আজ বৃহস্পতিবার | ২১ সেপ্টেম্বর২০১৭ | ৬ আশ্বিন১৪২৪
মেনু

রানা প্লাজা ও কেনসিংটন টাওয়ারের দুর্ঘটনার মধ্যে পার্থক্য কোথায়?

আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী | ২০ জুন ২০১৭ | ১:৫৪ অপরাহ্ণ

আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী

ছোটবেলায় একটা গল্প পড়েছিলাম একটা অপাঠ্য পুস্তকে। প্রাচীনকালের গল্প, আমার সুবিধার জন্য একটু পরিবর্তন করে গল্পটা লিখছি।

এক রাজার দেশে একটা বাড়ি সহসা ভেঙে পড়েছে। বাড়ির ভাড়াটে বাসিন্দাদের অনেকেই তাতে প্রাণ হারিয়েছে। রাজার কাছে নালিশ আসতেই রাজা হুকুম দিলেন, এই বাড়ির মালিককে ধরে নিয়ে এসো। তারপর বাড়ি শক্তভাবে তৈরি করা হয়নি। তাকে শূলে চড়াতে হবে। বাড়ির মালিককে ধরে আনা হলো। সে বলল, রাজাধিরাজ, আমি বাড়ির মালিক বটে, কিন্তু এ বাড়ি তো আমি তৈরি করিনি। করেছে রাজমিস্ত্রি, কাঠমিস্ত্রি ও অন্য লোকরা। তারা  খারাপভাবে বাড়ি তৈরি করে থাকলে আমার তো কিছু করার নেই। রাজার আদেশে রাজমিস্ত্রি ও কাঠমিস্ত্রিকে ধরে আনা হলো। তারা করজোড়ে বলল, হুজুর, যে ইট-কাঠ-বালু দিয়ে বাড়ি তৈরি করা হয়েছে, সেগুলো ভালো ছিল না। এই বাড়ি ভেঙে পড়ার জন্য যদি কেউ দায়ী হয়, তা হবে ইট, কাঠ, বালুর ব্যবসায়ী। এই ব্যবসায়ীকে ধরে আনা হলে দেখা গেল এই ব্যবসায়ী  রাজার শ্যালক ও ধনী ব্যবসায়ী, সুতরাং বাড়ি ভেঙে পড়া মামলার এখানেই সমাপ্তি।

এই গল্পের শেষাংশটা আমি একটু বদলেছি। তা আমার লেখার সুবিধার্থে। তা না হলে একালে ঢাকার সাভারের রানা প্লাজা বা লন্ডনে বহুতল ভবন (টাওয়ার) অগ্নিকাণ্ডে ভষ্মীভূত হওয়ার কারণের সঙ্গে সেকালের বাড়ি ভেঙে পড়ার ঘটনার মিলটি খুঁজে পাওয়া যাবে না। সেকালে বাড়ি ভেঙে পড়া ও একালে রানা প্লাজা ও কেনসিংটন টাওয়ারে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের কারণ খুঁজতে গিয়ে দেখা গেছে, এগুলো ন্যাচারাল ডিজাস্টার নয়, এমনকি অ্যাক্ট অব গডও নয়। এগুলো মেন মেড ডিজাস্টার। মানুষের অর্থলোভ ও দুর্নীতির কারণে এগুলো ঘটেছে। এই অপরাধীরা ক্ষমতার এমন শীর্ষস্থানে অবস্থান করে যে তাদের অনেকের বেলায় বিচারের বাণী নীরবে-নিভৃতে কাঁদে।

বাংলা ১৩৫০ সনে অবিভক্ত বাংলায় এক দুর্ভিক্ষে ৫০ লাখ নর-নারীর মৃত্যু হয়েছিল। ব্রিটিশ শাসন এই কলঙ্ক থেকে এখনো মুক্ত হতে পারেনি। পরে তো জানাজানি  হয়েছিল এটা ‘মেন মেড ফেমিন’—মনুষ্য সৃষ্ট দুর্ভিক্ষ। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী চার্চিলের নির্দেশে জাপানি হামলার মুখে যাতে খাদ্যশস্য তাদের হাতে না পড়ে, সে জন্য গুদামে লুকানো হয়েছিল। তাতে যে লাখ লাখ মানুষ মারা পড়বে, সেদিকে নজর দেওয়া হয়নি। এই খাদ্যাভাব সৃষ্টিতে সহযোগিতা জুগিয়ে অসাধু ব্যবসায়ীরা প্রতিটি মৃত্যুতে মুনাফা করেছিল এক হাজার টাকা। এ তথ্য পরে প্রকাশ করেন তৎকালীন ব্রিটিশ ভাইসরয়ের খাদ্য উপদেষ্টা শ্রী জওলাপ্রসাদ শ্রীবাস্তব।

