আজ বৃহস্পতিবার | ২১ সেপ্টেম্বর২০১৭ | ৬ আশ্বিন১৪২৪
মেনু

ভাসমান ‘পেয়ারার গ্রাম’

মানচিত্র ডেস্ক | ০১ জুলা ২০১৭ | ১:৪৫ অপরাহ্ণ

ঘুরে আসুন ভাসমান

পেয়ারা উৎপাদনে বিখ্যাত বরিশাল জেলা। বরিশাল বিভাগের সব স্থানে পেয়ার ফলন হলেও উন্নত ও সুস্বাদু পেয়ারা বরিশাল, ঝালকাঠি ও পিরোজপুরে উৎপাদন হয়। এ কারণে তিন জেলাকে বলা হয় ‘পেয়ারা রাজ্য’। পেয়ারার রাজ্য খ্যাত ঝালকাঠি-বরিশাল-পিরোজপুর জেলার ৫৬টি গ্রাম। বাংলার আপেলখ্যাত সুমিষ্ট পেয়ারা উৎপাদনের কারণে কুড়িয়ানা পরিচিতি পেয়েছে ‘পেয়ারার গ্রাম’ হিসেবে।

হাজার একর জমির ওপর গড়ে উঠেছে পেয়ারা বাগান। মৌসুমের তিন মাস পাকা পেয়ারার সুবাসে সুরভিত থাকে গ্রামের বাতাস। পেয়ারার পাইকারি বাজার ঝালকাঠি ভিমরুলীর ভাসমান বাজার। তিনটি খালের সংযোগস্থলে এ হাটটি অবস্থিত। একটি খাল থেকে নৌকা যায় স্বরূপকাঠি, একটি থেকে কাউখালী, অন্যটি থেকে ঝালকাঠির দিকে। প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত নৌকার ভাসমান এ বাজারে চলে পেয়ারার কেনাবেচা। ডিঙ্গি নৌকা করে পেয়ারা নিয়ে আসে চাষিরা। নৌকা ভরা পেয়ারা এই ভাসমান বাজারের পাইকারদের কাছে বিক্রি করা হয়। ভিমরুলী, শতদশকাঠি, জগদীশপুরের খালে লাইন ধরে চলে পেয়ারা ভর্তি নৌকা। পাইকাররা পেয়ারা কিনে কার্গো ও ট্রলারযোগে চালান করে দেশের বিভিন্ন জেলায়। প্রতিবছর পেয়ারার মৌসুমে বিভিন্ন স্থান থেকে নৌপথে পেয়ারা বাগানে আসে পর্যটকরা। পেয়ারা বাগানে এসে মুগ্ধ হয়ে এখান থেকে পেয়ারা কিনে নিয়ে যান পরিবার ও আত্মীয়-স্বজনদের জন্য।

পিরোজপুর জেলার নেছারাবাদ (স্বরূপকাঠী) উপজেলা সদর থেকে পাঁচ কিলোমিটার পূর্ব দিকে আটঘর কুড়িয়ানা ইউনিয়ন। এই ইউনিয়নের গ্রামগুলোসহ পাশের জলাবাড়ি ও সমুদয়কাঠি ইউনিয়নের মোট ২২টি গ্রামের ৮৫০ হেক্টর জমিতে রয়েছে ২ হাজার ২৫টি পেয়ারার বাগান। শুধু কুড়িয়ানা গ্রামে ৬৪৫ হেক্টর জমিতে পেয়ারা চাষ হয়। এখানকার মানুষের আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস পেয়ারা। শত বছর ধরে গ্রামগুলোতে বাণিজ্যিকভাবে পেয়ারা চাষ করা হচ্ছে। নেছারাবাদ উপজেলার আটঘর, কুড়িয়ানা, জিন্দাকাঠি, ভীমরুলী, আদমকাঠি, ধলহার খালে পেয়ারার মৌসুমে প্রতিদিন ভাসমান হাট বসে। দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে ব্যবসায়ীরা হাটে পেয়ারা কিনতে আসেন। প্রতিদিন হাটগুলোতে ১০ থেকে ১৫ হাজার মণ পেয়ারা বেচা-কেনা হয়। এসব এলাকায় গড়ে উঠেছে পেয়ারার ১৫-২০টি ছোট-বড় ব্যবসাকেন্দ্র।

