শুক্রবার ৬ই মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২১শে ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

প্রবৃদ্ধির পেছনে পিছিয়ে পড়া মানুষ

সৈকত ইসলাম   |   শনিবার, ০২ আগস্ট ২০২৫   |   প্রিন্ট   |   465 বার পঠিত

প্রবৃদ্ধির পেছনে পিছিয়ে পড়া মানুষ
একবিংশ শতাব্দীর প্রথম দুই দশকে বাংলাদেশের অর্থনীতি দৃশ্যমান অগ্রগতি অর্জন করেছে। বিশ্বব্যাংকের শ্রেণিবিন্যাস অনুযায়ী, বাংলাদেশ আর নিম্ন আয়ের দেশ নয়, বরং নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশের তালিকায় উন্নীত হয়েছে। একই সঙ্গে জাতিসংঘের মানদÐে স্বল্পোন্নত দেশের গÐি অতিক্রম করে উন্নয়নশীল দেশের পথে অগ্রসর হচ্ছে। অর্থনৈতিক এই সাফল্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, শুরুতে সরকারি বিনিয়োগই ছিল প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি।
নব্বইয়ের দশক থেকে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়লেও ২০০৮-০৯ অর্থবছরের পর তা ধীর হয়ে পড়ে। ফলে সরকার আবার প্রকল্পভিত্তিক ব্যয়ের দিকে ঝুঁকে পড়ে, যার একটি বড় অংশ আসে বৈদেশিক ঋণের মাধ্যমে।
সুতরাং বিগত তিন দশকে সরকারি ব্যয় প্রবৃদ্ধি বজায় রাখার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা রেখেছে। তবে প্রবৃদ্ধির হার যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার প্রক্রিয়াটিও ততটাই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ প্রবৃদ্ধির পেছনে যদি দীর্ঘমেয়াদি ভারসাম্যহীনতা লুকিয়ে থাকে, তবে তা অর্থনীতিকে টেকসই অগ্রগতির পরিবর্তে অস্থিরতার দিকে ঠেলে দিতে পারে। এর কারণ হলো প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করতে গিয়ে অতিরিক্ত ব্যয়প্রক্রিয়ায় সরকার প্রায়ই বাজেট ঘাটতি ও মুদ্রাস্ফীতির মুখোমুখি হয়। বিশেষ করে বৈদেশিক ঋণের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা দেশের রিজার্ভে চাপ সৃষ্টি করে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে দেখা যায়, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ঋণের পরিমাণ যেমন বেড়েছে, তেমনি পরিবর্তিত হয়েছে ঋণের ধরনও। ২০০৫ সালে বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ ছিল ১৬.৮ বিলিয়ন ডলার, যা ছিল মূলত স্বল্প সুদের ও দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন সহায়তা। ২০২২ সালের মধ্যে এই ঋণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৯৫.২ বিলিয়ন ডলার। একই সঙ্গে বেড়েছে বাণিজ্যিক ও আধাবাণিজ্যিক ঋণের অংশ, যেগুলোর সুদের হার তুলনামূলকভাবে বেশি এবং শর্তও কঠিন। এই ঋণের অর্থের বেশির ভাগই বিভিন্ন অবকাঠামোগত প্রকল্পে ব্যয় হয়েছে। সরকারি ব্যয় বৃদ্ধির ফলে প্রবৃদ্ধি হয়েছে, এটি নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। মানুষের হাতে অর্থও বৃদ্ধি পেয়েছে, কিন্তু সেটি দীর্ঘ মেয়াদে দারিদ্র্য হ্রাস এবং প্রবৃদ্ধিকে টেকসই করবে কি না, তা বিবেচনার বিষয়। টেকসইভাবে দারিদ্র্য হ্রাস করতে হলে দরিদ্র মানুষের আয় প্রবৃদ্ধির হারের চেয়েও বেশি হারে বাড়াতে হবে। এর ব্যতিক্রম হলে বৃহৎ জনগোষ্ঠী দারিদ্র্যসীমার নিচে রয়ে যাবে।
এটি স্বীকৃত মত যে প্রকৃত উন্নয়ন তখনই সম্ভব, যখন জাতীয় আয়ের ভেতর দরিদ্রতম ৪০ শতাংশ জনগণের অংশ বেড়ে যায়। এর জন্য কেবল সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর পরিসর বাড়ানো নয়, দরকার উৎপাদনশীল কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি। কারণ আয় বাড়ানোর একমাত্র কার্যকর উপায় হলো টেকসই ও উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান, যা মানুষের সক্ষমতা বিকাশে সহায়ক হয়।