এ কালের বাংলাদেশে ঢাকায় বহুতল রানা প্লাজা ধসে পড়ায় যে শত শত মানুষের মৃত্যু হলো, তাও তো অতি মুনাফালোভী মালিকের কারণে। ভবনটির নির্মাণকাজে ত্রুটি ছিল। ফাউন্ডেশনে ফাঁকিবাজি করা হয়েছে। গার্মেন্ট ইন্ডাস্ট্রির ভারী ভারী মেশিন ভবনটিতে তোলা হয়েছে, যার ভার বহনে ভবনটির সক্ষমতা ছিল না। এই আশঙ্কার দিকেও মালিকের কোনো দৃষ্টি ছিল না। তিনি গরিব মানুষের জীবনের চেয়ে মুনাফাকে অধিক গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি এখন জেলে। তাতে অসংখ্য পরিবারের জীবনে যে অন্ধকার নেমে এসেছে তা দূর হবে কি, না হয়েছে?

লন্ডনে সম্প্রতি কেনসিংটনের একটি টাওয়ারে যে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ঘটল, অর্ধশতাধিক নর-নারী ও শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে বলে অনুমিত হচ্ছে, এই দুর্ঘটনাও মনুষ্য সৃষ্ট। ভবনের নির্মাণ ব্যবস্থায় ত্রুটি, অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থায় খুঁত এবং এ সম্পর্কে দীর্ঘদিন যাবত্ ভাড়াটিয়াদের অভিযোগ উপেক্ষিত হওয়ায় শেষ পর্যন্ত এ দুর্ঘটনা ঘটেছে। সংবাদপত্রে এ দুর্ঘটনাকে আখ্যা দেওয়া হয়েছে ন্যাশনাল ডিজাস্টার। অথবা জাতীয় দুর্যোগ। টেরেসা মের প্রধানমন্ত্রিত্বের আমলে ম্যানচেস্টারে ও লন্ডনে পর পর চারটি সন্ত্রাসী হামলা ও কেনসিংটন টাওয়ারে এ অগ্নিকাণ্ড ব্রিটিশ জনজীবনে বিরাট বিপর্যয় সৃষ্টি করেছে।

লন্ডনের কেনসিংটন বারাই অন্যতম ধনী ও সমৃদ্ধ পাড়া। এখানে শুধু ধনী ব্যক্তিরা নন, রাজপরিবারের সদস্যরাও বাস করেন। বহুতল লাক্সারি বিল্ডিং আছে। এসব বিল্ডিংয়ে আগুন ধরেনি, ধরেছে এমন একটি বহুতল বিল্ডিংয়ে, যেখানে বেশির ভাগ সাধারণ মধ্যবিত্ত মানুষ থাকে। এখন ধরা পড়েছে কেনসিংটন ও চেলসি কাউন্সিল এই ভবনের বাসিন্দাদের মেইনটেন্যান্স সংক্রান্ত অভিযোগকে কোনো গুরুত্ব দেয়নি।

ভবনটি মেরামতের সময় টাকা বাঁচানোর জন্য কাউন্সিল এক্সটার্নাল ক্লাডিংয়ের জন্য যে প্লাস্টিক ব্যবহার করেছে, তাতে সহজেই আগুন ধরে এবং তা ছড়িয়ে পড়ে। ফায়ার সেফটির ব্যবস্থা ভালো ছিল না। স্প্রিংলার্স নেই। ভবনটি থেকে বেরিয়ে আসার সিঁড়ি একটি। এই টাওয়ারে আগুন লাগার কারণ সম্পর্কে তদন্ত আরম্ভ হতেই এ রকম বহু অভিযোগ জানা যাচ্ছে। আরো জানা গেছে, ব্রিটেনের এ ধরনের চার হাজার টাওয়ার ব্লকের এই একই অবস্থা। এখানে সাধারণ মানুষ বসবাস করে। এই বাসিন্দারা বহুবার আবেদন-নিবেদন করার পরও কাউন্সিল কর্তৃপক্ষ এই টাওয়ারগুলোতে ‘আধুনিক অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা সংযুক্ত করেনি।

