ হচ্ছে। হাতে ধরা সিগারেট শেষ হয়ে এসেছে। তিনি আরেকটা সিগারেট ধরালেন। আদিত গল্প বলে গেল, ‘বদরুল একদিন আদনানের বাসায় এল। আদনানের স্ত্রী তখন বাসায় নেই। নেস একটা প্রাইমারি ইশকুলে পড়ায়। সেদিন ছিল ছুটির দিন। তার বাসায় থাকার কথা ছিল। আদনান তাকে জরুরি কাজে পার্টির একজন প্রেসিডিয়াম সদস্যর কাছে যেতে বলেছিল। আদনানের স্ত্রী রাজনীতি করে না। সে স্বামীর কাজে সহায়তা করার জন্য গিয়েছিল। সামনে পার্টির সম্মেলন। বাসায় বসে আদনান পার্টির কিছু কাজ গুছিয়ে নিচ্ছিল।

আচমকা ফরিদ আহমেদ প্রশ্ন করলেন, ‘আদনানের কোনো ছেলেমেয়ে ছিল?’

অদিতি বলল, ‘হ্যাঁ, গল্পের প্রয়োজনে থাকতে পারে। আপনি বলুন তার ছেলে না মেয়ে?’

ফরিদ আহমেদ চুপ করে আছেন। তিনি কিছু বলছেন না। তাকে ভীষণ গম্ভীর দেখাচ্ছে। অদিতি বলল, ‘আদনান ভীষণ উত্তেজিত ছিল। তুই বসে-বসে পার্টর খাচ্ছিস। পার্টি চালাই আমি। মাসে কত টাকা চাঁদা দিই জানিস? আমাকে সেন্ট্রাল কমিটিতে না রাখার পুরো পরিকল্পনা তোর। আমি সেন্ট্রাল কমিটিতে থাকলে তোর দাম কমে যাবে। তুই জানিস শুধু বুদ্ধি আর শ্রম দিয়ে পার্টি চলে না। পার্টি চালানোর জন্য টাকার দরকার হয়। তোর টাকা নেই। টাকা আছে আমার।’

ফরিদ আহমেদ দাঁড়িয়ে পড়েছেন। অদিতি উঠে দাঁড়িয়েছে। ফরিদ আহমেদ ভারী গলায় বললেন, ‘আপনি বসুন। বসে ঘটনা বলুন।’

অদিতি বসে পড়ল। তার চোখ ফরিদ আহমেদের দিকে। ফরিদ আহমেদ ঘরের ভেতর হাঁটছেন। অদিতি বলল, ‘আদনান খুব শান্ত ছিল। সে স্থির গলায় বলল, আমাকে কী করতে হবে? বদরুল বলল, পার্টিকে বলবি সেন্ট্রাল কমিটিতে যাওয়ার তোর কোনো ইচ্ছে নেই। আর তারা যেন আমাকে সেখানে রাখে সেই ব্যবস্থা তুই করবি। তোর কথা সেন্ট্রাল কমিটি শোনে। আদনান বলল, পার্টির সেন্ট্রাল কমিটিতে কে থাকবে সেই সিদ্ধান্ত তারা আমার কাছ থেকে নেবে না। তুই ভুল করছিস। বদরুল বলল, আমি কোনো ভুল করছি না। ভুল তুই করছিস। নিজেকে তুই সরাতে চাইছিস না। খোঁড়া পায়ে লাফিয়ে উপরে উঠতে চাইছিস। টেন্ডার নিয়ে কী হয়েছে তুই জানিস। এখন আমি ছাড়া আর কেউ কোথাও টেন্ডার জমা দিতে পারে না। পার্টির অন্য কেউ না। সেন্টাল কমিটিতে তোর নামও আসবে না।’

ফরিদ আহমেদ হাঁটা বন্ধ করে দাঁড়িয়ে পড়েছেন। তিনি আদিতির দিকে তাকিয়ে আছেন। ঠিক অদিতির চোখের দিকে না। তার মুখের দিকে। অদিতি বলল, ‘তাদের দুই বন্ধুর ভেতর কথা কাটাকাটি হতে থাকল। হঠাৎ বদরুল রিভলবার বের করে আদনানকে গুলি করল। পরপর তিনটা গুলি। রিভলবারে সাইলেন্সার লাগানো ছিল। গুলির শব্দ শোনা গেল আস্তে। ভোতা শব্দ। ছটফট করতে করতে আদনানের দেহ নিথর হয়ে এল।’

