আজ রবিবার | ১৯ নভেম্বর২০১৭ | ৫ অগ্রহায়ণ১৪২৪
মেনু

অদ্ভুত আঁধার এক…

জসিম মল্লিক | ২১ মার্চ ২০১৭ | ৩:১৩ অপরাহ্ণ

জসিম মল্লিক

মা মারা যাওয়ার পর এক অদ্ভুত আলো আঁধারি সময় পার করছি আমি তখন। এক একটা সময় আসে মানুষের জীবনে। এ রকম হয়। কেমন শূন্য করে দিয়ে যায় সবকিছু। এই যে মানুষ জন্মাচ্ছে পৃথিবীতে, বেঁচে থাকছে, কাম-ক্রোধ-লোভের হাত ধরে চলেছে এরা তো আসলে জানেনা কেনো জন্ম, কেন এই জীবন, মৃত্যুই বা কেন! তাই পৃথিবীতে রয়েছে সবসময় এক ঘোর অন্ধাকার, কিন্তু মানুষ সেটা বুঝতেই পারে না। তাদেরই মন থেকে অন্ধকার ছড়িয়ে যাচ্ছে পৃথিবীতে। যতটুকু দেখে মানুষ ততটুকু আসলে কিছু নয়, তার চেয়ে অনেক বেশি কিছু যা সে দেখতে পায় না। মানুষের বেদনাগুলোও তাই। দেখা যায় না। আপনজন হরানোর বেদনা বিশেষ করে মা-বাবা হারানোর বেদনা যে কত তীব্র যে হারায় সেই অনুভব করে।

এই যে আমার মা চলে গেলেন। এখন শুধু মায়ের স্মৃতি নিয়ে বেঁচে থাকা। কত স্মৃতি ভীড় করে আসে মনে। পেয়ারাতলার ছোট্ট খুপরি রান্না ঘরটায় মা নিশ্চল বসে থাকতেন। একটু কুঁজো হয়ে কেমন ছেলেমানুষের মতো বসবার ভঙ্গি ছিল মা’র। যেন কোনও কিশোরীবেলার চিন্তায় বিভোড়। সারাদিন কাঠকুড়নির মতো কুঁজো হয়ে হয়ে মা সারা ঘর ঘুরে বেড়ায়, খুঁজে খুঁজে ময়লা বের করে ঘর থেকে, বার বার সামান্য জিনিসগুলো গুছিয়ে রাখে, বিছানার চাদর টান করে অকারণে, তারই ফাঁকে ফাঁকে হঠাৎ শূন্য হয়ে যায় মার চোখ, শিশুর মতো বোকা হয়ে যায় তোবড়ানো মুখ। যেন চার দিকের এই ঘড়বাড়ি. ছোটখাটো জিনিসপত্র, এই ছোট্ট সংসার- এর কোনও কিছুর অর্থই মা বুঝতে পারে না। হাঁটু মুড়ে ছোটখাটো হয়ে মা সবসময় ঘুমোতো, নিঃসাড় সেই ঘুম, আর মাঝে মাঝে সেই মুখে একটু একটু হাসি ফুটে উঠে মিলিয়ে যেতো। তখন মনে হয় মা স্বপ্ন দেখছে- সেই কিশোরীবেলার স্বপ্ন। এক দূর গঞ্জ কিংবা গাঁয়ের স্বপ্ন, যার সঙ্গে এই চারপাশের জীবনের লক্ষ লক্ষ মাইলের তফাত।

অপরাহ্নে এক-একদিন উঠোনে একটা অদ্ভুত আলো এসে পড়ত। শালিখের পায়ের মতো হলুদ তার রং। পাঁচালির ছায়া ঘর ছাড়িয়ে অর্ধেক উঠোন পর্যন্ত চলে যায়। পেয়ারা গাছে ফিরে আসে পাখির ঝাঁক। সেই অলৌকিক হলুদ আলো-আঁধারিতে মা কুঁজো হয়ে সড়সড় করে উঠোন ঝাঁট দেয়, বিড় বিড় করে কী যেনো কথা বলে নিজের সঙ্গে। ঝাঁট দেওয়া শেষ হলে মা পানি ছিটিয়ে দেয় সারা উঠোন। ঠিক সেই সময় দূরে কোথাও বাচ্চা ছেলেদের খেলা ভাঙে- তাদের হাসি চিৎকারের শব্দ ভেসে আসে। কোথা থেকে উঠোনে এসে পড়ে বিষন্ন সব ছায়া আর ছায়া। ভেজা মাটির গন্ধ মন্থর বাতাসে ভারী হয়ে ওঠে। তখন মা ডেকে বলে, যা ঘরে যা, সন্ধ্যা হয়ে গেছে। তখন অপরাহ্নের নিঃশেষ আলোয়, দীর্ঘ গাঢ় ছায়ার দিকে চেয়ে থেকে বহুদুরের এক নিস্তব্দতার কন্ঠস্বর শোনা যায়। তখন ছোট্ট উঠোনটায় শব্দহীন ভাবে শেষ হয়ে যায় এক একটা দিন।