কেনসিংটনের টাওয়ারে মর্মান্তিক অগ্নিকাণ্ডে বিক্ষুব্ধ নাগরিকরা রাস্তায় নেমেছে। লন্ডনের মেয়র সাদিক খান দুর্গত মানুষকে দেখতে এসে হেনস্তা হয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী টেরেসা মের নির্বাচনে পরাজয়ে যতটা ক্ষতি হয়েছে, তার চেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে এ দুর্ঘটনায়। সবার অভিযোগ, তাঁর ওয়েলফেয়ার বাজেটে নির্মম অর্থ ছাঁটাইনীতি ব্রিটেনে পৌনঃপুনিক সন্ত্রাসী হামলা ও ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড সম্ভব করেছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী থাকাকালে তিনি ২০ হাজার পুলিশ ছাঁটাই করেছেন। তদুপরি সামাজিক কল্যাণে বারা কাউন্সিলগুলোর জন্য নির্মমভাবে অর্থ বরাদ্দ বাতিল করে দেশে সন্ত্রাস ও দুর্ঘটনা বৃদ্ধির পথ করে দিয়েছেন। টেরেসা মের বিরুদ্ধে মিডিয়া ও নাগরিক সমাজ এখন সমালোচনামুখর।

কেনসিংটন বারার বাসিন্দারা তাদের বারা কাউন্সিলের সব সদস্যের পদত্যাগ দাবি করেছে। কাউন্সিল কর্তৃপক্ষ বলার চেষ্টা করছে, টোরি সরকারের নির্মম আর্থিক কৃচ্ছ্রনীতির জন্যই তারা জনকল্যাণ খাতে বিরাটভাবে ব্যয় সংকোচনে বাধ্য হয়েছে। ব্রিটেনের এবারের বাজেটে জুনিয়র স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীদের ‘ফ্রি ডে মিল’ দেওয়া বাতিলের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এই ডে মিল বাতিল হলে শিশুদের স্বাস্থ্যের জন্য কী দারুণ সমস্যা দেখা দেবে, তা নিয়ে বিশেষজ্ঞরা সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছেন। এর আগে আরেক টোরি প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচার স্কুলের শিশুদের জন্য দুধ খাওয়ার অর্থ বরাদ্দ বাতিল করেছিলেন। বিক্ষুব্ধ মানুষ তাঁর নাম দিয়েছিল ‘মিল্ক স্নেচার’। আর বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শিশুদের ডে মিল কর্তন করার প্রস্তাব করায় তাঁর বিরুদ্ধে বিক্ষোভ ধূমায়িত হচ্ছে। তিনি কদিন প্রধানমন্ত্রী পদে থাকতে পারবেন তা সন্দেহের বিষয়। জেরেমি করবিনের লেবার পার্টি টোরি সরকারের এই আর্থিক কৃচ্ছ্রনীতির প্রতিবাদ জানিয়েই এবারের নির্বাচনে বিরাট সাফল্য লাভ করেছে।

কেনসিংটন আসলে এক নগরীর মধ্যে দুই নগরীর উপাখ্যান। পাশাপাশি প্রাচুর্য ও দারিদ্র্যের এমন অবস্থান সহজে চোখে পড়ে না। একদিকে বড়লোকদের চোখ জুড়ানো অসংখ্য লাক্সারি বিল্ডিং, অন্যদিকে গরিবগুর্বার জন্য বহুতল বিল্ডিং। যার রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা নিম্নমানের এবং বাসিন্দারাও বিত্তশালী নয়। সাম্প্রতিক অগ্নিকাণ্ডের পর যারা বেঁচে গিয়ে গৃহহারা হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে—তাদের মাথা গোঁজার ঠাঁই কোথায় হবে? এই আশ্রয়হীনদের অন্য কোনো বারায় পাঠানো হোক তা তারা চায় না। এর মধ্যেই দাবি উঠেছে, কেনসিংটনে বড়লোকদের যে প্রাসাদোপম বহুতল অট্টালিকাগুলো খালি পড়ে আছে, তাতে অগ্নিকাণ্ডে আশ্রয়হীনদের আশ্রয় দেওয়া হোক। এই দাবিতে জনমত উত্তাল। কিন্তু বারা কাউন্সিল বা সরকার এ দাবি পূরণে এগোবে, তা মনে হয় না।