ফরিদ আহমেদ বললেন, ‘কে দেখেছে? তার বউ বাড়িতে ছিল না।’

এই প্রথম অদিতির ঠোঁটে হাসি দেখা গেল। সে ঠোঁটের কোনায় চিকন হাসি ঝুলিয়ে রেখে বলল, ‘আদনানের কোনো ছেলেমেয়ে ছিল কিনা আপনি জানতে চেয়েছিলেন। তার এক মেয়ে। তখন সেই মেয়ের বয়স পাঁচ বছর। ভেতরের ঘরে বসে সে ছবিতে রঙ করছিল। কথা কাটাকাটি আর ভোতা গুলির শব্দ শুনে ছুটে এসেছিল বাইরের বসার ঘরে। বাবার দেহ ঘরের মেঝেতে পড়ে আছে। রক্তে ভেসে যাচ্ছে চারপাশ। বদরুল তখনো রিভলবার হাতে দাঁড়িয়ে আছে।’

ফরিদ আহমেদকে বিভ্রান্ত দেখাচ্ছে। অদিতির ঠোঁটের হাসি তাকে বিভ্রান্ত করেছে। সে স্থির চোখে তাকিয়ে আছে অদিতির দিকে। অদিতি মাথা নামিয়ে নিচের দিকে তাকিয়েছে। ফরিদ আহমেদ বললেন, ‘এই ঘটনা মেয়ে পরে মাকে বা অন্য কাউকে বলেনি?’

‘অত ছোটো মেয়ে! বড়ো রকমের শক পেয়েছিল সে। ঠিক সেই মুহূর্ত থেকে আড়াই বছর আর কিছুই মনে করতে পারেনি। শুধু মাঝেমধ্যে চমকে-চমকে উঠত। ডাক্তার বলেছিলেন তাকে যেন কোনো মানসিক চাপে ফেলে দেওয়া না হয়। তাতে তার ক্ষতি হবে। সে স্থায়ীভাবে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলতে পারে।’

‘আড়াই বছর পর যখন তার ট্রমা কেটে গেল। তখন সেই মেয়ে কিছু মনে করতে পারেনি?’

‘পেরেছিল। সে পুরো ঘটনা মনে করতে পেরেছিল।’

ফরিদ আহমেদ ধীর পায়ে ঘুরে গিয়ে সোফায় বসলেন। তিনি সিগারেট জ¦ালিয়েছেন। শান্তগলায় বললেন, ‘তখন সেই ঘটনা সে কাউকে জানায়নি?’

‘বদরুল আগেই ঘটনা ধামাচাপা দিয়ে দেয়। তার অসীম ক্ষমতা। আদনানের স্ত্রী থানা-পুলিশ করে। পার্টির বড়ো নেতাদের কাছে যায়। মন্ত্রীর কাছে যায়। স্বামীর হত্যা রহস্য উন্মুক্ত হয় না। আদনানের স্ত্রী সংবাদ সম্মেলন করে। মিডিয়া সোচ্চার হয়। এবার মনে হয় কিছু একটা হবে। আদনানের স্ত্রী বলে, আমার স্বামীকে ফিরে পাব না। আর কেউ যেন আমার মতো বিধবা না হয় তার জন্য এই হত্যা রহস্যের সমাধান হওয়া দরকার। কিছুদিন পর মিডিয়া ক্লান্ত হয়ে পড়ে। নতুন ইস্যু চলে আসে। মিডিয়া তাই নিয়ে ব্যস্ত হয়ে যায়।’

‘মেয়ে কিছু বলে না কেন?’