বাংলাদেশের মতো জনবহুল ও শ্রমনির্ভর দেশের জন্য এই বিষয়টি আরো গুরুত্বপূর্ণ। যেখানে সরকারি ব্যয় প্রবৃদ্ধির চালিকা, সেখানে ব্যয়ের উদ্দেশ্যে যেমন হওয়া উচিত শ্রমনিবিড় প্রকল্পে গুরুত্ব দেওয়া; তেমনি এমন প্রকল্পে অর্থায়ন করা, যা দীর্ঘ মেয়াদে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর উৎপাদনশীল কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করবে। কিন্তু বাস্তবতায় দেখা যায়, বেশির ভাগ প্রকল্পই মূলত পুঁজি ও প্রযুক্তি নির্ভর, যার ফলে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সক্রিয় অংশগ্রহণ সীমিত হয়; যার ফলাফল এত বিনিয়োগ সত্তে¡ও বাংলাদেশে কাক্সিক্ষত হারে কর্মসংস্থান তৈরি হয়নি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, ২০১৬-১৭ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত দেশে কর্মক্ষম জনসংখ্যা বেড়েছে প্রায় ৭০ লাখ, অথচ এই সময়কালে নিট নতুন কর্মসংস্থান হয়েছে ৩০ লাখের মতো। বিশ্বব্যাংকের একটি রিপোর্টও তা-ই বলে, দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধির সঙ্গে কর্মসংস্থানের যোগ এখন আগের তুলনায় অনেক দুর্বল।
প্রকল্পভিত্তিক ব্যয়ের মাধ্যমে স্বল্প মেয়াদে প্রবৃদ্ধি অর্জিত হলেও তার স্থায়িত্ব নিয়ে তাই প্রশ্ন থেকেই যায়। প্রকল্প শেষে কর্মসংস্থানের অবসান ঘটে, অথচ ঋণ পরিশোধের দায় থেকে যায়। তখন তৈরি হয় অর্থনৈতিক ঘাটতি, বাড়ে মুদ্রাস্ফীতি, অবমূল্যায়িত হয় মুদ্রা এবং অর্থনীতিতে নেমে আসে চাপ। আরো উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই প্রকল্পগুলোর সুফল সমাজের নির্দিষ্ট শ্রেণি, বিশেষ করে স্থানীয় অভিজাত গোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রীভ‚ত হয়। ফলে সমাজে আয় ও সুযোগের বৈষম্য বাড়ে, যা শুধু অর্থনীতির ভারসাম্যই বিঘিœত করে না, রাজনৈতিক অস্থিরতারও জন্ম দেয়। কারণ যখন উন্নয়নের সুফল নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তখন গণতান্ত্রিক সমাজে ক্ষোভ জন্মায়, যা সমাজ ও রাজনীতির স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়।
বর্তমানে বৈশ্বিকভাবে দারিদ্র্েযর অন্যতম কারণ সম্পদের অপচয় ও বৈষম্যমূলক বণ্টন। সে জন্য প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি এটি মূল্যায়ন করা জরুরি, এই প্রবৃদ্ধি কতটা অন্তর্ভুক্তিমূলক? তা কি দরিদ্র মানুষের জন্য কাজের সুযোগ সৃষ্টি করছে? তাদের আয় বাড়াচ্ছে? বাংলাদেশের সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা বলছে, এ ক্ষেত্রে চিত্র আশাব্যঞ্জক নয়। কর্মসংস্থান বৃদ্ধির হার কমেছে এবং নিম্ন আয়ের ৪০ শতাংশ মানুষের প্রকৃত মজুরি স্থবির রয়েছে, কখনো কখনো তা হ্রাসও পেয়েছে। এর মানে, প্রবৃদ্ধি থাকলেও যদি তা উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান তৈরি না করে, তবে তা দারিদ্র্য হ্রাসে কার্যকর ভ‚মিকা রাখতে পারবে না।
বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির কাঠামো এখন পুনর্বিবেচনার প্রয়োজনীয়তায় দাঁড়িয়েছে। প্রবৃদ্ধি যদি সমাজের বৃহৎ অংশকে অন্তর্ভুক্ত না করতে পারে, তবে তা সাময়িক অর্জন হলেও স্থায়িত্ব হারাবে। তাই প্রতিটি প্রকল্পের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে এই প্রশ্ন থাকা উচিত, এই ব্যয় কি কেবল জিডিপি বাড়াবে, নাকি মানুষের জীবনে গঠনমূলক পরিবর্তন আনবে? যদি প্রকল্পভিত্তিক ব্যয়ের মাধ্যমে বেসরকারি বিনিয়োগ আকৃষ্ট না করে, দরিদ্র মানুষের উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান সৃষ্টি না করে, সাময়িকভাবে সরকার এবং এক শ্রেণির মানুষের আয় বৃদ্ধি হয়, তাহলে এই প্রকল্পভিত্তিক উন্নয়নের মেয়াদ শেষে তা দেশের অর্থনীতিতে একটি বড় শূন্যতা সৃষ্টি করবে। এই প্রক্রিয়ায় অর্থনীতে আসা অর্থের জোগানও বন্ধ হয়ে যাবে, একই সঙ্গে ঋণ পরিশোধের কারণে অর্থনীতি থেকে অর্থ চলে যাবে। ফলে এই প্রবণতা বজায় থাকলে দীর্ঘ মেয়াদে অর্থনীতি যেমন দুর্বল হবে, তেমনি সমাজ ও রাজনীতিতেও অস্থিরতা বাড়বে। তাই এমন খাতে ব্যয় বৃদ্ধি করা উচিত, যা সরাসরি দরিদ্র জনগণের সক্ষমতা ও আয়ে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। বৃহৎ অবকাঠামোর পাশাপাশি দক্ষতা, উন্নয়ন, গ্রামীণ শিল্প, কৃষিভিত্তিক কর্মসংস্থান ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সহায়তায় বিনিয়োগ অধিক গুরুত্ব দিয়ে বৃদ্ধি করা দরকার।
লেখক : প্রাবন্ধিক
Facebook Comments Box

Posted ১:৪২ অপরাহ্ণ | শনিবার, ০২ আগস্ট ২০২৫

manchitronews.com |

সম্পাদক
এ এইচ রাসেল
Contact

5095 Buford Hwy. Atlatna Ga 30340

17709121772

deshtravels7@gmail.com

error: Content is protected !!