এভাবেই সমাজ-বিপ্লব ঘটে। একটি ছোট ঘটনাকে কেন্দ্র করে জনসমাজ বিক্ষুব্ধ হয়। ধীরে ধীরে তা আরো অনেক ঘটনার মধ্য দিয়ে বিস্তার লাভ করে বিদ্রোহ অথবা বিপ্লবে পরিণত হয়। মানুষকে শোষণ ও বঞ্চনার ব্যাপারে একুশ শতকের ধনবাদ আঠারো শতকের ধনবাদের ‘ভালগারিটি’কেও ছাড়িয়ে গেছে। জনমনে বিক্ষোভ দানা বাঁধছে দেশে দেশে। ব্রিটেনে যে জেরেমি করবিনকে ‘অচ্ছুত্’, ‘নির্বাচিত হওয়ার অযোগ্য নেতা’ বলে প্রচার করা হয়েছিল, তিনি এখন নির্বাচনে বিরাট জয়ের অধিকারী হয়ে ব্রিটেনের সাধারণ মানুষের কাছে ‘ত্রাণকর্তা’ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছেন। লন্ডনের একটি মিডিয়া লিখেছে, করবিনকে এখন ব্রিটিশ জাতির গ্রান্ডফাদারের ভূমিকায় দেখা যাচ্ছে।

এই লেখার শুরুতে যে গল্পের অবতারণা করেছি সে গল্পে আবার ফিরে যাই। বাড়ি ভেঙে পড়ার অপরাধীদের শনাক্ত করার পরও যেমন রাজা তাদের সাজা দিতে পারেননি, তেমনি ঢাকার রানা প্লাজা বা লন্ডনের কেনসিংটন টাওয়ারের গণহত্যার জন্য যারা আসল অপরাধী, তারা শাস্তি পায় না বা অল্প শাস্তি পেয়ে বেঁচে যায়। রাষ্ট্র ও সমাজের অশ্লীল ধনবাদী ব্যবস্থা তাদের রক্ষা করে। ব্রিটেনে টোরি দলের নীতি দেশে ধনী ও গরিবদের ব্যবধান বাড়িয়ে ধনীদের সব ধরনের নিরাপত্তা দেওয়ার নীতি। এই বৈষম্যনীতি ব্রিটেনসহ উন্নত-অনুন্নত বহু দেশে জাতিকে দুই ভাগে বিভক্ত করে রেখেছে। আমেরিকার মতো উন্নত দেশেও ট্রাম্পের কৃপায় জাতি দ্বিধাবিভক্ত। এই বিভক্তি ও বিভাজনের ফাঁক ক্রমেই বাড়ছে। সমাজবিজ্ঞানীদের কেউ কেউ বলছেন, এই বিভক্তির ফাঁক থেকে অদূর ভবিষ্যতে বিশ্বে আবার ফরাসি বিপ্লব অথবা বলশেভিক বিপ্লবের মতো কোনো বিপ্লব অনুষ্ঠিত হতে পারে।

আগেই বলেছি, ঢাকার রানা প্লাজা বা লন্ডনের টাওয়ার-অগ্নিকাণ্ড—কোনোটাই অ্যাক্ট অব গড বা ন্যাচারাল ডিজাস্টার নয়। এগুলো মনুষ্য সৃষ্ট বিপর্যয়। এই বিপর্যয় সৃষ্টিকারীরা গণহত্যার অপরাধে দায়ী। গণহত্যাকারীদের যে শাস্তি প্রাপ্য, সেই শাস্তিই এই লোভী মানবতার শত্রুদের দেওয়া উচিত। কেনসিংটনের টাওয়ার-অগ্নিকাণ্ডে ব্রিটেনে সেই দাবিই এখন উঠেছে। এ দুর্ঘটনা সম্পর্কে এখন তদন্ত চলছে। তদন্তের রিপোর্ট যদি ‘জনস্বার্থে’র নামে ধামাচাপা দেওয়া না হয়, তাহলে ব্রিটেনের সমাজজীবনের গভীরে নির্মম ধনবাদী ব্যবস্থায় একটি গভীর ফাটলের ছবি বেরিয়ে আসবে।

লন্ডন, সোমবার, ১৯ জুন, ২০১৭

 

Comments

comments

x