‘আদনানের স্ত্রীর তখন দিশেহারা অবস্থা। আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকেও সে দূরে। আদনানের মতো বেকার ছন্নছাড়া একজনকে বিয়ে করেছিল বলে বাড়ির কেউ সম্পর্ক রাখেনি। শ^শুরবাড়ির মানুষ আদনানের এই ছন্নছাড়া জীবনের জন্য বরাবর তার স্ত্রীকে দোষ দিয়ে গেছে। তারাও সম্পর্ক রাখেনি। ছোট্ট মেয়ে নিয়ে আদনানের স্ত্রী তখন একেবারে একা হয়ে পড়েছে। ইশকুলের সামান্য বেতনে বাড়ি ভাড়া দিয়ে, মেয়ের চিকিৎসার খরচ জুটিয়ে, খেয়েপরে বেঁচে থাকা কঠিন হয়ে পড়ল। রাস্তায় গিয়ে দাঁড়ানোর মতো অবস্থা হলো তাদের।’

অদিতি মাথা ঝুকিয়ে চুপ করে বসে আছে। সে কিছু বলছে না। ফরিদ আহমেদ বললেন, ‘তারপর কী হলো?’

মাথা তুলে তাকিয়েছে অদিতি। তার চোখ নরম। ফরিদ আহমেদ অদিতির চোখের দিকে তাকিয়েছেন। অদিতি ভেজা চোখে বলল, ‘বদরুল এল। বন্ধুত্বের দাবী নিয়ে আদনানের স্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে এল। এক লোক অনেকদিন হলো বিদেশে থাকে। তার জমি বদরুল দখল করে রেখেছে। সেখানে বদরুল ঘর তুলল। আদনানের স্ত্রী আর মেয়ের থাকার ব্যবস্থা করে দিল। আদনানের স্ত্রী ঘটনা কিছু জানে না। তবু সে বদরুলের সেই দান নিতে রাজি হলো না। বদরুল বলল, বন্ধুর জন্য আমাকে এটুকু করতে দেন। আদনান আমার প্রাণপ্রিয় বন্ধু। তার পরিবারের জন্য কিছু করা আমার শুধু দায়িত্বের ভেতর পড়ে না, এ আমার পরম ভালোবাসা। আদনানের স্ত্রী এড়িয়ে যেতে পারেনি। তাকে রাজি হতে হয়েছে। সে মেয়েকে নিয়ে বদরুলের দেওয়া বাড়িতে গিয়ে উঠেছে।’

ফরিদ আহমেদ চুপ করে বসে আছেন। তিনি অদিতিকে চিনতে পেরেছেন। হাসানের মেয়ে অদিতি। ওদেরকে বাড়িতে তুলে দিয়ে আসার পর তিনি আর কখনো যাননি। মজনুকে ওদিকে যেতে দেন না। কেঁচো খুঁড়তে সাপ বের হয়ে আসতে পারে। মাঝেমধ্যে ওই পাড়ার কারও কাছ থেকে খবর নেওয়ার চেষ্টা করেন জমি এখনো দখলে আছে কিনা। জমি দখলে আছে। হাসানের স্ত্রী সেখানে তার মেয়ে নিয়ে থাকে।

অদিতি উঠে দাঁড়িয়েছে। সে টানটান শরীরে অনমনীয় ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে। তাকে দেখতে খাপখোলা তলোয়ারের মতো মনে হচ্ছে। ফরিদ আহমেদ বিপন্ন বোধ করছেন। নিজের ভেতরে ভেঙ্গে পড়েছেন। কোনো স্বাক্ষি পাওয়া যায়নি বলে হাসান হত্যা রহস্য উদঘাটিত হয়নি। অথচ অদিতি পুরো ঘটনা জানে। অনেকদিনের চাপাপড়া ঘটনা উঠে এসেছে। ফরিদ আহমেদ জানেন না এই ঘটনা কোথায় গিয়ে শেষ হবে।

অদিতি কাউকে কিছু বলেনি। ফরিদ আহমেদ বুঝতে পারছেন এই মেয়ের করুণায় তিনি বেঁচে আছেন। বাকি জীবন তার দয়াতেই বেঁচে থাকতে হবে। ইচ্ছে করলে তিনি এই মেয়েকে গুম করে দিতে পারেন। সেই ইচ্ছে করতে পারছেন না। অদিতির প্রবল ঋজু ব্যক্তিত্বের কাছে তিনি পরাজিত হয়েছেন।

অদিতি চলে যাচ্ছে। ফরিদ আহমেদ হেরে যাওয়া মানুষের মতো অসহায় চোখে তাকিয়ে আছেন। তার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম।

Comments

comments

x