দক্ষিণাঞ্চলের জেলা ঝালকাঠী ও স্বরূপকাঠীর বিভিন্ন জায়গায় বসে ভাসমান হাট। এ রকম কাছাকাছি তিনটি হাট হলো ভিমরুলি, আটঘর এবং কুড়িয়ানা। প্রথম দুটিতে বসে মৌসুমি ফল আর সবজির পসরা। অন্যটি নৌকার বাজার। প্রথমে ঝালকাঠী জেলা সদরে গিয়ে সেখান থেকে ১ দিনেই এ ৩টি বাজারে বেড়ানো সম্ভব।

ভিমরুলি হাট:

ঝালকাঠী জেলা শহর থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরে ভিমরুলি গ্রামের আঁকাবাঁকা ছোট্ট খালজুড়ে সারা বছরই বসে ভাসমান হাট। তবে পেয়ারার মৌসুমে হয় জমজমাট বাজার। সপ্তাহের প্রতিদিনই সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চলে বিকিকিনি। পেয়ারা বোঝাই শত শত নৌকা। বিক্রেতারা এখানকার খালে খুঁজে বেড়ায় ক্রেতা। আর ক্রেতাদের বেশিরভাগই হল পাইকার। বড় ইঞ্জিন নৌকা নিয়ে তারা বাজারে আসেন। ছোট ছোট নৌকা থেকে পেয়ারা কিনে ঢাকা কিংবা অন্য কোনো বড় শহরে চালান করে দেন।

ভিমরুলি হাট খালের একটি মোহনায় বসে। তিন দিক থেকে তিনটি খাল এসে মিশেছে এখানে। অপেক্ষাকৃত প্রশস্ত এ মোহনায় ফলচাষিরা নৌকা বোঝাই ফল নিয়ে ক্রেতা খুঁজে বেড়ান। ভিমরুলির আশপাশের সব গ্রামেই ভরপুর পেয়ারা বাগান। এসব বাগান থেকে চাষিরা নৌকায় করে সরাসরি এই বাজারে পেয়ারা নিয়ে আসেন। ভাসমান বাজারের উত্তর প্রান্তে খালের উপরের ছোট একটি সেতু আছে। সেখান থেকে বাজারটি খুব ভালো করে দেখা যায়। আকর্ষণীয় দিক হল এখানে আসা সব নৌকাগুলোর আকার আর ডিজাইন প্রায় একইরকম। মনে হয় যেন একই কারিগরের তৈরি সব নৌকা। ভিমরুলির বাজারের সবচেয়ে ব্যস্ত সময় হল দুপর ১২টা থেকে বিকেল ৩টা। এ সময়ে নৌকার সংখ্যা কয়েকশ ছাড়িয়ে যায়। ঝালকাঠী জেলা সদর থেকে মোটরবাইকে এই হাটে আসতে সময় লাগে প্রায় আধাঘণ্টা। আর ইঞ্জিন নৌকায় আসলে সময় লাগে এক ঘণ্টা।

কুড়িয়ানা নৌকাহাট:

এ হাটটি স্বরূপকাঠীতে। ভিমরুলির থেকে ইঞ্জিন নৌকায় জায়গাটিতে আসতে সময় লাগবে ঘণ্টাখানেকের মতো। এ হাটের বিক্রি হয় নৌকা। জেলার বিভিন্ন জায়গা থেকে কারিগররা এখানে তাদের তৈরি করা নৌকা বিক্রি করতে আসেন। বিশাল এলাকাজুড়ে শত শত নৌকায় পরিপূর্ণ হয় এ হাট। সপ্তাহের প্রায় প্রতিদিন বসলেও শুক্রবারে ক্রেতা-বিক্রেতার সমাগম বেশি ঘটে। বিক্রেতারা বড় একটি নৌকার উপরে ছোট ছোট অনেক নৌকা এনে খালে ভাসিয়ে ক্রেতার অপেক্ষায় থাকেন। ১ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকায় পাওয়া যায় বিভিন্ন আকারের নৌকা। সারাবছর হাট বসলেও জুন থেকে সেপ্টেম্বর, হাটের পরিসর বাড়ে। কারণ বর্ষায় এই অঞ্চলের বিভিন্ন জায়গায় পানি বেড়ে যাওয়ায় চলাচলের জন্য নৌকার প্রয়োজন পড়ে।

আটঘরের হাট:

কুড়িয়ানা থেকে প্রায় ৪ কিলোমিটার দূরে আটঘর পেয়ারার হাট। এটিও ভাসমান বাজার। বিভিন্ন জায়গা থেকে ছোট ছোট নৌকায় পেয়ারা নিয়ে চাষিরা এখানে হাজির হন। বাজারে আসার সঙ্গে সঙ্গেই নৌকা বোঝাই পেয়ারা বিক্রি হয়ে যায়। কারণ পাইকাররা এখানে চাষিদের জন্য অপেক্ষায় থাকেন। এ বাজারটিও আকারে বেশ বড়। আশপাশেই দেখা যাবে বড় বড় পেয়ারার বাগান, মাঝে ছোট ছোট নালা। চাষিরা ছোট নৌকা নিয়ে নালার মধ্যে ঢুকে গাছ থেকে পেয়ারা সংগ্রহ করেন। এছাড়া এ বাজারের পান চাষিরাও আসেন পান বিক্রি করতে।

যেভাবে যাবেন:

ঢাকা থেকে নদী ও সড়ক পথে ঝালকাঠী যাওয়া যায়। স্টিমারে চড়েও যেতে পারেন। ঢাকার সদরঘাট থেকে সন্ধ্যা ছয়টায় বিআইডব্লিউটিএ’র রকেট-স্টিমার ‘পিএস মাহসুদ’, ‘পিএস অস্ট্রিচ’, ‘পিএস লেপচা’ ও ‘পিএস টার্ন’ ছাড়ে। সপ্তাহের দিনগুলোতে পালাক্রমে ছাড়ে স্টিমারগুলো। ভাড়া প্রথম শ্রেণির কেবিনে জনপ্রতি ১ হাজার ২শ’ ৫০ টাকা। দ্বিতীয় শ্রেণির কেবিনে জনপ্রতি ৭৬০ টাকা। তৃতীয় শ্রেণির ডেকে জনপ্রতি ১৯০ টাকা। ঢাকা-হুলারহাট লঞ্চে ইন্দেরহাট বা স্বরূপকাঠী লঞ্চঘাট নেমে লঞ্চ বা অটোরিক্সা করেও আটঘর-কুড়িয়ানা পৌছাতে পারেন। ঢাকা-স্বরূপকাঠী বাস সার্ভিস হানিফ, সোনার তরী ,সাকুরা বা সুগন্ধা পরিবহনেও স্বরূপকাঠী আসতে পারেন। এছাড়া সদরঘাট থেকে সন্ধ্যা ৬টায় ঝালকাঠীর উদ্দেশে ছেড়ে যায় ‘এমভি টিপু’ এবং ‘এমভি সুন্দরবন-২’ লঞ্চ। ভাড়া দ্বৈত কেবিন ১ হাজার ৮শ’ টাকা। একক কেবিন ১ হাজার টাকা এবং ডেকে জনপ্রতি ২শ’ টাকা। ঢাকার গাবতলী থেকে সাকুরা পরিবহনের এসি বাসও যায় ঝালকাঠী। ভাড়া ৮শ’ টাকা। এছাড়া, ‘দ্রুতি’, ‘ঈগল’, ‘সুরভী’ ও ‘সাকুরা’ পরিবহনের নন এসি বাসও যায়, ভাড়া ৩৫০ থেকে ৪৫০ টাকা। এছাড়া ঢাকার সায়দাবাদ থেকে ঝালকাঠী সদরে যাওয়ার জন্য রয়েছে ‘সুগন্ধা’ পরিবহনের বাস। ঝালকাঠী লঞ্চঘাট কিংবা কাঠপট্টি থেকে ইঞ্জিন নৌকা ভাড়া পাওয়া যায়। ১০ জনের চলার উপযোগী একটি নৌকার সারাদিনের ভাড়া ১৫শ’ থেকে ২ হাজার টাকা। এ পথে মোটরবাইকের চেয়ে ইঞ্জিন নৌকায় চড়াই ভালো।

যেখানে থাকবেন:

সারাদিন ঘুরে সন্ধ্যায় আবার ঝালকাঠী থেকে ফিরে আসতে পারেন। থাকতে চাইলে জেলা শহরের সাধারণ মানের হোটেলই একমাত্র ভরসা। এ শহরের দু’একটি হোটেল হল কালিবাড়ি রোডে ‘ধানসিঁড়ি রেস্ট হাউস’, বাতাসা পট্টিতে ‘আরাফাত বোর্ডিং’, সদর রোডে ‘হালিমা বোর্ডিং’ ইত্যাদি। ভাড়া ১শ’ থেকে ২৫০ টাকা। তবে ভালো কোনো হোটেলে থাকতে চাইলে যেতে হবে বরিশাল সদরে। ঝালকাঠী থেকে যার দূরত্ব প্রায় বিশ কিলোমিটার।

 

Comments

comments

x