দিন যায়। এভাবেই দিন যায়। মাঝে মাঝে মাকে ফোন করা হয়ে উঠতনা। অকস্মাৎ মনে হতো আরে অনেকদিনতো মার সাথে কথা হয় না! শেষ কিছু দিন আমার কথা মা শুনতে পেতেন না ভাল করে। এই অবস্থায়ই চলে গেলেন মা। ওই ছোট্ট ঘরটায় মা আর নেই। কিন্তু আমি চোখ বুজলেই দেখতে পাচ্ছি মা শুয়ে আছেন। মা যে নেই সেই দৃশ্য আমি তখনও দেখিনি। আমার কল্পনায় মা আছেন। ওই শূন্য ঘরটার বেদনার্ত হাহাকার আমি অনেক পরে অনুভব করেছি।

আমি ফোনে বলি মা কেমন আছেন! মা বলতেন ভালো নেই। আমি ভালো নেই..।

মা ভালো নেই, ভাল থাকার কথাও নয়। শেষ দিকে লাম্বাগো আর বাতে প্রায় পঙ্গু মা ভাল করে হাঁটাচলা করতে পারতেন না, প্রায় সময়েই হামাগুড়ি দিয়ে চলতেন, টুকিটাকি কাজ করতেন। এখন বারবার মনে হয় আরও অনেক কিছু করার ছিল মায়ের জন্য। অনেক কিছূ। প্রতিবার যখন দেশে যাই ভাবি এবার মায়ের কাছে বেশী করে থাকবো। অনেক বড় হয়েও আমি মায়ের কাছে ঘুমিয়েছি। মায়ের বুকের মধ্যে মুখ রেখে ঘুমানোর অভ্যাস ছিল আমার।

বছরান্তে যখন মাকে দেখতে যাই মনে হতো মার চেহারা আরো পাল্টে গেছেন। আরও রোগা কিংবা বুড়ো হয়ে গেছেন। মনে হয় যেন মা আরও বোকা হয়ে গেছেন। মুখটা সামান্য খোলা, ভ্যাবলা একটা বোধবুদ্ধিহীন দৃষ্টি তার চোখে। আমাকে দেখে নীচের ঠোঁটটা আবেগে সামান্য কাঁপছে। মা তাকিয়ে থাকেন। রোগা দুটো হাতে ভর দিয়ে বিছানা থেকে মা উঠবার চেষ্টা করেন। একবার কোথাও বসলে মা আর সহজে দাঁড়াতে পারেন না, কোমড়ে রস জমে যায়। মা কাপড়ের আঁচলে চোখের পানি মোছেন। দৃশ্যটা কতবার দেখা।

অনেক ছোটখাটো কারণেও মাকে অনেকবার কাঁদতে দেখেছি। সব কান্নাই দুঃখের না। সুখেও মানুষ কাঁদে। কষ্টেসৃষ্টে নরবড়ে শরীরটা নিয়ে উঠে দাঁড়ায় মা, ফোকলা তোবড়ানো মুখে অদ্ভুত একটু হাসে। মা যে ঘরটায় থাকে তার খোলা জানালার ওপর সতেজ একটা পেয়ারার ডাল এসে পড়েছে। সিলিঙে ঘুরছে ফ্যানটা। দেয়ালে সেই সূর্যাস্ত আর তিনটে ডিঙি নৌকোর ছবিওয়ালা ক্যালেন্ডার। আমি আচ্ছন্নের মতো মায়ের ঘরটা দেখি। শেষ কয়েকটা মাস মা একেবারেই শয্যাশায়ী হয়ে পড়েছিল। সেটা ছিল কষ্টকর।

যখন ঘরে মন বসে না চলে যাই দূরে । নিজেকে ভুলিয়ে রাখি। শক্ত হই। কিন্তু রাত বাড়লেই স্মৃতি হানা মারে। মায়ের স্মৃতি। ছোট ছোট কথা, দৃশ্যকল্প। আমার মা খুব সামান্য মানুষ ছিলেন। সেই সামান্য জীবনের ঘটনাগুলো অসামান্য হয়ে আমার সামনে হামলে পড়ে। আজ মা নেই, মনে হয় আকাশ থেকে মহৎ এক বিষন্নতা হন হন করে হেঁটে আসছে। টের পাওয়া যায়। চারপাশের বিষন্নতা শক্ত মুঠিতে ধরেছে, আকাশের বিষন্নতা তেমন একটা কিছু নয় আর..।

Comments

comments

x